মৃত্যুর পর অঙ্গ দান কি শাস্ত্র সিদ্ধ?

0
1318

 

নিমাই নিতাই দাস: আজ না হোক কাল প্রত্যেক আয়ুর্বেদিক গুরু ও অনুশলীলনাকরীদের কোনো শিক্ষার্থীর বা রোগীর চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কিত কিছু জটিল প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই দিতে হবে। যদিও আমি বিশ বছরেরও অধিক অভিজ্ঞতা অনুসারে এমন সব প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেছি। সম্প্রতি একজন অ্যালোপ্যাথিক মেডিকেল বিদ্যালয়ে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ স্থানান্তর বিষয়ে অধ্যয়নরত একজন ভারতীয় ছাত্র সম্প্রতি ১২ বছরের একটি ছেলের কাছ থেকে হার্ট বা হৃদপি- দান বিষয়ে একটি অভিজ্ঞতা লাভ করে। তার প্রশ্নগুলো ছিল সংযমী: জীবন্ত হৃদপি- অপসারণ কি হত্যার সামিল? মৃত্যুর পর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দান করা আয়ুর্বেদিক প্রেক্ষাপট থেকে কতটা গ্রহণযোগ্য? যদি এক বা ততোধিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মৃত্যুর সময় স্থানান্তর করা হয় এবং বাকী শরীরটি দাহ করা হয় তবে আত্মার কি গতি হবে? যিনি এই সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গ্রহণ করবেন তারই বা কি অবস্থা হবে? যদি কোনো দেহ এত অসুস্থ থাকে যে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পুনঃসংস্কার করা দূরূহ, তবে সে ক্ষেত্রে কি স্থানান্তর করা উচিত?
বৈদিক শাস্ত্রানুসারে জীব (আত্মা) হৃদয়াভ্যন্তরে অবস্থান করে। [প্রশ্ন উপনিষদ (৩/৬)]। বৃহদারণ্যক উপনিষদ (৪/৩/৭) এ বর্ণিত আছে, “এটি সেই ব্যক্তি যে ইন্দ্রিয় দ্বারা গঠিত এবং যেটি হলো হৃদয়াভ্যন্তরে অবস্থিত একটি আলোক”। যখন জীব আত্মা ছেড়ে চলে যায় তখনি প্রকৃতপক্ষে তার শারীরিক মৃত্যু ঘটে। এছাড়া জীবের শারীরিক মৃত্যু অনুধাবন বিষয়ে শাস্ত্রে আর কোন উল্লেখ নেই। যখন হৃদস্পন্দন থাকে তখন অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে যে, জীব শরীরকে জীবন্ত বা সজীব রেখেছে এবং ঐ অবস্থায় অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অপসারণ করাকে হত্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মৃত্যুর পর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করা রোগী হত্যার পর্যায়ে না পড়লেও এর মাধ্যমে অন্যান্য সমস্যার সৃষ্টি হয়। জীব (চিন্ময় ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যেমন পরমহংস সন্ন্যাসীদের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম রয়েছে) তার জড় শরীরের প্রতি আসক্ত হওয়ায় এমনকি শারীরিক মৃত্যুর পরও ঐ শরীরটি ছেড়ে যেতে চায় না বা ছেড়ে যেতে বিলম্বিত করে। এজন্যে মৃতদেহকে দাহ করা হয় যাতে তার জড় শরীরটির অস্তিত্ব বর্তমান না থাকে। দাহ করার সময় নিয়মানুসারে মস্তকের খুলি চূর্ণ করা হয় যাতে ভস্মীকরণ প্রক্রিয়া সুসম্পন্ন হয় এবং সে সাথে ইন্দ্রিয়গুলোসহ জীবনী শক্তি যথাযথভাবে অবমুক্ত হয়। এভাবে যারা জীবনের প্রতি আসক্ত তাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দান করা অনুচিত। কেননা তাদের সূক্ষ্ম শরীর (মন, বুদ্ধি ও অহঙ্কার সম্বলিত) ও কারণ শরীর (অহঙ্কার, মিথ্যা অহঙ্কার সম্বলিত শরীর) এই প্রকার আসক্তি গ্রহীতার শরীরে স্থানান্তর করতে পারে। এমনকি গ্রহীতা সেটি সূক্ষ্ম ও কারণ শরীরের আরো বিভিন্ন প্রভাবের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।
অঙ্গ প্রত্যঙ্গ স্থানান্তর প্রক্রিয়াটি এমন একটি মেডিকেল প্রক্রিয়া যেটিকে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর উল্লেখ করেছেন, “দেহ ও আত্মাকে একসাথে ধরে রাখার একটি অতিরঞ্জিত প্রচেষ্টা মাত্র।” এই প্রক্রিয়াগুলো ভূক্তিকে (স্থূল ও সূক্ষ্ম দেহের ইন্দ্রিয়তৃপ্তি ও আসক্তি) বর্ধিত করে এবং এগুলোকে ‘উগ্র কর্ম’ হিসেবে পরিহার করা উচিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here