মুক্তাত্মাদের কবি

0
38
জয়দেবের পদ্যগীতে এত সুন্দরভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলাবিলাস বর্ণনা করা হয়েছে যে, শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু রূপে আবির্ভূত হয়ে সেগুলো শ্রবণ করে মুর্ছিত হতেন।

সত্যরাজ দাস


শ্রীল ব্যাসদেব আজ থেকে ৫ হাজার বছর পূর্বে বৈদিক শাস্ত্র রচনা করেছিলেন এবং তখন থেকে অনেক মহান ভক্ত ব্যাসদেবের রচনার সারতত্ত্ব অনুসরণ করে এবং তাদের নিজেদের উপলব্ধির আলোকে বৈদিক সাহিত্য কর্ম সৃষ্টি করেছেন। তেমন একজন শুদ্ধভক্ত হলেন জয়দেব গোস্বামী। যিনি বার শতাব্দীতে গীত গোবিন্দ রচনা করেছিলেন। যেটি হলো সমস্ত বৈষ্ণব সাহিত্যের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কর্ম। জয়দেব গোস্বামী আবির্ভূত হয়েছেন পশ্চিম বঙ্গের কেণ্ডুলি গ্রামে। তাঁর পিতার নাম ছিল ভোজদেব ও মাতার নাম হল শ্রীমতি রামা।
তাঁর শৈশব সম্পর্কে তেমন একটা অবগত না হলেও এটুকু সবাই অবগত যে, তিনি খুব অল্প বয়সেই সংস্কৃত পণ্ডিত হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন এবং বাল্যকাল থেকেই পারমার্থিক জীবনের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। অনেক বৈষ্ণব তাকে সুরের অবতার হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
যুবক বয়সে জয়দেব অনেক তীর্থস্থান ভ্রমণের পর জগন্নাথপুরী ভ্রমণ করেছিলেন। সেখানে পদ্মাবতীর সাথে তাঁর বিবাহ হয়। পদ্মাবতী জগন্নাথের বিগ্রহের প্রতি অত্যন্ত ভক্তি পরায়ন ছিলেন। জয়দেবও ভগবান জগন্নাথের গভীর প্রেমে উদ্ভাসিত হয়েছিলেন। পুরী এবং ভগবান শ্রীজগন্নাথের সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষিত হয়ে তিনি গীত গোবিন্দ রচনা করেছিলেন এবং তা বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে দ্রুতই বিস্তৃত হয়েছিল।
সে সময়ে পুরীর তৎকালীন রাজা গজপতি পুরুষোত্তম দেব জয়দেবের প্রতি ঈর্ষা পরায়ণ হন এবং শীঘ্রই তাকে প্রতিদ্বন্দিতায় আহ্বান জানান। রাজা নিজেকে জয়দেবের চেয়েও শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন এবং অভিনব ‘গীত-গোবিন্দ’ নামে একটি রচনা কার্য প্রকাশ করেছিলেন। একদিন তিনি তার উপদেষ্টাদের বলেছিলেন তার সেই রচনা কার্য সর্বত্র প্রচার করার জন্য। তিনি জয়দেবের চেয়েও নিজের রচনা কার্যকে অধিক জনপ্রিয় করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাজার নিজের লোকেরাই এটিকে হাস্যকর উদ্যোগ হিসেবে দেখেছিলেন। কেননা তারা জানতেন সূর্যের সঙ্গে একটি প্রদীপের আলোর তুলনা মূৰ্খামী।
তবুও রাজা নাছোড়বান্দা ছিলেন। শীঘ্রই এক বিতর্কিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল এবং রাজার ব্রাহ্মণগণ সিদ্ধান্ত নিলেন এক রাতের জন্য ভগবান শ্রীজগন্নাথের সম্মুখে জয়দেব ও রাজার উভয় রচনা কার্যই রাখা হবে। সকালের মধ্যেই ভগবান যেটি সিদ্ধান্ত নেন সেটিই হবে। পরদিন প্রত্যুষে ভক্তরা দেখতে পায় যে বিগ্রহের বক্ষে ‘গীত গোবিন্দ’ জড়িয়ে আছে এবং রাজার গীত গোবিন্দ মেঝেতে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এর মাধ্যমে ভগবানের কি সিদ্ধান্ত তা স্পষ্ট হয়ে যায়।
এভাবে জয়দেবের খ্যাতি ভারত জুড়ে বিস্তৃত হয় এবং ভারতের প্রতিটি প্রধান প্রধান মন্দিরে ও রাজ দরবারে তার ‘গীত গোবিন্দ’ আবৃতি বা গাওয়া হয়। তাঁর রচনা কার্য পনের শতাব্দীর শুরুর দিকে এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে, ভারতীয় শিল্পের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে অন্যান্য ধর্মীয় শাস্ত্রের চেয়ে তার রচনা কার্য অধিক শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করা হয়। ‘গীত গোবিন্দ’ রাজস্থানের উত্তর প্রদেশে গুজরাটে রচনা করা হয়। ১৪৫০ সালে প্রথম সচিত্র পাণ্ডুলিপি প্রকাশিত হয় গুজরাটে। ১৫৯০ সালে ‘গীত গোবিন্দ’ সিরিজ অঙ্কন করা হয় এবং সেটি বোম্বের প্রিন্স অব ওয়েলস মিউজিয়ামে এখনো প্রদর্শিত হয়।
এমনকি মোঘল সম্রাট আকবর জয়দেবের রচিত ‘গীত গোবিন্দের প্রতি আসক্ত ছিলেন এবং একটি বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ সচিত্র পাণ্ডুলিপির মর্যাদা লাভ করে।


‘গীত গোবিন্দ’ রাস্থানের উত্তর প্রদেশে গুজরাটে রচনা করা হয়। ১৪৫০ সালে প্রথম সচিত্র পাণ্ডুলিপি প্রকাশিত হয় গুজরাটে। ১৫৯০ সালে ‘গীত গোবিন্দ’ সিরিজ অঙ্কন করা হয় এবং সেটি বোম্বের প্রিন্স অব ওয়েলস মিউজিয়ামে এখনো প্রদর্শিত হয়।

তার পান্ডুলিপি তৎকালীন মোঘল ধরণে প্রকাশিত হয় এবং এর মাধ্যমে ধর্ম ও সংস্কৃতির এক মেলবন্ধন প্রতিষ্ঠিত হয়। এজন্যে তৎকালীন মোঘলদের বিভিন্ন বস্ত্রে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এক মহান ভক্ত শ্রীমতি রাধারাণীর চিত্রকর্ম দেখা যেতো।
পরবর্তীতে জয়দেব বাংলার রাজা লক্ষ্মণসেনের রাজ দরবারের কবি হিসেবে অভিসিক্ত হন এবং বার শতাব্দীর অর্ধেক সময় পর্যন্ত সেখানে তিনি অভিসিক্ত ছিলেন। জয়দেবের প্রতি রাজার এই সমর্থন গজপতি পুরুষোত্তম দেবের কাছে অপমানজনক হিসেবে প্রতিভাত হয় এবং তাই তিনি শীঘ্রই পুরীর পদ থেকে বরখাস্ত হন।
জয়দেবের সৃষ্টকর্ম বছরের পর বছর ধরে উত্তরোত্তর বিখ্যাত হতে থাকে এবং তার অপ্রকটের পর এই অমর গীত গোবিন্দের প্রতিটি শব্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের জয়-বিজয় দ্বারে খোদাইকৃতভাবে প্রদর্শিত হয়।
জয়দেবের সৃষ্টকর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশংসাপত্রটি প্রাপ্ত হয় চৈতন্য মহাপ্রভুর মাধ্যমে। যিনি এই ‘গীত গোবিন্দ’ স্বীকার করেছিলেন এবং মহাপ্রভুকে তা গেয়ে শোনানো হত। ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হলেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। যেহেতু জয়দেবের ‘গীত গোবিন্দ’ স্বয়ং ভগবানকে সন্তুষ্ট করেছিল। তাই সেটি অবশ্যই সর্বাঙ্গসুন্দর এক অনবদ্য কম বলে বিবেচ্য হয়। পরবর্তীতে শ্রীল প্রভুপাদ বিবৃতি দিয়েছেন যে, জয়দেবকে একজন মহাজন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। মহাজন মানে হল সেই মহাত্মা যিনি যথাযথ পদ্ধতিতে ভক্তিমূলক সেবা প্রদর্শনের জন্য ভগবানের নির্দেশে এই জড় জগতে আবির্ভূত হন। এভাবে তিনি ব্রহ্মা, নারদ, প্রহ্লাদের মতো উচ্চ স্তরের ব্যক্তিদের সমপর্যায় ভুক্ত। তাঁর গভীর সৃষ্টিকর্মের জন্য তিনি এই অবস্থানে উন্নীত হয়েছেন। ‘গীত গোবিন্দ’ রচনায় শ্রীমতি রাধারাণী ও শ্রীকৃষ্ণের লীলা বিলাসের মাধ্যমে চরম পারমার্থিক সত্য সম্পর্কে তুলে ধরা হয়েছে। সংস্কৃতের মাধ্যমে শাস্ত্রীয় বিষয়গুলি নাট্যকর্মের মাধ্যমে এতটা দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে যে, জয়দেব সেখানে চিন্ময় প্রেম, মিলন, ও বিরহের মাধ্যমে প্রাণ সঞ্চার করেছেন।
একজন যথার্থ শিক্ষক হিসেবে জয়দেব গোস্বামী খুব সতর্কতার সহিত এই গীত গোবিন্দ’ উপস্থাপন করেছেন। কেননা তিনি চাননি এর পাঠকগণ রাধাকৃষ্ণের প্রেমময়ী লীলাবিলাস কোনোরূপ কামুক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে ভুল করুক। রাধাকৃষ্ণের মিলন হলো পারমার্থিক সম্পর্কের সবচেয়ে উন্নত পর্যায় যার বিকৃতি রূপ হলো জড় জাগতিক তথাকথিত সম্পর্ক সমূহ।
এই সম্পর্কিত ভ্রান্তি নিরসনের জন্য মহান বৈষ্ণবাচার্যগণ সুপারিশ করেছেন প্রথমে পারমার্থিক শিক্ষা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা প্রাপ্ত হওয়ার জন্য শ্রীমদ্ভগব গীতার মতো শাস্ত্র অধ্যয়ন করা এবং পরবর্তীতে রাধাকৃষ্ণের অপ্রাকৃত লীলাবিলাসের অধ্যয়নের প্রতি অগ্রসর হওয়া। এজন্যে গুরু পরম্পরা ধারায় একজন যথার্থ পারমার্থিক গুরুদেবের দিক নির্দেশনা প্রয়োজন অন্যথা এসমস্ত শিক্ষা ভুল পথে পরিচালিত হওয়া আসংখ্যা রয়েছে। শ্রীল প্রভুপাদ লিখেছেন, “জয়দেব ও অন্যান্য মহান আচার্যদের সৃষ্টিকর্ম কেবল মাত্র মুক্ত আত্মাদেরই অধ্যয়ন করা উচিত।”
জয়দেব গোস্বামী তাঁর ‘গীত গোবিন্দে’র শুরুতেই একটি সুন্দর প্রার্থনা রচনা করেছিলেন। সেটি হল ‘দশাবতার স্তোত্র’। সেই প্রার্থনায় তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভগবত্তা সম্পর্কে তুলে ধরেছেন। যাতে করে ভগবানের লীলা বিলাস সম্পর্কে কোন রূপ ভ্রান্তি থাকলে তা প্রশমিত হয়। দশাবতার স্তোত্রের শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দশাবতারের লীলা বিলাস সম্পর্কে সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন:
হে কেশব! হে জগদীশ! হে হরে! প্রলয়কালে যখন বেদরাশি সমুদ্রজলে ভাসমান হতে লাগল, তখন অপনি মীনশরীর ধারণ করে অক্লেশে নৌকার ন্যায় সেই বেদরাশি ধারণ করে রেখেছিলেন। মীনশরীরধারী আপনার জয় হোক ॥ ১ ॥
হে কেশব! আপনার অতি বিপুলতর পৃষ্ঠদেশে পৃথিবী ধারণ জনিত ব্রণচিহ্ন জাত হয়েছে। আপনি কূর্ম (কচ্ছপ) রূপ ধারণ করলে অপনার সেই পৃষ্ঠদেশে এই পৃথিবী অবস্থিতা ছিল। হে কূর্মশরীরধারী জগদীশ! হে হরে! আপনি জয়যুক্ত হোন ৷৷ ২ ৷৷
হে কেশব! আপনি যখন শূকরমূর্তি ধারণ করেছিলেন, তখন চন্দ্রের কলঙ্ক-রেখার ন্যায় আপনার দত্তাগ্রে এই পৃথিবী সংলগ্না ছিল। হে শূকররূপী জগদীশ! হে হরে! আপনার জয় হোক ॥ ৩ ॥
হে কেশব! যখন আপনি নৃসিংহরূপ ধারণ করেছিলেন, তখন আপনার করকমলের নখাবলী অতীব আশ্চর্যাবহ অগ্রভাগযুক্ত হয়েছিল। আপনি ঐ নখদ্বারা দৈত্যপতি হিরণ্যকশিপুর তনুভূঙ্গটিকে বিদলিত করেছিলেন। হে নৃসিংহরূপী জগদীশ! হে হরে! আপনার জয় হোক ॥ ৪ ॥
হে জগদীশ! আপনার পদনখচ্যুত সলিলে নিখিল লোকের পবিত্রতা সম্পাদিত হয়। আপনি অদ্ভুত বামনরূপ ধারণ করে পদক্ষেপে ত্রিপাদভূমি প্রার্থনায়) বলিরাজাকে ছলনা করেছিলেন। হে বামনরূপী কেশব! হে হরে! আপনার জয় হোক ॥ ৫ ॥
হে জগদীশ! আপনি পরশুরাম মূর্তি পরিগ্রহ করে ক্ষত্রিরুধিরময় সলিলে জগৎ আপ্লুত করতঃ জগতের পাপ হরণ করেছিলেন। হে ভৃগুপতিরূপী কেশব! হে হরে! আপনার জয় হোক ৷৷ ৬ ৷৷
হে কেশব! আপনি রাম আকৃতি পরিগ্রহ করে রাবণের দশমুণ্ড ছেদনপূর্বক রমণীয় বলিস্বরূপ দিপতিগণকে উপহার প্রদান করেছিলেন। হে জগদীশ! হে হরে! রামশরীরধারী আপনার জয় হোক ৷৷ ৭ ৷৷
হে কেশব! আপনি হলধরমূর্তি ধারণ করে স্বীয় শুভ্র কলেবরে জলদ-শ্যামল বর্ণ বস্ত্র ধারণ করেছিলেন এবং তা আপনার হলাকর্ষণ-ভয়ে ভীতা যমুনার নীলকান্তিই প্রকাশ করেছিল। হে জগদীশ! হে হরে! হলধররূপী আপনি জয়যুক্ত হোন ॥ ৮ ৷৷
হে কেশব! হে জগদীশ! পশুবধদর্শনে আপনার সকরুণ হৃদয় আর্দ্রীভূত হলে আপনি হিংসার দোষ প্রদর্শনপূর্বক (পশুবধাত্মক) যজ্ঞবিধান প্রবর্তক বেদের অপবাদ দিয়েছিলেন। হে হরে! বুদ্ধশরীরধারী আপনি জয়যুক্ত হোন ॥ ৯ ॥
হে কেশব! আপনি যুগাবসানে ম্লেচ্ছকুলের সংহারার্থ ধূমকেতুর ন্যায় আবির্ভূত হয়ে করকমলে ভীষণ-দর্শন অসি ধারণ করেন। হে জগদীশ! হে হরে! কল্কিশরীরধারী আপনি জয়যুক্ত হোন ॥ ১০ ॥


 

জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here