মা দূর্গা:সর্বকালের রহস্য উন্মোচন

0
833

ভদ্র বলরাম দাস:
আজকের রিমোট কল্ট্রোল প্রযুক্তির দ্বারা দূর হতে বিস্ময়কর কার্য সম্পাদনের ব্যাপারটি দেখে যে কেউ এটা অনুধাবন করতে পারে যে আরো বৃহৎ মস্তিক দ্বারা আরো দূর হতে এ জগৎকে পরিচালনা নিশ্চয়ই সম্ভব। কিন্তু অল্প বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাছে তা নিছক একটি পৌরানিক গল্প মাত্র।
দূর্গাপূজা উৎসবে বিশ্বজুড়ে মা দূর্গা পূজিতে হন। ভারতবর্ষে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে কোটি কোটি মানুষ দৈনন্দিন জীবন থেকে বেরিয়ে জগজ্জননী মায়ের আশির্বাদ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন পূজামণ্ডপে পরিভ্রমণ করে। এদের মধ্যে ক’জনইবা ভাবেন, “প্রকৃতপক্ষে মা দূর্গা কে? তিনি সত্যিই একজন ব্যক্তি নাকি একটি প্রতীকমাত্র?” ‘মা দূর্গা-সকল রহস্যের ঊর্ধ্বে গমন’ শীর্ষক আমার পূর্ববর্তী প্রবেন্ধ আমি মা দূর্গা তার শক্তি এবং তাঁর যথার্থ অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে জানার উপায় সম্পর্কে সবিস্তার লিখেছিলাম।
বৈদিকশাস্ত্রকে ‘অলৌকিক কাহিনী’ বা ‘অবাস্তব’ বলে আখ্যা দেওয়া বর্তমান তথাকথিত বিদ্বান ও নেতৃবৃন্দের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হল কেন এ জগত সৃষ্টি হয়, স্থিতি লাভ করে ও লয়প্রাপ্ত হয় সে সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের স্বল্পতা এক কথায় বলতে গেলে, কুয়োর ব্যাঙের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরের বিবরণ রূপকথা বা কল্পকাহিনীর মতোই মনে হয়। কিন্তু এর ফলে প্রশান্ত মহাসাগর বা এর ভেতরের অদ্ভুত জীবকুল কাল্পনিক হয়ে যায় না। তেমনি, অসংখ্য লেখন যারা নিজেদের বিদ্বান বলে মনে করে তারা মা দূর্গাকে বিশ্বশক্তির একটি প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করেছ্ অন্যকথায় তাদের দৃষ্টিতে মা দূর্গা একটি কল্পচরিত্র। জ্ঞানের বিস্তার ঘটতে হলে কারো চিন্তাশক্তিকেও বিস্তৃত করা উচিত, এমনকি তা একটি কল্প বা পৌরাণিক তত্ত্ব হলেও। বৈজ্ঞানিক বা গাণিতিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও আমরা কোন অজ্ঞাত বস্তুকে স্বীকার করে তার সাহায্যে গবেষণার বা গাণিতিক সমাধানে আসি। এর জন্য মনের উদারতার প্রয়োজন।
‘দূর্গা’ শব্দটি ‘দূর্গ’ হতে এসেছে, যার অর্থ আশ্রয়স্থল,গোপনস্থল বা কারাগার। যিনি দুর্গের পরিচালক তাকে বলা হয় দূর্গা। তিনি জড়সৃষ্টির সর্বময় ক্ষমতার অধিকারিণী। এ জগত একটি কারাগার যেখানে ভগবানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী জীবদের সংশোধনের জন্য রাখা হয় ঠিক যেমন, সরকার দুষ্কৃতকারী ও বিদ্রোহী দেরকে সংশোধন করার জন্য কারাগারের নিক্ষেপ করে।
এজগতের প্রতিটি জীব কারাবদ্ধ এবং সেকারণে তাদের অনিচ্ছাসত্ত্বেও কষ্টভোগ করতে হয়। এ ক্লেশকে নিভাগে ভাগ করা হয়: আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক। আধ্যাত্মিক ক্লেশ হল শরীর ও মন হতে প্রাপ্ত ক্লেশ, আধিভৌতিক ক্লেশ হল অপর জীব হতে প্রাপ্ত ক্লেশ এবং আধিদৈবিক ক্লেশ হল প্রকৃতি বা দেবতা কর্তৃক প্রদত্ত ক্লেশ। মা দূর্গার হাতে যে ত্রিশূল তা উপর্যুক্ত তিন ধরণের ক্লেশের প্রতীক। এ ত্রিশূল শুধু একটি প্রতীকমাত্র নয়, এটি বাস্তব এবং এটি তিনি দুষ্কৃতকারীর জন্য সত্যিই ব্যবহার করেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি এ অস্ত্র সবসময় ব্যবহার করেন না। কারণ তিনি দূর হতে তার বিভিন্ন প্রতিনিধি (মহামারী, যুদ্ধ, ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি বন্যা, খরা প্রভৃতি) ব্যবহার করে তার কার্য সম্পাদন করেন থাকেন।
বস্তুর ভগবানের ইচ্ছা ও কৃপাতেই মানুষ রিমোট কল্ট্রোল প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে যাতে মানুষ সহজে এটা বুঝতে পারে যে আরো উন্নত বুদ্ধি (ভগবান)-এর দ্বারা আরো দূরবর্তী স্তান হতে দেবতাদের এ জগত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু অল্পবু্িদ্ধ সম্পন্ন মানুষের কাছে কল্পকথা ছাড়া আর কিছু নয়।
অল্পকয়েকটি পূজামণ্ডপ ছাড়া অধিকাংশ মণ্ডপে উচ্চৈস্বরে চলচ্চিত্রের গান বাজানো হয়, মানুষেরা ধূমপান, মদ্যপান অশ্লীল নাচ ও বিভিন্ন অমেধ্য খাবার; যেমন মাছ, মাংস ডিম প্রভৃতি উপভোগের মাধ্যমে পূজার উদযাপন করে মূলত, টিভি ও নিনেমার নোংরা প্রভারই এর জন্য দায়ী। এছাড়া মায়ের মূর্তিতে নায়ক-নায়িকাদের বিকৃত ও অশ্লীল সাজ রীতিমত ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এভাবে কি মায়ের পূজা আমাদের করা উচিত? এমন করে কি দূর্গাপূজা উদযাপন করা উচিত? উৎসব অঙ্গনে মাকে আহ্বানে করে এসব করা মানে মাকে সোজাসুজি অপমান করা।
সরকারের এখনই এ অপরাধ বন্ধ করা এবং কলস্বরূপ আসন্ন বৃহৎ দুর্ভোগের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা উচিত।
শ্রীল প্রভুপাদ বলেন, “যে সমস্ত বদ্ধজীব জড়াপ্রকৃতি-জাত দেহকে নিজের স্বরূপ বলে মনে করে ও তা নিয়ে অহংকার করে এবং ভগবানকে জানতে প্রয়াসী নয় তারা ভগবানের মায়াশক্তি দ্বারা দণ্ডিত হয়। এ মায়াশক্তি মহাকালী, চণ্ডী ও দূর্গা প্রভৃতি নামে পরিচিতি, যিনি ত্রিতাপ ক্লেশরূপ ত্রিশূলের দ্বারা তাদের ক্ষতবিক্ষত করেন। এ আসুরিক প্রবৃত্তিসম্পন্ন জীবকূলকে জোরপূর্বক মায়ার দাসত্ব করতে বাধ্য হয়।
ব্রহ্মসংহিতার গৌণ স্রষ্ট্রা ব্রহ্মা পরমেশ্বর ভগবানের স্তুতি করে এ জগতকে দেবীধাম নামে বর্ণনা করছেন:
                                    সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়সাধনশক্তিরেকা
                                    ছায়েব যস্য ভুবনানি বিভার্তি দূর্গা।
                                   ইচ্ছানুরুপমপি যস্য চ চেষ্টতে সা
                                  গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি॥(৪৪)
স্বরূপশক্তি বা চিচ্ছত্তির ছায়া-স্বরূপা প্রাপঞ্চিক জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়-সাধিনী মায়া -শক্তিই ভুবন-পূজিতা ‘দূর্গা; তিনি যাঁহার ইচ্ছানুরূপ চেষ্টা করেন, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজন করি॥
ইস্‌কন প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের গুরুদেব শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর এ শ্লোকের তাৎপর্যে লিখেছেন:
এজগত যেখানে ব্রহ্মা জন্মগ্রহণ করেছেন এবং গোলোকাধিপতি শ্রীকৃষ্ণের স্তুতি করেছেন তা হল দেবীধাম, সেখানে যেখানে চৌদ্দটি লোক বা ভুবন রয়েছে। দূর্গাদেবী হলে এ জগতের অধিষ্ঠাতী দেবী। তিনি দশভুজা, যা দশবিধ সংস্কারকে ইঙ্গিত করে। তাঁর বাহন সিংহ পরাক্রমের প্রতীক, মহিষাসুর বধ করার মাধ্যমে দুষ্টের দমনকারী। তাঁর দই পুত্র কার্তিক ও গণেশ যথাক্রমে সৌন্দর্য ও সিদ্ধির প্রতিনিধি এবং দুই কন্যা লক্ষ্মী ও সরস্বতী হল জড় ঐশ্বর্য ও বিদ্যার দেবী। তাঁর হাতে বিশটি অস্ত্র আছে বেদনির্দেশিত বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের প্রতীক যা দ্বারা অধর্ম নাশ হয়। তাঁর হাতের সর্পটি মহাগ্রাসী কালের প্রতীক। এভাবে দেবী দূর্গা হলে বহুবিধ রূপের অধিকারিনী। দূর্গা হলেন দূর্গের নিয়ন্ত্রক, যা কারাগারতুল্য। যখন তটস্থাশক্তি জীব ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা বিস্মৃত হয়, তখন তাকে এ কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। এখানে কর্মচক্র হল দণ্ডদানের হাতিয়ার। পতিত জীবদের দণ্ডদানের মাধ্যমে পরিশুদ্ধ করার দায়িত্বটি দেবী দুর্গার উপর ন্যস্ত। তিনি শ্রী গোবিন্দের ইচ্ছায় দণ্ডদানের কার্যের সতত নিয়োজিত। কিন্তু, কোন তত্ত্বদর্শী শুদ্ধভক্তের সংস্পর্শে আমার মাধ্যমে যদি কোন বদ্ধজীব শ্রীকৃষ্ণকে বিস্মৃত হয়ে থাকার বিষয়টি বুঝতে পারে ও সাথে সাথে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রেমময়ী সেবা অভিলাষ জাগ্রত করে তখন শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছায় দূর্গাদেবী তাকে মুক্তিদানের ব্যবস্থা করেন।

তাই সকলকে মা দুর্গা অপকট কৃপা লাভ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর অকপট কৃপা লাভ করতে হবে শ্রীকৃষ্ণকে নিঃস্বার্থ সেবা প্রদানের মাধ্যমে। ধন, ঐশ্বর্য, রোগমুক্তি, স্ত্রী-পুত্র লাভ, প্রভৃতি হল মা দূর্গার কপট কৃপা। তাঁর দশ-ভূজা রূপ হল জগতের ভোগ-লোলুপ জীবদের মোহিত করে রাখা। জীব ভগবানের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ। কিন্তু কৃষ্ণসেবা ভুলে সে যখন মায়ার চকে চিক্যে অভিভূত হয়, তখন মায়ার মোহময়ী ঘূর্ণিপাকে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে সে এগার ইন্দ্রিয়বিশষ্ট পঞ্চমহাভূতে গড়া জড় শরীর ধারণ করতে বাধ্য হয়। এ চক্রে পতিত হয়ে স্বর্গ নরকাদি লোকসমূহে সে নিরন্তর ঘুরপাক খেতে থাকে। এছাড়া সূস্থ দেহের সাথে রয়েছে সুক্ষ্মদেহ। সুক্ষ্ণ হই একদেহ হতে মুক্ত হতে পারে না। এটি সম্পূর্ণ অজ্ঞান ও অসৎ বাসনায় পূর্ণ। মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত জীব তার থেকে নিস্তার পায় না। সৌভাগ্যক্রমে কেউ যদি মুক্তি পায়। সে এ জগতের বাইরের বিরজাকুণ্ডে স্নান করে হরিধামে প্রবেশ করে। এ সকল কার্য শ্রীকৃষ্ণের আদেশে মা দূর্গাই সম্পন্ন করেন। এভাবে, আমরা বুঝতে পারি যে মা দূর্গা ও তার কৃপাময়ী কার্যকলাপসমূহ কাল্পনিক নয়। তিনি একজন দিব্য ব্যক্তিত্ব, যিনি আমাদের জড়বুদ্ধিস্তরে অতীত এবং কেবল ঐকান্তিক প্রার্থনাও সেবার দ্বারা তাঁর দর্শন মেলে। প্রার্থনা কী ফল তা আমরা ছোট একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বুঝতে পারি। একটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আমরা কোন বন্ধুকে ডাকতে পারি, তাহলে অপ্রাকৃত ব্যক্তিকে প্রার্থনা-স্তুতির মাধ্যমে কেন ডাকা যাবে না? এটি কেবল এ সত্য উপলব্ধি বিশ্বাস ও পালনের ব্যাপার মাত্র। শ্রীল প্রভুপাদের করুনায় তাঁর অনুগামীদের বিস্তৃত প্রচারের ফলে আজ পাশ্চাত্য বাসীরা বৈদিক দর্শনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তাই, অন্তত যারা ভারতবর্ষে জন্ম নিয়েছেন তাদের এ সুযোগ গ্রহণ করা কর্তব্য ভারতের শাশ্বত জ্ঞান গ্রহণ করে পাশ্চাত্যবাসীদের দ্বারা বৈদিকশাস্ত্রকে কাল্পনিক কাহিনী আখ্যা দেওয়ার প্রচারণা প্রতিহত করতে হবে। বস্তুত, বৈদিক শাস্ত্র ও তার চরিত্রাবলীকে কাল্পনিক বলাটাই সবচেয়ে বড় কাল্পনিক ব্যাপার। এ ব্যাপারটিই বিশ্বে বিশৃঙ্খলার জন্ম দিচ্ছে। তাই সকল সমাজের মঙ্গলার্থে এ সত্যকে উপলব্ধি ও প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। হরেকৃষ্ণ! 

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ পত্রিকা অক্টোবর ২০১৮ সালে প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here