মহাদেব শিবের গীতা মাহাত্ম্য কীর্তন

0
1265

মহাদেব শিব বৈষ্ণব জগতে “বৈষ্ণবানাং যথা” বলে পরিচিত। কেননা শ্রীশিবজীর বৈষ্ণবত্ব শাস্ত্রে বহু স্থানে পরিলক্ষিত হয়। তারমধ্যে ভাগবতে প্রচেতাদের উপদেশ, পার্বতীদেবীকে শ্রীমদ্ভাগবত শোনানো, নারদ মুনিকে উপদেশসহ বহু ঘটনা রয়েছে। সেই রকমই একটি ঘটনা পদ্মপুরানের আলোকে শিব কর্তৃক পার্বতীর কাছে ভগবদ্গীতার ৫ম অধ্যায়ের বর্ণনা নিম্নে তুলে ধরা হল:
পার্বতীদেবী বলেছেন-হে প্রভু, সকল অপার্থিব সত্য আপনি অবগত এবং আপনার কৃপায় আমি লীলাপুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মহিমা শ্রবণ করেছি।
হে ভগবান, এখন আমি আপনার কাছে যা শ্রবণ করলে ভগবান কৃষ্ণের প্রতি ভক্তি বৃদ্ধি পায় শ্রীকৃষ্ণের মুখ-নিঃসৃত সেই শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার-মাহাত্ম্য শ্রবণে অভিলাষী।
শ্রীশিব বললেন- জলদ মেঘ বর্ণ যাঁর রূপ, পক্ষিরাজ গরুড় যাঁর বাহন, অনন্ত-শেষ (সহস্র-ফণা বিশিষ্ট নাগ) যাঁর শয্যা-সেই অপার মহিমা মণ্ডিত ভগবান বিষ্ণুকে আমি সর্বদা উপাসনা করি। তিনি একদা লক্ষ্মীদেবীকে ভগবদ্‌গীতার পঞ্চম অধ্যায়ের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে বলেন-
ভগবান বিষ্ণু বললেন-আমি এখন শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার পঞ্চম অধ্যায়ের অনন্ত মাহাত্ম্যের কথা বর্ণনা করব। মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ কর। মদ্রদেশে পুরু কুৎসাপুর নামে এক নগর ছিল। পিঙ্গল নামে এক ব্রাহ্মণ সেখানে বাস করত। বাল্যকালে তাকে বিভিন্ন প্রকার ব্রাহ্মণ্য-ক্রিয়াকলাপ ও বেদ শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু অধ্যয়নে তার কোন আগ্রহই ছিল না। যৌবনে পদার্পণ করে সে ব্রাহ্মণের বৃত্তি পরিত্যাগ করে বাদ্যযন্ত্র ও নৃত্য-গীত শিক্ষা শুরু করে। ধীরে ধীরে এই সকল বিদ্যায় সে এত বিখ্যাত হল যে স্বয়ং রাজা তার প্রাসাদে বাস করার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানালেন। সেখানে বাস করে ধীরে ধীরে সে পাপী জীবনে বেশি করে লিপ্ত হতে থাকল। সে পরদার গমন শুরু করে এবং সব রকমের পাপ-কাজে লিপ্ত ও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। রাজার সঙ্গে যতই তার হৃদ্যতা বাড়াতে লাগল, ততই সে তার পদগৌরবে গর্বিত হল। সে বিশেষ করে গোপনে রাজার কাছে অন্যের সমালোচনা করে মজা পেত। পিঙ্গলের স্ত্রী অরুণার এক নিচু পরিবারে জন্ম। সে ছিল খুবই কামুকী এবং বহু পুরুষের সঙ্গ-সুখ উপভোগে আসক্তা। তার স্বামী যখন তার কার্যকলাপ জেনে ফেলে, সে তখন স্বামীকে হত্যার করতে মনস্থ করে।
একদিন গভীর রাত্রিতে সে তার স্বামীর মুণ্ড কেটে শরীরটি বাগানে পুঁতে ফেলে। মৃত্যুর পর পিঙ্গল গভীর নরকে পতিত হয় এবং অনেক কাল যাতনা ভোগের পর সে শকুন হয়ে জন্মায়। এরপর অরুণা বহু পুরুষের সঙ্গে স্বেচ্ছায় বিহার করে যৌনরোগের শিকার হয়। অচিরেই তার যৌবনবতী দেহটি কুশ্রী কদাকার ও আকর্ষণহীন হয়ে পড়ে। মৃত্যুর পর তার নরকে গতি হয়। সেখানে সে দীর্ঘকাল নরক যন্ত্রণা ভোগের পর একটি স্ত্রী তোতাপাখির রূপ প্রাপ্ত হয়।
একদিন পাখিটি খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছিল। ইত্যবসরে শকুনটি পূর্ব-জন্মে যে পিঙ্গল ছিল, তোতাটিকে দেখে গত জন্মের কথা তার মনে পড়ে গেল, সে বুঝতে পারল যে এই পাখিটিই তার স্ত্রী ছিল। সে তার ধারাল চঞ্চুদ্বারা পাখিটিকে আঘাত করল এবং তোতাপাখিটি একটা মানুষের মাথার খুলিতে জমে থাকা জলের মধ্যে পড়ে মরে গেল। তখনই একজন শিকারী এসে শকুনটিকে শরবিদ্ধ করল। শকুনটি পড়ে গেল, তার মুণ্ডটিও ওই খুলির জলে পড়ল। শকুনটি মরে গেল।
অতঃপর যমদূতেরা এসে তাদের যমপুরীতে নিয়ে গেল। তাদের অতীতের পাপী-জীবনের কথা স্মরণ করে তারা খুবই ভীত হল। যমরাজের সামনে হাজির হওয়ার পর যমরাজ বললেন, “এখন তোমরা সর্বপাপ মুক্ত হয়েছ। তাই তোমরা এখন বৈকুণ্ঠে যেতে পার।” পিঙ্গল এবং অরুণা যমরাজকে জিজ্ঞাসা করল যে, তাদের মতো এমন পাপী কী করে বৈকুণ্ঠে যাবার অধিকার পেল।
যমরাজ উত্তর দিলেন, “গঙ্গার তীরে ভাট নামে ভগবান বিষ্ণুর এক মহান ভক্ত বাস করতেন। তিনি ছিলেন কাম-লালসা শূণ্য ও নির্লোভ। তিনি প্রতিদিন ভগবদ্‌গীতার পঞ্চম অধ্যায় পাঠ করতেন। তার মৃত্যুর পর তিনি সরাসরি বৈকুণ্ঠ গমন করেন।
প্রতিদিন ভগবদ্‌গীতার পঞ্চম অধ্যায় পাঠ করার ফলে তাঁর দেহ সম্পূর্ণ শুদ্ধ হয়। ঘটনাক্রমে তোমরা তাঁর মাথার খুলির সংস্পর্শে আসার ফলে তোমাদেরও বৈকুণ্ঠে প্রাপ্তি হয়। এটাই হল ভগবদ্‌গীতার পঞ্চম অধ্যায়ের মাহাত্ম্য। ভগবান বিষ্ণু বললেন-প্রিয়ে লক্ষ্মী, যমরাজের কাছ থেকে ভগবদ্‌গীতার মাহাত্ম্য শ্রবণ করার পর তারা খুবই আনন্দের সঙ্গে পুষ্পক রথে আরোহণ করে বৈকুণ্ঠে উপনীত হল। ভগবদ্‌গীতার পঞ্চম অধ্যায় যে শ্রবণ করবে, যত পাপীই হোক তার বৈকুণ্ঠ প্রাপ্তি হবে। হরেকৃষ্ণ!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here