মনের পরজীবীরা

0
126
পারমার্থিক জীবনের জন্য ক্ষতিকর পরজীবীদের আক্রমন। থেকে আমাদের মনকে কীভাবে রক্ষা করতে পারি।
চৈতন্য চরণ দাস
 
আমাদের মধ্যে অনেকেই হয়তাে জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে অশান্ত থাকি। তখন আমরা। শারীরিকভাবে ক্লান্ত নাহলেও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। এই ক্লান্তির ফলে অনেকেই অজ্ঞতাবশত সময় অপব্যয় করে নেশা আসক্তির মতাে পাপাচারের মাধ্যমে পরিত্রাণ খোঁজে। মানসিক ক্লান্তির অনেকগুলাে কারণ থাকতে পারে, তবে সবচেয়ে প্রধান কারণ হচ্ছে কামনা-বাসনা পালন ও বাস্তবায়নের চেষ্টা। ভগবদ্গীতার ষােড়শ অধ্যায়ের ২১ ও ২২নং শ্লোক নির্দেশ করছে-“এই বিধ্বংসী কামনা- বাসনাগুলােকে কাম, ক্রোধ ও লােভ নামক তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়।”
কাম (ইন্দ্রিয়তৃপ্তির বাসনা) ও লােভ বাসনা রূপ আগুনের জ্বালানি স্বরূপ, যেটি আমাদের মনে নানা লক্ষ্য ও বর্ণিল জল্পনা কল্পনামূলক স্বপ্নের রসদ যুগিয়ে মনকে উচ্চাভিলাষী করে তােলে। ফলে সেটি সৎ বা অসৎ যেকোনাে উপায়ে সেটি পাওয়ার জন্য মন অস্থির হয়ে ওঠে। এই ধরনের কামনা বাসনা অসংখ্য ও সীমাহীন। উপরন্তু এদের বেশিরভাগই বাস্তবিকভাবে দুপুরণীয়। ফলে চেতন বা অবচেতনভাবে আমাদের মনে বিরক্তির উদয় হয়। সেই বিরক্তি যখন অসহ্য হয় তখন সেটি ক্রোধরূপে প্রকাশিত হয়, যেটি আমাদেরকে কায়-মন-বাক্যে খিটখিটে মেজাজি অথবা হিংস পশুতে পরিণত করে। এভাবে কাম, ক্রোধ ও লােভ আমাদেরকে জীবনের সর্বোত্তম লক্ষ্য অর্জনের কক্ষপথ হতে বিচ্যুত করে। সেটি জাগতিক ও পারমার্থিক উভয়ক্ষেত্রেই বিদ্যমান। তখন আমাদের সমস্ত পরিকল্পনা ভ্রান্ত পথ অনুসরণ করে। তখন মনে হয় জীবনে হয়তাে আর কিছুই সম্ভব হবে না। আমরা মানসিকভাবে ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। এভাবে আমাদের মানসিক ক্লান্তির জন্য বাহ্যিক কারণগুলাের চেয়ে অভ্যন্তরীণ বা মানসিক কারণগুলােই বেশি দায়ী। কাম, ক্রোধ ও লােভ পরজীবীর মতাে আমাদের মনে অবস্থান করে মনের শক্তিকে শােষণ করে । এ কারণে ভগবদগীতা উপদেশ দিচ্ছে-এই সমস্ত মনােশক্তি হরণকারী পরজীবী হতে মনকে মুক্ত করে বাস্তব ও প্রকৃত লক্ষ্যের ওপর গুরুত্ব আরােপ করতে হবে। কিছু পাঠক অভিযােগ তুলতে পারেন-“এত তাড়া কিসের? আমি যদি হৃদয়ের সকল কামনা বাসনা পূরণ করতে নাও পারি, অন্তত কিছুতাে পূরণ করতে পারবাে। সবকিছু সত্ত্বেও সুখ আসে কামনা পূরণ হতে । তাহলে কেন কামনা-বাসনাকে পরজীবীর সাথে তুলনা করব?”
 
বুদ্ধিমত্তা ঠিক রাখা
 
জড় জাগতিক কামনা-বাসনাগুলাে পরজীবীর মতাে। কারণ তারা সর্বদা আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্যকে দূষিত এমনকি নষ্ট করে দেয় । যখন তারা আমাদেরকে লক্ষ্য হতে বিচ্যুত করে এবং জীবনের মূল চাহিদা হয়ে দাঁড়ায়। তখন তারা ধ্বংসাত্মক রূপে আবির্ভূত হয়। এই পরজীবীগুলাের (কাম, ক্রোধ ও লােভ) প্রভাব অধিকতর ভয়ংকর হয়ে ওঠে এবং জন্ম দেয় অবর্ণনীয় হতাশার। তাই এ বিষয়ে আশ্চর্যময় ও চ্যালেঞ্জিং সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করে ভগবদ্গীতার (৫.২২) শ্লোকে বলা হচ্ছে-
যে হি সংস্পর্শজা ভােগা দুঃখযোনয় এব তে।
আদ্যন্তবন্তঃ কৌন্তেয় ন তেষু রমতে বুধঃ ॥
বিবেকবান পুরুষ দুঃখের কারণরূপ ইন্দ্রিয়জাত বিষয়ভােগে আসক্ত হন না। হে কৌন্তেয়! এই ধরনের সুখভােগ আদি ও অন্তবিশিষ্ট। তাই, জ্ঞানী ব্যক্তিরা তাতে প্রীতি লাভ করেন না।
সমস্ত জড় কামনা-বাসনার মূল লক্ষ্য যে জড় সুখ উপভােগ করা বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা তা থেকে বিরত থাকেন। কেননা তারা উপলব্ধি করেছেন যে, জড় সুখভােগ কখনাে স্থায়ী আনন্দ দেয় না বরং নিয়ে আসে অন্তহীন, অশেষ দুঃখ। আমরা বুদ্ধিকে ভগবদগীতার উপরযুক্ত শ্লোকটিকে বােঝার জন্য তৈরি করতে পারি নিম্নের FIT (Futile, Insubstantial, Temporary) মডেলটির সাহায্যে আমরা যখন জড়সুখ লাভের জন্য প্রয়াস করি তখন তিনটি সম্ভাব্য ফলাফল আমরা পেতে পারি :
Futile (নিরর্থক) : আমরা সুখভােগের প্রয়াস করি কিন্তু সে সুযােগ আমাদের কখনােই আসে না। যেমন- আমরা অত্যন্ত আগ্রহভরে ভােজে যােগদান করি। দেখা গেল সবচেয়ে প্রিয় খাবারটিই সেই ভােজে নেই ।
Insubstantial (কাল্পনিক) : আমরা হয়তাে সুখভােগের সুযােগ পেতে পারি কিন্তু সেটি বিপরীত ফল দেয়। যেমন- ভােজে হয়তাে আকাঙ্ক্ষিত খাবারটিই পেলাম কিন্তু সেটির স্বাদ আশাপ্রদ নয় অথবা সেটি নিম্নমানের।
Temporary (ক্ষণস্থায়ী) : হয়তাে আমরা তৃপ্তি পেতে পারি কিন্তু সেই তৃপ্তি শীঘ্রই ফুরিয়ে যায়। সেই তৃপ্তি ক্ষণস্থায়ী, কারণ আমাদের ভােগ্য বস্তু সীমিত বা আমাদের ভােগ করার ক্ষমতা সীমিত। ফলে আমাদের অতৃপ্তির বেদনা পেতে হয়। যেমন : ভােজের কেকটি খুব সুস্বাদু কিন্তু অপর্যাপ্ত ছিল বা এত বেশি পরিমাণে ছিল যে তা ভােগ ক্ষমতার বাইরে।
এভাবে আমরা দেখতে পাই, জড় বাসনাগুলাে আমাদের সুখ দেয় না বরং হতাশার দিকে পরিচালিত করে; হয় আজ না হয় কাল। উপর্যুক্ত শব্দটির (FIT) বিশ্লেষণে দেখতে পাই আমাদের জড় বাসনাগুলাে পরজীবীর মতাে। পরজীবী যেমন তার আশ্রয় দানকারী শরীরকে ধ্বংস করে তেমনি জড় কামনা বাসনাগুলােও আশ্রয় দানকারীর মনকে ধ্বংস করে।
অবশ্য, প্রিয় বস্তু লাভের অসামর্থ্য কখনােই মারাত্মক বিষয় নয় কিন্তু জড়সুখ ভােগের এই বৈশিষ্ট্য/পরিণতি বােঝার অক্ষমতা একটি মারাত্মক বিষয় ।
কিছু কিছু জড় বাসনা দৃঢ়মূলভাবে মানুষ তার হৃদয়ে আজীবন ধারণ করে । সেটি তাকে এতটায় মােহাচ্ছন্ন করে রাখে যে, বস্তুটি প্রাপ্তির আশায় যেকোনাে দুষ্কর্ম করতে বাধ্য হয়।
অধিকাংশ যৌনাচারী কি লাগামহীন কামের দ্বারা তাড়িত নয়? কিংবা নিষ্ঠুর চাদাবাজরা যখন লােকের লক্ষ লক্ষ টাকা লুট করে নেয়, তখন তারা কি লােভের বশবর্তী হয়ে সেটি করে না? কিংবা ঠাণ্ডা মাথার খুনি যখন প্রতিশােধপরায়ণ হয়ে শত শত লােকদের হত্যা করে তখন সেটি কি অনিয়ন্ত্রিত ক্রোধের ফল নয়? যদি আমরা জাগতিক সুখের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য/পরিণতি বুঝতে সমর্থ হই তখন আমরা দেখতে পাব তার পেছনে রয়েছে মর্মান্তিক বিপর্যয়। এই জড় সুখ লাভের প্রয়াসীরা প্রায়ই অন্য ব্যক্তিদের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি নিজের জড় সুখ প্রাপ্তির যে আশা সেটিও মিথ্যা ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে এবং কখনােই পূরণ হয়না।
যদি তারা তাদের বুদ্ধিমত্তাকে উপযুক্তভাবে কাজে লাগায় তখন তারা হয়তাে দেখতে পাবে, এই জড় ভােগাকাঙ্ক্ষা শুধু মানসিক শক্তিকেই হরণ করছে না, পরজীবীর মতাে ধীরে ধীরে তার জীবনকেও ধ্বংস করে চলছে।

মনকে জাগতিক কামনা-বাসনারূপ পরজীবী থেকে মুক্ত করতে প্রয়ােজন একটি পদ্ধতিগত এবং যথাযথ পারমার্থিক চিকিৎসা।


অবশ্য, অনেকেই হয়তাে মনে নাও করতে পারে যে, জড় কামনা-বাসনা তাদেরকে ধর্ষক বা চাঁদাবাজের পর্যায়ে নিয়ে যাবে। জড় বাসনাগুলাে আমাদেরকে ধর্ষক বা চাদাবাজের পর্যায়ে নিয়ে না গেলেও সেগুলাে আমাদের মানসিক শক্তির ক্ষতিসাধন করে। উদাহরণস্বরূপ- যেই চিরঅতৃপ্ত কামকে আমরা ভ্রান্তভাবে ভালবাসারূপে হৃদয়ে লালন করি, সেটি হয়তাে একটি সুন্দর স্ত্রী বা স্বামী প্রাপ্ত হওয়ার বাসনারূপে আমাদের হৃদয়ে আচ্ছাদিত থাকে। যেটি আমরা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর হৃদয়ে সযত্নে পুষে রাখি। চলুন আমরা এই বিষয়টির ওপর FIT তত্ত্বটি প্রয়ােগ করি।
Futile (নিরর্থক) : ধরুন, একটি যুবক একটি যুবতীকে পেতে চায়, সে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করতে পারে। সে অন্য কোনাে যুবককে নিয়ে একই রকম পরিকল্পনা করে রেখেছে। সে হয়তাে অন্য কাউকে ভালবাসে।
Insubstantial (কাল্পনিক) : ধরা যাক, সে নারীটি প্রস্তাবটি গ্রহণ করল এবং ভালবাসার সম্পর্কটি এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হল কিন্তু কিছুদিন পর হয়তাে আবিষ্কার হল যুবকটি তাকে স্বপ্নে যে রকম ভেবেছিল সেরকম নয়, তার বিপরীত। তার মধ্যে এমন অনেক কিছুরই অভাব রয়েছে, যা আশা করেনি। এভাবে আমরা দেখতে পাই ধীরে ধীরে তার স্বপ্নটি অর্থহীন হয়ে যায়।
Temporary (ক্ষণস্থায়ী) : হয়তাে দেখা গেল যুবকটি প্রত্যাশিত ব্যক্তিটিকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে পেল এবং যুবতীটির সকল ক্রিয়াকর্ম তাকে পরিতৃপ্ত করে। সে আশানুরূপ। কিন্তু দেখা গেল নিয়তির পরিহাসে হয়তাে সম্পর্কটি আর টিকলই না, বা কোনাে দুর্ঘটনায় তাকে হারাতে হলাে। এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনায় তখন তার মন হতাশ ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সকল জড় কামনা বাসনা সেটি সর্বাধুনিক বাড়ি, গাড়ি, উচ্চপদ যা হােক না কেন সেগুলাের জন্য আমাদের চড়ামূল্য দিতে হয় বিনিময়ে হয়তাে কিছুই পাই না।
জড় বাসনা বহু প্রকারের হতে পারে, কিন্তু বৈদিক সাহিত্য এই জড় কামনাকে ছয়টি শ্রেণিতে বিভক্ত করে: কাম, ক্রোধ, লােভ, মােহ, মদ ও মাৎসর্য। এর মধ্যে গীতায় (১৬/২১) প্রথম তিনটিকে অত্যধিক ক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যা আমাদেরকে বিপথে চালিত করে। তাই এই প্রথম তিনটি শ্রেণির ওপর আমি বিশেষভাবে আলােকপাত করছি।
উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যখন আমরা জড় সুখকে পর্যালােচনা করি তখন দেখতে পাই যে, এগুলাে আমাদের মনোবলকে খুঁড়ে খুঁড়ে খায়, যেমন করে পরজীবী আমাদের শরীরকে চুষে চুষে খায়।
শুধু জানাটাই যথেষ্ট নয়, এই ধরনের জড় বাসনার প্রলােভন হতে পরিত্রাণের জন্য দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন প্রয়ােজন। যেমন করে বুদ্ধিমান ব্যক্তি পরজীবী দমনে সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তেমন করে হৃদয়ে যাতে জড়আকাক্ষা অনুপ্রবেশ করতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
 
প্রলােভন : স্বাগত সম্ভাষণ নাকি সতর্ক সংবাদ?
 
গীতা (৩.৪১) আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছে যে, এই প্রলােভন পাপের প্রতীক। সেটি প্রতারক ও জ্ঞাননাশক হয়ে ওঠার পূর্বেই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করতে হবে।
কিন্তু বুদ্ধি যখন জড় হয়ে পড়ে তখন আমাদের মন ভুল পরিস্থিতিকে সম্ভাষণ জানায়। তখন বুদ্ধির সেই বিশ্বাসঘাতক প্রলােভনের মুখােশ উন্মােচন করার কোনাে ক্ষমতা থাকে না। ফলে এই প্রলােভন অসহায় মনকে হাজারাে স্বপ্ন, আশার মায়াজালে বন্দি = করে। তখন আমরা ভ্রান্ত সুখ অনুভব করি এবং এভাবে এটি আমাদের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে। কিন্তু যদি বুদ্ধিভিত্তিক ভাবে সতর্ক থাকি তখন প্রলােভন আসা মাত্রই মন হতে সতর্ক বার্তা (এলার্ম) শুরু হয়ে যায়। তখন বুদ্ধি সঠিক কাজ শুরু করে ।
অন্য কথায় বিভিন্ন জড় প্রলােভনের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে জড় বাসনারূপ পরজীবীগুলােকে হৃদয়ের অভ্যন্তরে আমরাই আমন্ত্রণ জানাই। বিপরীতে আমরা যদি সচেতন থাকি তাহলে একই প্রকার প্রলােভন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেও চেতনা আমাদেরকে সতর্কবার্তা দেবে। তখন আমাদের বুদ্ধিমত্তা সেই প্রলােভনকে হৃদয় হতে বিতাড়িত করার প্রয়ােজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কেননা বুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত মন এ বিষয়ে অবগত যে তথাকথিত প্রলােভন মনের বিচার ক্ষমতা বিনষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। তাই একটি তুষার বল যেমন পাথরের ওপর সজোরে নিক্ষেপ করলেও পাথরের কোনাে ক্ষতি করতে পারে না। ঠিক তেমনি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রলোভনও ইস্পাতদৃঢ় মনের কোনাে ক্ষতি করতে পারে না, যদি সেই মন কৃষ্ণের শরণ ও স্মরণ করার শক্তিতে বলীয়ান হয়। যেমন করে শরীরকে পরজীবী হতে মুক্ত করতে পদ্ধতিগত ও যথাযথ চিকিৎসার প্রয়ােজন, তেমনি মনকে পরজীবীরূপ জড় বাসনা হতে মুক্ত করতেও যথাযথ পারমার্থিক চিকিৎসার প্রয়ােজন। প্রকৃতপক্ষে ভগবদ্গীতা (৬.৩৬) বলছে, যথার্থ পরিকল্পনা ব্যতীত আত্মনিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। আসুন, পরিকল্পনাটি কী রকম তা দেখি ।
 
’হ্যাঁ’ বলার মাধ্যমে ‘না’ বলা
 
মনের জড় বাসনাগুলােকে নিবৃত্ত করার প্রয়ােজনীয়তা স্বীকার করার পরও, আমাদের মধ্যে অনেকেই জড় প্রলােভন এড়ানাে ও পরিহার করার লক্ষ্যে যথাযথ পরিকল্পনা অনুসরণের ব্যাপারে অনেকটা উদাসীন। এই ধরনের নেতিবাচক অথবা প্রতিরক্ষামূলক মনােভাব জড় বাসনার সাথে যুদ্ধে অনর্থক জটিলতা সৃষ্টি করে।
প্রলােভন হতে পরিত্রাণ পেতে আমাদের মধ্যে অনেকেই দুই ধরনের পন্থা অবলম্বন করি।
১। নৈতিক বিবেক : যেটি আমাদের বলে- যা সঠিক তাই কর।
২। দার্শনিক অনুশাসন: যেটিতে বলা হয় যা উপকারী তা কর।
নৈতিক বিবেক ও দার্শনিক অনুশাসন আমাদের জন্য প্রয়ােজনীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ কতগুলি । এটি অর্থহীন ছাড়া এবং উদ্দেশ্যবিহীন অনুশীলন ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু অনুশাসন আমাদের জন্য দরকারি, কিন্তু এটিই সবকিছু নয়।
অনুশাসনের ব্যাপারে আমরা স্বীকার করতে পারি যে, এটি আত্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় সঠিক ও উপকারী হতে পারে, কিন্তু কখনােই সেটি আনন্দময় নয়। এভাবে গীতার ২/৬০ শ্লোকে প্রতিপন্ন করা হচ্ছে-“হে কৌন্তেয়! ইন্দ্রিয়সমূহ এতই বলবান এবং ক্ষোভকারী যে, তারা অতি যত্নশীল বিবেকসম্পন্ন পুরুষের মনকেও বলপূর্বক বিষয়াভিমুখে আকর্ষণ করে।”
অর্থাৎ, প্রলােভন এতটাই শক্তিশালী যে, যত্নবান হয়ে অনুশাসন মান্যকারী ব্যক্তিও এর ফাঁদে আটকা পড়তে পারে।
এর পরবর্তী শ্লোকে বলা হচ্ছে শুধু ইন্দ্রিয়গুলিকে অনুশাসনের মাধ্যমে সংযত করাই নয় বরং সেই সাথে উত্তমা ভক্তিপরায়ণ হয়ে আমাদের উচিত শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিজেকে যুক্ত রাখা, বিশেষ করে শ্রীকৃষ্ণের চরণে নিবদ্ধ রাখা। তাহলে দিব্য আনন্দ কখনাে অধরা অভিলাষ হয়ে থাকবে না বরং সেটি আমাদের নিকট বাস্তব ও চিন্ময় আনন্দপূর্ণ হবে ।
গীতায় (২.৬২-৬৩) আলােচনা করা হয়েছে, একটি বিষয়ের প্রতি আমাদের মন আকর্ষিত হলে কামনা-বাসনা তার ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে কীভাবে সেই বস্তু প্রাপ্তির জন্য মনকে প্ররােচিত করে? এটিই হচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক বিদ্যার চিরন্তন নীতি, ‘যেখানে মন আটকে গেছে সেখানে আমিও আটকে গেছি যখন আমরা যে বস্তুর প্রলােভনে পড়ি, সেই বস্তুর কাছে আটকা পড়ি। উদাহরণ স্বরূপ-চটকদার বিজ্ঞাপন, বিলবাের্ডগুলাে সেই উদ্দেশ্যে করা যাতে মানুষকে বিভিন্ন প্রলােভনে আটকানাে যায়। সেই একই নীতিটি আমরা এই সমস্ত প্রলােভন হতে নিজেকে যুক্ত করার ব্যাপারে ব্যবহার করতে পারি। কীভাবে? যদি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি নিবদ্ধ করি। শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে সর্বব্যাপী, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সর্বাকর্ষকরূপে প্রকাশ করেছেন। যেমন তাঁর অর্চাবিগ্রহ, দিব্যনাম, কীর্তন, দিব্য লীলাসমূহ, পার্ষদ ও তাঁর সেবা। এগুলোও একদিক থেকে বিজ্ঞাপনের মত। এগুলাের প্রতি যদি আমরা যদি কৃ|প্রাপ্তির প্রলোভনে আমাদের চেতনাকে নিবদ্ধ করি তাহলে আমরা উপলব্ধি করতে পারব যে, শ্রীকৃষ্ণের প্রেমে আমরা বন্দি হয়ে গেছি। যখন তিনি তার অমিয় লীলা ও অপ্রাকৃত প্রেমের দ্বারা আমাদের হৃদয় পূর্ণ করে দেবেন, তখন সমস্ত জড় বাসনাগুলাে ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে আপনা আপনি পালাবে। তখন আমরা চিরতরে যন্ত্রণা হতে মুক্ত হব।
উপরন্তু, কৃষ্ণের প্রতি সেবার ক্ষেত্রে কোনাে সীমাবদ্ধতা নেই। এমনকি আমরা শব্দের মাধ্যমেও যদি শ্রীকৃষ্ণের বাণী প্রচার করি সেটিও কৃষ্ণের সেবারূপে পরিগণিত এভাবে আমাদের সকল কর্ম অথবা দায়দায়িত্ব পরিত্যাগ করার কোনাে প্রয়ােজন নেই। জড় বিষয় আমাদের সুখি করতে পারবে এই ধরনের মিথ্যা আশা আমাদের পরিত্যাগ করা প্রয়ােজন, কেননা শুধুমাত্র শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রেমময় সম্পর্কই প্রকৃত আনন্দ বয়ে আনতে সমর্থ এবং এটিই আমাদের জীবনের সকল উদ্দেশ্যের কেন্দ্রবিন্দু। সেই শ্রীকৃষ্ণের সাথে প্রেমময়ী সেবার মাধ্যমে আমাদের জীবন আলােকিত হতে পারে। যখন এই উদ্দেশ্য হৃদয়ে ধারণ করব, তখন আমরা জীবনে ছন্দ ফিরে পাব। তখন প্রতিটি কর্ম ও প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা দেখব যে, শ্রীকৃষ্ণকে সেবা করার সুযােগগুলাে দৃশ্যমান হচ্ছে। তারপর সুযােগগুলােকে আমরা স্বাগত জানাব। এর ফলে হৃদয়ের অভ্যন্তরে অথবা বাহ্যিকভাবে এই সেবাবৃত্তি আমাদের মধ্যে পারমার্থিক আনন্দের পরিপূর্ণতা আনবে। এভাবে এক সময় যখন আমরা এই পরিপূর্ণতার আস্বাদন করবাে তখন আমরা দেখতে পাবাে যে, এই প্রলােভনগুলাে সুখদায়ক নয় বরং বিভ্রান্তিকর। এ অবস্থায় সেই প্রলােভনগুলাের প্রতি না বলাটি শুধু সঠিক ও উপকারীই নয়, বরং আনন্দের উৎসও।
উপরন্তু কৃষ্ণভাবনামৃতের অপ্রাকৃত শক্তির মাধ্যমে এই বিধ্বংসী জড় বাসনাগুলােকে পরিবর্তন করে উপকারী কাজেও ব্যবহার করতে পারি। মহান বৈষ্ণবাচার্য শ্রীল নরােত্তম দাস ঠাকুর তাঁর প্রেম-ভক্তি-চন্দ্রিকা গ্রন্থে বলেছেন যে, এমনকি কাম, লােভ, ক্রোধ পর্যন্ত পারমার্থিক প্রগতির পথে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। যেমন- আমরা আমাদের কামভাবটিকে শ্রীকৃষ্ণের সেবা ও প্রীতি বিধানে নিমিত্তে একটি সুন্দর বিশ্বের আশায় প্রয়ােগ করতে পারি। আমরা শ্রীকৃষ্ণের মহিমা সকল দিকে ছড়িয়ে দেয়ার লােভ করতে পারি। আমরা কৃষ্ণবিরুদ্ধ ভ্রান্তি, অপপ্রচার, ভক্তবিদ্বেষীমূলক কর্মে ক্রোধ প্রদর্শন করতে পারি। এভাবে সমস্ত জড় কামনা-বাসনারূপ পরজীবীগুলােকে পারমার্থিক কাজে লাগিয়ে কৃষ্ণকে হ্যা বলে জড় বাসনাকে ‘না করতে পারি ।
 
চারটি সামঞ্জস্যতা
 
আমি আলােচনা করছি যে জড় কামনা বাসনা চার ভাবে পরজীবীর মতাে ক্রিয়া করে।
১। পরজীবী যেমন ধীরে ধীরে শরীরকে আক্রান্ত করে সমস্ত শরীরকে বিনষ্ট করে তেমনি জড় কামনা-বাসনাও ধীরে ধীরে মনে আক্রমণ করে মনকে বিপর্যস্ত করে।
২। ব্যাপক পরজীবীর আক্রমন তীব্র শারীরিক যন্ত্রণার কারণ, তীব্র জড় বাসনাও আমাদের মনে অসহ্য হতাশা ও বেদনার জন্ম দেয়।

কৃষ্ণ বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ বলাটাই হলাে পরজীবীরূপ জড় বাসনার প্রতি ‘না’ বলার সবচেয়ে ভাল উপায়।


৩। যেভাবে যথার্থ চিকিৎসা গ্রহণ করে আমরা যেমন পরজীবীর আক্রমণ হতে যুক্ত হতে পারি, তেমনি এই কৃষ্ণভাবনামৃত পন্থা অবলম্বন ও পারমার্থিক চিকিৎসা গ্রহণ করে আমরা নিজেদের পরজীবীরূপ জড় কামনা বাসনা হতে মুক্ত করতে পারি। যখন আমরা উপলব্ধি করতে সমর্থ হব যে, জড় কামনা বাসনাও পরজীবীর মতাে, তখন আমরা তা থেকে বিরত থাকব এবং মনােবল এর ক্ষয়রােধ করতে সমর্থ হবাে। তখন আমরা লক্ষ্য করব যে, আমরা জাগতিক ও পারমার্থিকভাবে উচ্চ মনােবল প্রাপ্ত হচ্ছি। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, পারমার্থিক ভক্তিপথ অনুসরণ করে আনন্দময় একটি জীবন অতিবাহিত করতে পারব এবং জীবনান্তে চিরন্তন প্রেম ও আনন্দের জন্য শ্রীকৃষ্ণের কাছে ফিরে যাব।
 

 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, এপ্রিল-জুন ২০১৩

 

 

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here