মধুসূদন রহস্য!

0
37

কৃষ্ণলীলায় মধু দৈত্য বধের কোনো ঘটনা নেই তথাপিও
অর্জুন কেন কৃষ্ণকে মধুসুদন নামে সম্বোধন করলেন?

সত্যরাজ দাস

নামে কী আসে যায়?

মধুসূদন সম্বোধনটি প্রথম আবির্ভূত হয় গীতার ১ম অধ্যায়ে। এরপর চতুর্থ ও একাদশ অধ্যায়ে কৃষ্ণের বিভূতি দর্শনের পূর্বে। প্রকৃতপক্ষে অর্জুনের মোহভ্রমটি ছিল একটি লীলা যেটি স্বয়ং ভগবানের ইচ্ছাতে সংগঠিত হয়েছিল। যার অর্থ, অর্জুনকে সাময়িকভাবে একটি মোহে আবদ্ধ করা হয়, যাতে তার মাধ্যমে অর্থাৎ অর্জুনকে শিক্ষাদানের ছলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্‌গীতার জ্ঞান উন্মুক্ত করতে পারেন। অন্যথায় কৃষ্ণ যে মূলত বিষ্ণু, যিনি পূর্ব অবতারে মধু দৈত্য হত্যা করেছিলেন, তা শুরু থেকে অর্জুন জানলেন কীভাবে?
যদিও শ্রীল প্রভুপাদের অনুসারীগণ এই তথ্য শুরুতে জানতে পেরেছিলেন। ভগবদ্গীতার ভাষ্যের সূচনায় শ্রীল প্রভুপাদ লিখেছেন, “অর্জুন ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের সহচর, তাই জড় জগতের অজ্ঞতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারত না, কিন্তু ভগবানের ইচ্ছানুসারে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় তিনি সাময়িকভাবে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন, যাতে তিনি তাঁর সেই সঙ্কটময় অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য শ্রীকৃষ্ণের শরণাপন্ন হয়ে তাঁকে প্রশ্ন করেন এবং তাঁর মাধ্যমে ভগবান আগামী দিনের মানুষের উদ্ধারের উপায়-স্বরূপ ভগবৎ-তত্ত্বজ্ঞান সমন্বিত ভগবদ্‌গীতা বর্ণনা করলেন।”
আরেকটি মজার ব্যাপার রয়েছে মহাভারতে (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা মহাভারতের একটি ক্ষুদ্রাংশ মাত্র), ৩/৪১/১-৪ এ ভগবান শিব অর্জুনকে বলেছেন যে, ভগবান নারায়ণের সাথে নররূপে তাঁর এক চিন্ময় সম্পর্ক রয়েছে এবং ৩/৪২/১৭২৩ এ যমরাজ অর্জুনকে বলেছেন, “বিষ্ণুর মাধ্যমেই তুমি পৃথিবীকে ভারমুক্ত করবে।”
অসুর মধুর ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে কালিকা পুরাণ, দেবী ভাগবত এবং মহাভারতে। শ্রীল প্রভুপাদ তার লীলা পুরুষোত্তম কৃষ্ণ গ্রন্থে এই কাহিনিটি উল্লেখ করেছেন (অধ্যায়- অক্রুরের প্রার্থনা) এবং শ্রীমদ্ভাগবতে (৭/৯/৩৭, তাৎপর্য)।
এই সকল কথা লিপিবদ্ধ আছে মহাভারতের ৬ষ্ঠ অধ্যায়ের পূর্বে যেখানে গীতার আবির্ভাব ঘটেছিল। এছাড়া কৌরব-পাণ্ডব সম্মুখে শ্রীকৃষ্ণ বিভূতি প্রদর্শন করলেও কৌরবগণ কৃষ্ণের পরিবর্তে তার সৈন্যদল বেছে নিলেন। পাণ্ডবগণ বিশেষত অর্জুন কৃষ্ণের বিভূতি জানতেন, হয়তোবা তা মাতা যশোদার মতো নয়, যিনি কৃষ্ণের মুখে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দর্শনের পরও কৃষ্ণকে কেবল তার পুত্ররূপে জানতেন।
গীতার অধ্যায়সমূহের আগে মহাভারতে বহুস্থানে মধুসূদন নামটি উচ্চারিত হয়েছে। অর্জুন ছাড়াও দ্রৌপদী, অসুর শিশুপালও এই নাম উচ্চারণ করেছিলেন। তাই মহাভারত ও গীতা অনুসারে কৃষ্ণের অবতার যে বিষ্ণু তা স্পষ্ট।

মধু’র গল্প

অসুর মধুর ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে কালিকা পুরাণ, দেবী ভাগবত এবং মহাভারতে। শ্রীল প্রভুপাদ তার লীলা পুরুষোত্তম কৃষ্ণ গ্রন্থে এই কাহিনিটি উল্লেখ করেছেন (অধ্যায়- অক্রুরের প্রার্থনা) এবং শ্রীমদ্ভাগবতে (৭/৯/৩৭, তাৎপর্য)।
জড়জগতের প্রকাশের পূর্বে, ভগবান বিষ্ণু পারমার্থিক জগতে উল্টো প্রতিবিম্ব বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করে সেখানের অভ্যন্তরে শেষনাগের শয্যায় যোগনিদ্রায় নিমগ্ন হলেন। যখন ভগবান বিষ্ণু যোগনিদ্রামগ্ন তখন তার নাভী থেকে একটি পদ্মের আবির্ভাব হয়। সেই পদ্মের শীর্ষভাগে ব্রহ্মার উৎপত্তি হল, যিনি ছিলেন প্রথম সৃষ্ট জীব। ভগবান বিষ্ণু ব্রহ্মাকে সৃষ্টিকার্য অর্পণ করলেন এবং ব্রহ্মাজী কিভাবে ভগবান প্রদত্ত কার্য সুন্দরভাবে সমাপন করবেন তা জানার জন্য তপস্যায় নিমগ্ন হলেন।
এটি বর্ণিত আছে যে, যখন ব্রহ্মা গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হলেন তখন বিষ্ণুর কর্ণ থেকে মধু ও কৈটব নামে দু’জন অসুর আবির্ভূত হলেন। সেই ভীষণ চেহারার দুই অসুর হাজার বছর তপস্যা করলেন। তাদের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ভগবানের শক্তি লক্ষ্মীদেবী আবির্ভূত হলেন এবং তাদের অভিলাষিত বর প্রদান করলেন, যা ছিল ইচ্ছামৃত্যু। যখনই অসুরগণ সেই বর লাভ করলেন তখন তারা তাদের প্রাপ্তিতে অহংকারী হয়ে উঠলেন। তারা তখন ব্রহ্মাকে আক্রমণ করলেন, যিনি তখনো গভীর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। অসুরগণ ব্রহ্মার কাছ থেকে চার বেদ অপহরণ করলেন। তখন ব্রহ্মা অসহায় অবস্থায় উপনীত হয়ে তার একমাত্র আশা ভগবান বিষ্ণুর সান্নিধ্য উপনীত হলেন এবং সাহায্য প্রার্থনা করলেন।
বিষ্ণু তখনও গভীর নিদ্রায় মগ্ন এবং ব্রহ্মার হাজারো চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি জেগে উঠলেন না।
তখন তিনি উপলব্ধি করলেন যে, ভগবান তার নিজস্ব কোনো কারণে যোগনিদ্রায় শায়িত আছেন। তাই তখন তিনি যোগমায়ার তথা লক্ষ্মীদেবী একটি বিশেষরূপকে আহ্বান করলেন ভগবানের নিদ্রা ভঙ্গের জন্য। ব্রহ্মার প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে যোগমায়া তাকে কৃপা করলেন এবং ভগবান বিষ্ণুকে নিদ্রা থেকে জাগালেন।
তখন ব্রহ্মা বিষ্ণুকে জানালেন মধু- কৈটবের নানাবিধ দুষ্ট কার্যকলাপের কথা এবং তাদেরকে সংহার করার জন্য প্রার্থনা জানালেন। তখন বিষ্ণু হয়গ্রীবরূপে আবির্ভূত হলেন, অর্থাৎ অতি সুন্দর ঘোড়ারূপ। হয়গ্রীবরূপে তিনি মধু ও কৈটবের সাথে যুদ্ধ করতে লাগলেন, এভাবে তিনি একে একে সকল বেদকে মুক্ত করলেন। কিন্তু যেহেতু তাদের ইচ্ছামৃত্যু ছিল, তাই ভগবান বিষ্ণু চতুরতার সাথে তাদের বললেন, যেহেতু লক্ষ্মীদেবী তাদের দুইজনকে বর প্রদান করেছেন তাই তাদেরও উচিত তাঁকে একটি বর প্রদান করা। কেননা তারা তার অন্তরঙ্গ শক্তির দেওয়া বর লাভ করে অসীম শক্তি লাভ করেছে, তাই তাদের উচিত ভগবানকে একইভাবে সম্মান করা।
কিন্তু তখনও তারা দাম্ভিকতার সাথে বললেন, আপনি আমাদের কাছে কি বর চান? আপনি যা চান আমরা তাই দেব?
ভগবান বললেন “আমি তোমাদের মৃত্যু চাই।” এরপর হয়গ্রীব তাদের সংহার করলে জগৎ ভয়শূন্য হয়।
শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীমদ্ভাগবত (৭/৯/৩৭ তাৎপর্য) লিখেছেন-
“ভগবান চিন্ময়রূপে তাঁর ভক্তদের সর্বদা পরিত্রাণ করতে প্রস্তুত থাকেন। এখানে উল্লেখ্য, মধু এবং কৈটভ নামক দুই দৈত্য যখন ব্রহ্মাকে আক্রমণ করেছিল, তখন ভগবান হয়গ্রীবরূপে তাদের সংহার করেছিলেন। আধুনিক যুগের অসুরেরা মনে করে সৃষ্টির প্রারম্ভে জীবন ছিল না, কিন্তু শ্রীমদ্ভাগবত থেকে আমরা জানতে পারি, ভগবানের সৃষ্ট প্রথম জীব হচ্ছেন ব্রহ্মা, যিনি পূর্ণরূপে বৈদিক জ্ঞান সমন্বিত ছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, যাদের ওপর বৈদিক জ্ঞান বিতরণ করার ভার অর্পণ করা হয়েছে, সেই ভক্তরা কখনও কখনও কৃষ্ণভক্তি প্রচার করার সময় অসুরদের দ্বারা আক্রান্ত হন, কিন্তু তাদের নিশ্চিতরূপে জেনে রাখা উচিত যে, সেই সমস্ত আসুরিক আক্রমণ কৃষ্ণভক্তদের স্থায়ী কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, কারণ ভগবান সর্বদাই তাঁদের রক্ষা করছেন।”

মধুসূদনের পুনরাগমন

মধুসূদন শব্দের অর্থ শুধুমাত্র তিনি “যিনি অসুর মধুকে বধ করেছেন” নয় কিন্তু এর অন্য অর্থ হলো তিনি “যিনি মিষ্টতায় মধুকেও পরাভূত করেছেন”। তাই মহান আচার্য শ্রীধর স্বামী তার ভাষ্যে এই নামের অর্থ করেছেন : মিথ্যা অহংকার হল মধুর ন্যায় মিষ্টি। এটি প্রত্যেকের হৃদয়ে থাকে যা নিজের প্রকৃত স্বরূপ ভুলিয়ে দেয়। এটি সকলকে দূষিত করে। যিনি আলোকবর্তিকার মতো সকলের মিথ্যা অহংকার দূর করে হৃদয়ে জ্ঞানের শিখা প্রজ্জ্বলন করেন তিনি মধুসূদন। মধুসূদনের মধু দ্বারা মৌমাছি এবং কৃষ্ণ উভয়কেই নির্দেশ করে। ঠিক যেমন মৌমাছি ফুলের মধু সংগ্রহ করে আনন্দ পায় তেমনি কৃষ্ণ তাঁর ভক্তের ভালোবাসা লাভ করে আনন্দ উপভোগ করে। ১৬ শতকের মহান বৈষ্ণব আচার্য শ্রীল রূপ গোস্বামী মধুসূদন নামের এই দ্বৈত অর্থ ব্যবহার করেছেন তার বিদগ্ধ মাধব নাটিকার পঞ্চম খণ্ডে।
একবার শ্রীমতি রাধারাণী এবং কৃষ্ণ একসাথে বসেছিলেন, তখন একটি মৌমাছি রাধারাণীকে বিরক্ত করছিল। কৃষ্ণ তখন এক সখাকে অনুরোধ করলেন, মৌমাছিটিকে তাড়ানোর জন্য। কার্য সমাধানের পর সেই সখা এসে জানালো সেই মৌমাছি পলায়ন করেছে। যেহেতু নামটি দ্বারা সেই মৌমাছি কিংবা কৃষ্ণ উভয়কেই বোঝায় তাই রাধারাণী ভুলবশত ভাবলেন যে, কৃষ্ণ চলে গিয়েছেন। তৎক্ষণাৎ রাধারাণী কৃষ্ণবিরহে ক্রন্দন করতে লাগলেন, যদিও তিনি কৃষ্ণের সাথেই ছিলেন। তিনি সম্পূর্ণরূপে বিপ্রলম্বভাব প্রকাশ করলেন অর্থাৎ ভগবানের সাথে বিচ্ছেদে যে করুণ অবস্থার উপনীত হয় সেই অবস্থা যা শুদ্ধ ভক্তদের ভগবানের প্রতি অসীম ভালোবাসার প্রকাশ। তখন রাধারাণীর এই ভাব দর্শন করে কৃষ্ণও কাঁদতে লাগলেন, তাদের উভয়ের চোখের জলে প্রেম সরোবর নামক এক পবিত্র তীর্থের প্রকাশ হল যা এখনো ব্রজে (বৃন্দাবনে) দৃশ্যমান।
শ্রীল প্রভুপাদের ভাষায় শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা হলো প্রাথমিক আবশ্য পাঠ্য পারমার্থিক গ্রন্থ, যেটি আমাকে মধুসূদন নামের ব্যাপারে গবেষণা করতে সহায়তা করেছে। এখন এই নামটি আমার কাছে। এক দিব্য জ্ঞানের অন্তরঙ্গ প্রকাশ যা পরমেশ্বর ভগবান এবং তার শক্তির মধ্যকার অকল্পনীয় ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। পরিশেষে বলা যায়, কৃষ্ণের মধুসূদন হওয়ার পেছনে রয়েছে শ্রীমতি রাধারাণীর হাত, যিনি নিজেকে পরবর্তীতে লক্ষ্মীদেবী এবং যোগমায়ারূপে প্রকাশ করেছেন এবং এই যোগমায়াই হলেন ভগবানের মধু নামক দৈত্য সংহারের পেছনের প্রধান নায়িকা।

লেখক পরিচিতি : সত্যরাজ দাস (স্টিভেন জে. রোজেন) একজন আমেরিকান লেখক। শ্রীল প্রভুপাদের অন্যতম একজন শিষ্য এবং শ্রীমৎ ভক্তিতীর্থ স্বামী মহারাজের অন্তরঙ্গ জন। বৈদিক শাস্ত্রের বিবিধ বিষয়ের ওপর ২০টিরও বেশী গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি জার্নাল অব বৈষ্ণব স্টাডিজ এর প্রধান সম্পাদক ও আন্তর্জাতিক ব্যাক টু গড়হেড এর সহ সম্পাদক। তাঁর অন্যতম বিখ্যাত একটি গ্রন্থ হলো, শ্রীমৎ ভক্তিতীর্থ স্বামী মহারাজের জীবনী সম্বলিত ব্ল্যাক লোটাস : দ্যা স্পিরিচুয়াল জার্নি অব এন আর্বান মিস্টিক।


 

এপ্রিল – জুন ২০১৬ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here