ভূত উদঘাটন

0
75

যারা এই অদ্ভুত জীবগুলো সম্পর্কে জানতে আগ্রহী তাদের জন্য রয়েছে বেদের স্বচ্ছ এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষন। এভাবে তারা এ বিষয়টি অধ্যয়নের মাধ্যমে স্বচ্ছ ধারণা লাভ করবেন।

চৈতন্য চরণ দাস

অনেক লোকই ভূতের ভয়ে ভীত হয়। কারণ তারা ভূতের বিষয়টিকেই ধারণাতীত হিসেবে দেখে। তবে ভূতের অস্তিত্ব কী রয়েছে? ঐতিহাসিক ও ভোগৌলিক প্রেক্ষাপট থেকে এ প্রশ্নের উত্তর হবে, হ্যাঁ। বিশ্বের মানব অভিজ্ঞতার আলোকে অনেক লোকই ভূত দেখেছে, কোনো না কোনো উপায়ে শুনেছে যে, ভুত হচ্ছে অদ্ভুত ও ভীতিপ্রদ একটি ব্যাপার। আমাদের বৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলে, ভূতের ব্যাপারটি রীতিমত অবৈজ্ঞানিক হিসেবে আখ্যায়িত করে বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করা হয়। তবুও কিছু প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক ভূতের বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছে। এরকম ভূতে বিশ্বাসী বিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইংরেজ প্রকৃতি বিষয়ক বৈজ্ঞানিক আলফ্রেড ওয়ালেস্, যিনি বিবর্তনবাদ তত্ত্বের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ My life : A record of events and opinions….. এ তিনি উল্লেখ করেছেন যে, কীভাবে প্রত্যক্ষ প্রমাণ তাকে ভূতে বিশ্বাসী হতে জোরারোপ করেছে। তিনি লিখেন, “আজকালকার বেশীরভাগ লোকই এই বিশ্বাসের মাধ্যমে বেড়ে উঠেছে যে, কোনোরূপ অলৌকিকতা, ভুত এবং ইন্দ্রিয়ের বোধগম্যতার বাইরে সামগ্রিক কার্যকলাপের অস্থিত্ব থাকতে পারে না। প্রকৃতির আইনের সাথে যেগুলো মতবিরোধমূলক। তারা এ সব ব্যাপারগুলোকে পূর্ব যুগের কুসংস্কার হিসেবে আখ্যায়িত করে। আর তাই তারা ব্যাপারগুলোকে নিছক ভণ্ডামী বা প্রতারণা হিসেবে বিবৃতি দেয়। তাদের ভাবনার জগতে এটি প্রাধান্য পায় না। যখন আমি এ বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু করি প্রথমদিকে আমার তাই মনে হয়েছিল। আমার ভাবনার জগতে এ বিষয়টির ঠাঁই ছিল না। আমার সমস্ত ধারণা, জ্ঞান, বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বের ওপর বিশ্বাস এবং প্রকৃতির আইন সবকিছুই এ বিষয়টির বিপরীতে অবস্থান করছিল।
যখন এ বিষয়টি প্রত্যক্ষভাবে একের পর এক প্রমাণিত হচ্ছিল তা আমাকে এটি বিশ্বাস করার জন্য জোরারোপ করছিল । এমনভাবে তা বাধ্য করছিল, তা থেকে পরিত্রানের সম্ভাবনাও ছিল না। এখনও ‘আত্মাই হল সর্বশেষ বিষয়’। এমনকি এ বিষয়টি বিশ্বাস না করার জন্য অন্যান্য সম্ভাবনাময় সমাধানও প্রত্যাখাত হয়েছিল……পাঠকদের আমরা এটি বিশ্বাস করার জন্য বলছি না। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ ও পরীক্ষামূলক গবেষণা করার জন্য বলছি।” আরেকজন প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী আমেরিকান মনস্তত্তবিদ উইলিয়াম জেমস্ প্রত্যক্ষ প্রমাণের আলোকে ভূতের অস্তিত্ব বিষয়ে সম্মত হন। তিনি উল্লেখ করেন, যখন আমি এ বিষয়ের ওপর প্রমাণগুলোর দিকে তাকাই তখন আমি আমার নেতিবাচক বৈজ্ঞানিক মনকে বহন করতে পারি না,” (উইলিয়াম জেমস্রের psychical Research by Gardner and Ballou murphy) |
এ বিষয়ের ওপর পূর্বের চেয়ে বর্তমানে অনেক গম্ভীর প্রমাণ রয়েছে যাদের মধ্যে বিভিন্ন প্যারানরমাল গবেষকদের বৈজ্ঞানিকভাবে গবেষণালব্ধ অনেক গ্রন্থ রয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ও সাধারণ জনগণের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাস সমান্তরাল রয়েছে। ১৯৯০ সালে একটি জরিপে দেখা গেছে যে :
—শতকরা ২৯ ভাগ আমেরিকান ভূত কর্তৃক আক্রমণকৃত ঘর বা হান্টেড হাউস সম্পর্কে বিশ্বাস করে।
—প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জন আমেরিকান দাবি করে, তারা ভূতের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শী ।
এ সমস্ত প্রশ্ন বর্তমান প্রমাণ ও জনগণের মধ্যে এর গ্রহণ যোগ্যতা সত্ত্বেও, ভূতের ধারণাটি অধিকাংশ বিজ্ঞানীদের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়। এর প্রাথমিক কারণ হল যে, আধুনিক জাগতিক বিজ্ঞানে কোনো ধারণাগত (conceptual) গঠনপ্রণালী নেই যার মাধ্যমে তারা ভূতের অস্থিত্ব সম্পর্কে বিশ্বাস করতে পারে। এটিই বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা যা তাদের জন্য ধারণাতীত, যারা উন্মুক্ত মনের অধিকারী ও দুঃসাহসিক তারা জাগতিক ধারণার উর্ধ্বে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আবিষ্কারের জন্য প্রচেষ্টা করে। বৈদিক জ্ঞান ভূতের অস্থিত্ব বিষয়ে একটি তত্ত্ব প্রদান করছে।
তিন স্তরের জীব : ভূত সম্পর্কে উপলব্ধির পূর্বে প্রথমে আমাদের জীবের অস্তিত্ব বিষয়ক তিনটি স্তর বা ধাপের সঙ্গে পরিচয় থাকতে হবে, যা বৈদিক শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে।
(১) স্থূল জাগতিক স্তর : এই স্তরে অনেক শারিরীক বাস্তবতা আমরা ইন্দ্রিয়সমূহের মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পারি এবং মাইক্রোস্কোপের মত যন্ত্র দ্বারা আমাদের ইন্দ্রিয়ের যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা বৃদ্ধি করতে পারি। জাগতিক বিজ্ঞান এই স্থূল জড় স্তরের ওপরই মূলত আলোকপাত করে থাকে।
(২) সূক্ষ্ম জড় স্তর : এই স্তর জাগতিকভাবে আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোর সহজাত বোধগম্যতার ঊর্ধ্বে। এই স্তরটি গঠিত হয় সূক্ষ্ম ইন্দ্ৰিয় মন, বুদ্ধি ও মিথ্যা অহঙ্কারের সমন্বয়ে। এই সামগ্রিক স্তরটিকে সংক্ষেপে আমরা মনের স্তর বা মানসিক স্তর বলে অবহিত করি।
(৩) চিন্ময় স্তর : আত্মা যেটি চেতনার উৎস, সেটি অজাগতিক স্তরে অবস্থিত।
এক্ষেত্রে মন এবং আত্মার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মন যদিও অদৃশ্য কিন্তু এটি চিন্ময় নয়। মন হল জড়, যদিও এটি সূক্ষ্ম বস্তু দ্বারা তৈরি।
কিন্তু মন আমাদের জড় ইন্দ্রিয় দ্বারা দৃশ্যমান নয়। মন চেতনা নয়, আত্মাই হল চেতনা, মন চিন্ময় স্তর ও স্থূল জড় স্তরের মধ্যবর্তী সূক্ষ্মদেহে অবস্থান করে এই প্রণালী (condult) বা সংযোগ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে আত্মার চেতনার সঙ্গে স্থূল শরীরের সম্বন্ধ স্থাপন করিয়ে দেয়। স্থূল জাগতিক স্তর থেকে অর্জিত সমস্ত ধরনের অনুভূতির ভাণ্ডার (storehouse) হলো মন। এই সমস্ত অনুভূতি বা প্রভাব আরো অন্যান্য বিষয় ছাড়াও পূর্বের বিভিন্ন স্মৃতি ও ভবিষ্যতের জন্য বাসনার সমন্বয়ে গঠিত হয়। বৈদিক তত্ত্বদর্শন অনুসারে উপরোক্ত এই তিনটি স্তর সম্বন্ধে অবগত হওয়ার পর, চলুন এখন উপলব্ধি করা যাক, কীভাবে এবং কেন কিছু আত্মা ভূত হয়ে যায়।

দেহবিহীন এবং দুর্দশাময় পরিস্থিতি

মৃত্যুর সময় আত্মা সূক্ষ্ম দেহকে সাথে নিয়ে স্থূল দেহটিকে ত্যাগ করে। স্বাভাবিকভাবে আত্মা তার কর্মফল অনুসারে একটি নতুন স্থূল শরীর লাভ করবে। কিন্তু ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে আত্মা যখন কোনো স্থূল শরীর পায় না তখন এটি দেহবিহীন অবস্থায় অবস্থান করে। আত্মার এই দেহবিহীন অস্তিত্বে বাস করাকে বলা হয় ভূত।
অবশ্যই ভূত পূর্ণাঙ্গভাবে দেহবিহীন নয়। ঐ অবস্থায় তাদের একটি সূক্ষ্ম শরীর রয়েছে। কিন্তু যেহেতু স্বাভাবিকভাবে দেহ বলতে স্থূল শরীরকে বোঝায় এবং আত্মার এ স্থূল শরীরবিহীন হওয়াকে দেহবিহীন হিসেবে অভিহিত করা হয়। 

কেন ভূতরা একটি জড় স্থূল শরীর পায় না?

(১) আত্মহত্যা : প্রত্যেক আত্মারই তাদের কর্মফল অনুসারে একটি নতুন দেহ লাভ হবে সেটি পূর্ব থেকেই নির্ধারিত। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি অপরিণতভাবে আত্মহত্যা করার মাধ্যমে জড় শরীরটিকে ধ্বংস করে ফেলে তখন তাকে ভূতের মত দেহবিহীন একটি অস্তিত্বে নিপতিত করার মাধ্যমে শাস্তি প্রদান করা হয়। তাদের এ অবস্থা কেনো নতুন শরীর না পাওয়া পর্যন্ত অবস্থান করে। শ্রীল প্রভুপাদ এ বিষয়ে বিবৃতি দেন যে, “ভূতরা আত্মহত্যার মতো তীব্র পাপময় কার্যকলাপের জন্য শরীরবিহীন হয়ে অবস্থান করে।” যারা হতাশাগ্রস্ত লোক তারা মনে করে মৃত্যুর মাধ্যমে তাদের অস্তিত্ব শেষ হবে এবং এজন্য নিজেদেরকে দুঃখ-দুর্দশা থেকে পরিত্রানের জন্য আত্মহত্যা করে থাকে। কিন্তু তারা মৃত্যুর পরবর্তী ভূত হওয়ার পর পূর্বের চেয়ে আরো অধিক দুঃখ-দুর্দশাময় অবস্থায় নিপতিত হয়। 
(২) চরম আসক্তি : যারা তাদের শরীরের প্রতি, নির্দিষ্ট পরিবেশ বা ব্যক্তিগত কিছুর প্রতি চরমভাবে আসক্ত থেকে মৃত্যুবরণ করে তারাও ভূত হতে পারে। এমন মৃত্যুর সময় অতীত বিষয়ে মনের অতিরিক্ত ও নিবিড় চিন্তা আত্মাকে পরবর্তী দেহ গ্রহণে প্রতিহত করতে পারে এবং যার ফলে সে দেহবিহীন অবস্থায় নিপতিত হয়। শ্রীল প্রভুপাদ এ বিষয়ে ব্যাখ্যা করেছেন, “যে সমস্ত ব্যক্তি অত্যন্ত পাপাচারী এবং তাদের পরিবার, গৃহ, গ্রাম বা দেশের প্রতি অত্যধিক আসক্ত তারা জড় উপাদান সম্বলিত স্থূল শরীর পায় না। পক্ষান্তরে তারা একটি সূক্ষ্ম দেহে অবস্থান করে যেটি মন, বুদ্ধি ও অহঙ্কারের সমন্বয়ে গঠিত। এরকম সূক্ষ্ম শরীরে যারা বাস করে তাদেরকে ভূত বলা হয়।” 

হতাশাব্যঞ্জক বা আতঙ্কজনক অবস্থা 

এই অস্বাভাবিক দেহবিহীন অবস্থা ভূতদের জন্য একটি দুর্দশাময় অবস্থা এবং তারা অন্যদের জন্য আতঙ্কজনক হয় । এটি কেন হয়?
(১) তাদের জন্য দুর্দশাময় অবস্থা: ভূতেরও মন রয়েছে যেরকম আমাদের মন রয়েছে। তাদের মন আমাদেরই মতই দেহগত অস্থিত্বের পূর্ব স্মৃতি ও বাসনায় পূর্ণ। কিন্তু তাদের কোনো স্থূল শরীর নেই এটুকুই পার্থক্য। যে শরীরটির মাধ্যমে তারা তাদের বাসনাগুলো পূর্ণ করতে পারত। উদাহরণস্বরূপ, তাদের স্মৃতিসমূহ স্বভাবতই কোনো প্রিয় রুচিকর খাবারের স্বাদ লাভের বাসনাকে জাগরিত করতে পারে। যেহেতু সূক্ষ্ম দেহে সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়সমূহ বিদ্যমান তাই যখন কোনো দেহধারীকে এ ধরনের কোনো বাসনা চরিতার্থ করতে দেখে তখন তাদের সে বাসনাকে আরো তীব্র করে তোলে। কিন্তু যেহেতু ভূতদের কোনো জড় জিহ্বা নেই যার মাধ্যমে তারা সেই রুচিকর খাবারের স্বাদ লাভ করতে পারে, তাই তাদের সেই বাসনা অপূর্ণই থেকে যায়। তাদের সেই অবস্থা একজন অসুস্থ ব্যক্তির মত যার ওপর বিবিধ খাবার গ্রহণের প্রতি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং সে খেতে পারছে না।
কিন্তু সে অন্যদের দেখে যে তারা সেই খাবার খেতে পারছে। অসুস্থ লোকদের জন্য এ প্রকার নিষেধাজ্ঞা হয়তো কিছুদিনের জন্য কিন্তু ভূতদের জন্য তাদের এ প্রকার অস্থিত্বের সময়কালীন পর্যন্ত ।
তারা তাদের অস্থিত্বকে দুর্দশাময় হিসেবে দেখে। শ্রীল প্রভুপাদ এ দুর্দশার কারণ হিসেবে বিবৃতি দেন, “ভূত, জড়শরীর বিহীন হওয়ায় চরম দুঃখ দুর্দশায় নিপতিত হয় কারণ সে তার ইন্দ্রিয়গুলোর সন্তুষ্টি বিধানে অসমর্থ”।
(২) অন্যদের জন্য আতঙ্ক : অনেক লোক ভূতদের দ্বারা আতঙ্কগ্রস্থ হয়, কারণ তারা এ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে বোধগম্য নয় এবং ভয় পায়। কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ দরজা খুলে যাওয়া কিংবা অদ্ভুত শব্দ শুনতে পাওয়া এ বিষয়গুলো মাধ্যমে তাদের শরীর শীতল হতে শুরু করে। অধিকাংশ লোকের জন্য ভূতের বিরুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারটিও যথেষ্ট ভীতিপ্রদ। কিন্তু ভূত যদি কাউকে অধিকার করে তবে সেটি ভয়াবহ। ভূত ব্যক্তিটির স্থূল দেহে প্রবেশ করে সেই স্থূল শরীরটিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেই দেহটিকে ভূতটির বাসনা চরিতার্থতার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। ফলশ্রুতিতে ব্যক্তিটির স্বাভাবিক আচরণ ও বলার ধরণ বিকৃত হয়ে যায় এবং তার পূর্বের ব্যক্তিত্ব পরিবর্তিত হয়ে নতুন একটি ব্যক্তিত্ব বিকৃতভাবে চলে আসে। এর ফলে ব্যক্তিটির আত্মীয় স্বজন তার এই বিকৃতি ব্যক্তিত্বের জন্য হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। এভাবে সাধারণ লোকদের মনে ভূত সম্পর্কে একটি ভীতিপ্রদ মনোভাবের সঞ্চার হয়।

ভীতিপ্রদ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ

বৈদিক শাস্ত্র ভূত সম্পর্কে নানাবিধ সমস্যার সমাধান দিতে পারে। বৈদিক শাস্ত্র ভূতের প্রকৃতি সম্পর্কে তথ্য দেয় যার মাধ্যমে আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, ভূতরা ঠিক ততটা অমঙ্গলকারী নয় বরং দুর্দশাগ্রস্থ একটি জীব। এটি ঠিক যে, কিছু ভূত হয়তো হিংস্র বা অমঙ্গলজনক হতে পারে, বিশেষত তাদের প্রতি যারা ভূতটির অতীত দেহে থাকাকালীন তার প্রতি কোনো খারাপ কিছু করেছিলেন। কিন্তু সাধারণভাবে বলতে গেলে ভূতরা হল দুর্দশাগ্রস্থ কারণ তারা দেহবিহীন অবস্থায় তীব্র বাসনা চরিতার্থ করতে পারছে না। এটি তাদের জন্য চরম হতাশা আর এই হতাশার চাপে তারা প্রায়ই বিভিন্ন সহিংসতা বা অমঙ্গলজনক মুহূর্তের সৃষ্টি করে। স্থূল পদার্থ, সূক্ষ্ম পদার্থ ও আত্মার প্রকৃতি সম্পর্কে স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি ভূতদের অদ্ভুত আচরণ আমাদের বুঝতে সাহায্য করে। যা স্থূল পদার্থ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের ওপর জাগতিক বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত তথাকথিত জাগতিক নীতিসমূহকে অগ্রাহ্য করে। যেহেতু মন সূক্ষ্ম জড় উপাদান, এটি এমনভাবে স্থূল জড় স্তরের ওপর ক্রিয়া করতে পারে যা জড় বিজ্ঞানের এই সমস্ত আইন বা নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আশ্চর্যের কিছু নয় যে যাদেরকে বিশ্বাস করতে শেখানো হয়েছে, প্রকৃতির সবকিছুই জড় বিজ্ঞানের আইন অনুসরণ করে, তাদের মানসিক স্তরে ভূতরা অবস্থান করতে পারে। শ্রীমদ্ভাগবত (৫/৫/২১-২২) এ ভূতদের রহস্যময় বা অলৌকিক শক্তি সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়, যার মাধ্যমে ভূতদেরকে মানুষেরও ওপরে অধিষ্ঠিত করা হয়; “মানবের চেয়েও উত্তম হল ভূত কারণ তাদের কোনো জড় শরীর নেই।”
বৈদিক শাস্ত্র ব্যাখ্যা করে যে, ভূতরাও মোহময় অবস্থায় প্রভাব বিস্তার করে। তাই যে সমস্ত এলাকা নিজেদের এরকম অবস্থায় নিপতিত করে যেমন দুর্বল মন নেশার মাধ্যমে খুব সহজেই আক্রান্ত হতে পারে এবং ভূতরা তখন তাদের অধিকার দখল করে নেয়।
শ্রীল প্রভুপাদ উদ্ধৃতি করেন, “অপরিশুদ্ধ অবস্থায় কেউ ভূতদের শিকার হয়।” আমরা নিজেদেরকে আলোকিত ধারায় পর্যবসিত করে এর থেকে পরিত্রাণ পেতে পারি। বৈদিক জ্ঞান অনুসারে সেই আলোকিত পথ বা ধারা হল পারমার্থিক প্রগতি অর্জন করা। এটিই জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ লক্ষ্য যার মাধ্যমে ভূতুড়ে জীবদের আক্রমণ থেকে আমরা রক্ষা পেতে পারি।
বৈদিক জ্ঞান শুধু এদের হাত থেকে প্রতিরক্ষার ব্যবস্থায় করে না বরং আরোগ্যের ব্যবস্থা করে। সে সমস্ত ভূতুড়ে স্থান বা ব্যক্তির জন্য ভক্তিমূলক কার্যকলাপ যেমন সম্মিলিতভাবে পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণ করতে পারি। শ্রীল প্রভুপাদ এক শিষ্যের জন্য লিখিত পত্রে উল্লেখ করেন : কোনো স্থান থেকে ভূতদের তাড়ানোর সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা হল অত্যন্ত উচ্চস্বরে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ ও উৎসবমুখরভাবে নৃত্য কীর্তন করা। ইংল্যান্ডে ১৯৬৯ সলে মি. জন লেননের গৃহে আমি যখন অবস্থান করছিলাম, তখন সেখানে একটি ভূত ছিল। কিন্তু যেই মাত্র ভক্তরা অত্যন্ত উচ্চস্বরে হরিনাম জপ করতে শুরু করল সে তৎক্ষণাৎ চলে গেল।”
(দামোদরকে পত্র-দিল্লি, ৩ই ডিসেম্বর ১৯৭১)

সমস্ত দুঃখ দুর্দশার উর্দ্ধে

বৈদিক শাস্ত্র গুরুত্বের সাথে ভূতের অস্তিত্ব বিষয়ে স্বীকৃত প্রদান করে। তবে কারো মধ্যে যদি অদ্ভুত ব্যবহার পরিলক্ষিত হয় তবে সবক্ষেত্রেই যে তা ভূতের কারণে হচ্ছে তা নয়। শ্রীল প্রভুপাদকে তাঁর এক শিষ্য জিজ্ঞেস করেছিল, তার মানসিক সমস্যার কারণ কী ভূতের কারণে হচ্ছে? শ্রীল প্রভুপাদ উত্তরে লিখেছিলেন, “অপরাধমূলক কার্যকলাপ যা তুমি শ্রবণ করছ তা ভূতের কারণে নয় বরং এটি তোমার মন কর্তৃক সৃষ্ট । মন প্রকৃতপক্ষে হতচ্ছাড়া একটি বিষয়।
তাই কৃষ্ণ বলেছেন যে, উদ্যোগী পরমার্থবাদীর উচিত প্রথমে মনকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং তারপর মন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সে শান্তি অনুভব করবে।”
(ধৃষ্টকেতুকে পত্র-বোম্বে, ১ নভেম্বর, ১৯৭৪)
নিজেদেরকে ভূতে পরিণত করা, কিংবা ভূত কর্তৃক শিকার হওয়া, কিংবা ভূত বা মনের কারণে উৎপাদিত বিভিন্ন সমস্যার দ্বারা আক্রান্ত হওয়া, অথবা অনিয়ন্ত্রিত মনের মাধ্যমে খারাপ কর্মে ব্রতী হওয়ার ফলে কর্ম প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি। জড় সমস্যার সমাধানের জন্য সবচেয়ে কার্যকরী পন্থা হল কৃষ্ণভাবনা অনুশীলনের মাধ্যমে মনকে শৃঙ্খলাভুক্ত করা।
এই কারণে ভূতের অস্থিত্ব প্রসঙ্গে এবং পবিত্র নামের শক্তির প্রভাবে ভূত তাড়ানোর ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করা সত্ত্বেও বৈদিক শাস্ত্র এর কোনোটির ওপর বেশী গুরুত্ব প্রদান করে না। বৈদিক শাস্ত্রানুসারে এই মনুষ্য জীবন আরো গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যের জন্য নিহিত। মানব জীবন ভূত থেকে পরিত্রানের জন্য নয় বরং পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রেমভক্তি লাভের মাধ্যমে অমরত্ব অর্জনের জন্য। যদি আমরা জড় বস্তুকে চিন্ময়ত্বে রূপান্তরিত করতে পারি তবে এটি সম্ভব। আমাদের হারানো চিন্ময় সত্ত্বার পুনরুদ্ধার করাই হল বৈদিক জ্ঞানের পরম সম্পদ।
 

চৈতন্য চরণ দাস রাধানাথ স্বামী মহারাজের একজন শিষ্য। তিনি ইলেক্ট্রনিক ও টেলিকমিউনিকেশনের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ করেছেন এবং পুনে মন্দিরে ব্রহ্মচারীরূপে শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। তিনি এই পর্যন্ত আটটি গ্রন্থ লিখেছেন ।

 
 
 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, এপ্রিল – জুন ২০১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here