ভীষ্মপঞ্চক ব্রত কী, কখন ও কীভাবে করবেন?

0
47

আলোচ্য সূচী: ভীষ্মপঞ্চক ব্রত কী? ভীষ্মপঞ্চক ব্রত কীভাবে এলো? পত্র-পুষ্প অর্পণ বিধি, আহার বিধি: ১ম স্তর-পঞ্চগব্য গ্রহণ, ২য় স্তর-ফলমূল গ্রহণ, ভীষ্মপঞ্চক ব্রতের উদ্দেশ্য

ভীষ্মপঞ্চক ব্রত কী?

পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অভিন্ন প্রকাশ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পার্ষদপ্রবর ও গৌড়ীয় আচার্যবর্গের অন্যতম শ্রীল সনাতন গোস্বামীপাদ শ্রীশ্রীহরিভক্তিবিলাস গ্রন্থে (১৬/৪৩৪) লিখেছেন-

আরভ্যৈকাদশীং পঞ্চ দিনানি ব্রতমাচরেৎ।
ভগবৎপ্রীতয়ে ভীষ্মপঞ্চকং যদি শক্নুয়াৎ॥

অর্থাৎ, “কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী হতে আরম্ভ করে পূর্ণিমা পর্যন্ত পাঁচদিন শ্রীভগবানের প্রীতির জন্য যদি সমর্থ হয়, “ভীষ্মপঞ্চক’ ব্রত আচরণ করবেন।” চাতুর্মাস্যের শেষ মাস অর্থাৎ কার্তিক তথা দামোদর মাসের এই ব্রতে বিশেষ খাদ্যসূচি থাকে সে অনুযায়ী কেউ পঞ্চগব্য অথবা ফলমূল অথবা হবিষ্যান্ন গ্রহণ করতে পারেন। এই ব্রত অনুষ্ঠানকারী ব্যক্তিকে ভগবৎপ্রেম প্রদান করে-

সর্বপাপবিনির্মুক্তঃ প্রাপ্তকামো হরিং ব্রজেৎ॥
(গরুড় পুরাণ, পূর্বখন্ড ১২৩/২)

বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীবিষ্ণুর প্রীতিপ্রদ বলে একে বিষ্ণুপঞ্চকও বলা হয়। সর্ববিধ বার্ষিক ব্রতের মধ্যে চাতুর্মাস্য ব্রত প্রধান, আর চাতুর্মাস্য ব্রত অপেক্ষা ভীষ্ণপঞ্চক ব্রত সর্বপ্রধান।

ভীষ্মপঞ্চক ব্রত কীভাবে এলো?

ভীষ্মপঞ্চক ব্রত প্রসঙ্গে স্কন্দপুরাণের বিষ্ণুখন্ডে, কার্তিক মাস মাহাত্ম্যে ৩২ তম অধ্যায়ের বর্ণনা অনুসারে-সত্যযুগের প্রথমে অম্বরীষ ও ভোগ প্রভৃতি নৃপগণ চাতুর্মাস্যের শেষ মাস অর্থাৎ, কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষে এই ব্রতাচরণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে মহারাজ শান্তনুতনয় ভীষ্ম ভগবান বাসুদেবের নিকট এই ব্রত প্রাপ্ত হন। মহাত্মা ভীষ্ম শরশয্যায় শয়ন করে পরপর রাজধর্ম, মোক্ষধর্ম ও দানধর্ম কীর্তন করেন; পান্ডবগণ ভীষ্মভাষিত সেই ধর্মতত্ত্ব শ্র্রবণ করেন; এমনকি কৃষ্ণও তা শ্রবণ করেন। তখন ভীষ্মভাষিত ধর্ম শ্রবণে মনে মনে প্রীত হয়ে কৃষ্ণ বলেন-
“হে ভীষ্ম, তুমিই ধন্য কেননা, তুমি আজ আমাদের শ্রেষ্ঠ ধর্ম শ্রবণ করিয়েছো। তুমি কার্তিক মাসের একাদশী দিবসে জল যাঞ্চা করেছিলে, অর্জুন বানবেগে গঙ্গাজল আনয়নপূর্বক তোমার শরীর শীতল করেছেন। অতএব, তদবধি সকলেই কার্তিকের শুক্লা একাদশী হতে পূর্ণিমা পর্যন্ত অর্ঘ্যদানে তোমার সন্তোষ সাধন করবে। অতএব, সকলেই আমার প্রীতিপ্রদ এই ভীষ্মপঞ্চক নামক ব্রত আচরণ করুক। কার্তিক ব্রত করে যে নর এই ভীষ্মপঞ্চক ব্রত না করে, তার সমগ্র কার্তিক ব্রত বিফল হয়ে থাকে। মানব যদি কার্তিক ব্রত করতে অসমর্থ হয়, তবে কেবল ভীষ্মপঞ্চক করেই সমগ্র কার্তিক ব্রতের ফল লাভ করতে পারে।” পদ্মপুরাণের উত্তরখন্ডে (১২৪/২৯-৩০) বলা হয়েছে-

ভীষ্মেণৈতদষতঃ প্রাপ্তং ব্রতংপঞ্চদিনাত্মকম্।
সকাশাদ্বাসুদেবস্য তেনোক্তং ভীষ্মপঞ্চকম্॥

“ভগবান বাসুদেবের নিকট থেকে ভীষ্মদেব এই পঞ্চদিনাত্মক ব্রত প্রাপ্ত হয়েছেন, তাই তা ভীষ্মপঞ্চক ব্রত নামে অভিহিত।”

ব্রতানাং মুনিশার্দ্দূল প্রবরং বিষ্ণুপঞ্চকম্।
তস্মিন যঃ পূজয়েদ্ভক্ত্যা শ্রীহরিং রাধয়া সহ॥
গন্ধপুষ্পের্ধূপদীপৈর্বস্ত্রৈর্নানাবিধৈঃ ফলৈঃ।
স যাতি বিষ্ণুসদনং সর্ববিবর্জিতঃ॥
(পদ্মপুরাণ, স্বর্গখন্ড ৪৮/৩-৪)

অর্থাৎ, “বিষ্ণুপঞ্চক ব্রত ব্রতসমূহের মধ্যে প্রবর। সেসময় যিনি ভক্তি সহকারে গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দীপ, বস্ত্র ও নানাবিধ ফল দ্বারা শ্রীরাধাসহ শ্রীহরিকে অর্চনা করেন, তিনি সর্বপাপ বিবর্জিত হয়ে বিষ্ণুসদনে গমন করেন।”

পত্র-পুষ্প অর্পন বিধি

ব্রত কালে শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণ বা ভগবানের অন্য যেকোনো রূপের শ্রীবিগ্রহকে ঘৃত প্রদীপ ও পুষ্প নিবেদন করা উচিত। ভগবানের শ্রীবিগ্রহে প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন পুষ্প নিবেদনের নিয়ম রয়েছে। এ প্রসঙ্গে গরুড়পুরাণ, পূর্বখন্ড ১২৩ অধ্যায়ে (৮-৯) বলা হয়েছে- ১ম দিন: পদ্মফুল- চরণকমলে, ২য় দিন: বিল্বপত্র-জানুতে, ৩য় দিন: গন্ধদ্রব্য- নাভিকমলে, ৪র্থ দিন: বিল্বপত্র ও জবাফুল- স্কন্দদেশে, ৫ম দিন: মালতীফুল -শিরোদেশে। যদি কখনো দুটো তিথি একদিনে পড়ে, তবে ঐদিন দু’দিনের উদ্দিষ্ট ফুলগুলো একই দিনে নিবেবদন করতে পারেন। আর যদি কারো নিকট ফুলগুলো না থাকে, তবে ভগবানের নির্ধারিত স্থানে নির্ধারিত ফুলগুলো কেউ মানসিকভাবে নিবেদন করতে পারেন।

আহার বিধি:

ব্রতকারী কতবার আহার গ্রহণ করতে পারে সে ব্যাপারে নির্ধারিত কোনোকিছু উল্লেখ নেই। ভীষ্মপঞ্চক ব্রত ব্যাক্তির সামর্থ্য অনুসারে বিভিন্ন স্তরে উদযাপন করা যায়-একথা পদ্মপুরাণে (স্বর্গখন্ড ৪৮/১৫) বলা হয়েছে-
এবং কর্ত্তুমশক্তে ষঃ ফলমূলঞ্চ ভোজনম্। কুর্য্যাদ্ববিষ্যৎ বা বিপ্র যথোক্তবিধিনা হ বৈ॥
সাধারণত একাদশীতে সম্পূর্ণ উপবাস এবং তার পরবর্তী চারদিন ফলমূল গ্রহণ করতে বলা হয় অথবা কেউ পাঁচদিনই ফলমূল গ্রহণ করতে পারেন। ভক্তরা তাদের সুবিধামতো নিম্নোক্ত স্তরগুলোর যেকোনোটি অনুসরণ করতে পারেন, যেন তাদের সাধারণ ভক্তিমূলক সেবা ও দৈনন্দিন সাধনায় বিঘ্ন না ঘটে।

১ম স্তর-পঞ্চগব্য গ্রহণ

পঞ্চগব্যের একেকটি একেক দিনে গ্রহণ করা যেতে পারে (গ.পু.পূর্ব ১২৩/১০; প.পু. স্বর্গ. ৪৮/১১-১৪; স্কন্দ.পু.কার্তিকমাস মাহাত্ম্য ৩২/ ৪৬, ৪৭, ৫০)। ১ম দিন: গোময়, ২য় দিন: গোমুত্র, ৩য় দিন: দুগ্ধ, ৪র্থ দিন: দধি, ৫ম দিন: গোময়, গোমূত্র, দুগ্ধ।

২য় স্তর-ফলমূল গ্রহণ

যদি কেউ ১ম স্তর অনুসরণ করতে না পারেন, তবে ফলমূল গ্রহণ করা যেতে পারে। অধিকাংশ ব্যক্তি ফলমূল গ্রহণ করেন। তাই আলু, মূল এবং ফল যেমন কলা, আপেল, কূল, পানিফল, বাদাম, আখরোট, হেলেনটস, কাজুবাদাম, কিসমিস ও খেজুর খাওয়া যেতে পারে। বিভিন্ন ফলের মতো এগুলোও ফল হিসেবে বিবেচিত হয়। আখের রস এবং ইক্ষুদ্রব্য যেমন মিছরি গ্রহণ করা যাবে। কিন্তু গুড় এবং মোলাসেস অনুমোদিত নয়। আলু, কাঁচকলা বা মিষ্টি আলু সেদ্ধ করে গ্রহণ করা যেতে পারে। স্বাদের জন্য সৈন্ধব লবণ ব্যবহার অনুমোদিত। তবে দুধ বা দুগ্ধজাত কোনো দ্রব্য গ্রহণ করা যাবে না। নারকেল ও নারকেলের জল গ্রহণ করা যাবে।

ভীষ্মপঞ্চক ব্রতের উদ্দেশ্য

যেহেতু উদ্দেশ্যটি হলো আমাদের নিয়মিত ভগবদ্ভক্তি চালিয়ে যাওয়া, এমন নয় যে, আমি উপবাস করছি, তাই আমি কিছু করব না। যাদের ডায়াবেটিস আছে অথবা যারা সম্পূর্ণ উপবাস করতে পারবেন না, তারা হবিষ্যান্ন পেতে পারেন। যে ব্যাপারটি চিত্তাকর্ষক তা হলো, ভীষ্মদেব তাঁর পিতার কারণে বিবাহ না করার প্রতিজ্ঞা করেছেন। এর পেছনে এক বৃহৎ কাহিনী রয়েছে। প্রার্থনায় আছে, ‘আজন্ম ব্রহ্মচারিণে’, আমরা তাঁর জন্য তর্পণ করছি। তাঁর কোনো সন্তান নেই, তিনি বিবাহ করেননি। সারা ভারতে এবং সারা বিশে^র লক্ষ লক্ষ মানুষ ভীষ্মদেবের জন্য ভীষ্মপঞ্চক করছেন এবং তারা তর্পণ করছেন; কিন্তু তাঁর কোনো সন্তান নেই এবং গঙ্গাদেবী প্রসন্ন হন যে, তাঁর পুত্র সম্মানপ্রাপ্ত হচ্ছেন। এভাবে এই ব্রতের ফলে মাতাগঙ্গা, মহাত্মা ভীষ্মদেব এবং সর্বোপরি পরমেশ্বর ভগবান প্রসন্ন হন। আর তাঁকে প্রসন্ন করাই সমস্ত যজ্ঞ, দান, ব্রত বা তপস্যার মুখ্য উদ্দেশ্য।

ভীষ্মদেবের উপদেশ

ভীষ্মদেব সমস্ত মানুষের জন্য নয়টি গুনের উপদেশ দিয়েছেন- ১) ক্রোধ না করা, ২) মিথ্যা কথা না বলা, ৩) সম্পদ সমানভাবে বিতরণ করা, ৪) ক্ষমা করা, ৫) বিবাহিত পত্নির মাধ্যমে কেবল সন্তান উৎপাদন করা, ৬) মন এবং শরীরে শুদ্ধ থাকা, ৭) কারও প্রতি শত্রুভাব পোষণ না করা, ৮) সরল হওয়া, ৯) ভৃত্য ও আশ্রিতদের পালন করা। যদি করো উপরোক্ত প্রাথমিক গুণগুলি না থাকে, তাহলে তাকে সভ্য বলা যায় না।

(শ্রীমদ্ভাগবত ১/৯/২৬)

মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ এবং মাৎসর্য জয় করতে হয়। ক্রোধ জয় করার জন্য ক্ষমা শিখতে হয়। অবৈধ বাসনার থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করার প্রবণতা ত্যাগ করতে হয়। আধ্যাত্মিক অনুশীলনের দ্বারা নিদ্রাজয় করা যায়। সহিষ্ণুতার দ্বারা লোভ জয় করা যায়। বিভিন্ন রোগের উৎপাত প্রতিহত করা যায় নিয়ন্ত্রিত আহারের দ্বারা। আত্ম-সংযমের দ্বারা মিথ্যা আশা থেকে মুক্ত হওয়া যায় এবং অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করার ফলে অর্থের অপব্যয় বন্ধ করা যায়। যোগ অনুশীলনের ফলে ক্ষুধা এবং তৃষ্ণা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। জগতের অনিত্য সম্বন্ধে জ্ঞান আহরণের ফলে বিষয়-তৃষ্ণা নিধারণ করা যায়। বিহ্বলতা জয় করা যায় খুব ভোরে শয্যা ত্যাগ করার দ্বারা এবং তথ্য নির্ধারণ করার মাধ্যমে মিথ্যা তর্ক জয় করা যায়। মৌনতা এবং গাম্ভীর্যের দ্বারা বাচালতা বর্জন করা যায় এবং বীর্যের দ্বারা ভয় জয় করা যায়। আত্ম-অনুশীলনের দ্বারা পূর্ণ জ্ঞান লাভ করা যায়। প্রকৃতপক্ষে মুক্তিলাভের জন্য কাম, লোভ, ক্রোধ, স্বপ্ন ইত্যাদি থেকে মুক্ত হওয়া অবশ্য কর্তব্য।

(শ্রীমদ্ভাগবত ১/৯/২৭)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here