গরুর গাড়ি

0
30

১৯৭৭ সালের অক্টোবর মাস, শ্রীল নারদ মুনি ট্রাভেলিং সংকীর্তন দলের সাথে লোকনাথ স্বামী মহারাজ উত্তর ভারতে ভ্রমণ করছিলেন। সে সময় সবাই সেখানে প্রচার, গ্রন্থ বিতরণ এবং বিভিন্ন উৎসব পরিচালনায় ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ সংবাদ এল শ্রীল প্রভুপাদের স্বাস্থ্য খুব একটা ভালো নয় এবং তিনি এখন বৃন্দাবনে অবস্থান করছেন। সারা বিশ্ব থেকে আগত ভক্তরা তখন বৃন্দাবনে অবস্থান করছিল। লোকনাথ স্বামী মহারাজও উত্তর ভারত থেকে ছুটে গেলেন বৃন্দাবনে গুরুমহারাজ শ্রীল প্রভুপাদকে দেখতে। শ্রীল প্রভুপাদের কোয়ার্টারে প্রবেশ করা মাত্রই প্রভুপাদ তাদের সংকীর্তন কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে গরুর গাড়ী চাইলেন। প্রভুপাদ তখন বিছানায় শুয়ে লোকনাথ মহারাজের নিকট থেকে জানতে চাইলেন কোন গ্রন্থটি বেশি বিতরণ হচ্ছে? কিভাবে সংকীর্তন দল পরিচালিত হচ্ছে? ইত্যাদি প্রভুপাদ তাদের প্রচার কার্যক্রমের কথা শুনে সন্তুষ্ট বোধ করল কিছুক্ষণ পর সবাই কক্ষ থেকে বের হয়ে যায়। সবাই বের হওয়ার সময় প্রভুপাদ লোকনাথ  স্বামী মহারাজকে পেছন থেকে ডাক দিলেন। প্রভুপাদ তাকে তার পাশে আসতে বলেছে  এটি শুনেই লোকনাথ স্বামী একটু অবাক হয়েছিলেন। তাকে প্রভুপাদ বললেন “আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাই। কোন সময়টি তোমার জন্য উপযুক্ত?” তিনি উত্তর দিলেন আপনার যখন খুশি, কোন প্রশ্ন ছাড়াই আমি আসতে বাধ্য। প্রভুপাদ তখন তাকে ঐদিন বিকেল ৪টায় আসতে বললেন। সেদিন বিকেল ৪টা পর্যন্ত লোকনাথ স্বামী একটু চিন্তিত ও রোমাঞ্চ | অনুভব করছিল যে প্রভুপাদ তাকে কি বলবে? অবশেষে বিকেল ৪টায় যখন একটি রুমে প্রবেশ করলেন তখন তিনি রুমের মধ্যে দেখলেন সেখানে অনেক সিনিয়র বৈষ্ণববৃন্দরা একত্রে মিলিত হয়েছে। যাদের মধ্যে ছিল শ্রীল প্রভুপাদের ব্যক্তিগত স্টাফ এবং সেক্রেটারীরা। তখন তারা আমাকে বলল শ্রীল প্রভুপাদ গরুর গাড়িতে করে বৃন্দাবন ঘুরতে চায়। আর তাকে এর ব্যবস্থা করতে বলা হল। শ্রীল প্রভুপাদের এ আদেশ শুনে মহারাজ তখন অত্যন্ত উৎসাহ ও আনন্দের সাথে পঞ্চদ্রভিদ স্বামী এবং ত্রিবিক্রম স্বামীর সাথে একত্রে মথুরায় গিয়েছিলেন দুটি গরুর গাড়ী ব্যবস্থা করতে। তারা দুটি গাড়ি ব্যবস্থা করে সন্ধ্যায় বৃন্দাবনে ফিরে আসল। পরদিন সকালে প্রভুপাদের ভ্রমনের অভিলাষ পূরণ করার জন্য সব প্রস্তুত হল। কিন্তু ঐ দিন রাতেই খবর এল, প্রভুপাদ প্রোগ্রামটি সঙ্গতকারণে বাতিল করেছেন কেননা উনার স্বাস্থ্যের কথা ভেবে তার শিষ্যরা অনুরোধ করল যেন এ অবস্থায় তিনি পদযাত্রায় বের না হন। তাই শ্রীল প্রভুপাদ সকলের অনুরোধ রাখলেন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই শিষ্যবৃন্দদের কাছে তার অভিলাষ পুনরায় ব্যক্ত করলে, এবার শিষ্যরা আর থেমে থাকেনি। তারা সবাই এখন রাজী কেননা তিনি এখন সামান্য সুস্থ অনুভব করছেন। তবে এবারের পরিকল্পনায় গরুর গাড়ির পরিবর্তে মোটর গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছিল । গিরিরাজ স্বামী উত্থাপন করলেন এ ভ্রমনে লোকজনদের কৃষ্ণভাবনার অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রচারের একটি সুবর্ণ সুযোগ। ভক্তিস্বরূপ দামোদর বললেন, “আমরা পথের মাঝখানে বিজ্ঞানীদের নিয়ে অনুষ্ঠান করতে পারি।” এভাবে এই ভ্রমনের গুরুত্ব সবাই উপলব্ধি করতে শ্রীল প্রভুপাদের কাছে আবেদন জানালে প্রভুপাদ তাদেরকে যাওয়ার জন্য অনুমতি দেয়। তখন লোকনাথ স্বামীও প্রভুপাদের কাছে প্রার্থনা জানালেন তিনিও এ ভ্রমনে অংশগ্রহন করতে চান। শ্রীল প্রভুপাদ উত্তর দিলেন “হ্যা, তুমিই আমাদের ভ্রমনের নেতৃত্ব দেবে।” শ্রীল অতৃপাদের মুখ থেকে এ কথা শুনে লোকনাথ স্বামী খুব খুশি হয়েছিল। পরবর্তীতে খুব সুন্দরভাবে অত্যন্ত সফলতা সহকারে উক্ত পরিকল্পনাটি সাফল্যমণ্ডিত হয়েছিল। এরপর ঐ বছরেই ১৪ই নভেম্বর শ্রীল প্রভুপাদ সন্ধ্যায় সমাধিস্থ হলেন। তার দেহত্যাগের কিছুদিন পর লোকনাথ স্বামী গরুর গাড়িতে শ্রীল প্রভুপাদর পোট্রেট বসিয়ে গোবর্ধন পর্বত পরিক্রমা করেছিলেন। ১৯৭৮ সালের দিকে লোকনাথ স্বামী পদযাত্রা বিষয়ক অনেকগুলো পরিক্রমার চিন্তা ভাবনা করলেও তা আর হয়ে উঠেনি। এভাবে শ্রীল প্রভুপাদের ষাঁড়ের গাড়িতে করে পরিভ্রমণ কার্যক্রম অনেকদিন যাবৎ অপুরণই থেকে গেল। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে যখন চৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব উপলক্ষে ইস্কন বৈষ্ণববৃন্দরা এ উৎসব বিশালভাবে উদযাপনের পরিকল্পনা করল তখন সবাই সিদ্ধান্ত নিল যে, মহাপ্রভু শত বছর আগে যেই পথ দিয়ে সংকীর্তন পদযাত্রা করেছিলেন সেই পথ দিয়ে পদযাত্রা হবে। আর এ উদ্যোগ গ্রহনের ফলে লোকনাথ স্বামীর পদযাত্রার ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হল। প্রায় সাত বছর পর শ্রীল প্রভুপাদের ঐ ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে ভক্তরা প্রায় ১৪,০০০  কি.মি পথ পায়ে হেঁটে পরিভ্রমন করেছিল সাড়ে তিন বছর পর ঐ পদযাত্রা মায়াপুর থেকে শুরু হয়ে ব্রজমণ্ডল, বদ্রিকা আশ্রম কুরুক্ষেত্র, পুস্কর, নাথদ্বারসহ বিভিন্ন তীর্থস্থান পরিভ্রমন করে দ্বারকায় ফিরে আসল। ঐ পদযাত্রা ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমগুলোতে জোড়ালোভাবে প্রচার। হরে কৃষ্ণ


চৈতন্য সন্দেশ আগস্ট-২০০৯ ইং প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here