ভারতের ভূ-স্বর্গ

0
35

যেটি পরিদর্শনের জন্য প্রতিদিন প্রায় ২৫,০০০ দর্শনার্থী ভ্রমণ করে।

ব্রজলীলা দাস

১৯৬৫ সালে আগস্টে আমেরিকায় পাড়ি দেয়ার কয়েক সপ্তাহ পূর্বে প্রভুপাদ যখন সিন্ধিয়া কলোনিতে ছিলেন, তখন সিন্ধিয়া স্টীমশিপ কোম্পানির চেয়ারম্যান শ্রীমতী সুমতি মোরারজির কাছে শ্রীমদ্ভাগবতের তত্ত্ব বিশ্লেষন করার জন্য অতিথিরূপে প্রতিদিন সন্ধ্যায় জুহুতে তাঁর বাড়িতে যেতেন। যাওয়ার পথে তিনি জুহুতে একটি জমি দেখছিলেন এবং ভাবতেন, এখানে শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণের মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে পারলে খুব ভাল হয়। যদিও তখন ভারত ত্যাগ করার চিন্তাতেই তিনি মগ্ন, তবুও তিনি জুহুতে এই জমিটির কথা বিবেচনা করেছিলেন। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে তিনি আবার জুহুতে ফিরে এসে, বহুদিন পূর্বে দেখা সেই জমিটির কথা পুণরায় বিবেচনা করেছেন। সেটি তিনি শ্রীকৃষ্ণের একটি ইঙ্গিত বলে মনে করেছিলেন।

মৌখিক চুক্তি

সেই পাঁচ একর জমিটির মালিক শ্রীযুক্ত ‘এন’ জমিটির জন্য বেশ স্বল্প মূল্যই নির্ধারণ করেছিলেন এবং তাঁকে দেখে মনে হয়েছিল বেশ বন্ধুভাবাপন্ন এবং ঐকান্তিক। তবুও এই ধরনের লেনদেনে বিপদের ঝুঁকি থাকে এবং এক্ষেত্রে সন্দিহান হওয়ার কয়েকটি কারণও প্রভুপাদের ছিল। প্রভুপাদ তাঁর উকিলের মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন যে, শ্রীযুক্ত ‘এন’ পূর্বে ‘সি’ কোম্পানির কাছে এই জমিটি বিক্রি করেছিলেন, তবে পরে তিনি সেই চুক্তিটি নাকচ করে দেন। ‘সি’ কোম্পানি তখন শ্রীযুক্ত ‘এন’-এর বিরুদ্ধে শর্তভঙ্গের মামলা করেছিল। মুম্বাই হাইকোর্ট যদি ‘সি’ কোম্পানির পক্ষে রায় দেয়, তাহলে জমিটি তারাই পাবে। প্রভুপাদের সেক্রেটারি শ্রীযুক্ত ‘এন’-কে এই সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে তিনি আশ্বাস দেন যে, এই মামলাটি ‘সি’ কোম্পানি কোনোমতেই জিততে পারবে না, তবে ‘সি’ কোম্পানির সঙ্গে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ইসকন কিছু টাকা জমা রাখতে পারে।
উল্লেখ্য, শ্রীযুক্ত ‘এন’ ছিলেন মুম্বাইয়ের একজন বিখ্যাত ব্যক্তি। পর্বে তিনি ছিলেন মুম্বাই-এর শেরিফ এবং এখন তিনি মুম্বাইয়ের সবচেয়ে বড় ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার প্রকাশক/সম্পাদক। তিনি ছিলেন ধনী। জুহু ও মুম্বাইয়ের অন্যান্য অঞ্চলে তাঁর বেশ কিছু সম্পত্তি ছিল-তিনি ছিলেন এমন একজন প্রভাবশালী মানুষ, যার বিরুদ্ধে সহজে কেউ দাড়াত না। বর্তমান পরিস্থিতিতে জুহুর সেই জমিটি কিনতে হলে বেশ নির্ভীক হতে হবে।
ডিসেম্বর মাসের শেষে প্রভুপাদ শ্রীযুক্ত ও শ্রীমতী ‘এন’ এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জুহুর সেই জমিটির প্রতি তাঁর আগ্রহ খোলাখুলিভাবে বলে স্বীকার করেন যে, তাঁর কাছে প্রচুর অর্থও নেই। মনে হয়েছিল, শ্রীযুক্ত ‘এন’ প্রভুপাদের প্রতি আসক্ত হয়েছিলেন এবং তিনি তাঁর কাছে সেই জমিটি বিক্রি করতে চান। অচিরেই তাঁদের মধ্যে একটি মৌখিক চুক্তি হয়েছিল ।

“অতি সুন্দর মন্দির তৈরি করব”

চুক্তি স্বাক্ষরের পর জুহুর ঐ স্থানে ১৯৭১ সালে শ্রীল প্রভুপাদ মুম্বাইয়ে শ্রীশ্রীরাধা-রাসবিহারীর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। কয়েকজন ভক্ত একটি ট্যাক্সি করে বিগ্রহগুলিকে ইস্কনের হরেকৃষ্ণ ল্যান্ডে নিয়ে আসেন। পূর্বেও তাঁদের এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু এবার তাঁদের আবাসস্থল হচ্ছে একটি তাঁবু। শ্রীল প্রভুপাদ যখন নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, জমি কেনার অগ্রিম অর্থ দেওয়া মাত্রই যেন শ্রীশ্রীরাধা রাসবিহারীকে সেখানে নিয়ে আসা হয়, তখন কয়েকজন ভক্ত তাঁকে প্রশ্ন করেছিল-উপযুক্ত ব্যবস্থা করার পূর্বেই কেন তাঁদের নিয়ে আসা হবে? মন্দির প্রতিষ্ঠা করা পর্যন্ত কি তাঁদের জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়? শ্রীল প্রভুপাদ উত্তর দিয়েছিলেন, “জমিতে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হলে, তখন কেউ তাদের সেখান থেকে সরাতে পারবে না।”
শ্রীশ্রীরাধা-রাসবিহারীর উপযুক্ত সেবাপূজা প্রদানে শ্রীল প্রভুপাদের চেয়ে বেশি সচেতন কেউ ছিল না। কিন্তু তিনি যে এভাবে জোর দিলেন, তার কারণ ছিল সেই জমিটির ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। তিনি বলেছিলেন, সেই জমিটির ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠা না করতে পারলে, কিভাবে তিনি শ্রীশ্রীরাধা-রাসবিহারীকে মর্মর মন্দিরে রাজসিংহাসন প্রদান করবেন? জুহুতে শ্রীশ্রীরাধা রাসবিহারীর আগমনের অর্থ ছিল ভক্তদের অসুবিধা বৃদ্ধি। এখন তাদের প্রতিদিন সকালে পূজা এবং ছোট রান্নাঘরে দিনে ছ’বার ভোগের বন্দোবস্ত করতে হবে, আর তাছাড়া রাধা-রাসবিহারীর তাঁবু খুব একটা সুদৃঢ় ছিল না এবং বাতাসে তা আন্দোলিত হতো।
কিন্তু শ্রীল প্রভুপাদ তাঁদের সেখানে নিয়ে আসাটা প্রয়োজন মনে করেছিলেন। সেটি ছিল একটি পারমার্থিক চাতুরী। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণকে যেহেতু এই অসুবিধা স্বীকার করতে হয়েছিল, তাই তিনি তাঁর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, “প্রভু দয়া করে আপনি এখানে থাকুন, আমি আপনার জন্য একটি অতি সুন্দর মন্দির তৈরি করব।”
শ্রীল প্রভুপাদ যখন মুম্বাইয়ে ফিরে আসেন, তখন শ্রীশ্রীরাধা-রাসবিহারীজী মণ্ডপের মন্দিরে প্রতিষ্ঠা হয়েছে। উৎসবে লোক সমাগম মুম্বাই শহরের মতো ততো বেশি হয়নি-প্রতি রাতে প্রায় জন্য পাঁচশ লোকের সমাগম হতো—কিন্তু শ্রীল প্রভুপাদ সন্তুষ্ট ছিলেন। এই অনুষ্ঠান হচ্ছে তাঁদের নিজেদের জমিতে এবং এটি হচ্ছে শুরু।

ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন

জমির মালিক জমিটি দিতে ষড়যন্ত্র করছিল। জুহুতে আসার কয়েকদিন পর প্রভুপাদ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের অনুষ্ঠান করেন—যেটি ছিল সেই জমিটির ওপর দখল কায়েম করার আর একটি চাতুরী। তিনি চেয়েছিলেন, শীঘ্রই একটি মন্দির তৈরি করতে। তিনি শ্রীশ্রীরাধা-রাসবিহারীকে একটি তাঁবুতে থাকতে দেখে অসন্তুষ্ট হতেন, তিনি চেয়েছিলেন তাঁরা যেন এক মর্মর মন্দিরে রূপার সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁদের দু’পাশে থাকবে দুজন গোপী-ললিতা এবং বিশাখার বিগ্রহ। মন্দিরের মর্মর গম্বুজ হবে একশ ফুটেরও বেশি উঁচু। প্রতিদিন হাজার হাজার লোক তাদের দর্শন ও প্রসাদ গ্রহণ করার জন্য আসবে।
একদিন সকালে, উৎসবের কার্যকলাপের মাঝে, হরেকৃষ্ণ ল্যান্ডের ভক্তরা প্রভুপাদের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। এর অনাড়ম্বর ভিত্তিপ্রস্তর প্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে তারা একটি গভীর গর্ত খনন করে তা ইট দিয়ে ঘিরেছিল। শ্রীল প্রভুপাদ সেই গর্তের সিঁড়ি বেয়ে নেমে শ্রীশ্রীঅনন্তদেবের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তারপর এক মঞ্চে বসে একটি কাঁসর বাজিয়ে কীর্তন করেছিলেন। আর ভক্তরা তখন তাঁর সামনে একে একে বসে, সেই গর্তে মাটি ফেলে গর্তটি ভরাট করেছিল, আর তখন যজ্ঞাগ্নির ধূম উঠছিল।
শ্রীল প্রভুপাদ যখন মুম্বাইতে ছিলেন, তখন কাকতালীয়ভাবে হাস কিলম্যান নামক হল্যান্ড দেশীয় একজন যুবক আর্কিটেক্ট তাঁর ভাষণ শুনতে এসে কৃষ্ণভাবনামৃতের প্রতি আকৃষ্ট হয়। শ্রীল প্রভুপাদের প্রেরণায় হাস অবিশ্বাস্যভাবে কৃষ্ণভক্তে পরিণত হয় এবং মুম্বাইয়ে হরেকৃষ্ণ নগরী তৈরির কাজে সাহায্য করতে শুরু করে। শ্রীল প্রভুপাদের পরিচালনায় হান্‌স তৎক্ষণাৎ মন্দিরের আর্কিটেক্‌চারাল ড্রয়িং করতে শুরু করে।

মায়ার বিরুদ্ধে প্রবল সংগ্রাম

১৯৬৫ সালে আমেরিকায় যাওয়ার আগেই তাঁর তাৎপর্যকৃত শ্রীমদ্ভাগবতে তিনি এই সিদ্ধান্তের কথা লিখেছিলেন।
সমস্ত মুনি-ঋষি এবং ভগবদ্ভক্তরা নির্দেশ দিয়ে গেছেন যে, শিল্পকলা, বিজ্ঞান, দর্শন, রসায়ন এবং জ্ঞানের অন্য সমস্ত শাখাগুলি যেন সম্পূর্ণরূপে পরমেশ্বর ভগবানের সেবায় নিয়োজিত হয়।
শ্রীল প্রভুপাদ চেয়েছিলেন, জড় জগতের একটি বিশাল অংশকে পারমার্থিক জগতে রূপান্তরিত করতে। জুহুতে পারমার্থিক নগরী প্রতিষ্ঠা করা কালে তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, তিনি মায়ার বিরুদ্ধে এক প্রবল আক্রমণের সূচনা করছেন। কয়েক মাসের মধ্যেই কত জটিলতা ও প্রতিবন্ধক তাঁর পরিকল্পনাগুলিকে বাধা দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তা আরো বৃদ্ধি পাবে; সংগ্রাম সবে শুরু হচ্ছিল।
উল্লেখ্য, মুম্বাই এক অতি গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং সেখানে মহা আড়ম্বরে মন্দিরে পূজা, প্রসাদ বিতরণ এবং বিভিন্ন ধরনের বৈদিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রয়োজন। জুহুর জমিটি স্কুল, নাট্যশালা, লাইব্রেরি এবং থাকার জন্য আদর্শ স্থান-যেন একটি হরেকৃষ্ণ নগরী। সুতরাং যে পাষণ্ডটি তাঁকে প্রতারণা করবার চেষ্টা করছে, তার ছলচাতুরিতে শ্রীল প্রভুপাদ পিছপা হবেন কি করে? কৃষ্ণভাবনামৃত প্রসারে বাধা সব সময়ই আসবে, কিন্তু তাই বলে ভক্তরা নতি স্বীকার করবে না। প্রচারককে অনেক সহিষ্ণু হতে হয় এবং কখনও কখনও যখন সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয় এবং শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্য বজায় রাখার আর কোনো উপায় থাকে না, তখন লড়াই করতে বাধ্য হতে হয়।
এই জমিটি ছাড়তে না চাওয়ার আর একটি কারণ ছিল, শ্রীশ্রীরাধা-বাসবিহারীর কাছে শ্রীল প্রভুপাদের প্রতিজ্ঞা। তিনি শ্রীকৃষ্ণকে এখানে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে এসেছেন এবং প্রার্থনা করেছেন, “হে প্রভু, দয়া করে আপনি এখানে থাকুন এবং আমি এখানে আপনার জন্য একটি সুন্দর মন্দির তৈরি করে দেব।”
সুতরাং যদিও হরেকৃষ্ণ ল্যান্ডের জমিটি পাওয়ার জন্য শ্রীল প্রভুপাদের বাহ্যিক অথবা আপাত কারণ ছিল প্রচারের কাজে সেই জমিটি ব্যবহার করা। কিন্তু আভ্যন্তরীণ কারণটি ছিল শ্রীশ্রীরাধা রাসবিহারীজীর কাছে তাঁর প্রতিশ্রুতি। জমিটি রাখার ব্যাপারে প্রভুপাদের সংগ্রামের উদ্যম ছিল এতই প্রবল যে, কখনও কখনও মনে হতো তিনি কেবল লড়াই করার জন্যই লড়াই করছেন। তিনি কখনও কখনও শ্রীযুক্ত ‘এন’-কে অসুর কংসের সাথে তুলনা করতেন, যে বারবার শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার প্রচেষ্টায় বহু অসুর নিয়োগ করেছিল, তেমনই শ্রীযুক্ত ‘এন’-ও তাঁর উকিল, বন্ধু, গুণ্ডা আদি আসুরিক প্রতিনিধিদের নিয়োগ করেছিলেন। কংসকে বধ করা ছিল শ্রীকৃষ্ণের লীলা-তিনি তা উপভোগ করেছিলেন এবং শ্রীকৃষ্ণের প্রতিনিধিরূপে শ্রীল প্রভুপাদ সেই লড়াইয়ে সম্পূর্ণভাবে মগ্ন ছিলেন। তিনি সতর্ক এবং প্রস্তুত ছিলেন। শ্রীযুক্ত ‘এন’ যখন ভক্তদের ভয় দেখিয়ে পিছু হটিয়ে দিচ্ছিলেন, শ্রীল প্রভুপাদ তখন বীরদর্পে সেখানে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি স্বাভাবিকভাবেই যেন সেই লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছিলেন; কেননা সেটি ছিল শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীকৃষ্ণের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ অবলম্বন করে বিরুদ্ধ পক্ষের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

শ্রীবিগ্রহের রক্ষক ও পালক

শ্রীল প্রভুপাদ মুম্বাই-ইসকনের শ্রীবিগ্রহদের রক্ষক এবং পালকরূপে আচরণ করছিলেন। সেই সম্বন্ধে তাঁর The Nectar of Devotion গ্রন্থে তিনি বর্ণনা করেছেন, বহু মহান ভক্ত শ্রীকৃষ্ণের রক্ষকরূপে তাঁর সঙ্গে নিত্য সম্পর্কে লিপ্ত। শিশুরূপে শ্রীকৃষ্ণ যখন কালীয় দমন করছিলেন, তখন শ্রীকৃষ্ণের মাতা ও পিতা গভীর ও অপ্রাকৃত আশঙ্কায় মগ্ন হয়েছিলেন। তাঁরা তাঁদের শিশুটিকে সেই ভীষণ সর্পের বেষ্টনে আবদ্ধ দেখেছিলেন এবং শ্রীকৃষ্ণের প্রাণের আশঙ্কা করে তাঁকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের অশুভ আশঙ্কায় তাঁর নিত্য মাতা এবং পিতা সর্বদাই চিন্তাগ্রস্থ থাকেন এবং যখন কোনো সংকট আসে তখন দের উৎকণ্ঠা স্বাভাবিকভাবেই বহুগুণে বর্ধিত হয়। এইভাবে তাঁরা শ্রীকৃষ্ণের প্রতি সব চাইতে গভীর অনুরাগ প্রদর্শন করেন।
শ্রীল প্রভুপাদের মনোভাব ছিল শ্রীশ্রীরাধা রাসবিহারীকে রক্ষা করা এবং কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের প্রচার করা। যদিও তিনি জানতেন যে, শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরম রক্ষক এবং তাঁর ইচ্ছাকে কেউই প্রতিহত করতে পারে না, কিন্তু তবুও শ্রীকৃষ্ণের মহিমা প্রচার অপ্রতিহত রাখার বাসনায় তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে, অসুর শ্রীযুক্ত ‘এন, হয়তো কোনো ক্ষতি করতে পারে।
কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন রক্ষা করার ব্যাপারে শ্রীল প্রভুপাদের উদ্বেগ তাঁর ভক্তদের মধ্যেও প্রসারিত হয়েছিল। তাঁর কাছে তারা ছিল পার্থিব বিষয়ে অনভিজ্ঞ শিশু; পাষণ্ডীদের সঙ্গে যে কিভাবে আচরণ করতে হয় তা তারা জানতো না এবং সহজেই প্রতারিত হতো। কিন্তু পুত্ররা যদি প্রতারিত হয়, তা হলে পরিবার রক্ষা করার জন্য পিতাকে অবশ্যই চতুর এবং দৃঢ় হতে হয়। শ্রীকৃষ্ণের প্রতিষ্ঠান এবং তাঁর ভক্তদের রক্ষকরূপে শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর শিষ্যদের বসবাসের জন্য সুন্দর বাড়ি তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যাতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবন যাপন করে শ্রীকৃষ্ণের সেবা করতে পারে। শ্রীল প্রভুপাদের গুরুদেব শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরও এই শিক্ষা নিয়ে ঘোষণা করেছিলেন যে, কৃষ্ণভাবনামৃতের প্রচারকেরা সব চাইতে ভালো জিনিসগুলি পাবে, কারণ তারা শ্রীকৃষ্ণের প্রতি সর্বশ্রেষ্ঠ সেবা নিবেদন করছে। শ্রীল প্রভুপাদ তাই মুম্বাই শহরে হরেকৃষ্ণ নগরী প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। তাঁর মনোভাব একজন নাগা সাধুর মতো ছিলো না, যিনি জড় জগতের সব কিছুর প্রতি উদাসীন। তিনি তাঁর হাজার হাজার শিষ্যের দায়িত্ব অনুভব করেছিলেন এবং তাই তাঁকে এত উদ্বেগের বোঝা বহন করতে হয়েছিল।
কি উদ্দেশ্য যে শ্রীল প্রভুপাদকে প্রণোদিত করছে, তা শ্রীযুক্ত ‘এন’ জানতেন না। আর শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর শুদ্ধ ভক্তের বিরুদ্ধাচরণ করার ফল যে কি তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি, সেই কথা ভগবদ্গীতা, শ্রীমদ্ভাগবত, রামায়ণ আদি ভারতবর্ষের সমস্ত শাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছে। শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীকৃষ্ণের পক্ষ অবলম্বন করে লড়াই করছিলেন; তাই শ্রীযুক্ত ‘এন’ পরম ঈশ্বর ভগবানের বিপক্ষ অবলম্বন করেছিলেন।

সমগ্র বিশ্বের জন্য মডেল

জাগতিক লোকদের সঙ্গে দীর্ঘ সংগ্রামের পর অবশেষে শ্রীল প্রভুপাদের বিজয় হলো। অর্থাৎ জুহুর জমিটি এখন ইসকনের অধীন। এরপর শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর শিষ্যদের অনুরোধ করেছিলেন, বিগ্রহের জন্য একটি মার্বেলের বেদির ওপর রৌপ্য ও সেগুন কাষ্ঠ দিয়ে তৈরি সিংহাসন তৈরির জন্য এবং তাদের মন্দিরটিতে মার্বেলের গম্বুজ থাকা উচিত যেটি শত ফুটেরও বেশি উঁচু হবে।
বর্তমানে এ সুন্দর মন্দিরটি ভারতের অন্যতম সবচেয়ে বেশি ভ্রমণমূলক মন্দির হিসেবে সুপরিচিত। প্রতিদিন প্রায় পঁচিশ হাজার দর্শনার্থী মন্দিরটি পরিদর্শন করে। ভারতের শুষ্ক এবং অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক রাজধানীর মধ্যে এ মন্দিরটি হল একটি পারমার্থিক মরুদ্যান। ১৯৭৮ সালে মন্দিরটি উদ্বোধন হয়। যেখানে রয়েছে একটি মার্বেল মন্দির, সম্প্রতি অন্তর্ভূক্তি ঘটেছে অডিটোরিয়াম, একটি বিশাল রেস্তোঁরা এবং এক জোড়া টাওয়ার বিশিষ্ট সাত তলা বিশিষ্ট অতিথিশালা যেখানে দর্শনার্থীরা অবস্থান করে মন্দিরের পারমার্থিক কার্যক্রমগুলোতে অংশগ্রহণ করতে পারে। প্রতি বছর ভারতের অনেক সেলিব্রেটি এ মন্দিরটি পরিদর্শন করে। তারা মন্দিরের পারমার্থিক কার্যক্রমগুলোতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে পারমার্থিক প্রশান্তি লাভ করে।
ভারতে শ্রীল প্রভুপাদের প্রধান কর্মসূচি ছিল বৈদিক শিক্ষা প্রসারের জন্য মন্দির প্রতিষ্ঠা করা। শ্রীল প্রভুপাদ এ মন্দিরটিকে ‘ভূ-স্বর্গ’ নামে অভিহিত করেছিলেন। ১৯৭২ সালের ২১ জুন গিরিরাজ দাসকে লেখা এক পত্রে প্রভুপাদ উল্লেখ করেছিলেন “আমি সর্বদা আমাদের জুহুর স্থানটির কথা ভাবি এবং আমি চাই কৃষ্ণভাবনাময় কমিউনিটির যথাযথ দৃষ্টান্ত হিসেবে অনুকরণ করতে ও সম্মান লাভ করতে এটি হবে সমগ্র বিশ্বের জন্য মডেল।”


 

জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here