ভগবান বুদ্ধ

0
42

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য : আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্‌কন)
২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭২ সালে, লস এঞ্জেলেসে প্রদত্ত প্রবচনের বঙ্গানুবাদ


ততঃ কলৌ সম্প্রবৃত্তে সম্মোহায় সুরদ্বিষাম্।
বুদ্ধো ন্মাঞ্জনসূতঃ কীকটেষু ভবিষ্যতি ॥

“তারপর কলিযুগের প্রারম্ভে ভগবান ভগবদ্বিদ্বেষী নাস্তিকদের সম্মোহিত করার জন্য বু দ্ধদেব নামে গয়া প্রদেশে অঞ্জনার পুত্ররূপে আবির্ভূত হবেন। (শ্রীমদ্ভাগবত ১/৩/২৪)
এই কথাগুলি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষত এই ভবিষ্যতি শব্দটি। ভবিষ্যতি কথাটির অর্থ হচ্ছে “ভবিষ্যতে তিনি আবির্ভূত হবেন।” অন্যান্য অবতারগণ, যেমন শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, তাঁরা বর্ণিত হয়েছেন, “তিনি এই কাজের জন্য আবির্ভূত হবেন, তারও তালিকা রয়েছে। তাই কোন নকল অবাতর আসতে পারে না। কেননা অতীত, বর্তমান ভবিষ্যতে সবকিছুর কথাই এখানে, ভাগবতে বর্ণিত রয়েছে ভবিষ্যতি। এই ভাগবত গ্রন্থ, শাস্ত্র রচিত হয়েছিল পাঁচ হাজার বৎসর আগে। সেই পাঁচ হাজার বছর আগে বুদ্ধ বলে কেউ ছিলেন না। কিন্তু ভবিষ্যতে তিনি আসবেন, আর সেই কথাটিই এখানে উল্লেখিত হয়েছে, ভবিষ্যতি। কেবল বুদ্ধের নামই নয়, তার মাতার নাম, কোন স্থানে তিন আবির্ভূত হবেন, সে কথঅও উল্লেখিত হয়েছে। একেই বলে শাস্ত্ৰ কোন জল্পনা কল্পনা নয়। বাস্তব সত্য। তা সে অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যতেই হোক, সেটি কোন ব্যাপার নয় ত্রিকালজ্ঞ ।
আমরা তাই সেই ধরনের ব্যক্তির থেকেই জ্ঞঅন গ্রহণ করি যিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত অবগত্ যে ব্যক্তি এমনকি বর্তমান কালেও কি ঘটছে এসব কিছুই জানেন না, কিভাবে আমরা তার কাছ থেকে জ্ঞঅন গ্রহণ করতে পারি? সেটি আমাদের পন্থা নয়। আমাদের পন্থাটি হল সেই ধরনের ব্যক্তির কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করা যিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতকে জানেন। ঠিক যেমন কৃষ্ণ ও অন্যান্য আচার্যগণ। তাঁরা জানেন। তাই আমাদের জ্ঞানও পূর্ণ, কেননা আমরা যথাযথ পূর্ণ জ্ঞানের থেকে জ্ঞান আরোহন করছি। অতএব আমাদের জ্ঞানও পূর্ণ। এর মানে এই নয় যে আমি পূর্ণ বা বিশুদ্ধ আমি পূর্ণ বা বিশুদ্ধ হতেও পারি বা নাও হতে পারি। কিন্তু যেহেতু আমি পূর্ণ বা বিশুদ্ধ জ্ঞান আরোহন করছি তাই সেই বিশুদ্ধ জ্ঞানের ভিত্তিতে যা বলব, সেটিও বিশুদ্ধ। এটিই আমাদের পন্থা। আপনাকে গবেষণা করার প্রয়োজন হবে না। আর কি গবেষণাই বা আপনি করবেন? কেননা আপনি স্বয়ং অপূর্ণ। কোন গবেষণা আপনি কতে পারেন? আপনার ইন্দ্রিয়গুলি অপূর্ণ। আপনার অণুবীক্ষণ যন্ত্র বা দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে আপনি মহাজাগতিক সৃষ্টি দর্শন করতে চাইছেন, কিন্তু সেই যন্ত্রটিও আপনার দ্বারাই নির্মিত আর আপনি যেহেতু অপূর্ণ, আপনি যা করবেন, তা সকলই অপূর্ণ। আপনি যে অপূর্ণ বা ভ্রান্ত সেটি আপনি কিভাবে জানবেন? বদ্ধ জীবের চারটি ত্রুটি রয়েছে। তার একটি হল সে নিশ্চিতরূপে ভুল করে। যে কেউই, তা তিনি পৃথিবীর যে কোন বড় মানুষই হোন না কেন, তাকে অবশ্যই ভুল করতে হবে। সে মায়াগ্রস্ত। সে কোনো কিছুর জন্য যেকোন কিছুকে গ্রহণ করছে আমরা প্রত্যেকেই এই দেহকে ‘আমি’ রূপে গ্রহণ করছি। আর সেই ধারণার ভিত্তিতে আমরা সংগ্রাম করছি। “আমি আমেরিকান, তুমি ভারতীয়।
“তুমি হিন্দু আমি মুসলিম।” এইসব চিন্তা কেবল জীবদের দেহগত ধারণার ভিত্তিতে। কি ন্তু ভাগবতে বলা হয়েছে যখন আমরা দেখব যে কেউ জীবনের দেহগত ধারণার স্তরে রয়েছে, বুঝতে হবে সে একটি পশু। সেটিই শেষ কথা। স এব গোখরঃ (ভাগবত-১০/৮৪/১০)। ‘গোখরঃ- গো মানে গরু, আর খরঃ মানে গাধা। তাই যারা দেহগত ধারণার অধীন তারা হচ্ছে বোঝা বা মূর্খ ।
এই সমস্ত কিছু শাস্ত্রে লিখিত রয়েছে। ঠিক যেমন ব্যাসদেব। ব্যাসদেব বলছেন যে কীকটে ভবিষ্যতি। কীকটেঘুষু মানে গয়া নামক অঞ্চল। যার অস্তিত্ব এখনও রয়েছে। ভবিষ্যতি অর্থাৎ হবে। কখন, ততঃ কলৌ সম্প্রবৃত্তে। কলৌ । এই যুগটিকে বলা হয় কলিযুগ। সম্প্রবৃত্তে— “ঠিক প্রারম্ভে।”
বুদ্ধদেব ২৬০০ বৎসর পূর্বে আবির্ভূত হয়েছিলেন কলিযুগের শুরুর সময়টিই সহস্র সহস্র বৎসর। ঠিক যেমন সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের একটি প্রারম্ভিক সময় আছে। না আলো না অন্ধকার। এটিকে বলে প্রারম্ভিক সময়। তেমনি একটি যুগের সমাপ্তির পর আরেকটি যুগের শুরুর একটি প্রারম্ভিক সময় আছে। তাকে বলে সম্প্রবৃত্তে কেবল শুরু।
অতএব সম্প্রবৃত্তে হচ্ছে কলিযুগের শুরুতে বা প্রারম্ভে। এই কলিযুগ ৪,৩২,০০০ বৎসর স্থায়ী হবে। তার মধ্যে আমরা মাত্র ৫০০০ বৎসর অতিবাহিত করেছি। কলিযুগ শুরু হয়েছিল পরীক্ষিৎ মহারাজের মৃত্যুর পর থেকে। পরীক্ষিৎ মহারাজের রাজত্বকালে কলিযুগ প্রবেশ করতে পারে নি। তিনি ছিলেন এমনই শক্তিশালী রাজা্ কলিযুগ মানে এই চারটি সূত্র-অবৈধ যৌনতা, নেশা করা, জুয়া খেলা আর মাংসাহার। কলিযুগ আরম্ভ হবার পূর্বে পৃথিবীতে এই সকল অধর্মগুলো ছিল না। কলিযুগের শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অবৈধ যৌনতা, আসবপান, জুয়া, মাংসাহারের মতো ব্যাপারগুলি শুরু হয়েছে। এখন তা প্রতিটি দেশে, প্রতিটি ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। পৃথিবী এখন এই চারটি পাপময় জীবনে পূর্ণ। এই শ্লোকে বলা হয়েছে-ততঃ কলৌ সম্প্রবৃত্তে সম্মোহায় সুরদ্বিষাম্। সুরদ্বিষাম্। দ্বিষ মানে “আমি তোমাকে দেখতে চাই না।” একেই বলে ‘দ্বিষ’। ইচ্ছা-দ্বেষ। আমাদের দু’ধরনের পছন্দ আছে। আমরা কাউকে দেখতে চাই এবং কাউকে দেখতে চাই না। ইচ্ছা-দ্বেষ্ এইগুলো হল আমাদের কার্যাবলী।

ইচ্ছা-দ্বেষ সমুখেন সর্গে যান্তি পরন্তপ।

আমরা এই জড় জগৎকে ভোগ করতে চাই এবং আমরা কৃষ্ণকে পছন্দ করি না। দ্বেষ মানে হলো, “আমি তোমাকে পছন্দ করি না।” আমরা যখন বলি যে, “আমি পছন্দ করি না।”, তাতে অনেক বিষয়কেই বোঝায়। যখনই আমরা বলি আমি কৃষ্ণকে, ভগবানকে পছন্দ করি না, আমি এ জগৎকে ভোগ করতে চাই, তখন তৎক্ষণাৎ আমাদের পতন হয় ইচ্ছা-দ্বেষ সমুখেন সর্গে যান্তি পরন্তপ। ভগবদ্‌গীতায় এই কথা বলা হয়েছে। সর্গে মানে সৃষ্টির সময়ে। আমাদের জড় জাগতিক দেহ সৃষ্টির এটিই কারণ। ঠিক যেমন তুমি যখন জলে প্রবেশ কর, সাঁতারুদের মতো। তুমি একটি নির্দিষ্ট পোশাক পরে জলে প্রবেশ করছ। তুমি যখন চাঁদে গমন করছ, তখন তোমাকে একটি নির্দিষ্ট ধরনের পোষাক ধারণ করতে হচ্ছে। সেটির দাম প্রায় চল্লিশ লক্ষ ডলার? তেমনই আমরা সকলেই চিন্ময় আত্মা। আমরা যখন এই জড় জগতে প্রবেশ করতে চাই, তখনই আমরা একটি জড় দেহ প্রাপ্ত হই। মাছ যেমন জলে সাঁতার কেটে আনন্দ পায়। তেমনি লোকেরাও জড় জগতে আনন্দ উপভোগের চেষ্টা ব্যস্ত। এই প্রকৃতিগত ঝোঁকটি সকলের মধ্যেই আছে । তুমি বলতে পার না, “কেন আমি এই জড় জগতে এসেছি? কেন তুমি জলে সাঁতার কাটছ? কেন? কে তোমাকে প্ররোচিত করেছে? এরকম কোন প্রশ্ন নেই। বাস্তব ঘটনা হলো যখনই তুমি এই জড় জগতে প্রবেশ করতে চাও, তোমাকে এই পোশাকটি গ্রহণ করতে হয়।
এখন, আমাদের সমস্যাটি হলো আমরা নিজেদের ইচ্ছার ফলেই এই জড় জগতে প্রবেশ করেছি। ইচ্ছা-দ্বেষ সমুখেন। কেউ আমাদের এখানে ঠেলে পাঠায় নি। তোমার কিছু উপভোগের জন্য জন্য তুমি কিছু চেয়েছো। কৃষ্ণ তোমাকে তা উপভোগের জন্য সরবরাহ করেছেন। ঠিক যেমন তুমি কারাগারের জীবনে প্রবেশ করতে চাও, তাই সরকার কারাগার সৃষ্টি করে। সরকার চায়না কারাগার তৈরী হোক। কেননা কারাগার রাখলে আলাদা একটি অপরাধী বিভাগ তৈরী করতে হয় এবং সেজন্য সরকারকে খরচ করতে হয় কোটি কোটি টাকা। এই ধরনের কোন পরিকল্পনা সরকারের থাকে না। কিন্তু যেহেতু তুমি কারাগার গৃহে প্রবেশ করতে চাও, তাই তোমার প্রবেশের পূর্বে সরকারকে প্রস্তুত হতে হয়, “এই যে তোমার গৃহ, এসো।” একইভাবে জাগতিক সৃষ্টিও সৃষ্ট হয়। এই জাগতিক সৃষ্টির কোন প্রয়োজন ছিল না। কোন কোন মূর্খ প্রশ্ন করে, “কেন ভগবান এই দুঃখ দুর্দশাপূর্ণ জগৎ সৃষ্টি করেছেন?” কিন্তু তুমি চেয়েছ, তাই ভগবান তোমাকে দিয়েছেন। যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাস্তথৈব ভজাম্যহম্ (গীতা-৪/১১)। কৃষ্ণ একথা বলছেন। তুমি একরম বস্তু চেয়েছিলে। সেই একই যেমন-কারাগার । কারাগার বিষয়ে সরকার কোনো প্রচার করছে না, “ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহিলাগণ, দয়া করে এখানে আসুন।” না তুমিই সেখানে যাচ্ছ। তেমনই, এই জড় জগৎ তোমাদের জন্য তৈরী হয়েছে, কেননা তোমরা এটা চেয়েছ। আর এখানে তুমি সুখ আশা করতে পার না। ঠিক যেমন কারাগারে তুমি আরামে থাকা আশা করতে পার না। এখানে অবশ্য কঠোর দুঃখ-দূর্দশা যন্ত্রণা থাকবে, যাতে তোমাকে আর এখানে না আসতে হয়। তুমি কখনই আশা করতে পার না যে কারাগৃহ খুব আরামদায়ক হবে আর সেখানে তুমি চিরদিন বাস করবে।
বিভিন্ন অবস্থাতে এত রকম শাস্তি, আঘাত, এত দুর্দশাপূর্ণ অবস্থা সত্ত্বেও আমরা এই স্থানটি ত্যাগ করতে চাই না। তাহলেই দেখ আমরা কতখানি আসক্তি লাভ করেছি। দুঃখালয়ং অশাশ্বতম্ (গীতা ৮/১৫)। এই স্থানটিকে দুঃখের স্থান বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি আনন্দ উপভোগের স্থান নয়। কিন্তু তবুও, আমরা সেটি ত্যাগ করতে ইচ্ছুক নই। এমনকি তুমি কোন আপস-মীমাংসাও করতে পার না। “ঠিক আছে, এটা তো দুঃখের স্থান, কিন্তু আমাদের রেডিও আর টেলিভিশন আছে। আমরা এখানে থেকে যাব না।” তোমার রেডিও টেলিভিশন থাকতে পারে এবং তুমি যদি থেকে যাবার জন্য আপস মীমাংসাও কর, প্রকৃতি সেটি অনুমোদন করবে না। কয়েক বৎসর পর তোমাকে এখান থেকে বের করে দেওয়া হবে “এখন এই গৃহ থেকে বেরিয়ে যাও।” “না, আমার এখানে টেলিভিশন আছে।” অশাশ্বতম্। তুমি কোন আপস-মীমাংসা করতে পার না। “ঠিক আছে, এটা দুঃখময় স্থান হলেও, আমি এখানে থাকব।” কিন্তু তোমাকে এখানে থাকতে দেওয়া হবে না। সেটি অনুমোদন করা হবে না। কিন্তু এইসব মূর্খ ও অজ্ঞরা, এগুলো বোঝে না। ভুত্বা ভুত্বা প্রলীয়তে।
তাই ভগবান বুদ্ধ আবির্ভূত হলেন। এইসব মূর্খদের সম্মোহিত করার জন্য, সম্মোহায় সুরদ্বিষাম্। “সুরদ্বিষাম্” মানে যারা মূর্খ, নাস্তিক। “ভগবান নেই।” বৌদ্ধধর্মে, তারা ভগবানে বিশ্বাস করে না। “হ্যাঁ, কোন আত্মা নেই । কোন ভগবান নেই।” এটিই বৌদ্ধ তত্ত্ব। শূণ্যবাদী । “সবকিছুই শূণ্য, শূণ্য হয়ে যাও।” বৌদ্ধ দর্শনটি হল—“এই দেহগত দুঃখ ও আনন্দ জড় বস্তুর সমন্বয়ের জন্য।” এই দেহ, এই স্থুল বা সূক্ষ্ম দেহ বিভিন্ন জড় পদার্থ দ্বারা নির্মিত। সেগুলো হল মাটি, জল, অগ্নি, বায়ু ও আকাশ আর মন, বুদ্ধি ও অহঙ্কার। এগুলো হচ্ছে স্থূল ও সূক্ষ্ম পদার্থ। বুদ্ধের দর্শনটি হল “এই পদার্থের সমন্বয়ের জন্যই আমরা দুঃখ ও আনন্দ অনুভব করি। সকলেই সকল দুঃখকে সমূলে উৎপাটিত করার চেষ্টা করছে। সেটিই হল অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম। তাই তুমি যদি এই সমন্বয়টিকে ভেঙে দাও তাহলে এই দুঃখ আপনা থেকেই শেষ হয়ে যাবে।” বুদ্ধ একে বলেছেন নির্বাণ। ভেঙে দেওয়া। ঠিক যেমন এই গৃহটি বিভিন্ন জড় বস্তুর সমন্বয়। কিন্তু যখন সেটি ভেঙে দেওয়া হয়, তখন আর কোন গৃহ থাকে না। আর যখনই কোন গৃহ থাকে না, সেখানে বাস করা বা দুঃখ কিংবা আনন্দ উপলব্ধিরও আর প্রশ্ন থাকে না।
এই হচ্ছে বৌদ্ধ দর্শন। শঙ্করের দর্শনটি হল, “না, কেবলমাত্র ভেঙে দেওয়াটাই কোন সমাধান নয়। এর ভিতরে আত্মা রয়েছে।” দেহিনোহস্মিন যথা দেহে। আচার্য শঙ্কর বললেন, “জীবনের এই বোধগম্যতা এই জ্ঞান কোথা থেকে আসছে? আত্মা রয়েছে, তাই ।” এটিই শঙ্করের দর্শন। কিন্তু তিনি হচ্ছেন নির্বিশেষবাদী, নিরাকারবাদী। তিনি বললেন,


ভগবান বুদ্ধদেব এমন এক সময় অবির্ভূত হয়েছিলেন, যখন মানুষ পশুহত্যার প্রতি অত্যন্ত আসক্তি ছিল। এখনও তা চলছে। কেশবধৃত বুদ্ধ শরীর জয় জগদীশ হরে। সদয় হৃদয়দর্শিত পশুঘাতম্। কোন ধর্মে যদি পশুঘাতম্ থাকে তবে সেটি বর্বরতা মাত্র।

“সেই চেতনার কোন রূপ নেই।” এরপর আরও উন্নতি সাধন হল বৈষ্ণব দর্শনে। বলা হল, যখনই কোথাও চেতনা রয়েছে, তার মনে সেই চেতনা একজন ব্যক্তির। এগুলি হল দর্শনের ক্রমোন্নতি । প্রকৃতপক্ষে এগুলি পরস্পর বিরোধী নয়। কিন্তু স্থান কাল অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের দর্শন উপস্থাপিত হয়েছে। ঠিক যেমন যীশু খ্রিষ্ট। তিনি উপদেশ দিচ্ছেন, “তুমি হত্যা করবেন না।” তার মানে মানুষ তখন হত্যা করতে অত্যন্ত অভ্যস্ত ছিল। প্রথম শ্রেণির একজন ভদ্রলোক। সেও হত্যা করতে চায়। এক্ষেত্রে কি উপদেশ দেওয়া যেতে পারে? প্রথমেই বলতে হবে “তুমি হত্যা করবে না।”
অতএব স্থান, কাল ও পাত্র অনুসারে বিভিন্ন শাস্ত্র রয়েছে। কিন্তু শাস্ত্রের অন্তিম উপদেশ হচ্ছে মানুষকে কৃষ্ণ চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা। তবে যেহেতু মানুষ সবকিছু বুঝতে অসমর্থ তাই সবকিছু ব্যাখ্যা করা হয় নি। ঠিক যেমন আমাদের কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে, আমরা আন্দোলন করছি, কিন্তু সকলেই যে হৃদয়ঙ্গম করছে এমন নয়। যারা অত্যন্ত বুদ্ধিমান বা যারা পুণ্যবান, তারা তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। ন মাং দুষ্কৃতিনো মূঢ়াঃ প্রপদ্যন্তে নরাধমাঃ। (গীতা ৭/১৫)। যারা মূঢ়, নরাধম এবং মায়ার দ্বারা যাদের জ্ঞান উপহৃত হয়েছে— এই ধরনের ব্যক্তিরা কখনই কৃষ্ণের শরণাগত হয় না। কিন্তু কে শরণাগত হয়? চতুর্বিধা ভজন্তে মাং জনাঃ সুকৃতিনোহর্জুন— যারা পুণ্যবান তাদের মধ্যে চার শ্রেণির মানুষ আর্ত, অর্থার্থী, জ্ঞানী ও জিজ্ঞাসু, ভগবানের শরণাগত হন। আর্ত মানে যারা দুর্দশাগ্রস্ত, অর্থার্থী মানে যাদের অর্থের প্রয়োজন, জ্ঞানী মানে যারা জ্ঞান অবগত এবং জিজ্ঞাসু মানে যারা ভগবান সম্বন্ধে কৌতূহলী।
ভগবান বুদ্ধদেব এমন এক সময় অবির্ভূত হয়েছিলেন, যখন মানুষ পশুহত্যার প্রতি অত্যন্ত আসক্তি ছিল। এখনও তা চলছে। কেশবধৃত বুদ্ধ শরীর জয় জগদীশ হরে। সদয় হৃদয়দর্শিত পশুঘাতম্ । কোন ধর্মে যদি পশুঘাতম্ থাকে তবে সেটি বর্বরতা মাত্র। তাই ভগবান এতটাই বিরক্ত হন যে,—এই মূর্খগুলো কেবল হত্যা করছে। সেই সময় অবশ্য বৌদ্ধ ধর্ম ছিল না। তথাকথিত বৈদিক ধর্মের অনুগামীরা মাত্র ছিল। বেদে বিশেষ যজ্ঞের মাধমে পশু বধের অনুমোদন রয়েছে। কিন্তু লোকে সেই অনুমোদনকে সাধারণভাবে গ্রহণ করেছিল। তারা বেদের নামে ইচ্ছামত পশু বধ শুরু করেছিল। তাই বুদ্ধদেব অবির্ভূত হয়ে যখন তাঁর দর্শনের অহিংসার প্রচার শুরু করলেন, তিনি বেদের কর্তৃত্ব অস্বীকার করলেন। কেননা মানুষ তার অপব্যহার করছে। সুতরাং তিনি বললেন, “আমি তোমাদের বেদকে গ্রাহ্য করি না।” ঠিক যেমন প্রভু যীশুখ্রিষ্ট সমস্ত টেস্টামেন্টের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। তিনি তাঁর নতুন সূত্র ‘নিউ টেস্টামেন্ট” তৈরী করেছিলেন। তেমনই ভগবান বুদ্ধদেব বেদকে অস্বীকার করলেন এবং তিনি তার নতুন দর্শন অহিংসার উপস্থাপন করলেন। অহিংসা পরম ধর্ম। কেননা তিনি অসহায় প্রাণীদের প্রতি অত্য ন্ত দয়ালু ছিলেন। সদয় হৃদয়দর্শিত পশুঘাতম্ পশুঘাতম্ মানে প্রাণী হত্যা। নিন্দসি যজ্ঞবিধেরহহ শ্রুতিজাতম্ । শ্রুতিজাতম্। শ্রুতি মানে বেদ। যদিও বেদে কোন কোন বিশেষ ক্ষেত্রে পশু হত্যার অনুমোদন রয়েছে, কিন্তু সেটিও অত্যন্ত সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে। তাই আমরা বলতে পারি না যে, বেদে পশু হত্যা নেই কিছু কিছু ক্ষেত্রে রয়েছে। তাই ভগবান বুদ্ধ বেদের নিন্দা করলেন, নিন্দসি, “না, আমি তোমাদের বেদকে স্বীকার করব না।” তাই বুদ্ধের প্রবর্তিত ধর্ম, বেদ হতে ভিন্ন। কেননা তিনি বেদকে প্রত্যাখান করেছেন। আর যেহেতু তিনি বেদকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাই বেদের অনুগামীরা তাঁকে বললেন, “আপনি নাস্তিক।” নাস্তিক মানে অবিশ্বাসী।


 

এপ্রিল-জুন ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here