ভক্ত ও ভগবান

0
50

ভগবদ্‌গীতায় ভগবান কৃষ্ণ স্বয়ং তাঁর আবির্ভাবের কারণ বর্ণনা করে বলেছেন-

পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্ ।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ৷৷

অর্থাৎ ভগবদ্ভক্তদের সুরক্ষা প্রদান ও অসুর হনন করে, ধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য যুগে যুগে তিনি আবির্ভূত হন। ঠিক যেমন আজ থেকে ৫০০০ বৎসর আগের মনুষ্যরূপে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মথুরায় আবির্ভূত হয়েছিলেন। বৈষ্ণবাচার্যগণ বলেন বিশেষভাবে ভক্তদের আনন্দ বিধানের জন্যই ভগবান আবির্ভূত হন এবং তাঁর বিভিন্ন মধুর ও অদ্ভূত লীলাসমূহ প্রদর্শন করেন। ভক্ত, ভগবান ও ভগবৎ-সেবা, এই তিনটি নিত্য। ভগবানের অপ্রাকৃত লীলাবিলাসসমূহ অনন্ত, তাঁর শেষ নেই। এইসব দিব্য, অপ্রাকৃত মধুর ভগবৎ লীলাসমূহ স্মরণ করে ভগবদ্ভক্তবৃন্দ সর্বদাই অপার আনন্দ লাভ করেন। নারদমুনি তাই ব্যাসদেবকে ভগবানের লীলাবিলাসমূহের মহিমা কীর্তন করতে নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। শ্রীল ব্যাসদেব বেদসমূহ প্রণয়ন করে আনন্দ লাভ করতে পারেন নি। কারণ, সেখানে তিনি ভগবানের মহিমার গুণ-কীর্তন করেন নি। তখন ব্যাসদেব তাঁর অবসাদ বা নিরানন্দের কারণ বিষয়ে নারদ মুনিকে জিজ্ঞাসা করলে নারদমুনি ব্যাসদেবকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলাবিলাস কীর্তন করতে বলেন। শ্রীল ব্যাসদেব তখন শ্রীমদ্ভাগবতের মাধ্যমে ভগবানের লীলাসমূহ বর্ণনা করে তাঁর মহিমা কীর্তন বা ‘হরি-কীর্তন’ করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ভগবদ্‌গীতায় (১০/৯) তাঁর ভক্তের লক্ষণ এভাবে প্রকাশ করেছেন—

মচ্চিত্তা মদ্‌গতপ্রাণা বোধয়ন্তঃ পরস্পরম্।
কথয়ন্তশ্চ মাং নিত্যং তুষ্যন্তি চ রমন্তি চ ॥

অর্থাৎ “যারা আমাতে চিত্ত ও প্রাণ সম্পূর্ণরূপে সমর্পন করেছেন, তাঁরা পরস্পরের মধ্যে আমার কথা আলোচনা করে এবং আমার সম্বন্ধে পরস্পরকে বুঝিয়ে পরম সন্তোষ ও অপ্রাকৃত আনন্দ লাভ করেন।”
একদিন বসুদেব, কুলপুরোহিত গর্গমুনিকে নন্দ মহারাজ ও যশোদা মাতার গৃহে প্রেরণ করলেন। নন্দ-যশোদা গর্গমুনিকে সাদরে অভ্যর্থনা করলেন। নন্দ মহারাজ তাঁর গৃহে শিশু দুটির সম্বন্ধে বিশদ জানতে চান ও তাদের নামকরণ করতে গর্গমুনিকে অনুরোধ করেন। প্রথম শিশুটি অসাধারণ বলবান হওয়ায় তাঁর নাম হল বলদেব। এছাড়া এই রোহিনীপুত্র সকলকে দিব্য আনন্দ দান করায় তাঁর অপর নাম হল রাম। যদু বংশ ও নন্দ বংশকে মিলিত করার জন্য এই শিশু বলদেবের অপর নাম হল সঙ্কৰ্ষণ।
অন্য পুত্রটি সম্বন্ধে গর্গমুনি বললেন যে, সে বিভিন্ন যুগে রক্ত, শুক্ল ও পীত বর্ণ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এইবার সে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে এসেছে। পূর্বে কখনও কখনও সে বসুদেবের পুত্র রূপেও জন্মগ্রহণ করেছিল, তাই তাঁর এক নাম হচ্ছে বাসুদেব। তাঁর নাম, যশ, ঐশ্বর্য আদি সবকিছু ঠিক ভগবান নারায়ণের মতো। কংস যাতে জানতে না পারে কৃষ্ণ এখানে আছেন, তাই নন্দ মহারাজের গৃহে এই নামকরণ উৎসব অনাড়ম্বরভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
শিশু কৃষ্ণ বলরাম ব্রজভূমিতে হামাগুড়ি দিয়ে খেলা করতেন আর গোপ গোপীগণ তাঁদের সেই শৈশব লীলা দর্শন করতেন। কৃষ্ণ বলরাম কখনও কখনও হামাগুড়ি দিয়ে ব্রজবাসীদের অনুসরণ করতেন। কিন্তু যখন তাঁরা বুঝতে পারতেন যে, এরা তাঁদের মা নয়, তখন সন্ত্রস্ত হয়ে মা যশোদা ও রোহিনীর কাছে তাঁরা ফিরে আসতেন। তাঁদের হামাগুড়ি দিতে দেখে প্রতিবেশীরা মুগ্ধ হয়ে বলতেন, “দেখ, দেখ, আমাদের কৃষ্ণ বলরাম কেমন সুন্দর হামাগুড়ি দিচ্ছে আর খেলছে।” কাদা, ধুলো আর গো-ময়ে মাখামাখি দুষ্ট শিশু কৃষ্ণ বলরামকে খুব সুন্দর দেখাতো। মা যশোদা ও রোহিনী স্বস্নেহে তাদের নিজ নিজ সন্তানদের আবার পরিষ্কার করিয়ে দিতেন এবং কোলে তুলে নিয়ে স্তন দান করতেন। যোগমায়ার প্রভাবে স্নেহময়ী যশোদা ও রোহিনীদেবী ভাবতেন, “এই আমার পুত্র” আর শিশুরা মনে মনে চিন্তা করতেন ‘এই আমার স্নেহময়ী মা।’ মাতৃস্তন পান করে শিশু কৃষ্ণ ও বলরামকে খুব খুশী দেখাতো।
মা যশোদা ও রোহিনীও তাঁদের শিশুদের হাসি খুশি মুখ দেখে পরম আনন্দ লাভ করতেন। তাঁদের মুখের ভিতর শুভ্র ছোট ছোট দাঁতগুলো গুনে আহ্লাদিত হয়ে উঠতেন মা যশোদা ও রোহিনী । যখন গৃহস্থালীর কাজে গোপীরা ব্যস্ত থাকতো তখন কৃষ্ণ বলরাম স্বাভাবিক শিশুসুলভ ঔৎসুক্যবশত গো বৎসদের লেজ ধরে আকর্ষণ করতেন। গো-বৎসরা তখন ভীত হয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করত। ব্রজ গোপীরা কৃষ্ণ, বলরাম ও গো-বৎসদের এই রকম ক্রীড়া দেখে আনন্দ উপভোগ করতো।


যোগমায়ার প্রভাবে স্নেহময়ী যশোদা ও রোহিনীদেবী ভাবতেন, “এই আমার পুত্র” আর শিশুরা মনে মনে চিন্তা করতেন ‘এই আমার স্নেহময়ী মা।’ মাতৃস্তন পান করে শিশু কৃষ্ণ ও বলরামকে খুব খুশী দেখাতো।


বিভিন্ন পশু, পাখি, বানরাদির দ্বারা শিশু কৃষ্ণ বলরামের বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় স্নেহময়ী মা যশোদা ও রোহিনী সর্বদাই উদ্বিগ্ন থাকতেন। তবে তাঁদের এই উদ্বেগ জড়জাগতিক উদ্বেগের সঙ্গে তুলনীয় নয়। তা অপ্রাকৃত, কেননা ভগবদ্‌গীতায় লীলা পুরুষোত্তম ভগবান স্বয়ং বলেছেন যে, তাঁর এইসব লীলাসমূহ অপ্রাকৃত। জন্ম কর্ম চ মে দিব্যম্। গোপীরা কৃষ্ণলীলা উপভোগ করার জন্য মা যশোদার কাছে গিয়ে দুরন্ত শিশু কৃষ্ণের বিরুদ্ধে নালিশ জানাতো। কৃষ্ণ যখন মায়ের কাছে উপস্থিত থাকতো, তখন প্রতিবেশিনী ব্রজগোপীকারা এসে দুষ্টু কৃষ্ণের দুষ্কর্মের কথা বলতো, “প্রিয় যশোদা, তুমি কৃষ্ণকে শাসন করবে। কৃষ্ণ ও বলরামের দুষ্টুমীর কথা শোন। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় দুইভাই আমাদের গৃহে আসে আর গো-দহনের আগেই গো-বৎসদের বন্ধন খুলে দেয়। তার ফলে গো-বৎসরা গরুর সব দুধই পান করে ফেলে। তাই গো-দহন করতে গিয়ে আমরা শূন্য পাত্র নিয়ে ফিরে আসি। এ ব্যাপারে তাদের সতর্ক করলে তারা শুধুই মিষ্টি হাসি হাসে। তাই কিছুই করা যাচ্ছে না। তাছাড়াও আমাদের অনুপস্থিতিতে গৃহের সমস্ত দই, মাখন, ছানা ইত্যাদি দ্রব্য চুরি করে তারা খুব আনন্দ লাভ করে। আবার ধরা পড়ে গেলে তারা বলে, আমাদের ঘরে কি দই, ছানা, মাখনের অভাব আছে? কখনও কখনও বানরদের মধ্যে তারা এইসব দই, ছানাও মাখন বিতরণ করে দেয়। বানরেরা মাখন, ছানা, খেয়ে তৃপ্ত হলে আর নেয় না। তখন কৃষ্ণ বলরাম বলে – “দেখ, এইসব দই. মাখন, ছানা কোনো কাজেরই না। বানর পর্যন্ত খাচ্ছে না।” এই বলে তারা শিকায় ঝুলানো দই মাখনের পাত্রগুলোকে ভেঙ্গে ফেলে, চারিদিকে তা ছড়িয়ে ফেলে দিয়ে নষ্ট করে। আমরা যখন এইসব মাখন দই গৃহের কোথাও লুকিয়ে রাখি, যদি তারা খুঁজে না পায়, তখন কৃষ্ণ বলরাম আমাদের ঘুমন্ত ছোট্ট শিশুদের চিমটি কেটে কাঁদায়। তারপর ঘর থেকে পালিয়ে যায়। আমরা গৃহের কোনো উঁচু জায়গায় এইসব মাখন, ছানার পাত্রগুলি এমনভাবে ঝুঁলিয়ে রাখি যাতে তারা কেউ এগুলো ধরতে না পারে। কিন্তু তারা ঘরের কাঠের উদুখলগুলো একসঙ্গে জড়ো করে তার ওপরে দাঁড়িয়ে ঐসব মাখন ছানা সংগ্রহ করে। ঘর অন্ধকার হলেও তাদের দেহের অলঙ্কারের বিচ্ছুরিত আলোতে তারা সবকিছু খুঁজে বের করে ফেলে। তাই আমরা মনে করি তাদের দেহের অলঙ্কারগুলো যদি তোমরা খুলে নাও, তা হলে ভাল হয়।”
মা যশোদা রাজি হয়ে বলেন “আচ্ছা তাই হবে। আমি কৃষ্ণের দেহ থেকে গহনাগুলো খুলে নেব। তাহলে ওরা আর মাখনের পাত্রগুলো ঘরের অন্ধকারে খুঁজে পাবে না।” তারপর তারা বললো, “কৃষ্ণ বলরামের দেহ থেকে এক রকম আলো বিচ্ছুরিত হয়। তার ফলে অন্ধকারেও তারা সবকিছুই দেখতে পারে, তাই তাদের দেহের অলঙ্কারগুলো খুলে নিও না।”
জড় জাগতিক বিচারে চুরি করা নিন্দনীয়, কিন্তু ভগবান সর্বদাই পবিত্র। ভগবদ্‌গীতায় বলা হয়েছে, ‘পবিত্রং পরমং।’ ভগবান কৃষ্ণ পূর্ণতত্ত্ব। তিনি পরম সত্য, তাঁর কাজে কোনো হেয়তা নেই। জগতের নৈতিক বিচারে চুরি করা গর্হিত হলেও কৃষ্ণ ও তাঁর লীলাবিলাসমূহ সকলই জীবকুলের মন হরণ করে। সর্বাকর্ষক হওয়ায় তাঁর নাম কৃষ্ণ। এইরকম দিব্য প্রীতিময় স্তরেই ভগবৎ-সেবা অনুষ্ঠিত হয়, আর তা মা যশোদা রোহিনী ও ব্রজগোপিকাদের চিত্তহরণ করে। তাই তাঁরা কৃষ্ণকে তার এইসব কাজের জন্য তিরস্কার বা ভর্ৎসনা করতে পারেন না। পক্ষান্তরে তাঁরা এইসব কাজ দেখে আনন্দ পান। হাসেন, এইসব কৃষ্ণলীলা কথার মহিমা কীর্তন ও শ্রবণে তাঁরা দিব্য আনন্দ লাভ করেন।
একদিন কৃষ্ণ, বলরাম ও ব্রজের অন্যান্য গোপবালকরা যখন খেলাধুলা করছিল তখন তাদের কাছে মা যশোদা শুনলেন যে, কৃষ্ণ মাটি খেয়েছে । বলারামসহ কৃষ্ণের অন্যান্য সখাদের কাছে এই কথা শুনে তাঁর পরম হিতাকাঙ্ক্ষী ও কল্যাণকারী মা যশোদা কৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন, সে মাটি খেয়েছে কি না? বড় ভাই বলরাম ও তাঁর অন্যান্য সখারা এই অভিযোগ তাঁর সম্বন্ধে করেছে বলে মা যশোদা কৃষ্ণকে জানালেন।
নন্দ যশোদার গৃহে মাখন আদি খাবারের পূর্ণতা সর্বদাই থাকতো। খাবারের কোনো অভাবই ছিল না কখনও।
তাহলে কৃষ্ণ মাটি খেল কেন? এট হচ্ছে কৃষ্ণের অপ্রাকৃত, দিব্য লীলা বিলাসসমূহের আর একটি দৃষ্টান্ত। গোপীদের দিব্য আনন্দ দানের জন্য এইসব লীলা অনুষ্ঠিত হত।
মা যশোদা যাতে কৃষ্ণকে ভর্ৎসনা করেন তাই প্রথমে তাঁর বিরুদ্ধে মাখন চুরি করবার অভিযোগ আনা হয়েছিল। মা যশোদা তখন কৃষ্ণকে তিরস্কার করেন নি। পক্ষান্তরে তিনি স্মিত হাসি হেসেছিলেন। এইবার মা যশোদা যাতে রেগে গিয়ে তাঁকে তিরস্কার না করে তাই কৃষ্ণ বলল-“আজ খেলার সময় দাদা আমার ওপর রাগ করে; তাই দাদা ও অন্যান্য সখারা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। তোমার কাছে আমার বিরুদ্ধে মাটি খাওয়ার মিথ্যা অভিযোগ এনেছে-যাতে তুমি আমার ওপর রাগ কর, আমাকে ভর্ৎসনা কর-এটা হচ্ছে তাদের চক্রান্ত। আসলে আমি আদৌ মাটি খাইনি। যদি তুমি মনে কর ওরা সত্যি কথা বলছে, তাহলে আমার মুখের ভিতরে তাকালেই জানতে পারবে, আমি মাটি খেয়েছি কি না! তখন মা যশোদা কৃষ্ণকে তাঁর মুখ খুলতে বললেন।
আমাদের পরমারাধ্য গুরুদেব কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভূপাদ বলেছেন যে এইসব বালকেরা কেউই সাধারণ বালক নয় । শ্রীমদ্ভাগবতে (১০/১২/১১) বলা হয়েছে—

ইত্থং সতাং ব্রহ্মসুখানুভূত্যা দাস্যং গতানাং পরদৈবতেন।
মায়া শ্বিয়তানাং নরদারকেণ সাকং বিজহুঃ কৃতপুণ্যপুঞ্জাঃ ॥

অর্থাৎ “বহু বহু জন্মের ভগবদ্ভজনের পর একজনের এরকম সৌভাগ্য হয়—একজন ভগবানের অন্তরঙ্গ সান্নিধ্য লাভ করে, তাঁর সঙ্গে সাধারণ বালকের মত খেলাধুলা করে। তারা সাধারণ বালকের মতো মিথ্যা কথা বলছে বলে অভিযোগ করা উচিত নয় কেননা বহু তপশ্চর্যার ফলে তারা এভাবে কৃষ্ণের সান্নিধ্য লাভ করেছে।
মা যশোদা আদেশ করা মাত্র এক সামান্য বালকরূপী পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ তক্ষুনি মুখ খুলেন। মা যশোদা তখন কৃষ্ণের সেই মুখের ভিতর সম্পূর্ণ সৃষ্টিকে দর্শন করলেন। তিনি দেখলেন সমগ্র দিকব্যাপী অন্তরীক্ষ, দিকসমূহ, পর্বত, দ্বীপ, ভূতল, সমুদ্র, বায়ু, আগুন, চন্দ্র, তারাসমূহ, গ্রহমণ্ডল, জল, আকাশ, কর্মানুযায়ী বিভিন্ন জীবদেহ, বৃন্দাবন ধাম, পুত্রসহ নিজেকে। চরাচর সৃষ্টির এই রূপ দেখে পুত্রের প্রকৃতি সম্বন্ধে তিনি বিস্ময়ে অভিভূত হলেন। পুত্রের মুখের ভিতর এইসব যে দেখা যাবে মা যশোদা তা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। সবকিছুর পরম উৎস ভগবান। তাই ভগবানের মুখের ভিতর এগুলো দেখা বাস্তবিকই সম্ভব ।
মা যশোদা মনে মনে ভাবতে লাগলেন-“আমি কি স্বপ্ন দেখছি? বা এসব কি ভগবানের দেবমায়ার অলীক সৃষ্টি? না কি এটি আমার বুদ্ধি বিভ্রমের ফল বা এটি আমার পুত্রের যোগবল? মা যশোদা সরলচিত্ত হওয়ায়, তিনি ভাবলেন “ভগবান হচ্ছেন আমার যুক্তি তর্কের অতীত। আমাদের মন বা বাক্যদ্বারা তাকে বোঝা যায় না। তিনি সবকিছুর পরম উৎস। তাই তাঁর শরণাগত হওয়া যাক।”
প্রকৃতপক্ষে পরমেশ্বর ভগবানকে কোনো জড় জাগতিক পন্থা দ্বারা অনুভব করা যায় না। মহাভারতে উল্লেখ করা হয়েছে, অচিন্ত্যাঃ খলু যে ভাবা ন তাংস্তর্কেন যোজয়েৎ-অর্থাৎ যুক্তি তর্কের মাধ্যমে অচিন্ত্যতত্ত্বকে জানার চেষ্টা নিরর্থক। আমরা কোনো সমস্যায় পড়লে, তার কোনো কারণ খুঁজে না পেলে, পরমেশ্বর ভগবানের শরণাগত হয়ে তাঁকে সশ্রদ্ধ প্রণতি জানানো ছাড়া আমাদের অন্য কিছু করার নেই। মা যশোদা তাই এমতাবস্থায় এই উপায় গ্রহণ করেছেন। ব্রহ্মসংহিতাতেও বলা হয়েছে যে, সকল ঘটনার আদি বা মূল কারণ হচ্ছেন ভগবান কৃষ্ণ।
ভগবানের মায়ার প্রভাবে ভ্রমবশত নন্দ মহারাজকে তাঁর পতি, কৃষ্ণকে তাঁর পুত্র, তিনি নন্দরানী হওয়ায় সমস্ত গো-ধনকে তাঁর সম্পত্তি, সকল গোপগোপীকে মা যশোদা তাঁর প্রজা বলে মনে করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনিও ভগবানের অধীন। সকলেরই অন্তিমগতি হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ। ভগবৎ কৃপায় মা যশোদা এই তত্ত্ব বুঝেছিলেন। কিন্তু পরমুহূর্তেই যোগমায়ার প্রভাবে মা যশোদা গভীর পুত্রস্নেহে অভিভূত হয়ে পড়লেন। গভীরভাবে যে উচ্চ দার্শনিক চিন্তাভাবনা করছিলেন তা সবই ভুলে গিয়ে কৃষ্ণকে নিজ পুত্ররূপে গ্রহণ করলেন এবং সস্নেহে কৃষ্ণকে কোলে তুলে নিলেন।

শ্রীমৎ সুভগ্ স্বামী গুরু মহারাজ (১৯৪০) কলকাতার স্কটিশ চার্চে পড়াশুনা করেন পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশুনার জন্য লন্ডন যান। ১৯৭০ সালে শ্রীল প্রভুপাদের সাথে লন্ডনে পরিচয় হওয়ার পর থেকে ৭ বছর ধরে শ্রীল প্রভুপাদ থেকে ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণ ও উপদেশ গ্রহণ করেন। সন্ন্যাস দীক্ষা লাভের পর ভারত, বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বব্যাপী হরেকৃষ্ণ আন্দোলন নিরলসভাবে প্রচার করে যাচ্ছেন। গুরুদেবের নির্দেশানুসারে বিভিন্ন শাস্ত্র সংস্কৃত থেকে ইংরেজি এবং ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন। তার মধ্যে চৈতন্য মঙ্গল, আনন্দ বৃন্দাবন চম্পু ও অদ্বৈত প্রকাশ অন্যতম।


 

এপ্রিল-জুন ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here