ভক্ত ও ভগবানের পারস্পরিক সম্পর্ক

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৪ | ৯:১২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০২৪ | ৯:১২ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 37 বার দেখা হয়েছে

ভক্ত ও ভগবানের পারস্পরিক সম্পর্ক

পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ হচ্ছেন করুণাসিন্ধু। অর্থাৎ করুণার সাগর। কিন্তু তিনি করুণার সাগর হয়েও জীবকে শাসন করার মাধ্যমে তিনি তাঁর কর্তব্য পালন করেন। ভগবানের ভক্ত হলে ভগবানের সগুণাবলী ভক্তের মধ্যে প্রকাশিত হয়। হরাভক্তস্য কুতো মহগুণাঃ। তাই ভক্তের মধ্যেও সর্বদা করুণার প্রকাশ থাকবে। ভক্ত যা কিছুই করুক না কেন, তা সে কর্তব্যের খাতিরেই হোক বা ভগবানের নির্দেশেই হোক, সেই কার্য সম্পাদন করেও ভক্ত চিন্তিত থাকবে এইভাবে যে-অন্যের কোন হানি বা দুঃখের কারণ হলাম না তো! সেটি তাঁর দুর্বলতা নয়। সেটি তাঁর করুণার প্রকাশ।

ভগবানের যে ভক্ত নয়, তার মধ্যে ভাল গুণ নেই এমন নয়। কিন্তু অভক্তের মধ্যে ভাল গুণ থাকলেও সেই ভাল গুণের কোন মূল্য নেই। ঠিক যেমন হিরণ্যকশিপু, রাবণ, দুর্যোধনাদি সকলে অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এরা ছিলেন অত্যন্ত বিদ্বান, পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব ও বড় যোগী। দুর্যোধন যখন রাজ্যশাসন করত, তার রাজ্যশাসন এত নিখুঁত ছিল যে, প্রজাদের কোনও অসুবিধা ছিল না।

হিরণ্যকশিপুর রাজত্বে কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে কিছু ছিল না। বন্যা, খরা ইত্যাদি ছিল না। পৃথিবী ছিল শস্যপূর্ণ। লোকেরা শান্তিতেই ছিল। হিরণ্যকশিপুর প্রভাব ও প্রতাপ এতই বেশি ছিল যে, সাম্রাজ্যের মধ্যে কোনো অসুবিধা ছিল না। কিন্তু এত ভাল গুণ থাকা সত্ত্বেও যেহেতু তারা শ্রীহরির ভক্ত ছিল না, তাই তাদের মহৎগুণের কোনো দাম ছিল না। কেননা যেহেতু তারা ভগবানের ভক্ত ছিল না, তাই তাদের মধ্যে করুণার প্রকাশ ছিল না।

পরমেশ্বর ভগবান সবকিছুকে পরমভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি সমস্তকিছুর পরম নিয়ন্ত্রক। সেজন্য সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে তত্ত্ববিদ পুরুষগণ ভগবানের আরাধনা করেন। কিন্তু ভগবান যে সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করেন, এটি তাঁর অন্যতম গুণ নয়। ভগবানের শ্রেষ্ঠ গুণ কি? তাঁর করুণা, ভক্তানুগ্রহকাতরতা। ভক্তকে অনুগ্রহ করার জন্য ভগবান সবসময় উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন। সেজন্যই তিনি ভগবান। সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন বলেই যে তিনি ভগবান, প্রকৃতপক্ষে তা নয়। লোকে মনে করে যে ‘যেহেতু ভগবান সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করেন তাই তিনি সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছেন। তাই আমিও নিয়ন্ত্রণ করব। সাধারণ মানুষ তার বাড়ীর স্ত্রী পুত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা থেকে শুরু করে গ্রাম প্রধান, অঞ্চলপ্রধান, মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী সবাই ভাবছেন ‘আমি নিয়ন্ত্রণ করব।’ নিয়ন্ত্রণ করলেই বড় হতে পারব, ভগবানের মতো হতে পারব, পূজা পাব-আমরা সবাই এরকম কম বেশী ভেবে থাকি ও চেষ্টা করে থাকি।

কিন্তু ভগবান সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন বলেই যে তিনি ভগবান হয়েছেন তা নয়, আসলে ভগবান তাঁর ভক্তের নিয়ন্ত্রণাধীন হন বলেই তিনি ভগবান হয়েছেন। আমরা ভগবান হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে, বড় হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রিত না হয়ে কি করে অপরকে নিয়ন্ত্রণ করব সেই চিন্তা করি। আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, কারও নিয়ন্ত্রিত হতে ইচ্ছা করি না। কিন্তু আমাদের জানা উচিত যে ভগবানের শ্রেষ্ঠতা নিয়ন্ত্রণকর্তা বলে নয়, অহং ভক্ত পরাধীনো–জনপ্রিয়ঃ। এই হচ্ছে ভগবানের শ্রেষ্ঠতা।

ভাগবতের প্রারম্ভে–ভগবানের লক্ষণ সম্বন্ধে বর্ণনা করে বলা হয়েছে, তিনি স্বরাট পুরুষ। কিন্তু ভগবান বলছেন, শাস্ত্র আমাকে ‘স্বরাট’ বলে বর্ণনা করলেও আমি স্বরাট বা স্বতন্ত্র নই। আমি ‘ভক্ত পরতন্ত্র’। অহং ভক্ত পরাধী- নো। ভক্তরা আমাকে তাঁর হৃদয়রূপ কারাগারে বদ্ধ করে রাখে। আমি যে শুধু ভক্তদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তা-ই নয়, এমনকি আমি ভক্তের ভক্তদের দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত। ভক্তভক্তজনপ্রিয়ঃ। আমার ভক্তের যে ভক্ত, সেও আমার অত্যন্ত প্রিয় হয়।

এইভাবে দেখা যায় যে ভগবানের কার্যকলাপ অচিন্ত্য। আর তাই ভগবানের কার্যকলাপে বিমোহিত হয়ে তারা ভগবানকে ভগবান বলে জানতে পারে না। কেন জানতে পারে না? তার কারণ হল তারা ভগবান সম্বন্ধে একটি বিশেষ তত্ত্ব অবগত নয়। সেই তত্ত্বটি হল, ভগবান মানে হল যাঁর মধ্যে সবসময় পরস্পর বিরোধী লক্ষণসমূহ থাকবে। সাধারণতঃ আমরা মনে করি যে ভগবান হচ্ছেন সব থেকে বড় বা বৃহৎ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয়। তিনি যেমন সমস্ত বড় থেকে বড়, তেমনি বিরুদ্ধভাবে আবার সহস্র ছোট থেকেও ছোট।

যিনি শুদ্ধ ভক্তি করেন, ভগবানের শরণাগত হন, তিনি সবকিছুকেই অতিক্রম করে যান। শ্রীউদ্ধব বলেছেন, ‘হে ‘কৃষ্ণ, তোমার উচ্ছিষ্ট ভোজ্যদ্রব্য গ্রহণ করে, তোমার প্রসাদী মালা পরিধান করেই তোমার দুরতিক্রম্য মায়াকে অতিক্রম করতে পারব।’ তাহলে দেখা যাচ্ছে যে কেবলমাত্র ভগবানের প্রসাদ গ্রহণ করার ফলেই, মানুষ মায়ার কবল থেকে রক্ষা পেতে পারে।

একটি কথা আমরা সবসময় শুনে থাকি–‘রাখে কৃষ্ণ মারে কে, মারে কৃষ্ণ রাখে কে!’–এটি খুব ভাল ব্যাপার আর তাই আমি কৃষ্ণের শরণাগত হই। তিনি আমাকে রক্ষা করলে আমাকে আর কেউ মারতে পারবে না। কিন্তু যখন বলা হয় ‘মারে কৃষ্ণ, রাখে কে!’–তখন ব্যাপারটি ভালো লাগে না। কৃষ্ণ আমাকে মারবে’ না, না, ব্যাপারটি ভালো নয়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শিক্ষা প্রদান করেছেন, কৃষ্ণ রক্ষা করবেন, শুধু এই মনে করেই তাঁর শরণাগত হলে চলবে না। কৃষ্ণ রক্ষিষ্যতীতি বিশ্বাস; কৃষ্ণ ন রক্ষিষ্যতীতি বিশ্বাসঃ। কৃষ্ণ আমাকে রাখুক কিম্বা মারুক, তবু আমি তাঁর শরণাগত। “হে কৃষ্ণ, তুমি আমাকে আলিঙ্গন কর, দর্শন দাও, কিংবা দর্শন না দিয়ে মর্মাহত কর, তোমার চরণক- মলে মর্দন কর, যাই কর না কেন, তবুও তুমি আমার প্রভু।” এই হচ্ছে ভক্তের লক্ষণ। তুমি আমাকে বাঁচালেও আমার রক্ষা, মারলেও সেটি আমার রক্ষা। ভক্ত ভগবানকে এইভাবে হৃদয়ঙ্গম করে। ভগবান আমাকে বাঁচাক অথবা মারুক, উভয়েই আমার কল্যাণ। তিনি আমাকে রক্ষা করলেতো মুক্তি পাবই, এমনকি তিনি আমাকে মারলেও আমি মুক্তি পাব।

ভগবান যে শুধু রক্ষাকর্তা এটি তাঁর পূর্ণ পরিচয় নয়। তার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সংহার কর্তাও। এই তত্ত্বটি হৃদয়ঙ্গম করতে হবে। তাঁর শরণাগত হলে তিনি আমাকে রক্ষাই করুন আর সংহারই করুন-উভয়ই আমার জন্য কল্যাণকর হবে। আর তার শরণাগত না হলে কি হবে? আমি নিজেকে সুরক্ষিত করলেও মহাকাল তাকে সংহার করবেই। কালসর্প মাথার উপরে রয়েছে। আর আমি ব্যাংক ব্যালেন্স, ঘর বাড়ি, স্ত্রীপুত্রাদি নিয়ে মনে করছি বেশ সুখে আছি। এরাই আমাকে রক্ষা করবে বলে মনে করছি। এই হচ্ছে বিমোহন বা ভ্রান্তি।

অবশ্য এমন মনে করাও ঠিক হবে না যে ভক্তের ঘর, বাড়ি, স্ত্রী, পুত্র ব্যাঙ্কব্যালেন্স থাকবে না। ভক্তেরও এসব থাকবে। গৃহস্থ ভক্তের এই সবকিছুই থাকবে। কিন্তু এইসব থাকা সত্ত্বেও ভক্তের হৃদয়ে এই কথাটি সর্বদা জাগ্রত থাকবে যে, কালগর্ভে সবকিছুই হারিয়ে যাবে। সেজন্য প্রকৃত ভক্তরা তাঁদের ঐশ্বর্য, স্ত্রী, পুত্রাদি থাকলেও সে সব দ্বারা প্রভাবিত হন না। অম্বরীশ মহারাজ, পরীক্ষিত মহারাজ প্রমুখ বড় বড় রাজাগণ সংসারে থেকে সমস্ত কর্তব্য কর্ম সম্পাদন করলেও, সংসার তাঁদের প্রভাবিত করতে পারত না। তাঁরা জানতেন সংসারের স্বরূপটা কি! ভক্ত এও জানেন, ‘আমার কোনও স্বতন্ত্রতা নেই হে কৃষ্ণ, আমি সম্পূর্ণ আপনার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। ভক্ত বলছেন ‘আমি ভগবানপরতন্ত্র’ আর ভগবান বলছেন ‘আমি ভক্তপরতন্ত্র’। ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে এই হল পারস্পরিক সুন্দর সম্পর্ক।


মাসিক চৈতন্য সন্দেশ মার্চ ২০২২ হতে প্রকাশিত

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।