ভক্তদের জীবনে দুঃখ আসে কেন?

0
82

রবিন চৌধুরী

একসময় একজন ইঞ্জিনিয়ার ৫০ তলা দালানের ছাদ থেকে নিচের এক কর্মীকে ডাকছিলেন, কিন্তু সে কর্মীটি এত কাজে মগ্ন ছিল যে, সে ইঞ্জিনিয়ারের ডাক শুনছিল না। তখন ঐ ইঞ্জিনিয়ার ঐ কর্মীর মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য ১টি ৫০ টাকার নোট উপর থেকে নিচে ফেলল কর্মীটি নোটটি দেখে তা পকেটে নিয়ে আবার কাজ করতে লাগল। ইঞ্জিনিয়ার তখন মনে করলো কম টাকার নোট তাই বোধ হয় উপরে থাকাচ্ছে না। তখন তিনি ১টি ৫০০ টাকার নোট নিচে ফেললেন। এইবার ঐ কর্মীটি তা পেয়ে খুশি মনে পকেটে নিয়ে আবার তার কাজে মগ্ন হলেন। তখন ইঞ্জিনিয়ারটি ১টি ছোট পাথর নিয়ে তার দিকে ছুঁড়ে মারলেন। পাথরটি যখন কর্মীটির মাথার উপর পড়েছে তখন সাথে সাথে সে উপরের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলছে, ‘কে মেরেছে এই পাথর’, তখন ইঞ্জিনিয়ার বলল, ‘আমি মেরেছি উপরে আস কাজ আছে।’ আমাদের জীবনও এরকম নয় কি?
যখন আমরা সবকিছু সহজেই পেয়ে যায়, সব কিছু স্বাভাবিকভাবে চলে তখন আমরা আমাদের আধ্যাত্মিকতাকে এত গুরুত্ব দেই না। কিন্তু যখন দুঃখ পাই, সমস্যা আসে তখন আমরা ভগবানের শরণ গ্রহণ করি এবং আমাদের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি ও আমাদের প্রকৃত দায়িত্ব পালন করার জন্য তৎপর হই। প্রায়শই অনেকে প্রশ্ন করে- যারা হরিনাম জপ করে, ভক্তি করে, তাদের জীবনে দুঃখ আসে কেন? প্রকৃতপক্ষে ভগবান সর্বদা যেভাবে চান আমরা সেভাবে কার্য করব।
উনার নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন ধারণ করব। কিন্তু আমরা চাই আমাদের মতো করে চলতে। তাই আমরা দুঃখ-দুর্দশায় থাকি। ভগবান এই দুঃখ জন্যেই প্রদান করেন যাতে আমরা বাস্তবিক পক্ষে উপলব্ধি করতে পারি কৃষ্ণ ছাড়া, ভগবদ্ধামে যাওয়া ছাড়া, কৃষ্ণভক্তি ছাড়া, আমরা প্রকৃত সুখী হতে পারবো না। তাই ভগবান যখন দুঃখ প্রদান করেন তার পেছনে এক মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে।

মাঝে মাঝে নির্দয় আচরন

ইংরেজিতে প্রবাদ আছে ”To be truly kind is to be cruel at times” অর্থাৎ প্রকৃত দয়া করার জন্য মাঝে মাঝে নির্দয় আচরণ করতে হয়। যেমনঃ যীশুখ্রিষ্টের ১ জন রুগ্ন শিষ্য ছিল। ১ দিন যীশুখ্রিষ্ট ওনাকে নির্দেশ দিলেন, ‘তুমি আজ থেকে টানা ১৪ দিন কিছু খাবে না।’ এটা শুনে অন্য শিষ্যরা অবাক হয়ে গেল এবং চিন্তা করল, ১৪ দিন না খেলে সে তো মারাই যাবে। শিষ্যটির যীশুখ্রিস্টের প্রতি প্রবল ভক্তি ছিল। তাই সে ওনার কথামত ১৪দিন কিছু না খেয়ে ছিল। ১৪ দিন পর যীশুখ্রিস্ট ১ বাটি মধু নিয়ে ঐ শিষ্যের সাথে দেখা করতে গেল।
শিষ্যটি এত দুর্বল হয়ে গিয়েছিল যে, সে বিছানা থেকে উঠতেই পারছিল না, যীশুখ্রিস্ট তাকে কোলে নিয়ে আদর করেছিল এবং তাকে নির্দেশ দিল, ”তোমার জন্য ১ বাটি মধু এনেছি নাও তুমি নাক দিয়ে এর ঘ্রাণ গ্রহণ কর, কিন্তু খেতে পারবে না।” এটা শুনে অন্য সমস্ত শিষ্যরা যীশুখ্রিস্টের নির্দয় আচরণ দেখে বিস্মিত হয়ে গেল। শিষ্যটি মধুর ঘ্রাণ গ্রহণ করলে কিন্তু খাচ্ছিল না। হঁঠাৎ সবাই অবাক হয়ে দেখল, ১টি লম্বা ফিতা কৃমি ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে। যীশুখ্রিস্ট এবার ব্যাখা করলেন, তিনি কেন এমন করেছেন শিষ্যটি যা খেত তা ঐ ফিতাকৃমি খেয়ে ফেলত, তাই ১৪ দিন না খাওয়াতে ফিতাকৃমি মধুর ঘ্রান পেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসল।
যীশুখ্রিস্ট তখন ঐ শিষ্যকে বলল, আজ থেকে তুমি সবকিছু খেতে পার। তখন অন্যান্য শিষ্যরা তাদের ভুল বুঝতে পারল যীশুখ্রিস্ট কত মহান! তাই আপাতদৃষ্টিতে ভক্তদের মনে হচ্ছে, কষ্টে আছে। কিন্তু এর পিছনে নিশ্চয় ভগবানের কোন মহৎ পরিকল্পনা রয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করে, ওমা! একি! ভক্ত হয়েও তারা কষ্ট পাচ্ছে। ভগবান কৃষ্ণ তাহলে করুণাময় হলেন কি করে? যেমনঃ জেব্রা যখন বাচ্চা প্রসব করে। তখন সে তার বাচ্চাকে ক্রমাগত লাথি মারে।
বাচ্চাটি উঠে দাঁড়ানোর জন্য মায়ের সাহায্য কামনা করে কিন্তু মা সাহায্য না করে উল্টো লাথি মারে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, জেব্রা কত নিষ্ঠুর ও নির্দয় কিন্তু বাস্তবে জেব্রা তার বাচ্চাকে ভালবাসে বিধায় এরূপ কার্য করে। জেব্রা যখন বাচ্চা প্রসব করে তখন হিংস্র প্রাণীরা যেকোন মুহূর্তে আক্রমণ করতে পারে এ আশঙ্কায় জেব্রা তার বাচ্চাকে এমনভাবে তৈরি করে যেন পালাতে পারে। তাই বাচ্চার জীবন বাঁচানোর কথা চিন্তা করে সে এভাবে লাথি মারে যাতে করে সে নিজের শক্তিতে দাঁড়িয়ে উঠতে পারে ও দৌঁড়াতে পারে। একসময় এক ব্যক্তি প্রভুপাদকে প্রশ্ন করলেন, আপনি বলছেন- ভগবান সর্বশক্তিমান এবং সবচাইতে করুণাময়, তাহলে প্রয়োজনের সময় আমরা যা চাই, তা তিনি দেন না কেন? আমরা যা চাই তা যদি তিনি না দেন তাহলে তিনি সবচাইতে করুণাময় সর্বশক্তিমান হলেন কি করে? উত্তরে প্রভুপাদ বললেন, ভগবান হয়ত জানেন আপনি যেটি চাচ্ছেন সেটি আপনার জন্য মঙ্গলদায়ক হবে না। আপনাকে ভালবাসে, আপনার ভাল চায় বিধায় তিনি তা দেন না। যেমনঃ কোনো ছোট শিশু মায়ের কাছ থেকে খেলা করার জন্য চাকু খুজঁতে পারে কিন্তু মা দেন না। কারণ মা জানেন চাকু দিলে সে রক্তাক্ত হবে এবং কষ্ট পাবে। অর্থাৎ ভগবান আমাদের মঙ্গল চাই বিধায় আমাদের জন্য যা মঙ্গলদায়ক তা তিনি প্রদান করেন। আমাদের জন্য যা ক্ষতিকর তা তিনি দেন না।
আমরা যারা ভক্তি জীবন শুরু করি আমরা মনে করি এখন থেকে আমাদের জীবনে আর কোন দুঃখ দুর্দশা আসবে না। কিন্তু আমরা যদি ইতিহাস দেখি তাহলে দেখব, যারা মহাজন যারা ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত তাদের জীবন কেমন ছিল। পাণ্ডবেরা ভগবানের এত প্রিয় হওয়া সত্ত্বেও অনেক যাতনা সহ্য করতে হয়েছে। হরিদাস ঠাকুর নামাচার্য কিন্তু ২২ বাজারে উনাকে বেত্রাঘাত করা হয়েছিল। প্রহ্লাদ মহারাজ কত পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন। উনারা ঐ সমস্ত দুঃখ, দুর্দশা সহ্য করেছেন বিধায় আজকে উনারা মহান এবং এখনো আমরা উনাদের জীবনচরিত পাঠ করছি। কৃষ্ণ আমাদের শিক্ষা দিচ্ছেন উনাকে পেতে হলে এরকম মূল্য দিতে হবে। দেবকী-বসুদেব কারাগারে ছিলেন, তাদের ৬টি পুত্র সন্তান হারাতে হয়েছে, এত কষ্ট সহ্য করার পরে কৃষ্ণকে পুত্র রূপে পেয়েছে। ব্রজবাসীরা সবাই কৃষ্ণগত প্রাণছিল কিন্তু প্রতিনিয়ত তাদের কষ্ট পেতে হয়েছে কেননা প্রতিদিন কোন না কোন অসুর তাদের আক্রমণ করত।
রামচন্দ্রকে বিবাহ করার আগে সীতা মহারাণী ছিলেন রাজকন্যা, কোন রকম দুঃখ ছিল না। যখনই রামচন্দ্রকে পতি হিসাবে গ্রহণ করলেন তখন থেকে কষ্ট শুরু হল উনার জীবনে। আমরা যদি শ্রীমদ্ভাগবতম অধ্যয়ন করি তাহলে দেখব ভক্তরা কৃষ্ণকে প্রাপ্ত হওয়ার জন্য কিরকম মূল্য দিয়েছেন। কৃষ্ণ আমাদেরকে উনার মতই বানাতে চান। উনার মনের মত করে, তাই যারা ভগবানের প্রেমময়ী ভক্ত তারা তা বুঝতে পেরে কৃষ্ণের চরণ আরো জোরালোভাবে আঁকড়ে ধরে রাখে। তখন তারা বুঝতে পারে কৃষ্ণ পাদপদ্মের শরণাগত না হলে জড়া প্রকৃতির চাপে প্রতিনিয়ত পিষ্ট হতে হবে। যেমনঃ কোনো রমনী যদি স্বামীর সাথে না থাকে তাহলে তাকে বাইরে সবার থেকে নির্যাতন স্বীকার করতে হবে।
ছোট বাচ্চাদের মা বেত দিয়ে মারলে পালাতে চাইলে বেতের আঘাত আরো জোরে হয় কিন্তু মাকে জড়িয়ে ধরলে মা আর মারতে পারে না। তাই ভক্তের মনোভাব হচ্ছে সুখে-থাক দুঃখে থাক সদা হরি বলে ডাক। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেন, ”আপনি কষ্ট দিন সুখ দিন সর্বাবস্থাতেই আপনিই আমাদের প্রাণনাথ”। ভক্তরা জানেন কৃষ্ণই হচ্ছেন একমাত্র আশ্রয়দাতা ও ত্রাণকর্তা। তাই কৃষ্ণ যখন পাণ্ডবদের বিদায় দিয়ে হস্তিনাপুরে গমণ করছিলেন। তখন কুন্তুীদেবী প্রার্থনা করছেন কৃষ্ণের নিকট। “হে জগদীশ্বর আমি কামনা করি সেই সমস্ত সংকট বারে বারে উপস্থিত হউক। যাতে বারে বারে আমরা তোমাকে দর্শন করতে পারি। কারণ তোমাকে দর্শন করলেই আমাদের আর জন্ম মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হতে হবে না বা এই সংসার চক্র দর্শন করতে হবে।”
তাই যারা জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত হয়েছেন তারা কৃষ্ণকে প্রাপ্ত হওয়ার জন্য সমস্ত কঠিন পরিস্থিতি মেনে নিতে প্রস্তুত থাকে। ভক্তরা মনে করে, কৃষ্ণ আমাকে এরকম দুঃখ-দুর্দশা দিয়ে পরিশুদ্ধ করছেন। যেমনঃ স্বর্ণকারেরা স্বর্ণকে যত পোড়ায় স্বর্ণ ততই খাঁটি হয়। চন্দনকে যত ঘর্ষন করা হয়, ততই সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ে। পেন্সিল ধারালো করলে লেখা সুন্দর হয়। অনুরূপভাবে, ভক্তদের জীবনে যত দুঃখ আসে ভক্তরা তা ভগবানের অহৈতুকী করুণা বা কৃপা হিসেবে দর্শন করে ভক্তিজীবনে এগিয়ে চলে। একবার এক লোক নদীর এক পাড় থেকে অন্যপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে পাথর ছুঁড়ে মারছিল। যাকে পাথর ছুঁড়ে মারছিল সে বলছিল, আরো বেশি করে করে পাথর ছুঁড়ে মারা। তার কারণটি ছিল ঐ পাথরগুলি সব স্বর্ণের পাথর। সে চিন্তা করছিল হালকা একটু ব্যথা পেলেও স্বর্ণের পাথর পাওয়া যাচ্ছে। অনুরূপভাবে দুঃখ-দুর্দশা এসে যদি আমাদের কৃষ্ণচেতনা বৃদ্ধি করে, কৃপা প্রাপ্তিতে সহায়তা করে, তাহলে দুঃখ-দুর্দশা আরো বেশি করে আসুক ভক্তরা তাই চাই।

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ, ডিসেম্বর ২০২০ সংখ্যা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here