ব্রহ্মচর্য

0
744

শ্রীপাদ রবীন্দ্র স্বরূপ দাস: বৈদিক শাস্ত্র থেকে জানা যায়, যথাযথভাবে বিধিবদ্ধ জীবন যাপনের মাধ্যমে ব্র‏হ্মচর্য পালন করা হলে জড় জাগতিক চিন্তাভাবনার বন্ধন থেকে নিরাসক্তি জাগানো সম্ভব হয় আর সেই ব্র‏হ্মচর্য পালনে আন্তরিকতার অভাব থাকলে, বিভ্রান্তি জন্মালে অথবা দ্বিধাগ্রস্ত পরিবেশের মধ্যে পালনের চেষ্টা করলে, তা হবে নিতান্তই সময়ের অপচয় মাত্র।
ইন্দ্রিয়সুখ উপভোগের জন্য লালায়িত জীবাত্মা সদা সর্বদাই সুখান্বেষণে বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরছে, তাই তার পক্ষে এমন মনে হওয়াই স্বাভাবিক যে, স্বরূপ উপলব্ধির জন্যই প্রথমে ইন্দ্রিয় উপভোগ একান্তভাবে অপরিহার্য, কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক তার বিপরীত। যারা হৃদয়ঙ্গম করেছেন যে, তাঁদের ধর্মগুরা বা যাজক বলেন, সকলের জন্য ব্র‏হ্মচর্য অবশ্যই পালনীয়, তাঁর নিশ্চয়ই সত্ত্বগুণসম্পন্ন মানুষের স্তরে উন্নীত হয়েছেন এবং তাই তাঁরা পারমার্থিক বিশুদ্ধতার সুফল অচিরেই অর্জন করে থাকেন, আর তার ফলে খুব শীঘ্রই ইন্দ্রিয় উপভোগে অনীহা জাগে। অবশ্য সমাজের মধ্যে যারা প্রকৃতই পারমার্থিক সত্ত্বগুণ সম্পন্ন শুদ্ধ আত্মা তাদেরই পক্ষে ধর্মগুরু বা ধর্মযাজকের মর্যাদা লাভ করা সম্ভব হয়ে থাকে এবং সমান্তরালভাবে তাঁরা লাভ করেন বিশাল প্রাসাদোপম বাসভবন আর ধর্মগুরুর পদমর্যাদা অক্ষুন্ন রাখবার উপযোগী কূটনৈতিক ভাবনাচিন্তাও। এই সবই একসাথে চলতে থাকে।
ব্র‏হ্মচর্য এবং যৌনাচার থেকে বিরত থাকার যে রীতি, তা হল পারমার্থিক জাগরণের অপরিহার্য অঙ্গ এবং তারই পরিণামে মানুষ প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হয়ে উঠতে পারে আর সুবিবেচক ধর্মযাজক রূপে পরিগণিত হওয়া তার পক্ষেই সম্ভব। তা সত্ত্বেও, ব্র‏হ্মচর্য পদিও আত্ম উপলব্ধির পথে অগ্রসর হওয়ার পাথেয় রূপে পরিগণিত হয়ে থাকে, তবু ভগবদ্ভাবনায় চরম লক্ষ্যে তা পৌছে না দিতেও পারে।

হাজার হাজার ব্র‏হ্মচাযী রয়েছেন, কিন্তু তারা ভগবদ্ভক্ত কি না সেটাই বিচার্য। বরং বলা যায়, ভগবদ্ভাবনাই হল মানুষের ব্র‏হ্মচর্য পালন, সাধনের যোগ্যতা ও ক্ষমতার উৎস। বিশেষ করে একাদিক্রমে দীর্ঘকাল ব্র‏হ্মচর্য ব্রতে একনিষ্ঠ হয় থাকতে হলে প্রথমেই চাই আন্তরিকভাবে ভগবদ্ভাবনা। সুতরাং বৈদিক দৃষ্ঠিভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে হয় যে, প্রকৃত শুদ্ধ পারমার্থিক তৃপ্তি ক্রমশ লাভ হতে না থাকলে ব্র‏হ্মচর্য পালন তিতান্তই একটা পুঁথিগত আদর্শ লক্ষ্য হয়েই থেকে যায় তা দৈনন্দিন বাস্তব জীবনে সার্থকভাবে রূপায়িত হতে পারে না কোনো দিনই।
শরীরতত্ত্বের বিচার থেকেও ব্র‏হ্মচর্য পালন করা বাস্তবিকই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, যখন কোনো পূজারী বা ধর্মযাজক তাঁর জিহ্বার বেগ দমন করতে পারেন না, বিশেষত তিনি যখন মাছ-মাংস আহার, এমনকি সুরা পানেও নিয়মিতভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। এমনও দেখা গেছে, বিভিন্ন ধর্মের বহু শ্রদ্ধাভাজন সন্ন্যাসী বা ধর্মগুরু মর্যাদার উচ্চস্তরে অধিষ্ঠিত থেকেও নির্বিকারভাবে মদ মাংস সেবক করে থাকেন।
আসলে আজকের জড়জাগতিক ভোগতৃপ্তির সার্বিক পরিবেশের মাঝে সত্ত্বগুণসম্পন্ন ব্র‏হ্মচারী, পূজারী, সন্ন্যাসী সকলের ওপরেই একটা ভোগোন্মত্ত মায়াবিনীর অশুভ প্রভাব কাজ করে চলেছে। অপর্যাপ্ত ধন-ঐশ্বর্য, সাংগঠনিক কর্তৃত্ব ক্ষমতা আর মহিলাদের সঙ্গে নিয়ত নানা ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চলাফেরা করা, এই সবেরই পরিণামে যে রজোগুণ সম্পন্ন জীবনধারা আজকাল অনেক আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ত্বের মধ্যেও অনুপ্রবেশ করেছে এবং অস্বীকার করার উপায় নেই যে, যথার্থভাবে পারমার্থিক ভক্তিচর্চাও আরও কঠিন, প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ইউরোপেও ১৩৯২ খ্রিষ্টাব্দের গির্জার পরিবেশে মঠের মধ্যে যে কঠোর নিষ্ঠাভাব প্রতিপালিত হোত, বর্তমান সময়ের নিউইয়র্ক সুলভ অত্যাধুনিক পরিবেশে কোনো গির্জায় তা আশা করাই আকাশকুসুম।
বৈদিক সভ্যতা-সংস্কৃতির ঐতিহ্য অনুসারে মানুষের জীবনচর্যা চার আশ্রমের মধ্যে তিনটি আশ্রমেই ব্র‏হ্মচর্য যে কেবল মেনে চলতেই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে তাই নয়- ব্র‏হ্মচর্য পালন অত্যাবশ্যকীয় বলেই পরিগণিত হয়ে থাকে। ২০-২৫ বছর বয়স পর্যন্ত যতদিন না মানুষ বিবাহ করছে, ততদিন কোনো মহিলার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে তাকে পরিহার করে চলতে হয়। সেই বয়সটিতে মানুষের সমস্ত সঞ্চিত শক্তিরাশিকে কাজে লাগিয়ে পাঠ-অধ্যয়ন চর্চা, বৃত্তিশিক্ষা এবং অবিষ্যৎ জীবনে বৃহত্তর দায়-দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেকে উপর্যুক্ত করে তুলতেই হয়। একেই বলে ব্র‏হ্মচর্য। শুধু ভারতেই নয় এশিয়ার বহু দেশেও এখনো পর্যন্ত যুবক-যুবতীদের কঠোরভাবে ব্র‏হ্মচর্য রীতিতে অভ্যস্ত হতে সৎ পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু আধুনিক জড়বাদী ও ভোগন্মুখ সামাজিক ব্যবস্থার ও শিক্ষা ব্যবস্থার পাল্লায় পড়ে সেই সৎ ও সভ্য জীবন গড়ার ব্যবস্থা নষ্ট হতে বসেছে। এই বয়সেিত পরিবেশের নানা প্রলোভনের চাপ আজকাল এতই প্রবল এবং দুর্ধর্ষভাবে মানুষকে বিপর্যস্ত করে ফেলে যে, বৈদিক শিক্ষার মাধ্যমে যুবক যুবতীদের ভগবন্মুখী করে না রাখতে পারলে তাদের বিভ্রান্তি জাগা খুবই স্বাভাবিক। বৈদিক শিক্ষার মূল কথাই হল ভগবৎ-প্রেমই নামব জীবনের প্রধান লক্ষ্য।

বৈদিক বর্ণাশ্রম জীবনে যৌবনের ব্র‏হ্মচারী জীবনের পরে গার্হস্থ্য জীবনে স্বামী স্ত্রীরূপে সন্তান সৃষ্টি করে তাকেও ব্র‏হ্মচর্য শেখাতে হয় যাতে সে পারমার্থিক ভাবনা-চিন্তার মাধ্যমে প্রথম থেকেই ভগবন্মুখী হয়ে উঠে। গার্হস্থ্য জীবনের শেষে সন্তানেরা যৌবনে প্রবেশ করলে স্বামী-স্ত্রী বানপস্থ আশ্রম জীবনে চলে যান সংসারের দায়ভার পরিত্যাগ করে এবং সেই জীবনটিও ব্র‏হ্মচর্যের নীতি অনুযায়ী শুদ্ধ-সাত্ত্বিকতায় কাটাতে হয়। এমনকি বৈদিক শাস্ত্রানুসারে, ৬০ বছর বয়স হলে সংসার জীবন সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করেত্যাগীর জীবনধারা গ্রহণ করার রীতি। সন্ন্যাস জীবনে মানুষ তার যৌবনের মতোই কঠোর ব্র‏হ্মচর্য পালন করে থাকে। সুতরাং বৈদিক সংস্কৃতি অনুসারে ব্র‏হ্মচর্য পালন না করলে ভগবদ্ভক্তির আস্বাদন সুকঠিন হয়ে উঠে আবার সেই ভগবদ্ভক্তির আস্বাদন সুকঠিন হয়ে উঠে আবার সেই ভগবদ্ভক্তি জগতে থাকলে ব্র‏হ্মচর্য রক্ষা করা সহজসাধ্য হয়ে পড়ে। -হরেকৃষ্ণ।

(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ পত্রিকা জানুয়ারি ২০১৪ প্রকাশিত)


এরকম চমৎকার ও শিক্ষণীয় প্রবন্ধ পড়তে চোখ রাখুন ‘চৈতন্য সন্দেশ’‘ব্যাক টু গডহেড’

যোগাযোগ: ০১৮৩৮-১৪৪৬৯৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here