বৈষ্ণব সঙ্গ লাভের উপকার

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৩ | ৯:৪৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ২ মে ২০২৩ | ৭:৪০ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 76 বার দেখা হয়েছে

বৈষ্ণব সঙ্গ লাভের উপকার

শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: বহু সৌভাগ্যের ফলে ভগবানের কৃপায় জীবের সংসার বাসনা দুর্বল হয়ে পড়ে; তখন ভাবেই সাধুসঙ্গের প্রতি স্পৃহা জন্মে। সাধুসঙ্গে কৃষ্ণকথা শ্রবণ হতে শ্রদ্ধার উদয় হয়। তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্য হচ্ছে বৈষ্ণবদের শ্রীমুখ থেকে কৃষ্ণকথা শ্রবণ।
শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয় তাঁর উপদেশাবলীতে গেয়েছেন-

তীর্থ ফল সাধুসঙ্গ,

সাধুসঙ্গে অন্তরঙ্গ,

শ্রীকৃষ্ণভজন মনোহর।

যথা সাধু, তথা তীর্থ,

স্থির করি নিজ চিত্ত,

সাধুসঙ্গ কর নিরন্তর\

যে তীর্থে বৈষ্ণব নাই,

সে তীর্থেতে নাহি যাই,

কি লাভ হাটিয়া দূরদেশ।

সেই স্থান বৃন্দাবন,
যথায় বৈষ্ণবগণ

সে স্থান বৃন্দাবন,

সেই স্থান আনন্দ অশেষ

ভগবদ্ভক্তির নয়টি বিধির মধ্যে শ্রবণ হল প্রথম পদ্ধতি। শ্রীল প্রভুপাদ এই শ্রবণের বিশেষ গুরুত্ব দিতেন, তাই পৃথিবীর প্রত্যেকটি কৃষ্ণভাবনাময় মন্দিরে সকালে এবং সন্ধ্যায় গীতা ও ভাগবত পাঠের ব্যবস্থা করেছিলেন। এই কৃষ্ণভাবনাময় আন্দোলনে আমরা বহু নিষ্ঠাবান, সমর্পিত প্রাণ এবং ভগবদ্ভক্তি অনুশীলনরত বৈষ্ণবদের বিপুল আশীর্বাদ পেয়ে থাকি। তাঁরা শুদ্ধভাবে ভগবদ্ভক্তি সম্পাদনের চেষ্টা করে চলেছেন। শ্রীল রূপ গোস্বামীও উপদেশামৃত গ্রন্থে বলেছেন যে, ভগবদ্ভক্তের সান্নিধ্য অর্জন করা কৃষ্ণভাবনায় অগ্রসর হওয়ার পথে ষড়বিধ পন্থার অন্যতম। এই সান্নিধ্যের সুযোগ আমাদের গ্রহণ করা দরকার। গীতা, শ্রীমদ্ভাগবত এবং কৃষ্ণভাবনা সম্পর্কে বৈষ্ণবেরা যেসব প্রবচন এবং সারগর্ভ আলোচনা করে থাকেন, সেগুলি নিয়মিত শুনতে হবে। ঠিক যেমন অবৈষ্ণবদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতেও নিষেধ করা হয়ে থাকে, তেমনই বৈষ্ণবদের কথা শুনতেও পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।
যখনই আমি শুনতে পাই, আমার গুরুভ্রাতারা তাঁদের প্রবচন সভায় নানা উপলব্ধির কথা বুঝিয়ে বলছেন, তা শুনে সব সময়েই আমার আত্মদর্শন প্রসারিত হয়ে উঠে। কৃষ্ণভাবনা অনুশীলনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এবং নতুন পরিমন্ডল বা নতুন অন্তর্দৃষ্টি এনে দেয় আমাদের মাঝে, যা হয়ত আমি খেয়াল করিনি কিংবা একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তা লক্ষ্য করতে পারিনি। তাছাড়া এতে পরিশুদ্ধিও লাভ হয়। অতএব এই বিষয়টি নিয়ে আমার সমস্ত অনুগামীদের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই যে, বৈষ্ণবদের কাছ থেকে, বিশেষ করে যাঁরা কৃষ্ণভাবনায় অনেক অগ্রণী হয়ে রয়েছেন, তাঁদের কাছ থেকে কিছু শোনার প্রয়োজন আছে।
ভগবদ্ভক্ত শ্রীকৃষ্ণের বড় প্রিয়, আর শ্রীকৃষ্ণও ভক্তদের পরম প্রিয়। ভক্ত সর্বদাই শ্রীকৃষ্ণের সেবা করছেন আর শ্রীকৃষ্ণও সেবা করছেন তাঁর ভক্তের। শ্রীমদ্ভাগবতের নবম স্কন্ধের চতুর্থ অধ্যায়ে ৬৩ থেকে ৬৮ শ্লোকে পরমেশ্বর শ্রীবিষ্ণু দুর্বাসা মুনিকে বলেছেন, কিভাবে তাঁর নিজের সাথে তাঁর ভক্তদের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে।পরমেশ্বর ভগবানের কাছে ভক্ত এমনই প্রিয় যে, ভগবান এই কথা বারে বারে

শাস্ত্রাদিতে ঘোষণা করেছেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্তগণ বিশ^ব্রহ্মান্ড পারমার্থিক জ্যোতিতে উদ্ভাসিত করে রেখেছেন। ঠিক যেমন সূর্য তার বিচ্ছুরিত কিরণালোকের মাধ্যমে বিশ^ব্রহ্মাÐকে জ্যোতির্ময় করে রেখেছে। এই কথা শ্রীমদ্ভাগবতে (১১/১৬/৩৪) শ্রীকৃষ্ণ উদ্ধব সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে- আমার ভক্তরা দিব্য চক্ষু দান করে, যেক্ষেত্রে সূর্য শুধুই বহিরঙ্গা দৃষ্টিক্ষমতা এনে দেয়, আর তাও যখন সে আকাশে উঠে। আমার ভক্তবৃন্দ মানুষের প্রকৃত আরাধ্য দেবমন্ডলী আর প্রকৃত পরিবার গোষ্ঠী; তারাই মানুষের স্বরূপআত্মা, শেষ পর্যন্ত তারাই আমার থেকে অভিন্ন।

তাই বৈষ্ণবদের কাছ থেকে আমরা শ্রীকৃষ্ণভাবনার অন্তরঙ্গা জ্ঞানালোক লাভ করতে পারি! ভক্ত সান্নিধ্য লাভের মূল্যায়ন কে করতে পারে। বৈষ্ণবদের কাছ থেকে শ্রবণ করা এবং বৈষ্ণবদের সেবা করার এমনই মাহাত্ম্য। যখন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং তাঁর ভক্তদের সেবা করে থাকেন, তাহলে কোন উৎসাহী ভক্তের কথা আর কী বলার আছে। বৈষ্ণব ভক্তদের সেবা করা কতই না জরুরী। ভগবান শ্রীবিষ্ণু আগেই বলেছেন, ‘ভক্তদের কথা আর কি বলব- এমনকি যারা আমার ভক্তেরও ভক্ত, তারাও আমার অধিক প্রিয়।’

শ্রীল প্রভুপাদ বারে বারেই নরোত্তম দাস ঠাকুরের ভক্তিগীতিটি তুুলে ধরতেন, যেখানে তিনি গেয়েছেন, ‘ছাড়িয়া বৈষ্ণব সেবা নিস্তার পেয়েছে কেবা – ভক্তের ভক্ত না হতে পারলে কখনও জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায় না।
শ্রীমদ্ভাগবত ৯/৪/৬৩ তাৎপর্য
বাস্তবিকই, পদ্ম পুরাণে পরিষ্কার ভাবেই বলা আছে, পরমেশ্বর ভগবানের ভক্তরূপে তাকে গণ্য করা হবে না, যে ভগবানের শুদ্ধ বৈষ্ণব ভক্তদের আরাধনা পরিত্যাগ করেছে, এমনকি যদি সে সরাসরি গোবিন্দের ভজনাও করে থাকে। তেমন মানুষকে বৃথা অহংকারী  এবং উদ্ধত বলেই জানতে হবে। অতএব অতি সযতেœ ও মনোযোগ সহকারে মানুষকে নিয়ত বৈষ্ণবগণের আরাধনা করতে হবে।

-পদ্মপুরাণ, উত্তর খন্ড

প্রহ্লাদ মহারাজ তাঁর পিতা হিরণ্যকশিপুকে বলেছেন- “যে সব মানুষের জড়জাগতিক জীবনের প্রতি অত্যধিক প্রবণতা রয়েছে, তারা যদি জড় কলুষ থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত কোনও বৈষ্ণবের চরণকমলরেণু তাদের সর্বাঙ্গে লেপন করতে না পারে, তা হলে অসাধারণ কার্যকলাপের মহিমান্ডিত  সেই পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি তারা আসক্ত হতে পারবে না। শুধুমাত্র শ্রীকৃষ্ণভাবনায় মগ্ন হয়ে এই ভাবে পরমেশ^র ভগবানের পাদপদ্মে আশ্রয় গ্রহণ করেই মানুষ জড় কলুষতা থেকে মুক্ত হতে পারে।”

শ্রীমদ্ভাগবত ৭/৫/৩২

আরো জানতে পড়–ন, “পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুদ্ধ ভক্তদের, ভগবানের সেবায় সমর্পিত প্রাণ, নিষ্ঠাবান ভক্তদের ভগবদ্ভক্তির মাহাত্ম্য সম্পর্কে অসংখ্য উল্লেখ শাস্ত্রে আছে। অবশ্যই আমি চাই আমার সকল অনুগামীরা ভগবানের ভক্তবৃন্দের চরণকমলের সেবা করে, এই বিশেষ কৃপা লাভ করুন, সেই সুযোগটি করুক। দীক্ষাগুরুর প্রতি সেই ধরনের বিশ্বাস এবং ভালবাসা প্রত্যেক শিষ্যেরই আছে বা থাকা উচিত। তারা এইভাবেই গুরুদেবের সেবা পূজা করতে চায়।”

শ্রীমদ্ভাগবত ৫/১২/১২

উন্নত বৈষ্ণব ভগবদ্ভক্তের কাছ থেকে শ্রবণ করা এবং তাঁদের সেবা করার মাধ্যমেই বিশেষ পরিশুদ্ধি এবং কৃপালাভের সুযোগ ঘটে। আমি চাই না যে, আমার শিষ্যসমূহ তা থেকে বঞ্চিত থাকবে। শুধুমাত্র কনিষ্ঠ অধিকারী ভক্তদেরই এমন ধারণা থাকে যে, তার গুরুই হলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের একমাত্র ভক্ত এবং আর কেউই ভক্ত হতে পারে না। আমি চাই অবশ্যই আমার সমস্ত শিষ্যসমূহ অন্তত মধ্যম অধিকারী পর্যায়ে উন্নীত হবে এবং কেবল তাদের গুরুদেবের প্রতিই প্রেম ও বিশ্বাস থাকবে, তা নয় বরং পরমেশ্বাস ভগবানের সমস্ত শুদ্ধভক্তদেরই শ্রদ্ধা ভালবাসা দিতে জানবে।
বহু বৈষ্ণবদের কাছ থেকে শ্রবণ করার মাধ্যমে উপদেশ গ্রহণ করতে হলে ভক্তদের মধ্যে খানিকটা বিশেষ পরিণত মনোবৃত্তি থাকা বাঞ্ছনীয়। প্রচার সম্পর্কিত দর্শনভঙ্গির মধ্যে সামান্য মতভেদগুলি সহ্য করতে শিখতে হবে। দর্শন তত্তে¡র বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে প্রত্যেক ভক্তের সামান্য কিছু মত পার্থক্য বা গুরুত্বভেদ থাকতে পারে, তবে শ্রীকৃষ্ণের মর্যাদা এবং মহিমা সম্পর্কে আর দর্শনতত্তে¡র পরম বিষয়াদি সম্পর্কে কোন মতানৈক্য থাকা অনুচিত।

আমাদের চেতনাকে শ্রীকৃষ্ণভাবনাময় দর্শনতত্তে¡ পরিপূর্ণ করে তুলতে হবে এবং ভগবানের শুদ্ধভক্তদের কাছ থেকে তা শোনার চেয়ে আর ভাল পন্থা কী হতে পারে! সচরাচর আমাকে প্রবচন বা ভাষণ দিতেই হয়, কিন্তু যখনই আমি সুযোগ পাই কিছু শোনার, আমি তখন অন্যান্য ভক্তদের আলোচনা বা পর্যালোচনা থেকে বিপুল উদ্দীপনা আর অর্ন্তদৃষ্টি লাভ করে থাকি।


চৈতন্য সন্দেশ  ফেব্রুয়ারি ২০২৩ প্রকাশিত 


চৈতন্য সন্দেশ অ্যাপ ডাউনলোড করুন :https://play.google.com/store/apps/details?id=com.differentcoder.csbtg


 

Hare Krishna Thanks For Reading

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।