বৈষ্ণবের দয়া

0
79
উচ্চতর পারমার্থিক স্থিতি না থাকা সত্ত্বেও বৈষ্ণবের সমবেদনা প্রদর্শন একটি মূল্যবান গুণ 

মায়াপুর শশী দাস


শুদ্ধ বৈষ্ণবগণ গভীরভাবে অপরের প্রতি যত্নবান। তারা অপরের দুর্দশা হৃদয়ের অভ্যন্তর থেকে উপলব্ধি করতে পারেন। তাদের সর্বোত্তম দয়ার প্রকাশ হলো তারা সকলকে চিরতরে তাদের সকল দুর্দশা থেকে মুক্ত করার প্রচেষ্ঠা করেন, আর তা হলো তাদেরকে তাদের স্বধামে ফিরে যেতে সাহায্য করা অর্থাৎ ভগবদ্ধামে প্রত্যাবর্তন করানো। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাথে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন না করছে এবং কৃষ্ণসেবায় তাদের জীবন অতিবাহিত করার পন্থা শ্রবণ না করছে, তারা কখনোই প্রকৃত সুখ লাভ করতে পারবে না এবং দুঃখ দুর্দশা থেকে মুক্ত হতে পারবে না।
যেহেতু সকল বৈষ্ণবগণ জীবকে ভগবানের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টার মাধ্যমে সর্বোত্তম দয়া প্রদর্শন করছে, তাহলে তারা কি দয়া প্রদর্শন কিংবা দাতব্য কাজে নিয়োজিত হওয়ার মাধ্যমে কোনো জড় কর্মে আবদ্ধ হচ্ছে কিনা তার বিচার করতে পারবে?
বৈদিক সংস্কৃতিতে বিভিন্ন উক্তি এবং বাক্যের মাধ্যমে সহমর্মিতার নানা অনুভূতি ব্যক্ত করা হয়েছে- কৃপা, দয়া, অন্যর দুঃখ-কষ্ট দূর করার অভিলাষ ইত্যাদি। কয়েক স্থানে উল্লেখ আছে, অন্যের ব্যাথা ও দুর্দশা দর্শন করে কারো মনে যে ভাব উৎপন্ন হয় তা হলো সমবেদনা। বৈদিক সাহিত্য সমবেদনা প্রকাশের নানা ঘটনাবলী উল্লেখিত আছে, বিশেষত ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষাধারায়।
উদাহারণস্বরূপ, তৎকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ বৈষ্ণব ও পণ্ডিত ছিলেন শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর (১৮৩৮ ১৯১৪)। তিনি ছিলেন আরেকজন সর্বশ্রেষ্ঠ আচার্য এবং ইস্কন প্রতিষ্ঠাতা আচার্য কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল এ.সি.ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের গুরুদেব শ্রীমৎ ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের পিতা। শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তার “তত্ত্ববিবেক, তত্ত্বসূত্র এবং অমনেয় সূত্র: আধ্যাত্মিক বাস্তবতার একটি সুবিস্তৃত প্রকাশ” এ লিখেছেন, যারা মনে করে যে ভগবানের প্রতি ভক্তি এবং জীবের প্রতি দয়া হলো একে অন্য অপেক্ষা ভিন্নতর, এবং সেই অনুসারে কার্য করেন, সেইরূপ ব্যক্তি কখনোই ভক্তিমূলক সংস্কৃতি গ্রহণ করতে পারবেন না। তাদের সেই ভক্তিমূলক সেবা শুধুমাত্র একটি আভাস মাত্র। তাই অপরের হিতার্থে যা কিছু করা হয় যেমন দয়া, বন্ধুত্ব, ক্ষমা, দান, সম্মান প্রদর্শন এবং অন্যান্য সকল কিছুই ভক্তির অন্তর্ভুক্ত… সম্মান, বন্ধুত্ব কিংবা দয়ার প্রদর্শন হলো ভালবাসার প্রকাশ এবং যা হলো ভক্তির বৈশিষ্ট্য, ঔষধ, বস্ত্র, অন্ন, জল বিতরণ, দুঃখ-দুর্দশায় আশ্রয় প্রদান, জড় ও অজড় জ্ঞান শিক্ষা প্রদান ইত্যাদি হল ভক্তিমূলক সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত কর্ম।
ভগবদ্গীতায় (১/২৮) অর্জুন বলেছেন, “হে প্রিয়বর কৃষ্ণ! আমার সমস্ত বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয় স্বজনদের এমনভাবে যুদ্ধাভিলাষী হয়ে আমার সামনে অবস্থান করতে দেখে আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবশ হচ্ছে এবং মুখ শুষ্ক হয়ে উঠছে।” শ্রীল প্রভুপাদ তার ভাষ্যে বলেছেন, “যে সমস্ত হীন মনোভাবাপন্ন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবেরা অর্জুনকে সব রকম দুঃখ-কষ্টের মধ্যে ঠেলে দিতে কুণ্ঠাবোধ করেনি, যারা তাকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করবার জন্য এই যুদ্ধের আয়োজন করেছিল, এই যুদ্ধক্ষেত্রে তাদেরই দেখে অর্জুনের অন্তরাত্মা কেঁদে উঠেছিল। তাঁর স্বপক্ষের সৈন্যদের প্রতি অর্জুনের সহানুভূতি ছিল অতি গভীর, কিন্তু যুদ্ধের পূর্বমুহূর্তে এমনকি শত্রুপক্ষের সৈন্যদের দেখে এবং তাদের আসন্ন মৃত্যুর কথা ভেবে অর্জুন শোকাতুর হয়ে পড়েছিলেন…সেই সঙ্গে অনুকম্পা ও সহানুভূতিতে তাঁর চোখ দিয়ে জলও পড়েছিল অর্জুনের এই ধরনের আচরণ দুর্বলতার প্রকাশ নয়, এ হচ্ছে কোমলতা।”
শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের রচয়িতা শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী বৈষ্ণবের ২৬টি গুণের কথা উল্লেখ করেছেন। ভক্তরা সকলের হিতের জন্য কাজ করেন এবং তারা সর্বদাই বন্ধুভাবাপন্ন, কৃপাপরায়ন, উদার, শ্রদ্ধাশীল, সকলের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং সমদর্শী
কাজাকিস্তানে একটি প্রবচনে প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রচারক শ্রীমৎ নিরঞ্জন স্বামী বৈষ্ণব সহানুভূতির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন :
ভক্তিরসামৃতসিন্ধুর একটি উদ্ধৃতিকে বিস্তৃত করলে আমরা পাই যে আমাদের উচিত নয় অযৌক্তিকভাবে কোন জীবকে কষ্ট দেওয়া। কৃষ্ণভাবনামৃতের মৌলিক নীতি হলো বৈষ্ণবের গুণাবলী অর্জনে সচেষ্ট হওয়া।

বাঞ্ছাকল্পতরুভ্যশ্চ কৃপাসিন্ধুভ্য এব চ।
পতিতানাং পাবনেভ্যো বৈষ্ণাবেভ্যো নমো নমঃ

সমস্ত বৈষ্ণব ভক্তবৃন্দ, যাঁরা বাঞ্ছাকল্পতরুর মতো সকলের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে পারেন, যাঁরা কৃপার সাগর এবং পতিতপাবন, তাঁদের চরণকমলে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।
ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তার সজ্জ্বন-তোষনী (৯/৯)
তিনি লিখেছেন-
জীবের প্রতি আমাদের সহানুভূতির প্রকাশ তিন ধরনের। সহানুভূতির প্রকাশ যদি জড় দেহের সাথে সম্পর্কিত হয় তবে তাকে পূণ্যকর্মরূপে গণ্য করা হয়। ক্ষুধার্তদের মাঝে খাদ্য বিতরণ, রোগীদের মাঝে ঔষধ বিতরণ, শীতার্ত ব্যক্তিদের বস্ত্র বিতরণ ইত্যাদি হলো জড় দেহের সাথে সম্পর্কিত সহানুভূতি। বিনামূল্যে শিক্ষা তথা জ্ঞান বিতরণ হলো আমাদের মনের সাথে সম্পর্কিত সহানুভূতি। কিন্তু সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ সহানুভূতি আমাদের আত্মার সাথে সম্পর্কিত। সেই সর্বশ্রেষ্ঠ সহানুভূতি হলো এই জড় জগতে আবদ্ধ জীবসমূহকে জড় জগৎ থেকে মুক্ত করে ভক্তিমূলক সেবার দ্বারা কৃষ্ণপ্রেম লাভ করানোর জন্য প্রচেষ্ঠা করা।
১৯৭৪ সালে শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীমায়াপুর ধামের বারান্দায় বসে দেখলেন কিছু স্থানীয় শিশু একটি খাবার সংগ্রহের জন্য কুকুরের সাথে লড়াই করছে। শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ বলেন, যখন শ্রীল প্রভুপাদ দেখলেন যে, কিভাবে এক টুকরো খাবার সংগ্রহের জন্য কুকুরের সাথে লড়াই করছে, তৎক্ষণাৎ তার চোখ বেয়ে জল পড়ছিল। তিনি বলেছিলেন, “তারা কেমন ক্ষুধার্ত ছিল? অন্যের ছুড়ে ফেলা বাসি খাবার খাওয়ার জন্য কুকুরের সাথে লড়াই করতে কে চায়?” প্রভুপাদ এই ক্ষুধার্ত শিশুদের দেখে এত বেশি দুঃখিত হলেন যে তিনি বললেন, “আমাদের এমনভাবে খাদ্য বিতরণ কর্মসূচীর আয়োজন করতে হবে যাতে মন্দিরের চতুর্দিকে ১০ মাইল ব্যাপি এলাকায় কেউ ক্ষুধার্ত না থাকে। সকলেই যাতে ভগবানের প্রসাদ লাভ করতে পারে।” এরপরই প্রতিষ্ঠত হলো “ইসকন ফুড রিলিফ” পরবর্তীতে যেটি “ফুড ফর লাইফ” নামে বিশ্বব্যাপি পরিচিতি লাভ করে। প্রভুপাদ চেয়েছিলেন যেন নিয়মিতভাবে প্রসাদ বিতরণ করা হয় এবং বর্তমানে আমরা সপ্তাহের ৭ দিনই প্রসাদ বিতরণ করি। (Memories: Ancedotes of a Modern-Day Saint, Vol. 1, Tape 2)

ফুড ফর লাইফের সেবামূলক কর্মসূচী

১৯৯০ সালে বসনিয়া-হারজিগোভিনাতে সারাজিভো যুদ্ধের সময় ফুড ফর লাইফের স্বেচ্ছাসেবকগণ হাসপাতাল, এতিমখানা, আশ্রয় প্রকল্প, বৃদ্ধাশ্রম, যুদ্ধে আহত শিশুদের জন্য পৃথক হাসপাতাল তৈরির মাধ্যমে তিনবছর ব্যাপি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মানুষদের আশ্রয় ও সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি প্রায় ২০ টনেরও বেশি খাবার বিতরণ করে।


আমরা কোন দান করার সময় যদি সময় স্থান এবং পাত্র ঠিক থাকে সেই সেই দানে যদি প্রতিদানের কোন উদ্দেশ্য না থাকে তবে সেই দানকে সত্ত্বগুণ সম্পন্ন দান বলে। তাই বৈষ্ণবীয় দানের ক্ষেত্রে অবশ্যই সময়, স্থান, পাত্র ঠিক রেখে দান করতে হয়।


১৯৯৫ সালের ১২ ডিসেম্বর নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ ছিল “রাশিয়ায় দুর্দিনে হরেকৃষ্ণদের শীতল জলধারা বিতরণ” শীর্ষক প্রবন্ধে মাইকেল স্পেকটার গ্রোনজি, চেচনিয়ার মত যুদ্ধবিধ্বস্থ শহরে ফুড ফর লাইফের সেবা কার্যক্রম পরিচালনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। এখানে তাদের কার্যক্রমকে কলকাতার মাদার তেরেসার সেবার সাথে তুলনা করা হয়েছে। যে শহরগুলোতে মানুষের মিথ্যা, লোভ এবং দুর্নীতি দিন দিন ব্যাপক আকারে প্রকাশ পাচ্ছে সেখানে এই হরেকৃষ্ণ ভক্তরা নিঃস্বার্থে নিত্যদিন খাবার বিতরণ করছেন। এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ১৯৭৪ সালের ১৬ মার্চ শ্রীল প্রভুপাদ সত্যহিত দাসকে লিখিত এক পত্রে বলেন, এখন আমি বিশেষত শস্য, চাল, গমকে ডাল এবং অন্ন প্রসাদরূপে ক্ষুধার্ত মানুষদের মাঝে বিতরণ করার উপর গুরুত্ব আরোপ করছি। এই জড় জগতের মানুষ সর্বদাই ত্যক্ত বিরক্ত থাকে কেননা তারা সর্বদাই প্রকৃতি কর্তৃক শাস্তি পাচ্ছে।
এছাড়া অসুর সদৃশ্য কিছু নেতার অব্যবস্থাপনার কারণে খাবারের পরিমাণ অত্যন্ত কমে যাচ্ছে। তাই আমি আশা প্রকাশ করছি যে, আমরা ব্যাপক হারে সমগ্র ভারতব্যাপি খাবার বিতরণ করব। শহরের প্রাণকেন্দ্র ছাড়াও ভ্রাম্যমান গাড়ির মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলেও প্রসাদ বিতরণ করতে হবে। আমরা কৃষ্ণসেবার মাধ্যমে সমগ্রবিশ্বকে জয় করতে পারব যদি আমাদের কার্যক্রম এভাবে চলতে থাকে।

নিত্যকার সহানুভূতির প্রকাশ

বৈষ্ণবগণ তাদের প্রতিদিনের জীবনে নিয়মিতভাবে সহানুভূতির প্রকাশ ঘটাতে পারেন। আমি মায়াপুর ভ্রমণের সময় এই ধরনের উদাহরণ লক্ষ্য করেছি। আমি দেখলাম মায়াপুরে আগত দর্শনার্থীদের একটি দল অত্যন্ত উৎসুকভাবে একটি মায়াপুর নিবাসী ভক্তের দিকে তাকাচ্ছে। সেই মাতাজী ভক্তটি কর্মচঞ্চল একটি রাস্তায় ধীরে ধীরে হেঁটে বেড়ানো একটি পতঙ্গ নিজ হাতে নিয়ে নিরাপদ স্থানে রেখে দিলেন। আমি কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি জানালেন, যেকোন মুহূর্তে হয়তোবা কারো পায়ের আঘাতে সেই পতঙ্গের মৃত্যু হতে পারত, তাই আমি তাকে রক্ষা করলাম। এই ঘটনা দর্শন করে আগত দর্শনার্থীগণ বৈষ্ণবের দয়ার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করলেন এবং আমি নিশ্চিত যে তারা একটি অসাধারণ শিক্ষা নিয়ে তাদের নিজস্থানে ফিরে যেতে পেরেছিলেন সেদিন। যদিও এটি ছিল অত্যন্ত সাধারণ একটি ঘটনা কিন্তু এর মাধ্যমে মহান বৈষ্ণবীয় গুণাবলী প্রকাশ হয়েছে।
মুকুন্দ গোস্বামীর ইনসাইড দ্যা হরেকৃষ্ণ মুভমেন্ট গ্রন্থে উল্লেখিত কিছু লেখা, যা হরেকৃষ্ণ ওয়ার্ল্ড নিউজপেপারে প্রকাশিত হয় (জানু/ ফেব্রু ১৯৯৫): “উচ্চস্থানে আরামপ্রদভাবে জীবন অতিবাহিত করা, কিংবা জড় জগতের সমস্যা নিবারণ না করে মুক্তির জন্য প্রার্থনা করা ভক্তদের কাজ নয়। আমাদেরকে অবশ্যই মানুষের কাছে জানাতে হবে যে আমরা তাদের জীবনে ধনাত্মক পরিবর্তন আনতে পারি, তা সে ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত হোক। আমরা পৃথিবীর সকল মানুষের জীবন আনন্দময় করতে পারি।”
পৃথিবীর দুর্দশা লাঘবে ভক্তদের অংশগ্রহণের সুফল খুব সুন্দর ভাবে উপলব্ধি করা গেছে সুখুমী, জর্জিয়াতে ১৯৯০ সালে যখন সেখানে খুবই পাশবিক যন্ত্রনাদায়ক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। ময়ুরধ্বজ দাস বহু বছর ধরে যুদ্ধবিধ্বস্থ আহত মানুষের সেবার্থে ভক্তদের সেবা কর্মসূচী পরিচালনা করে আসছেন। এই ভক্ত তার জীবন বাজি রেখে আর্তদের কল্যানে নিঃস্বার্থভাবে ঝুকি নিয়ে এমনভাবে সেবা করে গেছেন যেন কেউ প্রসাদ থেকে বঞ্চিত না হয়। উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালে সুখুমির তৎকালীন মন্দির অধ্যক্ষ রাঘব পণ্ডিত দাসকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তখন সুখুমীর মেয়র এবং অন্যান্য প্রদেশসমূহের প্রধান কর্মকর্তাগণ জনগণের উদ্দেশ্য দেওয়া বাণীতে তার প্রশংসা করেন এবং বৃহৎ জনগোষ্টির অংশগ্রহণে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদিত হয়। হাজারো মানুষেরা ভক্তের সাহসিকতা ও সহানুভূতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখতে পেলেন, এমন আত্মত্যাগের মাধ্যমে সহানুভূতির প্রকাশ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তিন গুণের দান যেকোনো দান বা সেবার ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই প্রকৃতির তিন গুণের কথা স্মরণ রাখতে হবে। আমরা যদি কাউকে কোনো কিছু দান করি এবং সে সেগুলো অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে তবে সেই প্রকারের দানকে তমগুণ সম্পন্ন দান বলে ।
যদি কোনো প্রকার দানে প্রতিদান পাওয়ার আশা থাকে তবে তাকে রজগুণ সম্পন্ন দান বলে। কোন দান করার সময় যদি সময়, স্থান এবং পাত্র ঠিক থাকে সেই সেই দানে যদি প্রতিদানের কোন উদ্দেশ্য না থাকে তবে সেই দানকে সত্ত্বগুণ সম্পন্ন দান বলে। তাই বৈষ্ণবীয় দানের ক্ষেত্রে অবশ্যই সময়, স্থান, পাত্র ঠিক রেখে দান করতে হয়।
সকল প্রকার সেবার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে কৃষ্ণের কাছে নিয়ে যাওয়া। এটিই হলো বৈষ্ণবের সর্বশ্রেষ্ঠ সহানুভূতি । এটি সুস্পষ্ট যে শ্রীল প্রভুপাদ চাইতেন না যে তার প্রথমদিকের ভক্তগণ বেশি বেশি কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হোক, কিন্তু বর্তমানে ইস্কন সমগ্র পৃথিবীব্যাপি ছড়িয়ে থাকা লাখো ভক্তের অংশগ্রহণে একটি বৃহৎ সংস্থায় পরিণত হয়েছে, তাই সমাজের বিভিন্ন লেভেলে আমাদের সেবার পরিধি বিস্তারের দারুন সুযোগ আমাদের রয়েছে। তবে আমাদের সহানুভূতিশীল কার্যক্রম সমূহের খেয়াল রাখতে হবে যেন বেশি বেশি শ্রীল প্রভুপাদের উদ্দেশ্য কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌছায়।
একজন বৈষ্ণব নানা উপায়ে সহানুভূতির প্রকাশ ঘটাতে পারেন- যেমন ভগবানের পবিত্র হরিনামের প্রচার, ভক্তিশাস্ত্রের প্রচার, প্রসাদ বিতরণ এবং মানুষের দুর্দশা লাঘবে সেবামূলক কর্মসূচী । আমি ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের একটি সুন্দর উদ্ধৃতির মাধ্যমে আমরা প্রবন্ধের যবনিকা টানতে চাই: “আপনাকে কৃপাপরায়ন হতে হবে এবং অন্যান্য জীবের উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত নয় । অন্যর প্রতি সহানুভূতিতে হৃদয় পরিপূর্ণ থাকা উচিত। ভক্তিমূলক সেবার একটি অঙ্গ হলো সকল জীবের প্রতি অসীম কৃপার বর্ষন করা।”
লেখক পরিচিতি: মায়াপুর শশী দাস হলেন শ্রীমৎ কেশবভারতী গোস্বামীর শিষ্য। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত বিট্রিশ সেনা, বর্তমানে তাইওয়ানে বসবাস করছেন।


 

অক্টোবর – ডিসেম্বর ২০১৬ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here