বৈশ্বিক দারিদ্রতার বৈদিক সমাধান

0
44

ড. প্রেমাঞ্জন দাস, শ্রীধাম মায়াপুর,ভারত
মন্দিরের সিংহদ্বারে সারি সারি ভিখারীর দল বসে আছে। তা দেখে একটি মেয়ে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ল। এটি কেমন মন্দির। মন্দিরের মধ্যে ভক্তরা ভাল মন্দ খাচ্ছে অথচ ভিখারীর দল কিছুই খেতে পাচ্ছে না। এমনকি মন্দিরের মধ্যে আপনারা পাথরের মূর্তিকে দামী দামী পোশাক পরাচ্ছেন অথচ ভিখারীরা ছেঁড়া কাপড় পরে বসে আছে, তাও আবার মন্দিরের সিংহদ্বারে। মেয়েটির দাবী, পৃথিবীতে কোটি কোটি দরিদ্র মানুষকে অন্ন, বস্ত্র, ওষুধ দান করাটাই মন্দিরের প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত। সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিশ্বদ্যালয় নির্মাণ এবং পরিচালনা করছেন অথচ বিশ্বদ্যালয়ে চত্বরে যে সমস্ত ভিখারীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের যত্ন নিচ্ছেন না। কেন? এমনকি আমেরিকার মতো ধনী দেশেও ভিক্ষা করাকে বে-আইনি ঘোষণা করা হয়েছে। কি আমেরিকা, কি ভারতবর্ষ-সর্বত্রই দেশের প্রধান নিয়ন্ত্রণকারী হচ্ছে দেশের সরকার। সরকার কেন এই ভিখারী সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান করার চেষ্টা করছে না?
এই সমস্যার সমাধান দু’রকম হতে পারে: (১) আপাত সমাধান।(২) স্থায়ী সমাধান।
১) আপাত সমাধান হচ্ছে লক্ষ লক্ষ ভিখারীকে সাধ্যমতো অর্থ দান করা। প্রত্যেক ভিখারীকে যদি ১ টাকা করে দেওয়ার বাজেট করা হয় এবং প্রত্যেক ভিখারীর গড় আয়ু যদি ত্রিশও হয়, তাহলেও কোটি কোটি টাকার বাজেট তৈরি করতে হবে। আবার পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ এই প্রস্তাবে রাজীও হবে না, কেননা আজকাল অধিকাংশ ধনী লোকও ভিখারীকে ভিক্ষা দিতে চায় না। সুতরাং এই আপাত সমাধান মরুভূমিতে এক বিন্দু জল দেওয়ার মতো। পৃথিবীর সমস্ত মন্দির, বিশ্বদ্যালয় পার্ক ইত্যাদি প্রকল্প বাস্তবায়ন বন্ধ করে যে পয়সা বাঁচানো সম্ভব হবে, তা দিয়েও এই ভিখারী সমস্যার সমাধান হবে না। আর ভিখারী সমস্যা সমাধান করার জন্য বিশ্বিদ্যালয়, মন্দির–এ সব বন্ধ করাও যুক্তিযুক্ত নয়।
বিশ্বদ্যালয় যেমন মানুষকে জড় শিক্ষা দান করছে, তেমনি মন্দির থেকে মানুষ পাচ্ছে পারমার্থিক শিক্ষা। সেই অর্থে বিশুদ্ধ পরম্পরায় স্থাপিত মন্দিরগুলি হচ্ছে পারমার্থিক স্কুল, কলেজ এবং বিশ্বিদ্যালয়। কেউ হয়তো যুক্তি দেখাতে পারে, সমাজে পারমার্থিক শিক্ষাকেন্দ্র তথা মন্দিরের কোনও প্রয়োজন নেই। নাস্তিকেরা মনে করে ভগবান নেই। সুতরাং গীতা, ভাগবত, বেদ, বেদান্ত, উপনিষদ, পুরাণ, বাইবেল ইত্যাদি গ্রন্থে প্রদত্ত শিক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই। মানুষ ছাগল, মুরগী, মাছ, শূকর ইত্যাদি প্রাণীকে কষ্ট দিয়ে যেভাবে নিজের প্রোটিন সংগ্রহ করছে, ঠিক একইভাবে লক্ষ লক্ষ ভিখারীকে পয়সা না দিয়ে মানুষ প্রোটিন কেনার পয়সা সঞ্চয় করতে পারে। এক অর্থে, ছাগল, মুরগী, মাছ এরা সকলেই ভিখারী। ভিখারী যেমন অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের অভাব অনটনে ুগছে, এই সমস্ত পশু পাখিদেরও আশ্রয় চাই, খাদ্য চাই। তাই তো গরু-ছাগল ইত্যাদি প্রাণীরা মানুষের আশ্রয়ে থাকে। মাছগুলি মানুষের দেওয়া খাদ্য খেতে চায় বলেই বড়শী গিলে ফেলে। নাস্তিকেরা মানুষ ভিখারী থেকে শুরু করে পশু পাখি সমস্ত ভিখারীকেই বঞ্চনা করে। বৈষ্ণবরা কিন্তু একটা পিঁপড়াকেও হত্যা করে না। গরু যেহেতু মানুষের কাছে আশ্রয় ভিক্ষা করে, বিনিময়ে মায়ের মতো দুধ দান করে, তাই বৈষ্ণবেরা গোহত্যা করে না।
আবার আর এক অর্থে এই সংসারে ৯৯.৯ শতাংশ মানুষই কোনও না কোনও দিক থেকে ভিখারী। কেউ জ্ঞানের ভিখারী, কেউ চরিত্রের ভিখারী, কেউ অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের ভিখারী, কেউ কামের ভিখারী, লোভের ভিখারী ইত্যাদি। তাই আমরা দেখি আমেরিকার মতো ধনী দেশেও মানুষ দিন রাত ওভারটাইম পরিশ্রম করছে অথচ তারা ভিখারীকে ভিক্ষা দেয় না। সে দেশে ভিক্ষা দান করা আইনত নিষিদ্ধ। সে দেশের মানুষ ওভারটাইম পরিশ্রম করে প্রমাণ করছে যে তারাও বড়ই অভাবের মধ্যে রয়েছে। আর সেই অভাব এতই ব্যাপক যে দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা তাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। তাই তারাও ভিখারী। তাহলে ধনী ভিখারী, দরিদ্র ভিখারী, পশু পাখি-সবই ভিখারী। সমস্যা বড়ই গুরুতর। এর স্থায়ী সমাধান চাই।
২) স্থায়ী সমাধান: গণতান্ত্রিক সরকার কখনই এই ভিখারী সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। ভারত সরকার ভিখারী সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমেরিকা সরকার একে বে-আইনি ঘোষণা করেছে।
আমেরিকাতেও ছদ্মবেশী ভিখারী রয়েছে প্রচুর। তাহলে সমাধান? এই সমাধান রয়েছে বেদে নির্দেশিত বর্ণাশ্রম ধর্মে। গণতন্ত্রে ভিখারীর সংখ্যা বাড়বে ছাড়া কমবে না। কিন্তু বর্ণাশ্রম ব্যবস্থায় এর সমাধান রয়েছে। চরিত্রবান জ্ঞানী বুদ্ধিজীবীদের বেদে ব্রাহ্মণ বলা হয়েছে। এরা ছিলেন শ্রদ্ধাজীবী। এরা জনগণকে জ্ঞান দান করতেন। বিনিময়ে জনগণ এমনকি রাজাও এদের দেখভাল করতেন। ক্ষত্রিয়রা ছিলেন শাসক গোষ্ঠি। এরা ছিলেন করজীবী। বৈশ্যরা ছিলেন কৃষি এবং গোরক্ষায় তৎপর। তারা আবার কৃষি এবং গোরক্ষা ভিত্তিক বাণিজ্যও করতেন। তারা ছিলেন প্রধানত কৃষিজীবী এবং বাণিজ্যজীবী। আর শূদ্রদের কেউ কেউ ব্রাহ্মণের অধীনে চাকুরী করতেন, কেউ কেউ ক্ষত্রিয় বা বৈশ্যের অধীনে। তাই শূদ্ররা ছিলেন প্রধানত বেতনভোগী। কলিযুগে অধিকাংশ মানুষই হচ্ছে শূদ্র তথা বেতনজীবী। চাকরি মানেই চাকর। কিন্তু দু’জন ছিল বিরল প্রজাতি। রূপ গোস্বামী, সনাতন গোস্বামী–এঁরা ছিলেন হুসেন শাহের মন্ত্রী। অথচ পরবর্তীকালে তাঁরা যখন বৃন্দাবনে গিয়ে গ্রন্থ লিখতে শুরু করলেন, তখন তাঁরাও দরজায় দরজায় মাধুকরী ভিক্ষা করতেন। তাঁরা ছিলেন এমনই মহান ভিখারী যে সম্রাট আকবর, সম্র্রাট মানসিংহ তাদের চরণস্পর্শ করার জন্য বৃন্দাবনে যেতেন।
বৈদিক শিক্ষার যত প্রচার হবে, ভিখারী সমস্যার ততই সমাধান হবে। ভিখারীকেও রূপ সনাতন গোস্বামীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে মহান হতে হবে। আমি একজন ভিখারীকে জানি, যিনি ভিক্ষা করে মদ খেতেন, গাঁজা টানতেন। বৃন্দাবনের ষড় গোস্বামী কিন্তু সেরকম ভিখারী ছিলেন না। সেরকম মহান ভিখারী যখন গৃহস্থের দরজায় গিয়ে উপনীত হয়, তখন গৃহস্থরা

ভিক্ষা দেয় লজ্জাভরে
হস্ত কাঁপে থরথরে
ভাবে ইহা মহতের লীলা।”

বৈদিক শাস্ত্রে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে প্রত্যেক গৃহস্থের ধর্ম হচ্ছে অন্ন দান। ঘরে যদি কোনও টিকটিকিও থাকে, তাকেও খাদ্য দান করা গৃহস্থের কর্তব্য। এমনকি গৃহবাসী কোনো সাপও যেন অভুক্ত না থাকে, সেটা দেখাও গৃহস্থের কর্তব্য। গণতন্ত্রের অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন, ভিখারী নিষেধ আইন ইত্যাদি তখন ছিল না। গৃহস্থের জন্য বৈদিক সমাজের প্রধান আইন ছিল food sharing অর্থাৎ খাদ্যকে সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে খাওয়া। তাই বৈদিক গৃহস্থ ভোজনে বসার আগে দরজায় দাঁড়িয়ে ঘোষণা করতেন: “এখানে যদি কেউ অভুক্ত থাকেন, দয়া করে এগিয়ে আসুন, ভোজন প্রস্তুত।” অকৃষিজীবী কোলকাতা, ওয়াশিংটন বাসীরা বৈদিক কৃষিজীবী সমাজের খাদ্য প্রাচুর্য স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারবে না। তখন দেশে অখাদ্য নাট বল্টু, টায়ার রাবারের কোনও ফ্যাক্টরীই ছিল না। নন্দ মহারাজের নয় লক্ষ গাভী ছিল। কোথায় আজ সেই দুধ মাখন আর দই ঘিয়ের ফ্যাক্টরী। প্রত্যেক গৃহস্থই গাভী পালন করতেন। চাষাবাদ করতেন। মানুষ আজ জনসংখ্যা বৃদ্ধির অজুহাত দিয়ে নাট বল্টু, রাবার, টায়ার, কম্পিউটার ইত্যাদি বেশী করে বানাচ্ছে যাতে তারা সেসব জিনিস খেতে পারে। নষ্ট বুদ্ধি।
মানুষ আসলে দরিদ্র হয় পাপের কারণে। পাপের ফলে বর্তমান জন্মের ধনী ব্যক্তি আগামী জন্মে পথের ভিখারী বা জন্তু জানোয়ার হয়ে জন্মাতে পারে। বেদ তাই প্রথমেই মানুষকে নিষ্পাপ জীবনের শিক্ষণ এবং প্রশিক্ষণ দান করে। বৈদিক সমাজ মানুষকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিত যে সকল গৃহস্থরা ভড়ড়ফ ংযধৎরহম করতে অভ্যস্ত হতেন এবং মৃত্যুর পরে ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার জন্য সাধনা করতেন যাতে এই দুঃখের সংসারে আর পুনর্জন্মই না হয়। পুনর্জন্ম রোধ হলে ভিখারী জন্মের তো কোনও প্রশ্নই উঠে না।
তবে এই জগতে পারমার্থিক শিক্ষা (কৃষ্ণভা প্রদানই হচ্ছে ভিখারী সমস্যার সর্বশ্রেষ্ঠ সমাধান। আমরা দেখি কোলকাতা বম্বে থেকেও ভিথারীরা মায়াপুর বৃন্দাবনে সহজে টিকে থাকতে পারে। কেন না সেখানে মন্দিরে মন্দিরে এত বেশী প্রসাদ বিতরণ হয় যে, বর্তমান ভোগবাদী শহর এবং নগরে তা একেবারেই কল্পনাতীত। সুতরাং বৈদিক সংস্কৃতির প্রচার এবং প্রসারই ভিখারী সমস্যার স্থায়ী সমাধান।


চৈতন্য সন্দেশ জুন-২০২২ প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here