বৈদিক কালচক্র (পর্ব-১)

0
426

মাইকেল এ-ক্রোমো: সময়ের ধারণা যেটি আধুনিক ঐতিহাসিক বিজ্ঞানীগণ ব্যবহার করে থাকেন সেটি হল জুডি-খ্রীষ্টিয়ান ধারণা। এটি সম্পূর্ণরূপে প্রাচীন গ্রিক এবং ভারতীয় ধারণা থেকে ভিন্ন। প্রত্যেকটি সভ্যতা কিংবা সংস্কৃতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে যে, সেখানকার সাধারণ মানুষ দুই ধরনের কালের ধারণা পোষণ করে থাকেন। একটি সরলরৈখিক এবং অন্যটি চক্রাকার। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায় যে, প্রাচীন গ্রিসে দার্শনিকগণ এই দুই প্রকারের সময়ের ধারণা দিয়েছেন। তবে তাদের কালের চক্রাকার আবর্তিত হওয়ায় ধারণার সাথে ভারতীয় পুরাণভিওিক সাহিত্যেও সময়ের ধারণার মিল লক্ষ্য করা গেছে। যেমন গ্রিকের প্রাচীন লেখক হেসোডি’র ‘ওয়ার্ক এন্ড যেস’’ নাম গ্রন্থ সিরিজের কালের ধারণা ভারতীয় যুগভিওিক কালের ধারণার সমতুল্য। উভয়ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, যতই সময় গড়াবে মানব সভ্যতা ততই খারাপের দিকে যাবে। ‘ওন নেচার’ নামক গ্রন্থে এমপিযোক্লিস মহাবিশ্বের কালের চক্রাকারে আবর্তনে কর্তা উল্লেখ করেন, এছাড়াও প্লেটোর লিখিত বিভিন্ন গ্রন্থে সময়ের আবর্তন এবং বিশাল প্রলয়সম ঘূর্ণিঝগে মানব সভ্যতা ধবংসের বিবরণ পাওয়া যায়। অ্যারিস্টেটল একসময় বলেছিলেন, কলা এবং বিজ্ঞান উভয়ই বহু পূর্বে আবিস্কৃত হয়েছে। সুতরাং বলা যায় যে, তৎকালীন গ্রীক দার্শনিকদের বৈদিক শাস্ত্র সম্বন্ধে ভাল ধারণা ছিল।
যখন ইউরোপে জুডিও খ্রীস্টিয়ান সময়ের ধারণা উদ্ভুত হয় তখন একটি ধারণা জন্মায় যে, সময় কেবলমাত্র সরলরৈখিক বিস্তারে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। এই ধারণা আত্মার পূনর্জন্ম স্বীকার করে না। এছাড়া বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উদ্ভবের পর সরলরৈখিকভাবে সময়ের গতি চলে এক সময় সেটি ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর আর কিছুই থাকবে না। আধুনিক বিজ্ঞানীগণ এবং প্রত্নতাত্ত্বিকগণ সময়ের এই বিশেষ ধারণাই পোষণ করে থাকেন।
তাদের মতে এই মহাবিশ্বের আবির্ভাব হয়েছে এই রহস্যাবৃত কারণে, সেসাথে এখানে হঠাৎ মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে। মূলত বিবর্তনবাদের মাধ্যমে মানুষের সৃষ্টি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই জাতির কি অবস্থা হবে তা বরা মুশকিল!!! বিজ্ঞান বর্তমানে মৃত্যুকে জয় করে মানুষের অমরত্ব লাভের চেষ্টা কওে যাচ্চে মূলত বায়োমেডিক্যাল সায়েন্স গবেষণার মাধ্যমে এবং স্পেস ট্রাভেলিং এর মাধ্যমে সমগ্র মহাবিশ্বের কর্তা হতে চাচ্ছে। কিন্তু জুডিও খ্রীষ্টিয়া সময়ের ধারণা অনেকের কাছে প্রশ্নবোধক হয়ে দাড়িয়েছে। যেমন সান্তা ফি ইনষ্টিটিউট নামক এক সংস্থা আর্টিফিশিয়াল লাইফ শীর্ষক বিভিন্ন করফারেন্স ভবিষ্যতবাণী করেছে যে, মানুষের বুদ্ধিমত্তা একসময় যন্ত্রে রূপান্তরিত হবে এবং কম্পিউটারগুলো জীবিত মানুষের জটিল লক্ষণগুলো প্রদর্শন করবে। অর্থাৎ আর্টিফিশিয়াল লাইফ মতে অবশেষে রূপান্তরের মাধ্যমে মূলত মনুষ্য প্রজাতির অপমৃত্যু ঘটবে। অবশেষে বিগ ব্যাঙ্গ থেকে সৃষ্টি হওয়া জগতের সবকিছু বন্ধ হয়ে যাবে।

ব্রহ্মাণ্ডের স্থায়িত্বকাল পর্যন্ত ব্রহ্মা বেঁচে থাকেন। যদিও ব্রহ্মা- সৃষ্টি এবং প্রলয় চক্রাকারে চলতে থাকে। যখনই ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি হয় তখন একজন নতুন ব্রহ্মার জন্ম হয়। ব্রহ্মার সামগ্রিক জীবনে নির্দিষ্ট সময় পর পর ব্রহ্মাণ্ডের আংশিক প্রলয় হয়ে থাকে। ব্রহ্মার বর্তমান দিনটি শুরু হয়েছিল ২.৩ বিলিয়ন বছর পূর্বে।
খ্রীষ্টিয় ধর্ম মতে, মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে অন্যান্য প্রজাতির আবির্ভাবের পরে। জেনেসিস মতে, ঈশ্বর মানুষের পূর্বে বৃক্ষ, জীবজন্তু ও পাখি সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু বাইবেবের সময়ের ধারণাকে বহু প্রকারে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। জুডিও-খ্রীস্টিয়ান ধারণা এর আধুনিক বিজ্ঞানের ধারণা হিসেবে যদিও মানব সভ্যতার আবির্ভাব মাত্র কয়েক হাজার বছর পূর্বে কিন্তু আবিস্কৃত কিছু মানব খুলি পর্যবেক্ষণ করে কমপক্ষে ১ লক্ষ বছর পূর্বের মানব অস্তিত্ব সনাক্তকৃত হয়েছে। আধুনিক সময়ের ধারণার বহু ত্রুটি লক্ষ্য করায় অনেক ঐতিহাসিক এবং বিজ্ঞানী বৈদিক সময়ে ধারণা গ্রহণ করছেন। বৈদিক শাস্ত্রেও চক্রাকারে কালের আবর্তন, আত্মার দেহান্তর এবং কর্ম এই তিনিটি মুখ্য ধারণা গ্রহণ করা হলে সময়ের ধারণার সকল প্রকার ত্রুটিমুক্ত হয়। বৈদিক শাস্ত্র পুরাণসমূহ মতে, সময় মূলত যুগ আকারে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। প্রত্যেক চক্রযুগ ৪টি যুগের সমন্বয়ে গঠিত।
১ম টি হল সত্যযুগ যার স্থায়িত্বকাল ১৭,২৮০০০ বছর, ২য় টি হল ত্রেতাযুগ যার স্থায়িত্বকাল ১২,৯৬,০০০ বছর, ৩য় টি হল দ্বাপরযুগ যার স্থায়িত্বকাল ৮,৬৪,০০০ বছর, ৪র্থ টি হল কলি যুগ যার স্থায়িত্বকাল ৪,৩২,০০০ বছর। তাহলে ১টি চক্রযুগের মোট স্থায়িত্বকাল হবে ৪৩,২০,০০০ বছর। যা ব্রহ্মার ১ দিন মাত্র।
ব্রহ্মার একদিনকে বলা হয় কল্প। ব্রহ্মার এক রাতের স্থায়িত্বকালও দিনের সমতুল্য। ব্রহ্মার রাত্রিকালীন সময়ে সমস্ত বিশ্বব্রহ্মা- ধ্বংস হয় এবং অন্ধকাররে নিমজ্জিত থাকে, যখন আবার ব্রহ্মার দিন শুরু হয় তখন আবার জীবজগৎ সৃষ্টি হয়। ব্রহ্মার প্রতিটি দিন ১৪ মন্বান্তরবাদে বিভক্ত। প্রত্যেক মন্বান্তর ৭১টি চক্রযুগে বিভক্ত। ১টি চক্রযুগ আবার সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি চতুর্যুগে বিভক্ত। প্রত্যেক মন্বন্তর সময়ের পর ব্রহ্মান্ডে আংশিক প্রলয় দেখা যায়। পুরাণ মতে, বর্তমানে আমরা সপ্তম মন্বন্তরের ২৮তম চক্রযুগে অবস্থান করছি (ব্রহ্মার দিন) সুতরাং এতে দেখা যায় যে, বর্তমান পৃথিবীর বয়স ২.৩ বিলিয়ন বছর। হরেকৃষ্ণ! (চলবে…)

 


(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ পত্রিকা আগষ্ট ২০১১ তে প্রকাশিত)

এরকম চমৎকার ও শিক্ষণীয় প্রবন্ধ পড়তে চোখ রাখুন ‘চৈতন্য সন্দেশ’‘ব্যাক টু গডহেড’

যোগাযোগ: ০১৮৩৮-১৪৪৬৯৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here