বৈদিক আর্কিটেক্চার

0
605

আমাদের এই পৃথিবী অসংখ্য জীবের আবাসস্থল। ধরিত্রী মাতা তাঁর বক্ষে আমাদের ধারণ করে আছেন। কিন্তু আমরা অনেকেই হয়ত জানি না যে, এই পৃথিবীর উপর বহু মহাজাগতিক চাপ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে কিছু সংখ্যক আকাশ হতে এবং অন্যান্য চাপসমূহ ভূম-ল হতে আসে। এই অতি সূক্ষ্ম শক্তিসমূহ মানবের জীবযাপনে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম। পৃথিবীর উপর প্রভাববিস্তারকারী উক্ত অদৃশ্য শক্তিসমূহ হচ্ছে আসামঞ্জস্য অভিকর্ষ (Inconsistent Gravity) আসামঞ্জস্য তাপমাত্রা (Inconsistent Temperature) আসামঞ্জস্য চুম্বকীয় বল (Inconsistent Magnetic Field)পৃথিবীর আবর্তনজনিত শক্তি, ভূচুম্বকীয় রেখা (Geomagnetic Line) মহাজাগতিক তেজস্ক্রীয় রশ্মি ইত্যাদি। পৃথিবীতে ১৭০ কি.মি. ব্যাপী যে কোন প্রান্তে তাপমাত্রা 100°C থেকে 500°C পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয় এবং নির্দিষ্ট সময পরপর প্রচণ্ড বায়ু প্রবাহিত হয় যা পৃথিবীর তাপশক্তির ভারসাম্য বিনষ্ট করে। এছাড়া পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে যদি আমরা কম্পাস যন্ত্র ব্যবহার করি তবে আমরা সহজেই পৃথিবীর চৌম্বকীয় বলের উপস্থিতি উপলদ্ধি করতে পারব। এই চৌম্বকীয় বলের আসামঞ্জস্য শক্তির কারণে ৮০ কি.মি বা তার চেয়ে অধিক অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। Geological Survey of Canada এর তথ্য মতে প্রতিবছর এই বল কানাডার নির্দিষ্ট অঞ্চল হতে ধীরে ধীরে ৪০ কি.মি দূরে সরে যাচ্ছে। হার্টমান নামক একজন বিজ্ঞানী গবেষণা করে দেখছেন যে, পৃথিবীর ভূচৌম্বকীয় রেখায় অবস্থানমুখী আবাসস্থলের বসবাসরত মানুষসমূহ শারীরিকভাবে অধিকাংশ সময় বিভিন্ন অসুস্থতা বোধ করেন। এছাড়া চেন্ডলার ওবলী নামক বিজ্ঞানী পৃথিবীর ঘূর্ণনে সৃষ্ট গতি পৃথিবীকে কিরকম চাপের সৃষ্টি করে তা ব্যাখা করেন। কিথ বেচলার Earth Radiation  নামক একটি গ্রন্থ লেখেন। যেখানে তিনি প্রায় ৩০০০টি পরিবারের বাসস্থানের উপর গবেষণা করে প্রমাণ করেন যে, কেউ যদি Water Veins (ভূগর্ভস্থ জলের দিকপ্রবাহ ) এবং Grid Crossings (ভূ-চৌম্বকীয় রেখা) এর উপর ঘুমায় তবে তারা নানা রোগে ভোগেন। যেমন-নিদ্রাহীনতা, মাথাব্যথা, ক্যানসার ইত্যাদি। এছাড়া মহাজাগতিক কোন বিস্ফোরণের কারণে পৃথিবীতে নির্দিষ্ট দিকে ক্ষতিকর রশ্মি আসে। এছাড়া তখন সূর্য হতে প্রচুর ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন নির্গত হয় যা প্রতি ঘন্টায় ২৪,০০০ কি.মি. গতিতে পৃথিবীতে নেমে আসে। এইসব ক্ষতিকর মহাজাগতিক রশ্মিগুলোর মধ্যে রয়েছে প্লাজমা, ইলেকট্রন, প্রোটন, পায়ন, মিয়ন ইত্যাদি। উপরিউক্ত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণগুলোর সত্যতা আমরা বিভিন্ন বৈদিক শাস্ত্রেও লক্ষ্য করি। বৈদিক শাস্ত্রে সূর্য, চন্দ্র, আদি নানা গ্রহ নক্ষত্র এবং দেবতাদের পৃথিবীর উপর প্রভাব বিস্তারের কথা লেখা আছে। জ্যোতিষ শাস্ত্র ও এই প্রকারের অদৃশ্য মহাজাগতিক শক্তির সত্যতা স্বীকার করে। কিন্তু এখানে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে বিজ্ঞানীরা যেখানে কিছুদিন পূর্বে মাত্র এই সকল অদৃশ্য শক্তির কথা জানতে পেরেছে এবং সমাধানের পথ এখনো জানতে পারেনি সেখানে আমাদের প্রাচীন বৈদিক শাস্ত্রবিদগণ হাজার হাজার বছর পূর্বেই তা অবগত ছিলেন এবং তাঁরা এ সমস্যা সমাধানের খুবই সুন্দর পথ বৈদিক শাস্ত্রে লিপিবদ্ধ করেছেন। উক্ত বৈদিক শাস্ত্রসমূহকে বাস্তুশাস্ত্র বলা হয়। বাস্তুশাস্ত্র হচ্ছে প্রাচীন আবাসস্থান নির্মাণের বৈজ্ঞানিক পন্থা যাতে শুধুমাত্র দার্শনিক তত্ত্ব এবং নির্মাণ কৌশলের সুত্র আলোচিত হয়নি। এছাড়াও মানুষের উন্নত জীবনযাত্রার প্রণালীর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানের জাতীয় বিল্ডিং কোড ভিত্তিক স্থাপত্যগুলো যেখানে বেশিদিন ঠিকতে পারে না সেখানে বাস্তুশাস্ত্রের মন্ত্র ও সূত্র ভিত্তিক গঠিত স্থাপত্যগুলো হাজার হাজার বছর ধরে অক্ষত রয়েছে। যেমনঃ ভুবনবিখ্যাত পুরীধামের শ্রী জগন্নাথ মন্দির নির্মিত হয়েছে বাস্তুশাস্ত্রের কলাকৌশল দ্বারা যা এখনও হাজার হাজার বছর ধরে প্রাচীন বৈদিক ইতিহাসের সাক্ষ্য স্বরূপ চিরউজ্জলরূপে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। বাস্তুশাস্ত্রের উৎপত্তি মূলত বেদ হতে। এছাড়া বেদের অন্য শাখা উপনিষদেও বাস্তুবিদ্যার পরিচয় লাভ করা যায়। তাই বাস্তুশাস্ত্রকে আমরা বৈদিক আর্কিটেকচার রূপে পরিগণিত করতে পারি। মৎস্য পুরানে উল্লেখিত-
ভৃগুরত্রী বৈশিষ্ঠাশ্চ বিশ্বকর্ম মায়সতত্ত্ব… অর্থাৎ ভৃগু, অত্রী, বিম্বকর্ম, ময়, নারদ, নগনজী, বিশালাক্ষ, পুরন্ধর, ব্রহ্মা, কুমার, নন্দীস, সনক, গর্গ, বাসুদেব, অনিরুদ্ধ, শুক্র এবং বৃহস্পতি হচ্ছে ১৮ জন লেখক যারা বাস্তুশাস্ত্রের বিজ্ঞান রচনা করেছেন। বাস্তুশাস্ত্রে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করা হয়। তা হল পৃথিবী (Earth): আমাদের দেহের হাঁড়, মাংস, চামড়া, চুল প্রভৃতি তৈরি করে। বায়ু (Air) : আমাদের দেহের স্নায়ু সচল ও রক্ত চলাচলে সহায়তা করে। অগ্নি (Fire) : দেহে গতি, উষ্ণতা প্রদান করে এবং দেহকে খাদ্য হজমে সহায়তা করে।
জল (Water) : রক্ত তৈরি ও স্থিতি প্রদানে সহায়তা করে। আকাশ (Atmosphere) : আমাদের চরিত্র গঠন এবং মানুষের মানবিক পারমার্থিক ভাবনা জাগ্রত করে। বাস্তুশাস্ত্রে এই পাঁচটি উপাদান কিভাবে আমাদের দেহ ও বাসস্থানেরে উপর প্রভাব বিস্তার করে তার বিশদ বর্ণনা দেওয়া আছে। পৃথিবী তার নিজ কক্ষপথে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ২৩.৪ ডিগ্রী কাত হয়ে সূর্যের চারদিকে ঘুরছে। পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়। যে, একটি কার (গাড়ী) এর সামনের অংশের চেয়ে পেছনের অংশ কিছু ছোট হয়। ঠিক সেইরকম একটি রকেটের নাকের অংশ হতে ক্রমাগত পেছনের দিকে সরু হয়ে আসে। যেহেতু পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরছে সেহেতু কোন স্থাপত্য যদি পশ্চিম দিকের চেয়ে পূর্বে যদি উচ্চতায় ছোট রাখা হয় তবে, এটি সহজেই অতি বায়ুবেগ প্রতিরোধ করতে পারে। যার ফলে প্রাকৃতিক অশুভ শক্তির হাত থেকে ঘরটি সুরক্ষা পায় এবং উত্তর-পূর্ব মূখে প্রাকৃতিক শুভশক্তি (Positive Energy)-র উদয় ঘটে। একইভাবে সূর্য আলো এবং উষ্ণতা প্রদান করে সকল প্রাণীকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। তাই সূর্য উদয়ের দিককে পবিত্র দিক বলে ধরা হয়। তাই যদি পূর্ব অভিমূখে স্থাপত্য নির্মাণ করা হয়ে তাহলে সেটি হবে সবচেয়ে উপযোগী নিরাপদ বাসস্থান। এতক্ষণ যা আলোচনা করা হল এর সবগুলোই বাস্তুশাস্ত্রের প্রায়োগিক বিধি। প্রাচীন বৈদিক শাস্ত্রবিদদের রচিত বাস্তুশাস্ত্র এখন উন্নত বিশ্বের ইঞ্জিনিয়ারদের পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে যা এক আশ্চর্যের বিষয়। যেমন-হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর বৈদিক বাস্তুশাস্ত্রবিদ জন হগলিন আমেরিকান তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকে দক্ষিণ প্রবেশদ্বার ব্যবহার না করে উত্তর প্রবেশদ্বার ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি তৎকালীন বিটিশ প্রধানমন্ত্রি টনি ব্লেয়অরকে বাস্তুশাস্ত্রের ভিত্তির বাসস্থান সম্পর্কে নানা পরামর্শ প্রদান করেছিলেন। এছাড়া তাঁর ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের বাড়িটি বাস্তুশাস্ত্রের ভিত্তিতেই নকশা করা হয়। এছাড়া সাম্প্রতিক আলোচিত খবর হচ্ছে ওয়াশিংটন ডিসিতে ৭২ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ “বৈদিক গ্রীন টাওয়ার” নির্মিত হতে যাচ্ছে। যা সম্পূর্ণরূপে বাস্তুশাস্ত্রের সূত্রের ভিত্তিতে নির্মিত হবে। বাস্তুশাস্ত্রের পরিধি এখন সমগ্র বিশ্বব্যাপী। সম্রাট অশোক এর আমলে বৌদ্ধরা প্রাচীন বাস্তুশাস্ত্রের জ্ঞান  জাপান ও চীনদেশে স্থানান্তর করেছিল যা বর্তমানে সেখানে “Feng Shui Art ” নামে অধিক পরিচিত। মাইকেল বরডেন নামক একজন বাস্তুবিজ্ঞানী বাস্তুশাস্ত্রে কেন্দ্রীক বৈদিক জ্ঞানকে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চান। তার ওয়েবসাইটে তিনি বাখ্যা করেন “বর্তমানে পাশ্চাত্যবাসীরা প্রাচ্যের বিজ্ঞানকে অনুসরণ করেছে যা অধিক বাস্তব এবং আবেদন সৃষ্টি করে।” এছড়া আরেকটি আশ্চর্যজনক খরর হচ্ছে বলিউডের ২ টি ব্লকবাস্টার হিট ফিল্ম ‘পরদেশ’ ‘হাম দিল দে চুকে সনম’ এর প্রতিটি শ্যুটিং হয়েছে বাস্তুশাস্ত্রের কলাকৌশল মেনে। এছাড়া সম্প্রতি ভারতীয় জ্যোতির্বিদরা বাস্তুশাস্ত্রের জ্ঞান নিয়ে ভাস্তু কম্পাস তৈরি করেছেন যা বিস্ময়কর কাজ করতে সক্ষম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here