বৃহৎ মানব, বৃহৎ হৃদয়

0
107

গত ৭ জুন শ্রীবৃন্দাবন ধামে অপ্রকট হন শ্রীল প্রভুপাদের অন্তরঙ্গ প্রিয় এক শিষ্য ব্রহ্মানন্দ দাস। তাঁর এ প্রয়ান উপলক্ষে স্মৃতিচারণমূলক নিম্নের এই বিশেষ প্রতিবেদন। ২০১৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর শ্রীমৎ কদম্ব কানন স্বামী দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেটোরিয়াতে এ স্মৃতিচারণ করেন।

কদম্বকানন স্বামী

বিশাল দেহধারী

শ্রীল প্রভুপাদ পশ্চিমা বিশ্বে গমন করেছিলেন, সেখানে তিনি কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন শুরু করেছিলেন। সংক্ষিপ্ত পরিসরে তিনি আমেরিকার লোয়ার ইস্ট সাইডে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারে সফলতা লাভ করেছিলেন। সে সময় তাঁর প্রতি কিছু ভক্ত আকর্ষিত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ব্রহ্মানন্দ দাস।
যেকোনোভাবে হোক ব্রহ্মানন্দ ছিলেন খুবই বড় ও শক্তিশালী ব্যক্তি পারমার্থিক ও শারীরিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি ছিলেন শক্তিশালী। তার শরীরটি বৃহদাকার ছিল। কৃষ্ণভাবনামৃতের সঙ্গে যোগদানের পূর্বে তিনি একজন কুস্তীবিদ ছিলেন এমনকি কৃষ্ণভাবনায় আসার পরও একটু আধটু অনুশীলন করতেন। ব্রহ্মানন্দের সামনে এমনকি বড় বড় ব্যক্তিদেরকেও ছোট দেখাত ।
একবার শ্রীল প্রভুপাদ এক ভক্তকে এক বড় আকারে মিষ্টি দিয়েছিলেন। প্রভুপাদ সেটি ভক্তটির সম্মুখে একটি থালায় রাখেন আর সেটিকে দেখতে থাকেন। একই সময়ে ব্রহ্মানন্দও সেটির দিকে তাকাচ্ছিলেন। ব্রহ্মানন্দ তখন সেটি পুরোটাই মুখে পুড়ে দিলেন! প্রভুপাদ বললেন, “হ্যাঁ এই হল কৃপার প্রকৃতি। যদি তুমি তৎক্ষণাৎ এর সুবিধাটি গ্রহণ না কর, তবে তা হারিয়ে যেতে পারে।”

একজন নেতা

ব্রহ্মানন্দকে নিয়ে অনেক কাহিনি রয়েছে। কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের শুরুতে ব্রহ্মানন্দ প্রভুপাদের বিশ্বস্ত প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রভুপাদের প্রতি সম্পূর্ণ শরণাগত। প্রভুপাদ যা বলতেন তাই করতেন। আমার মনে হয় যদি তার চরিত্রের মধ্যে কোনো গুণ সুবিদিত হয়ে থাকে তবে সেটি হল তার বিশ্বস্ততা।
তিনি ছিলেন সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেবক, প্রভুপাদের প্রতি সম্পূর্ণরূপে বিশ্বস্ত প্রভুপাদ বলতেন, “ঠিক আছে, তাই আমরা করতে যাচ্ছি, সেটি যাই হোক।” এটি এত সহজ নয় এবং সেটি সবার মাঝে সচরাচর খুঁজে পাওয়া যায় না। এই কারণে ব্রহ্মানন্দ প্রভুপাদের সন্নিকটে গমনের অদ্বিতীয় পদটি লাভ করেছিলেন।
প্রকৃতপক্ষে, শুরুর দিনগুলোতে সমস্ত ভক্তদের মধ্যে ব্রহ্মানন্দ ছিলেন একমাত্র নেতা। প্রভুপাদ তাকে নেতা হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। যখন সবাই বলাবলি করছিল যে, আমাদের কোষাধ্যক্ষ নির্বাচন করা উচিত এবং একজন প্রেসিডেন্ট বা সভাপতিও। তখন ব্রহ্মানন্দ বললেন, “সৎস্বরূপ একজন ভালো সেক্রেটারি হবে।” গর্গমুনি যাকে গর্গমানি হিসেবে ডাকত সবাই, তিনি হবেন কোষাধ্যক্ষ হিসেবে যথার্থ ব্যক্তি। প্রভুপাদ তখন বলে উঠলেন, “তোমার (ব্রহ্মানন্দ) প্রেসিডেন্ট হওয়া উচিত।” সেটাই হয়েছিল এবং তখন থেকেই ব্রহ্মানন্দ সবকিছুর দায়িত্বে ছিলেন এবং তা ছিল খুবই অভাবনীয়।
প্রথমদিকে, প্রভুপাদের কাছে ভগবদ্গীতার যে পাণ্ডুলিপিটি ছিল তিনি সেটি প্রকাশনা করতে চেয়েছিলেন। সেটি করাটা বেশ কঠিন ছিল কিন্তু তিনি ব্রহ্মানন্দকে বললেন, “এটি প্রকাশনা কর”। আপনারা হয়তো এটি জানেন যে বলাটা সহজ, কিন্তু করাটা কঠিন। যা হোক কিভাবে প্রকাশনা করতে হবে? তখন যেভাবে হোক, ম্যাকমিলান পাবলিশিং কোম্পানিতে কাজ করে এমন একজন ব্যক্তির কাছ থেকে একটি বায়না আসে। অতএব, ব্রহ্মানন্দ তখন এ বিষয়ে কিছু করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং যখন তিনি সেখানে গেলে কোনো যোগসাজস করার উদ্দেশ্যে তখন তিনি দেখলেন যে, ব্যক্তিটি একাউন্টস বিভাগে কাজ করে এবং প্রকাশনা করার ব্যাপারে তার কোনো কিছুই করার নেই। এভাবে সবকিছু ভালোভাবে ঘটছিল না।
তখনই, সেই অ্যাকাউন্ট্যান্টের অফিসে প্রধান সম্পাদক এসে হাজির এবং তখন ব্রহ্মানন্দ দেখে এই হল সুযোগ। তিনি তখন লোকটিকে বললেন, “আমার কাছে এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের তাৎপর্য সম্বলিত একটি ভগবদগীতা রয়েছে এবং আমি প্রকাশনার জন্য সেই পাণ্ডুলিপিটি আপনার কাছে প্রদান করতে আগ্রহী।”
লোকটি বলল, “ভগবদ্গীতা? আমরা পারমার্থিক বিষয়গুলোর ওপর একটি সিরিজ শেষ করলাম এবং এটি সম্পূর্ণ করার জন্য আমাদের একটি ভগবদ্গীতা প্রয়োজন। আমি এটি নেব।” এই হল ঘটনা! ম্যাকমিলানের মতো একটি বড় কোম্পানি প্রভুপাদের ভগবদ্গীতা প্রকাশনা শুরু করল। এই হল ব্রহ্মানন্দ। প্রভুপাদ গ্রন্থ প্রকাশনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী ছিলেন।
একসময় ভক্তরা জাপানে গেলেন যেখানে “লীলাপুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ” গ্রন্থটি ছাপানোর কথা। ব্রহ্মানন্দ ছাপাখানাতে গিয়ে সবকিছু তদারকি করছিলেন, কিভাবে কি করতে হবে ইত্যাদি। কিন্তু দেখা গেল ব্রহ্মানন্দ জাপান থেকে চলে যাচ্ছেন তখনও এর ছাপাকার্য সম্পন্ন হয়নি। তাকে ফ্লাইট ধরতে হচ্ছে। যদিও তারা কথা দিয়েছিল, কিন্তু ঠিক সময়ে ছাপাকার্য শেষ হয়নি। এজন্যে তিনি খুব হতাশ হয়ে পড়েন এবং তিনি এটিও জানতেন যে, প্রভুপাদও অত্যন্ত হতাশ হবেন। যখন তিনি প্লেনের সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলেন তখন হঠাৎ বিশাল একট লিমোজিন এক প্রকার মোটরগাড়ি) সেই প্লেনের দিকে এসে হাজির হল সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন দায় নিপ্পন ছাপা কোম্পানির কর্মকর্তারা। ব্রহ্মানন্দ দেখলেন এরা তো সেই লোকগুলো যাদের সাথে তিনি কাজ করছেন। তিনি তাড়াতাড়ি প্লেনের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নিমে গেলেন। তারা তখন গ্রন্থের একটি বাক্স তার হাতে তুলে দিলেন।
ব্রহ্মানন্দ প্লেনের ওপর উঠে বাক্সটি খুললেন এবং সেখান থেকে লীলাপুরুষোত্তম গ্রন্থটির একটি রূপালী রঙের কপি বের করে আনলেন। তখন তার পাশে বসে থাকা এক লোক বলে উঠল “এটা কী?” তিনি বললেন, “এটি একটি গ্রন্থ, কৃষ্ণ সম্পর্কিত গ্রন্থ, এটি প্রকাশ করেছেন আমার গুরুদেব, এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন জর্জ হ্যারিসন”। লোকটি বলল, “এর মূল্য কত?” তিনি বললেন ‘২০ ডলার’ । লোকটি আবার বলল, “ঠিক আছে, আমি এটি নিব” তিনি তখন গ্রন্থটি কিনেই নিলেন!
যখন ব্রহ্মানন্দ আমেরিকায় আসলেন, তিনি প্রভুপাদের কাছে বক্স হস্তান্তর করে সামান্য লজ্জিত অনুভব করছিলেন। প্রভুপাদ বললেন, “সেখানে কতটি গ্রন্থ রয়েছে? তিনি বললেন, “প্রভুপাদ এখানে চব্বিশটি গ্রন্থ দেখতে পাচ্ছি। এখানে কিন্তু পঁচিশটি গ্রন্থ ছিল”।
হ্যাঁ, আমি প্লেইনে চড়ে আসার সময় একটি গ্রন্থ বিক্রি করে ফেলি।” প্রভুপাদ বললেন, “খুব ভাল”। তারপর প্রভুপাদের হাতে এর একটি ছিল এবং তিনি বললেন, “বাকি সবও বিক্রি হয়ে যাবে”। তিনি তাঁর কপির দিকে তাকিয়ে বললেন, এই কপিটিও বিক্রি হয়ে যাবে।
সমস্ত গ্রন্থই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল এবং প্রভুপাদ অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন। অতএব, ব্রহ্মানন্দ শ্রীল প্রভুপাদের অনেক নিকটের ও অন্তরঙ্গ ছিলেন। বলতে গেলে অনেকভাবে তিনি প্রভুপাদের পুত্রের মতোই ছিলেন, এতটা নিকটের ছিলেন তিনি।

অপ্রাকৃত আরোগ্য-বিধান

ব্রহ্মানন্দ একসময় বৃন্দাবনে কিছু কাহিনি বলছিলেন এবং আমি তা শ্রবণ করি। একবার, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, প্রভুপাদ সেটি পছন্দ করেননি। প্রভুপাদ বলছিলেন, “তুমি কিভাবে অসুস্থ হতে পারে? ব্রহ্মানন্দ বললেন, “এইমাত্র অসুস্থ হয়ে পড়লাম”। প্রভুপাদ বললেন “তুমি সবসময়ই অসুস্থ থাক।”
প্রভুপাদ তার প্রতি মোটেও অনুকম্পা প্রদর্শন করেছিলেন না। ব্রহ্মানন্দ সত্যিই সত্যিই কষ্ট পাচ্ছিল। পক্ষান্তরে প্রভুপাদ কর্কশভাবে কথা বলছিলেন যেন এটি এমন একটি ভয়ানক রোগ যা বিরক্তিকর। ব্রহ্মানন্দের তাতে খুব খারাপ অনুভূত হয়েছিল। তারপর একসময় প্রভুপাদ তার কাছে আসেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন আর ব্রহ্মানন্দও অবিশ্বাস্যভাবে সুস্থ হয়ে গেলেন। এই হল অপ্রাকৃত কৃপা। ব্রহ্মানন্দ বলছিলেন, “হ্যাঁ, তিনি (প্রভুপাদ) আমার রোগকে এভাবে ভালো করে দিয়েছিলেন।”

আমি কি এখান থেকে বেরোতে পারি?

ব্রহ্মানন্দ দাস যে শ্রীল প্রভুপাদের কিরকম প্রিয় ছিলেন তা এই কাহিনি থেকে আরো বেশি বোধগম্য হয়। যদিও শ্রীল প্রভুপাদের সমস্ত শিষ্যরাই প্রিয় তবে ব্রহ্মানন্দ ছিল সবচেয়ে প্রিয় শিষ্যদের অন্যতম। নিম্নোক্ত কাহিনিটি ব্রহ্মানন্দ দাসের মুখনিঃসৃত কাহিনি।
১৯৭১ সাল, প্রভুপাদ ভারতে বড় বড় পাবলিক প্রোগ্রাম করছিলেন। এরকম একটি সন্ধ্যায় এক আর্য সমাজবাদী প্রভুপাদকে চ্যালেঞ্জ করে বসল। তিনি বলেন, “ও স্বামীজি, আপনি আপনার পশ্চিমা চেলাদের নিয়ে ভারত এসেছেন। কিন্তু আপনি যেটি শিখাতে চাচ্ছেন সেগুলো আমরা সবই জানি। এটি আমাদের সংস্কৃতি। ভালো হয়তো আপনি অন্য কোথাও গিয়ে কাজটি করেন। আপনি তো পশ্চিমা বিশ্বে প্রচার করেছেন, তবে মুসলিম দেশগুলোতে কি হবে? পাকিস্তানের মতো দেশে কি হবে? আপনার উচিত পাকিস্তানে গিয়ে প্রচার করা। পারলে আপনি তাদেরকে ভক্ত করুন।”
সেটি ছিল একটি পাবলিক প্যান্ডেল, হাজার হাজার লোক তখন উপস্থিত। প্রভুপাদ বললেন, “আপনি কি আমাদেরকে সেখানে যাওয়ার জন্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন?” লোকটি বলল “হ্যাঁ। আমি আপনাকে চ্যালেঞ্জ করি। আপনাকে অবশ্যই পাকিস্তানে যেতে হবে।”
প্রভুপাদ বললেন, “ঠিক আছে, আমরা যাব।”
প্রভুপাদ আমাকে তখন এক পত্রে লিখেন, “অনতিবিলম্বে পশ্চিম পাকিস্তানে যাও।” তিনি গর্গমুনিকেও লিখেছিলেন, “অনতিবিলম্বে পূর্ব পাকিস্তানে যাও।” আমরা এই পত্রগুলি পাওয়ার পরদিনই রওনা হলাম। আমাদের কোনো অর্থ ছিল না। কেউ একজন ফ্লোরিডা থেকে নিউইয়র্ক যাওয়ার জন্য বাস ভাড়া দিয়েছিলেন। গর্গমুনির অর্থ ছিল তাই সে উড়াল দিল। আমাকে ভারত হয়ে বাসে, ট্রেনে করে বহু কষ্টে যেতে হয়েছিল।
সেসময় একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রভুপাদ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শত্রুতা ও যুদ্ধ সম্পর্কে জানতে পারলেন। তখন তিনি দ্বিতীয় চিঠিতে লিখেন যে, “এই রকম পরিস্থিতিতে আমি সেখানে যাওয়ার উপদেশ দিচ্ছি না।”
কিন্তু আমরা সেই পত্রটি পাইনি। আমরা তার আগেই পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যাই। যুদ্ধময় এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা তখন হাঁটছিলাম। প্রতিকূল পরিস্থিতি ছিল, কিন্তু তবুও আমরা সেখানে প্রচার করছিলাম ও কিছু একটা করার চেষ্টা করছিলাম। আমি করাচিতে ছিলাম। করাচির উত্তর দিকটা হল সিংহ মরুভূমি, পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ স্থান। সময়টি ছিল মে মাস, সবচেয়ে উষ্ণতম মাস এবং আমি আমাশয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম।
আমার কোনো গ্রন্থ ছিল না, লোকেরা রাস্তায় আমাকে দেখে থু থু ফেলত। আমার পেছনে ছুড়ি ধরে ভয় দেখাত। যখন আমরা কীর্তন করতাম লোকেরা এসে আমাদের তিলক মুছে দিত ও থুথু ফেলত। সে এক জঘন্য পরিস্থিতি এরপর ভারত ও পাকিস্তানের একটি সংবাদপত্রে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয় যে,
“চার হরে কৃষ্ণ ধর্ম প্রচারক গুলিবিদ্ধ”। বোম্বেতে করন্ধর প্রভুপাদকে সংবাদপত্রের রিপোর্টটি দেখায়। সেখানে কোনো নাম উল্লেখ করা হয়নি যে কারা কারা গুলিবিদ্ধ।
পূর্ব পাকিস্তানে গর্গমুনি পুষ্ট নামে এক ভক্তের সাথে ছিল এবং পশ্চিম পাকিস্তানে আমি ও জগন্নিবাস আমরা চারজনই প্রচারে ছিলাম। প্রভুপাদ তাতে অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছিলেন। তিনি ভাবলেন যে, আমরা গুলিবিদ্ধ হয়েছি।
প্রভুপাদকে একটি টেলিগ্রাম করে লিখলাম, “আমরা এখান থেকে চলে আসতে পারি?” প্রভুপাদ পাল্টা টেলিগ্রাম পাঠালো, “অনতিবিলম্বে চলে আস। ভক্তিবেদান্ত স্বামী”। শুধুমাত্র চারটি শব্দ। সেগুলো ছিল সেরা চারটি শব্দ। দেশটি থেকে বেরিয়ে আসাটাই বড় বিজয় ছিল। যেকোনো ভাবে হোক আমরা বেরিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছিলাম। বেরোনোর পর আমি বোম্বেতে চলে আসি এবং যেখানে প্রভুপাদ অবস্থান করছিলেন সেই আকাশ গঙ্গা ভবনে গেলাম।
আমি প্রভুপাদ কক্ষে প্রবেশ করতেই প্রভুপাদ তাড়াতাড়ি উঠে গেলেন। আমার কাছে এসে তাঁর বাহুযুগল বাড়িয়ে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে আমাকে আলিঙ্গন করলেন। তিনি আমার সারা অঙ্গে তাঁর হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। যেরকম একজন মাতা যদি ভাবে যে, তার সন্তান আহত হয়েছেন কিনা তখন যেভাবে সন্তান আগলে ধরে প্রভুপাদও ঠিক সেরকম করছিলেন। মা তার সন্তানকে তখনও অক্ষত দেখতে চান।

ভগবানের মতোই

বৃন্দাবনে দু’বছর পূর্বে, দক্ষিণ আমেরিকান বংশোদ্ভূত একজন ভক্ত ব্রহ্মানন্দকে জিজ্ঞেস করলেন, “ব্রহ্মানন্দ, প্রভুপাদের সাথে প্রথম দিকের দিনগুলো ছিল অত্যন্ত অন্তরঙ্গময়, শুধুমাত্র কতিপয় ভক্তদের সাথে অত্যন্ত অন্তরঙ্গময় ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনটি বড় হয়ে উঠে। তো আপনি কি অনুভব করেন যে, প্রভুপাদের সাথে সেই সম্পর্কের মধ্যে কি কোনো পরিবর্তন এসেছে?”
ব্রহ্মানন্দ বললেন, “দেখ, যখন তুমি একজন সন্তান ছিলে, তোমার পিতা তখনো তোমার পিতাই এবং যখন তুমি বড় হয়েছো তখন তোমার পিতাই তখনো তোমার পিতা। এর মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়? প্রভুপাদ ছিলেন আমার গুরুদেব!”
দক্ষিণ আমেরিকান ভক্তটি বললেন, “আমার মনে হয় আপনার কাছে প্রভুপাদ হলেন ভগবান। তখন ব্রহ্মানন্দ বললেন, “ওহ্ না, না, না, না। ১৯৭০ সালের দিকে একবার আমি সেই ভুলটি করেছিলাম। ওহ্ না, প্রভুপাদ ভগবান নয়, প্রভুপাদ হলেন ভগবানের মতোই। তিনি ভগবানের মতোই উত্তম ছিলেন। কিন্তু এই দিনগুলোতে আমার মনে হয় প্রভুপাদ ভগবানের চেয়েও উত্তম। কারণ, তিনি আমেরিকার লোয়ার ইস্ট সাইডে এসে আমাকে রক্ষা করেছিলেন।”
এরপর তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, তখন শ্রোতাদের সবাই সেই আবেগের তরঙ্গ অনুভব করছিল। মুহূর্তেই পুরো আসরটি সম্পূর্ণ নিরব হয়ে পড়ে। (সংক্ষেপণ ও সংকলিত)

কদম্বকানন স্বামী : ১৯৭৮ সালে আমস্টারডামে ইস্‌কনের সাথে যুক্ত হন। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি বৃন্দাবনে বিভিন্ন প্রজেক্টের ব্যবস্থাপনায় ছিলেন। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি মায়াপুরের শ্রীল প্রভুপাদের সমাধি মন্দির নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট হন। এরপর তিন বছরের জন্য তিনি বৃন্দাবনে মন্দির সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত হন এবং পরবর্তী দু’বছর ইউরোপে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার কার্যে সময় অতিবাহিত করেন। ১৯৯৭ সালে সন্ন্যাস দীক্ষায় দীক্ষিত হন এবং বর্তমানে ইস্কনের একজন দীক্ষাগুরু হিসেবে তিনি সুপরিচিত।


 

অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here