বৃহৎ ও ক্ষুদ্র বৃষ্টিপ্রণেতাগণ

0
43

সুরেশ্বর দাস

আমরা যে সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল, সেটি খুব কম ব্যক্তিই উপলব্ধি করে। কৃষক যদি শস্য বিক্রি না করে বরং কসায়খানার জন্য গরু বিক্রি করেও জীবিকা নির্বাহ করে, তবুও তিনি অবগত যে, অন্তত গরুদের মোটা তাজা করার জন্য কতটা জমির দয়ার ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। যেমন পশুখাদ্য স্বরূপ উদ্ভিদ সংগ্রহের পর, খড় তৈরির জন্য প্রখর সূর্যতাপ থাকা অবস্থায় দুই/তিন দিন প্রয়োজন হয় এবং আবার বৃষ্টির প্রয়োজন হয় শস্য উৎপাদনের জন্য যাতে তিনি পুণরায় খড় সংগ্রহ করতে পারেন। এমনকি যদি বৃষ্টি না পড়ে তবে জমিতে সেচ দেয়ার জন্য নদী ও কূপগুলোও শুকিয়ে যাবে।
আমাদের জীবন নিয়মিতই বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। এখন প্রশ্ন হতে পারে, এই বৃষ্টি কিভাবে আসে?
প্রতিটি শিক্ষার্থীই জানে, পৃথিবীর পৃষ্ঠ বিশেষত মহাসাগর থেকে সূর্য জলীয় বাষ্প আকারে জল সংগ্রহের পর তা মেঘে রূপান্তর করে। যখন এই জল ঘনীভূত হয় তখন মেঘ পৃথিবীর ওপর বৃষ্টি বর্ষন করে। মাঝে মাঝে প্রকৃতি সেই জল পর্বতের চূড়ায় তুষার ও বরফ আকারে সঞ্চিত রাখে। পরবর্তীতে বসন্ত, গ্রীস্ম ও শরৎকাল জুড়ে সেগুলো গলতে শুরু করে। সেই জল তখন পর্বত থেকে বড় বড় নদীতে গিয়ে এবং পুণরায় লবণাক্ত মহাসাগরগুলোতে গিয়ে মিলিত হয়। এভাবে বৃষ্টি মহাসাগর থেকে শুরু হয়ে পুণরায় মহাসাগরেই মিলিত হয়। এখন প্রশ্ন হল, তবে সেই মহাসাগর কোত্থেকে এসেছে?
শ্রীল প্রভুপাদ উল্লেখ করেছেন, “বিজ্ঞানীরা বলেন, জল হল হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের সম্মিলন কিন্তু যখন তারা বিশাল বিশাল মহাসাগর দেখে তারা আশ্চর্য হয় যে, কোথা হতে এরকম বিশাল পরিমাণ হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন এসেছে। তারা ভাবে সবকিছু রাসায়নিক উপাদান থেকে উদ্ভুত হয়েছে। কিন্তু এই রাসায়নিক উপাদানসমূহ কোত্থেকে এসেছে? আমরা প্রকৃতপক্ষে দেখি যে, জীব এ রাসায়নিক উপাদানগুলো তৈরি করে। যেমন, একটি লেবু বৃক্ষ অনেক টন সাইট্রিক এসিড তৈরি করে। এক্ষেত্রে সাইট্রিক এসিড এই বৃক্ষের উৎপত্তির কারণ নয়, পক্ষান্তরে সাইট্রিক এসিডের উৎপত্তির কারণ হল সেই বৃক্ষটি। ঠিক তদ্রূপ, পরমেশ্বর ভগবান হলেন সর্বকারণের পরম কারণ। তিনিই হলেন সেই বৃক্ষের উৎপত্তির কারণ, যেটি সাইট্রিক এসিড উৎপাদন করে থাকে। তিনিই হলেন সমস্ত রাসায়নিক উপাদানের উৎপত্তির কারণ।”
প্রকৃতি সম্পর্কে নির্বিশেষ, যান্ত্রিক দর্শনের ওপর ভিত্তি করে জাগতিক বিজ্ঞানিরা অস্বীকার করে যে, বৃষ্টি হল প্রকৃতপক্ষে ভগবানেরই শক্তি। চরমে, তারা বলে, আমরা বৃষ্টি বা অন্য কিছু নিয়ে ঠিক নিশ্চিত নই। চরমে আমরা সবকিছু শোনার পর তাদেরকেই সঠিক বলে মনে করি। অনেক বছর পূর্বে ক্যালিফোর্নিয়ায় এক প্রবল খড়া চলাকালীন সময়ে এক বিজ্ঞান মনস্ক রাজনীতিবিদ প্রস্তাব করেছিল আর্কটিক অঞ্চল থেকে দড়ি বেধে বরফ খণ্ড নিয়ে আসার জন্য। তিনি সেটি বলতে না বলতেই বৃষ্টি আসে। যখন এখানে এসব ঘটছিল আমি তখন সান্তা বারবারাতে জিউস নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করছিলাম। তিনি স্থানীয় আবহাওয়া অফিসে চাকরি করেন। জিউস তখন আমাকে বলেছিল, “মানুষ হল জীন ও পরিবেশের একটি ক্রিয়া। কিন্তু (চুপিচুপি বলছিলেন) মানুষ যতটা জানে তার চেয়েও বেশি নিয়ন্ত্রণ বা আধিপত্য করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা রয়েছে।”
আমি বললাম, “এখন মানুষ আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে যাচ্ছে?” “যাচ্ছে! এইতো গত সপ্তাহেই আমরা ক্যাটালিনার আকাশে কিছু মেঘের বীজ বপন করেছিলাম, আর তাইতো অনেক বৃষ্টি হয়েছিল।” আমি তৎক্ষণাৎ বললাম, “আপনি সেটি থামাতে পারেন না?” জিউস তখন চোখ-মুখ বড় বড় করে তর্জনী তুলতেই শুধু হাঁচি আর হাঁচি দিতে লাগল ।
জিউসের মেঘ-বীজ কৌশলটি হল মেঘের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণে শুষ্ক-বরফ ক্রিস্টাল বা সিলভার আইওডাইড এর ধোঁয়া নির্গমন করা হয়। মেটিয়োরোলোজিস্ট বা আবহাওয়াবিদরা সংঘটিত বন্যাগুলোর জন্য দায়ী করে মহাসাগরের অবিশ্রান্ত স্রোতগুলোকে, আগ্নেয়গিরির ধূলোকে, সূর্যপৃষ্ঠের ওপর দাগ বা আবরণ এমনকি গ্রহমণ্ডলীর শ্রেণীবিন্যাসকে। কিন্তু এই অজুহাতগুলোর উর্ধ্বে সমস্ত ত্রুটি হল আমাদের মধ্যেই। যখন কোন কৃষ্ণভাবনাময় ভক্ত কোন প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগ (খড়া, বন্যা, ভূমিকম্প) দেখেন তখন তিনি আমরা পৃথিবীতে কি করি এবং আকাশে প্রকৃতপক্ষে কি যাচ্ছে তার মধ্যকার সম্বন্ধটির কথা ভাবেন। তিনি অবৈধ যৌন সঙ্গ, নেশা, ভ্রুণহত্যা ও প্রাণী হত্যার মত পাপ কর্মের ফলে প্রকৃতির প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বৈদিক শাস্ত্রের বর্ণনার ধ্যান করেন। তিনি ধ্রুবসত্যের মত শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতায় প্রদত্ত ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাণীকে গ্রহণ করেন যে, অন্ন খেয়ে প্রাণীগণ জীবন ধারণ করে। বৃষ্টি হওয়ার ফলে অন্ন উৎপন্ন হয়। যজ্ঞ অনুষ্ঠান করার ফলে বৃষ্টি উৎপন্ন হয় এবং শাস্ত্রোক্ত কর্ম থেকে যজ্ঞ উৎপন্ন হয় (গীতা-৩/১৪)
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন তাঁর পবিত্র নাম জপই হল সর্বশ্রেষ্ঠ যজ্ঞ (ভগবদ্‌গীতা ১০/২৫), তার শরণাগত হওয়ায় জীবনের পরম লক্ষ্য (ভ.গী ১৮/৬৬)
কৃষ্ণের কৃষকরা জানেন যে, যেহেতু ভগবানই হলেন সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, তাই তিনিই হলেন সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকর্তা। ভগবান বৃষ্টি, সূর্যালোক, চন্দ্রালোক, ভূমি, বায়ু, এমনকি আমাদের জড় শরীরগুলো প্রদান করেছেন যাতে আমরা তার সেবা করতে পারি। যখন আমরা ভগবানকে অগ্রাহ্য করে চোরের মত তার সম্পত্তিগুলো নিজের ইন্দ্রিয় তৃপ্তির উদ্দেশ্যে শোষন করার চেষ্টা করি তখন তাঁর নির্দেশনার অধীন প্রকৃতি বন্যা, খড়া, হারিকেন, টর্নেডোসহ অজস্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসে। কিন্তু এক্ষেত্রে যদিও প্রকৃতি মাতা অত্যন্ত শক্তিশালী, তবুও কৃষ্ণের কৃষকরা তার কোলে নির্ভয়ে শায়িত থেকে বীজ-প্রদানকারী পিতার (ভগবানের) ওপর নির্ভরশীল থাকেন ।
অনেক বছর পূর্বে হায়দ্রাবাদে অবস্থিত একটি হরে কৃষ্ণ ফার্মে শ্রীল প্রভুপাদ তার শিষ্যদের বলেছিলেন যে, তাদের অনেক কূপের প্রয়োজন নেই । তিনি বলেছিলেনন, তাদের শুধু বাদ্যযন্ত্র ও নৃত্য সহকারে উচ্চস্বরে সংকীর্তন করলে চলবে এবং সে সাথে প্রসাদ বিতরণ করলে হবে, তখন পর্যাপ্ত বৃষ্টি বর্ষিত হবে ।
ইস্কনের একজন ভক্ত তেজস দাস এ বিষয়ে মন্তব্য করেন, “একদিন আমরা মহাসংকীর্তন করি ও প্রসাদ বিতরণ করি। প্রথম দিকে আকাশে তখন মেঘ ছিল না, কিন্তু কিছুক্ষণ পর হঠাৎ মেঘের আবির্ভাব ঘটে এবং তখন প্রচুর বৃষ্টি হয়। মন্দিরের পেছনে জলের উৎসগুলো তখন জলরাশিতে পূর্ণ হয়ে উঠে। আমরা তখন অপ্রাকৃত আনন্দ উপভোগ করছিলাম, এবং তখন মন্দির থেকে বেরিয়ে এসে আমরা বৃষ্টির মধ্যেই প্রবল আনন্দের সহিত হরিনাম করছিলাম। ভগবানকে স্মরণ করার অতীন্দ্রিয় শক্তির সেটি ছিল প্রকৃত প্রমাণ।”
জড়বাদীরা অবশ্য বৃষ্টি লাভের এই পারমার্থিক পদ্ধতিটি বিশ্বাস করে না। কিন্তু তারা বিশ্বাস করুক বা না করুক, বিষয়টি হল তারা কখনো বৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তারা হয়তো কৌতুক করতে পারে, কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি ঘটাতে পারে এতটুকুই । যে সমস্ত স্যাটেলাইট, কম্পিউটার ও রাডার তারা ব্যবহার করছে সেগুলোর মাধ্যমে তাড়া বড়জোড় আমাদেরকে এটি বলতে পারে যে, পরবর্তীতে প্রকৃতি কোথায় আমাদের পদাঘাত করতে যাচ্ছে। ন্যাশনাল ওশানিক ও অ্যাটমসফরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের একজন মুখপাত্র একটি মন্তব্য করেছিল যে, “এই বছর প্রকৃতির পদাঘাতটি বেশ কঠিন ছিল।”
প্রকৃতপক্ষে আমরাই আমাদেরকে পদাঘাত করছি। প্রকৃতির সম্পদ শোষণ করতে যেমন আমরা বড় বড় কলকারখানা স্থাপন করছি, যেগুলো থেকে বিশাল পরিমণে দূষিত উপাদান পরিবেশে গিয়ে মিশছে। মাঝে মাঝে সে দূষিত উপাদানগুলো এসিড বৃষ্টি আকারে পতিত হয়ে গাছপালা, ভূমি নষ্ট করে এবং সরোবর ও ঝর্ণার মতো জলউৎসগুলোকে বিষাক্ত করে তোলে ।
অনেক কৃষক নগরের যন্ত্রনির্ভরতার মাধ্যমে শোষিত হওয়ায় ক্রোধান্বিত হতে পারে। একটি কথা আছে, “মূখভর্তি খাদ্য রেখে কখনো কৃষকের প্রতি অভিযোগ তুলবে না।” কিন্তু কৃষকরাও দায়বদ্ধতার উর্ধ্বে নয়। সে ঐ কলকারখানাগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে ট্রাক্টর ও রাসায়নিক সার তৈরি বা ব্যবহার করছে, কেননা তারা তার মাধ্যমে দ্রুত লাভ পেতে পারে। এক্ষেত্রে অবশ্যই ট্রাক্টর ও রাসায়নিক সারগুলোও বৃষ্টি ছাড়া অকেজো। কিন্তু কৃষক যখন বৈজ্ঞানিক প্রগতির নিদর্শনস্বরূপ ট্রাক্টরগুলো চালায় বা এগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তখন তারা ভগবানের ওপর নির্ভরশীলতা সম্পর্কে বিস্মৃত হয়।
সম্প্রতি আমি একটি খামারে গিয়েছিলাম যেখানে বীজ সংরক্ষণ করা হয়। ওখানে একজন লোক কিছু বীজ কিনতে এসেছিল ।
লোকটি জিজ্ঞেস করল, “এই বীজটি জন্মাবে বা বেড়ে উঠবে তার গ্যারান্টি আছে?”
গুদামরক্ষক নিশ্চিত করল যে, “গ্যারান্টি দিচ্ছি, যদি ঈশ্বর পর্যাপ্ত বৃষ্টি প্রদান করেন।” লোকটি তখন বলে উঠল, “তার প্রয়োজনই নেই। আমার তো জল ছিটানোর যন্ত্র রয়েছে। যখন শস্যগুলো গৃহে চলে আসবে, আমি খাওয়ার টেবিলে রেখে দিব, আর তখন ভোজনের জন্য এমনকি ভগবানকেও নিমন্ত্রণ জানাব না।”
গুদামরক্ষক চ্যালেঞ্জ করে বলল, “তো, সূর্য সম্পর্কে কি বলবেন?”
লোকটি পিছু হটে গুদামঘরটি ত্যাগ করতে করতে অনেকটা আত্মবিশ্বাস সহকারেই বলছিল যে, “একদিন বিজ্ঞান নতুন কোন উন্নত সূর্যও আমাদের জন্য তৈরি করবে।”
পুরনো প্রচলিত কথা হল, “প্রত্যেকেই আবহাওয়া নিয়ে কথা বলে, কিন্তু কেউ এ নিয়ে কোন কিছু করে না।” আর কৃষ্ণের কৃষকরা জানেন, এরকম প্রচেষ্টাও নিতান্তই মূর্খতা। তিনি শুধু ভগবানের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে যান আর যা কিছু প্রাপ্ত হয় তা ভগবানের কৃপা হিসেবেই দর্শন করে। বৃষ্টি বা সূর্যের আলো হোক, তিনি সর্বদা ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করেন আর এভাবে শান্তি, সমৃদ্ধি ও তার প্রতি ভালোবাসার ফসল উত্তোলন করেন।


 

অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here