বিশ্ব ধর্মীয় এনসাইক্লোপিডিয়াতে ইস্‌কন সম্পর্কে তথ্য

0
735

 

মাধব দাস: এনসাইক্লোপিডিয়া অব গ্লোবাল রিলিজিয়ন (বিশ্বের সমস্ত ধর্মের উপর নিমিত তথ্য ভাণ্ডার) তাদের অক্টোবরের সংখ্যায় প্রথম প্রচ্চদের দ্বিতীয় শিরোনামে ইসকন, শ্রীল প্রভুপাদ এবং বৈষ্ণব দর্শন সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য ও প্রবন্ধ প্রায় দু’খণ্ডে সবিস্তারে তুলে ধরে।
১৫২৮ পৃষ্ঠা সমন্বিত বিশাল আকারের এই তথ্য ভাণ্ডার সারাবিশ্বে বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি, সমাজ ব্যবস্থা ইত্যাদির বিশদ প্রবন্ধে ধর্মগুলোর ঐতিহ্যগত অবস্থা ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানার আখাঙ্ক্ষা পূরণের সমর্থ হবে এই আশাবাদ করা যায়।
এই তথ্য ভাণ্ডারের সম্পাদকরা হলেন মার্ক জুয়েজেনসামায়ার, ওয়েড ক্লার্ক বুক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্তা বারবারা সহ বহু ধর্মীয় শিক্ষাবিদ এবং সম্মানিত লেখকবৃন্দ। এদের মধ্যে জুয়াজেনসামায়ার ছিলেন দক্ষিণ এশিয়া ও হিন্দু ধর্মীয় শিক্ষা বিশেষজ্ঞ। এই সমস্ত নেতৃস্থানীয় লেখকবৃন্দ সমন্বিতভাবে বিশ্বের সমস্ত ধর্মের উপর এই বিশাল তথ্য ভাণ্ডার নির্মাণ ও প্রকাশ করেন। এদের মধ্যে অন্যতম স্টিভেন জেরোসন যিনি প্রভুপাদের শিষ্য। যার দীক্ষিত নাম সত্যরাজ দাস এবং তিনি প্রায় ঊনত্রিশটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে The Hidden Glory of India & Krishnas Song : A New look of Bhagavad Gita  অন্যতম। সত্যরাজ দাস ইস্‌কন, প্রভুপাদ ও বৈষ্ণবীয় দর্শন সম্পর্কে এই তথ্য ভাণ্ডারে কিছু উপস্থাপন করার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন দুটি কারণে। প্রথমত তিনি একজন বৈষ্ণব ধর্মীয় শিক্ষাবিদ হিসেবে যথেষ্ট পরিচিতি লাভ করেছিলেন। যেটি প্রায় বিশ বছর ধরে বিভিন্ন পত্রিকায় বৈষ্ণব দর্শন সম্পর্কে প্রবন্ধ উপস্থাপন করার কারণে সম্ভব হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, যেহেতু তিনি বৈষ্ণব দর্শনের উপর সাধারণ কোন শিক্ষাবিদ ছিলেন না। উপরন্তু তিনি প্রভুপাদের শিষ্য হওয়ায় তিনি বৈষ্ণব দর্শনের অনুশীলনকারীও বটে। ফলে তিনি শুধু এই বিষয়ে বিদগ্ধ ছিলেন না তা হৃদয়েও ধারণ করেছেন সুতরাং এই ক্ষেত্রে অন্য যে কোন অনুশীলনকারী বিদগ্ধ পন্ডিতের চেয়ে তিনি তুলনামূলক সংবেদনশীল। সত্যরাজ দাস বলেন,-শুধুমাত্র ১টি কারণে আমি উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করি এবং বৈষ্ণব শিক্ষার উপর বিভিন্ন প্রবন্ধ উপস্থাপন করি কেননা আমি দেখেছি ইস্‌কন এবং বৈষ্ণব দর্শন সম্পর্কে ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃত যেভাবেই হোক প্রচুর পরিমাণ ভুল তথ্য ও ভ্রান্ত ধারণা সমাজে প্রচলিত রয়েছে এবং প্রচার করা হচ্ছে। এর উৎসগত তথ্য বা ভারতে এর প্রাচীন ঐতিহ্যগত ভিত্তি সম্পর্কে কোন তথ্য প্রদান ব্যতীত অনেকেই একে নতুন ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে অভিহিত করছেন। যদিও ইস্‌কন এমন কোন সংস্থা নয়। তাই গ্লোবাল এনসাইক্লোপিডিয়া অব রিলিজিয়ন এর প্রবন্ধে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ইস্‌কনের প্রামাণিক ভিত্তি সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়েছে। ইস্্কন হচ্ছে কৃষ্ণভক্তদের ১টি বিশ্ব পরিব্যাপ্ত সংস্থা। যেটি সনাতন ধর্মীয় সংস্থার ১টি অতি প্রয়োজনীয় জ্ঞান যার উৎসমূল হচ্ছে গৌড়িয় বৈষ্ণব ঐতিহ্য। যা গৌড়িয় বৈষ্ণবদের অপরিহার্য নীতি গুরুশিষ্য পরম্পরার দ্বারা প্রবাহিত হয়। প্রভুপাদ এই পরম্পরা প্রাপ্ত হয়েছিলেন তার আচার্য ভক্তিসদ্ধিান্ত সরস্বতী ঠাকুরের কাছ থেকে। ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর হচ্ছেন বিখ্যাত বিদগ্ধ পন্ডিত এবং বিখ্যাত পরিব্রাজক সন্ন্যাসী যিনি ইস্‌কন প্রতিষ্ঠার বহু পূর্বে ইস্‌কনের মতই কৃষ্ণভক্তের সংগঠন গৌড়িয় মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। তার শিক্ষকের নিকট থেকে প্রাপ্ত আদেশের ভিত্তিতে প্রভুপাদ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার এবং ইস্‌কন প্রতিষ্ঠা করেন। উক্ত প্রবেন্ধ আরেকটি ভুল তথ্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। তা হল ইস্‌কন হচ্ছে হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন। সনাতন ধর্মের জ্ঞান অনুসারে প্রভুপাদ ১টি বৈশ্বিক সংগঠন হিসেবে ইস্‌কন প্রতিষ্ঠা করেন। সনাতন একটি প্রাচীন ধর্ম যেটি ঈশ্বরের সাথে চিন্ময় আত্মার সম্পর্ক বিষয়ক জ্ঞানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। প্রভুপাদ এটিকে হিন্দুত্ববাদের একটি অংশ বলে কখনো বলেননি। ইস্‌কন সেই শিক্ষা দেয় যা প্রভুপাদ দিয়ে গেছেন। প্রভুপাদ বলেছেন কৃষ্ণভাবনামৃত হচ্ছে ঈশ্বর ভাবনার বিজ্ঞান। অন্য কথায় এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেটি সাধারণ ধর্মীয় পরিচায়ক বৈশিষ্টগুলো এড়িয়ে তার চেয়েও উন্নততর আদর্শ প্রচার করছে। যেমন- হিন্দু, জরক্রষ্ট, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, অথবা মুসলিম ধর্ম শিক্ষা দেয়, সত্য মেনে চল, মিথ্যা পরিহার কর, ইত্যাদি সাধারণ বাণী দ্বারা একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু ইসকন শুধু এই নীতিশিক্ষা সমূহ নয় বরং সেইসাথে আত্মার কর্তব্য ও ঈশ্বরের সাথে তার মাধুর্যময় সম্পর্কের কথাও তাদের মধ্যে প্রচার করছে। অপর দিকেও অনেক সময় ইস্‌কনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল প্রভুপাদকে কখনো কখনো তথ্যবিকৃতির মাধ্যমে ভুলভাবে পরিচিত করা হচ্ছে। যেমন-১টি প্রবন্ধে প্রভুপাদকে একজন ঔষধ বিক্রেতা হিসেবে পরিচয় দেয়। সত্যরাজ প্রভু প্রশ্ন করেন যখন আপনি প্রভুপাদকে পরিচয় দিতে যাবেন তখন আপনি সাধারণভাবে প্রভুপাদকে একজন ‘বিশুদ্ধ ভক্ত’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকবেন। কিন্তু এতে কি সবকিছুই বলা হল। সাধারণ লোকেরা এর দ্বারা কিছুই বুঝবে না। সেজন্য আমি এই তথ্য দিতে চেয়েছি যে, কেন তিনি এনসাইক্লোপিডিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাই অত্যন্ত সুনিপুনতার সাথে আমি ঐ প্রবন্ধে প্রভুপাদের অবদানগুলো লিপিবদ্ধ করে দিয়েছি যাতে করে তা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়। বিশুদ্ধ ভক্ত বলার পরিবর্তে সত্যরাজ ‘অভয়চরণ দে’ শব্দটি ব্যবহার করেন এবং স্কটিশ চার্চ কলেজে লেখাপড়া করেন। যদিও তিনি খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত বিদ্যাপীটে পড়ালেখা করেন। তবুও বৈষ্ণব পরিবারে বেড়ে ওঠা প্রভুপাদ কখনো এক মুহুর্তের জন্যও কৃষ্ণবিস্মৃত হননি। অন্যদিকে এই প্রবন্ধে প্রভুপাদের অবদানগুলো সবিস্তারে লিপিবদ্ধ করা হয়। যাতে সকলের কাছে তা গ্রহণযোগ্যতা পায়। বার বছর ধরে অপ্রকট হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রভুপাদ ছয় মহাদেশেরই বিভিন্ন দেশে প্রবচন, গুরুকুল, মন্দির, ফার্ম কমিউনিটি ইত্যাদির প্রতিষ্ঠার জন্য ১৪ বার পৃথিবী পদক্ষিণ করেন। তিনি ভক্তিবেদান্ত বুক ট্রাস্ট গঠন করেন যেটি সনাতন কৃষ্টি ও শিক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রকাশনা সংস্থা হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া তিনি ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় ২০০০ একর জমির উপর নব বৃন্দাবন নামে ফার্ম কমিউনিটি প্রতিষ্ঠা করেন। বৈদান্তিক দর্শন, বৈষ্ণব দর্শন, শিক্ষা সংস্কৃতির উপর তিনি ৬০ টির অধিক গ্রন্থ প্রকাশ করেন যা পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় মুদ্রিত হয়ে লক্ষ লক্ষ পাঠকের কাছে পৌঁছে গেছে, এবং উত্তরোত্তর জ্যামিতিক হারে এর চাহিদা বাড়ছে। এ ছাড়াও তিনি শত শত স্কুল, কলেজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ফার্ম কমিউনিটি প্রতিষ্ঠা করেন। বৈষ্ণব দর্শন অনুসারি কত রয়েছে প্রশ্নটি বহু ঈশ্বর অথবা নিরাকারবাদ তত্ত্ব সম্পর্কিত বহু ভ্রান্ত তত্ত্ব সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দেয়। সাধারণভাবে বৈষ্ণব দর্শন আদর্শগতভাবে সনাতন ধর্মের ঈশ্বর বিষ্ণুকে (অথবা তার অবতার) পরমেশ্বর হিসেবে গ্রহনের মাধ্যমে স্বীকৃত। এটি একেশ্বরবাদ আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত যেখানে অন্যান্য সত্ত্বা সমূহকে তার অধীনস্থ বা দাস রূপে স্বীকৃত এমনকি তার একেকটি শক্তির প্রতিনিধিত্বকারী দেবতাদেরও তার দাস হিসেবে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। বৈষ্ণব দর্শনমতে দাবি করা হয় তাদের লক্ষ লক্ষ অনুগত রয়েছে যদিও ভারতে এর অনুশীলনকারী সংখ্যা বেশি। কিভাবে অনুশীলনকারী তার হৃদয়ে পারমার্থিকতা সম্পর্কে বুঝতে পারে। সত্যরাজ লিখেন “ভক্তিযোগে ১টি রহস্যময় পথ যার মাধ্যমে যে ঈশ্বরের সাথে আন্তব্যক্তিক সম্পর্কে গভীর প্রবেশ করে। এখানে সমস্ত ধার্মিক ক্রিয়াকলাপগুলি অতিন্দ্রিয়, এখানে জ্ঞানের চর্চা হয়। সাথে সাথে বিভিন্ন রহস্যময় ক্রিয়াদিও ঘটে। যেমন-যোগ, ধ্যান এই ভক্তিযোাগের বিজ্ঞান সম্পর্কে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ সমূহে বিশদ বর্ণনা রয়েছে যেমন-গীতা ও ভাগবত পুরান। কিন্তু তা আরো ভালোভাবে অবগত হতে হলে শুদ্ধ ভক্তের সঙ্গ করতে হবে। যে ভক্ত তার হৃদয়ে কৃষ্ণকে ধারণ করেছেন। নিয়মিতভাবে কীর্তন ও ভজনের মাধ্যমে ভক্তিপথের অনুশীলন করতে হবে। নিয়মিত মালা জপ করতে হবে এবং শ্রীকৃষ্ণকে নিবেদিত প্রসাদ আস্বাদন করতে হবে এবং তার বিগ্রহ বা চিত্রপটের নিয়মিত সেবা অর্চনা করতে হবে। ঐ প্রবন্ধে সত্যরাজ অবশেষে একটি হৃদয়স্পর্শী সারাংশ লিপিবদ্ধ করেন। “ঈশ্বরের প্রতি ঐকান্তিক ভালবাসা লাভ করা হচ্ছে সমস্ত পারমার্থিক যাত্রার চূড়ান্ত ফল। এই ভাবনাটিই হল বৈষ্ণব দর্শনের মূল ভিত্তি।” এ সম্পর্কে আরো বিশদ জানতে লগ অন করুন। www.sagepub.com/ books/ book225428 হরে কৃষ্ণ

(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ ২০১২ সালে জানুয়ারি প্রকাশিত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here