বিশ্ব গ্রন্থে শ্রীল প্রভুপাদ

0
23

বিশ্ব স্কলার্সরা শ্রীল প্রভুপাদকে সমসাময়িক মহান পারমার্থিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন

সত্যরাজ দাস

প্রত্যেকেই একজন ব্যক্তির জন্য তার প্রাপ্য ভাল বা মন্দ জিনিস দেখতে পছন্দ করে। যেমন, একটি মুভি বা নাটকে যখন একজন মন্দ লোক তার প্রাপ্য শাস্তি পায় তখন সবাই আনন্দিত হয়। আবার যখন একজন নায়ক বিজয়ী হয় তখন আমরা ভাল অনুভব করি। এর কারণ এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিভিন্ন ছন্দ এবং কারণ থেকে আমরা তা শিক্ষা লাভ করি। অন্য কথায়, আমাদের বিচার করার ইন্দ্রিয় নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের মতই অতি প্রাকৃতিক।
এই যদি হয় তবে, এটি অবাকের কিছু নয় যখন আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা ও আচার্য শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর অবিস্মরনীয় অবদানের জন্য সবার কাছে পরিচিতি লাভ করেন, তখন ভক্তরাও আনন্দিত হন। উদাহরণস্বরূপ ১৯৭৬ সালে, The Encyclopedia Britannica Book of the year এ প্রভুপাদ সম্পর্কে বলা হয়েছে, “১৯৬৮ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এই সময়ের মধ্যে প্রাচীন বৈদিক সংস্কৃতির ওপর ৫২টি গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ করে প্রভুপাদ সারাবিশ্বের প্রাতিষ্ঠানিক ও সাহিত্যমনা গোষ্ঠিগুলোকে অবাক করে দিয়েছেন।”
১৯৯২ সালে Who’s who of world religions একটি গ্রন্থ বের হয়েছিল যার সম্পাদনা করেছিলেন জন আর হিনেলস্। সেই গ্রন্থটি সারাবিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্স গ্রন্থ ‘হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং শীঘ্রই প্রাতিষ্ঠানিক লাইব্রেরি গুলোতেও গুরুত্বপূর্ণ সহায়িকা গ্রন্থ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
এনসাইক্লোপেডিয়ার মতোই এই গ্রন্থটি সারাবিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একটি তালিকা প্রকাশ করে। সেই গ্রন্থে ৩২৯ পৃষ্ঠায় শ্রীল প্রভুপাদকে নিয়ে প্রশংসাসূচক বিস্তৃত তথ্য দে হয়। অন্যান্যদের জন্য যেখানে মাত্র অর্ধেক কলামেই বর্ণনা শেষ হয়ে গেছে, সেখানে প্রভুপাদকে নিয়ে দেড় পৃষ্ঠা বর্ণনা দেওয়া হয়। গ্রন্থটিতে ঐতিহাসিক কিছু তথ্য তুলে ধরা হয়, যার অধিকাংশই ছিল নির্ভুল এবং অন্যান্য কৃষ্ণভাবনার নিদর্শন সম্পর্কেও কিছু তথ্য তুলে ধরা হয়। গ্রন্থটিতে স্থান পায় আনন্দ তীর্থ (মাধব), ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুর, চৈতন্য, গৌড়িয়, হরেকৃষ্ণ, ইসকন, জয়দেব, কৃষ্ণদাস কবিরাজ, রামানুজ, রূপ গোস্বামী এবং বল্লভ।
২০০২ সালে আরেক ব্যাপক জনপ্রিয় গ্রন্থ বের হয় যার নাম Spiritual innovators : Seventy-five extraordinary people who changed the world in the past century । যার সম্পাদনা করেন ইরা রিফকিন আর প্রকাশক হল স্কাই লাইট পাহাস্। এই গ্রন্থটি বেস্ট সেলার গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং সারাবিশ্বের ধর্মীয় স্কলার্সদের কাছে থেকে বেশ সাধুবাদ অর্জন সাধুবাদ অর্জন করে। সেই গ্রন্থটি শ্রীল প্রভুপাদকে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। গ্রন্থটি বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত। যেমন : They made intellect a spiritual force, They brought the traditions together, They spoke from the power of silence. They shook thing up. যার ভাবার্থ সবকিছুকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।”
এটি ঠিক অবশ্যই এ সমস্ত গ্রন্থগুলো বিশ্বের ধর্মের ইতিহাসে শ্রীল প্রভুপাদের প্রকৃত অবস্থান পূর্ণাঙ্গভাবে চিনতে অসমর্থ। তাঁর অপরিসীম অবদান সে সমস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে তুলনীয় যাঁরা একসময় পৃথিবীতে পারমার্থিক বিজয় নিয়ে এসেছিলেন। ভগবান বুদ্ধ মারা অসুরকে বিনাশ করেছিলেন, যীশু খ্রীস্ট শয়তানের বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন, শ্রীকৃষ্ণ ধর্মের বিরোধী অসুরদের নিধন করেছিলেন। যাদের মধ্যে ছিল পুতনা, কেশী, অঘাসুর, বকাসুর, কংস। প্রভুপাদের অর্জনও তাঁদের মতোই। তিনি অনেক মানুষের হৃদয় থেকে বলপূর্বক মায়াকে অপসারণ করেছিলেন। তাঁর শিক্ষা ও দৃষ্টান্তের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন পরিবর্তন হয়ে গেছে।
শ্রীল প্রভুপাদকে গৌড়িয় বৈষ্ণব ধর্মের আধুনিক দূত হিসেবে, বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম সনাতন ধর্মের শিক্ষক হিসেবে, কিংবা সমস্ত ধর্মের অসাম্প্রদায়িক প্রকৃত সত্য উন্মোচনের ক্ষেত্রে বিংশ শতাব্দির প্রধান পারমার্থিক অগ্রদূত হিসেবে চিনতে অনেক অধ্যয়ন ও বিনয় থাকা প্রয়োজন ৷
আধুনিক ইতিহাসবিদ এবং ধর্ম বিষয়ক স্কলার্সরা প্রকৃত সত্যের বাহক হিসেবে শ্রীল প্রভুপাদের অদ্বিতীয় অবস্থানকে চিনতে অসমর্থ। কীভাবে তারা পারবে? এজন্যে হরে কৃষ্ণ জপকীর্তন এবং বিশ্বাসের সাথে ভক্তদের সঙ্গ করার মাধ্যমে কৃষ্ণভাবনা অনুশীলন করলে তবেই শ্রীল প্রভুপাদের অদ্বিতীয় অবস্থান সম্পর্কে হৃদয়ঙ্গম হবে। অন্যথা তাদের কাছে শ্রীল প্রভুপাদ শুধুমাত্র অনেকের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবেই রয়ে যাবে। আমি সাধুবাদ জানাই সে সমস্ত ধর্মীয় স্কলার্স্দের যারা তাদের গ্রন্থে শ্রীল প্রভুপাদের নাম ও তাঁর মিশন সম্পর্কে তুলে ধরেছেন। আমি লেখকদেরকে এবং গ্রন্থগুলোর পাঠকদের কাছে অনুরোধ করবো যাতে তারা সবকিছু গভীরভাবে দর্শন করে এবং সতর্কতা সহকারে শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ অধ্যয়ন করে। সে সাথে তিনি যে চৈতন্য মহাপ্রভুর সংস্কৃতি অনুশীলনের পন্থা নিয়ে এসেছিলেন তা অনুশীলন করা উচিত। যাদের মধ্যে প্রধান হল এই মন্ত্রটি জপ কীর্তন করা: হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।
শ্রীল প্রভুপাদের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে সত্যিকার উপলব্ধির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক অনুশীলন নয় বরং পারমার্থিক অনুসন্ধানী হতে হবে। এক্ষেত্রে প্রভুপাদকে বিংশ শতাব্দির একজন বিশিষ্ট মহাত্মা ও স্কলার্স আধুনিক বিশ্বের রক্ষাকারী হিসেবে দেখতে পারেন। তাঁর প্রকৃত অবস্থানকে চিনতে পারলে কেউ তার প্রকৃত পরিচয়, যে আত্মা সেটিকে চিনতে পারবে। আর তারো উর্ধ্বে কেউ যদি শ্রীল প্রভুপাদকে চিনতে পারে তবে সে কৃষ্ণকে চিনতে পারবে, যিনি হলেন পরমেশ্বর ভগবান এবং তিনি আমাদের নিত্য আলয় চিন্ময় ধামে প্রবেশের অনুমতি দেন।


সত্যরাজ দাস শ্রীল প্রভুপাদের শিষ্য এবং ব্যাক টু গডহেডের একজন নিয়মিত লেখক। তিনি কৃষ্ণভাবনার ওপর ২০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং Holy war : Violence and the Bhagavad Gita নামক গ্রন্থের সম্পাদক। তিনি নিউইয়র্ক শহরের নিকটেই তাঁর পত্নী ও কন্যাকে নিয়ে বাস করেন। 


 
 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, এপ্রিল – জুন ২০১৪

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here