বিশ্বের সর্ববৃহৎ জনসমাগম কুম্ভমেলা

0
1286

১.৫ কোটি ভক্ত মেলার প্রথম দিন এলাহাবাদে গঙ্গা ও যমুনা নদীর মিলনস্থলে পুন্যস্নান করেছে।
৩ কোটি পুন্যার্থী ১০ ফেব্রুয়ারি মাউনি অমাবস্যার দিন মেলায় যোগ দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে ১৫ ফেব্রুয়ারি বসন্ত পঞ্চমীতে মেলায় যোগ দেবে আরো দুই কোটি পুন্যার্থী।
৭,০০০ আধা সামরিক বাহিনীর সাত হাজার সেনা পুণ্যার্থীদের সেবায় নিয়োজিত থাকবে।
৩৫,০০০ টয়লেট, ১৪টি মেডিকেল সেন্টার, ২২ হাজার সড়কবাতি, ৭৫০টি ট্রেন, ১৫০ কিলোমিটার অস্থায়ী সড়ক, ১৮টি সেতু স্থাপন করা হয়েছে।

“কুম্ভমেলা হল সৎসঙ্গ। যদি তুমি কুম্ভমেলায় গিয়ে জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ একজন মানুষকেও পাও তাহলে তোমার কুম্ভমেলায় গমন সার্থক । অন্যথায় যদ বুদ্ধি সলিলে চ এব গো খরাঃ (শ্রীমদ্ভাগবত)। যদি কেউ ভাবে যে সলিল অর্থাৎ শুধুমাত্র জলে স্থান করার নামই কুম্ভমেলা তবে সে গোখর। কিন্তু প্রকৃত বিষয়টি হল যে এখানে কতশত সাধু মহাত্মাদের অবস্থান। তাহলে তাদের কাছ থেকে আমরা তত্ত্বজ্ঞান লাভের সুযোগ গ্রহণ করি। এটিই হল বুদ্ধিমত্তা।” শ্রীল প্রভুপাদ
‘কুম্ভ’ মানে ‘পাত্র’। অমৃতের পাত্র কিভাবে এই অমৃত পৃথিবীতে এল সেই সম্পর্কে একটি পৌরাণিক কাহিনি রয়েছে। শ্রীমদ্ভাগবত মতে বহুকাল পূর্বে দেবতা এবং অসুরদের মধ্যে আধিপত্য লাভের জন্য ব্যাপক যুদ্ধ সাধিত হয়েছিল। দেব অধিপতি ছিলেন ইন্দ্র এবং অসুরদের অধিপতি ছিলেন হিরণ্যকশিপুর বংশধর বলি মহারাজ। ইন্দ্র দুর্বাসা মুনি কর্তৃক অভিশাপ প্রাপ্ত হয়েছিলেন তাই দেবগণ শ্রীহীন হয়ে যশ, ঐশ্বর্য হারান। এসুযোগে অসুরগণ সহজেই দেবতাদের যুদ্ধে হারিয়ে দেবরাজ্য দখল করেন। দেবতাগণ সকলে মিলে ভগবান বিষ্ণুর কাছে গিয়ে প্রার্থনা জানান। ভগবান বিষ্ণু দেবতাদের প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবতাদের বললেন অসুরদের সাথে যুদ্ধবিরতি করার জন্য। ভগবান নির্দেশ দিলেন দেবতা এবং অসুর উভয়ে সমুদ্র মন্থনের মাধ্যমে অমৃত লাভে একসাথে কাজ করতে এবং এর মাধ্যমে সেখান থেকে উত্থিত অমৃত দেবতা এবং অসুরদের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে ভগবান বিষ্ণু চাতুর্যের মাধ্যমে অসুরদের ঠকাতে চাইলেন কেননা অসুরগণ অমৃত লাভ করলে তারা সমগ্র জগতে পাপাচারে লিপ্ত হয়ে বিভিন্ন অপকর্ম সাধন করতে থাকবে। ভগবদগীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন যে, দুই ধরনের মানুষ রয়েছে-দেব স্বভাবের এবং অসুর স্বভাবের । এ প্রসঙ্গে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন যে, যাঁরা শাস্ত্রানুসারে ভগবান এবং ভগবানের প্রতিনিধিদের পথ অনুসরণ করে তারা দেব স্বভাবের এবং অসুর স্বভাবের লোকেরা ভগবানকে বাদ দিয়ে নিজেদের ইন্দ্রিয় তৃপ্তিতে মগ্ন থাকে। ভগবান বিষ্ণুর নির্দেশেনা মতে দেবতা এবং অসুরগণ দুগ্ধসমুদ্রে গমন করেন। ভগবানের নির্দেশে গরুড়দেব তার পিঠে মন্দর পবর্ত বহন করে এনে সমুদ্রের মাঝখানে নিক্ষেপ করেন। এই পবর্তকে মন্থন দণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হবে। দেবতাদের অনুরোধে গরুড়দেবকে প্রস্থান করতে বলা হয়। কেননা তখন নাগরাজ বাসুকী সেখানে আগমন করতে যাচ্ছেন। সমুদ্র মন্থনের দড়ি হিসেবে বাসুকী নাগকে ব্যবহার করা হবে। অসুরগণ বাসুকী নাগের মুখের অংশ ধরেন এবং ভগবান বিষ্ণুর উৎসাহে দেবগণ লেজের অংশ ধরেন। এরপর মন্থন শুরু হল। বাসুকীর মুখ হতে আগুন, ধোয়া নির্গত হচ্ছিল যাতে অসুররা ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিল। যখন মন্থন হচ্ছিল তখন বিশাল মন্দর পর্বত ডুবে যাচ্ছিল, তখন ভগবান বিষ্ণু কূর্ম অবতার রূপ ধারণ করে তাঁর পিঠে মন্থন পর্বত ধারণ করলেন। শ্রীমদ্ভাগবত মতে বিশাল মন্দর পর্বতের ঝাকুনীও ভগবানের দেহে সামান্যই অনুভূত হচ্ছিল।


মন্থনের শুরুতে বিষ উত্থিত হয়, যা দেবগণের প্রার্থনায় শিব গ্রহণ করেন। এরপর বিভিন্ন ঐশ্বর্যময় বস্তুর আবির্ভাব ঘটতে লাগল। প্রথমে সুরভী গাভীর আবির্ভাব হল, যা বিভিন্ন মুনীগণ গ্রহণ করেন। এরপর উস্বর্ভ নামক ঘোড়া আবির্ভূত হলে তা বলি মহারাজ গ্রহণ করেন। এরপর ঐরাবত আবির্ভূত হয় এবং ইন্দ্র তা গ্রহণ করেন এরপর কৌস্তব মণি উত্থিত হয় যা ভগবান বিষ্ণু গলায় পরিধান করেন। পারিজাত বৃক্ষ উত্থিতহয় যা দেবগণ গ্রহণ করেন। এরপর বিভিন্ন অপ্সরা উত্থিত হয় যা অসুরগণ গ্রহণ করেন।

 

একসময় ধনন্তরী অমৃত পাত্র হাতে উঠে আসেন। অসুরগণ এবং দেবগণ তখন অমৃত পানে দ্বন্দে লিপ্ত হয়। সেই সময় কয়েক ফোটা অমৃত পতিত হয়ে পৃথিবীর চারটি স্থানে পতিত হয়। সেগুলো হল মহারাষ্ট্রের নাসিক, মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়নী, হরিদ্বার এবং এলাহাবাদে মন্থন স্বর্গের সময়ে প্রায় ১২দিন চলেছিল। স্বর্গের ১দিন পৃথিবীর এক বছরের সমান। তাই সেই অমৃত পতনের দিনকে উদযাপন করার জন্য প্রতি ১২ বছর পর পর এই চার স্থানে কুম্ভমেলা উদযাপিত হয়।
কুম্ভমেলার প্রকারভেদঃ
১. সাধারণ কুম্ভ: প্রতি তিন বছর পর পর অনুষ্ঠিত হয়।
২. অর্ধ কুম্ভ: প্রতি ৬বছর পর পর অনুষ্ঠিত হয়।
৩. কুম্ভ: পতি ১২বছর পর পর অনুষ্ঠিত হয়।
৪. মহা কুম্ভ: প্রতি ১৪৪ বছর পর পর অনুষ্ঠিত হয়।
কুম্ভমেলার স্থান:
৪টি তীর্থস্থানে কুম্ভমেলার স্থান সম্পন্ন করা হয়। যথা:
১. এলাহাবাদ (প্রয়াগ): গঙ্গা, যমুনা এবং সরস্ততী নদীর সঙ্গম স্থান।
২. হরিদ্বার: গঙ্গা নদীর তীরে
৩. নাসিক: ১৪ টি স্থানক্ষেত্র রয়েছে। বৈষ্ণবগণ গোদাবরীর সন্নিকটে রামকুণ্ডতে স্থান করেন এবং শৈবগণ ত্রিমম্বকাশ্বরে স্থান করে।
৪. উজ্জয়নী: শিপ্রা নদীর তীরে।

 

কুম্ভমেলায় কখন স্নান করতে হয় ?

কুম্ভমেলার বিশেষ শুভদিনগুলোতে গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, কৃষ্ণা ও কাবেরী নদীতে স্নান করলে অশেষ পূণ্য অর্জিত হয়।
মকর সংক্রান্তি: এটি হিন্দুদের একটি পবিত্র দিন। এই দিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্র্যন্ত ¯œান করা যায়।
পৌষ পূর্ণিমা : পৌষ মাসের পূর্ণ চন্দ্রতে অর্থাৎ পূর্ণিমায় এই বিশেষ ¯œান অনুষ্ঠিত হয়। এটি শীতকালের শেষ পূর্ণিমা।
মৌনি অমাবশ্যা স্নান : সাধু সন্তদের জন্য বিশেষায়িত এই স্নান দিবস। এই দিনে প্রায় ৫ কোটির উপর মানুষ স্নান করে থাকে।
বসন্ত পঞ্চমী স্নান : বসন্তের পঞ্চম দিনে এই স্নান শুরু হয়। এই দিনে সাধারণত মানুষ হলুদ কাপড় পরিধান করে থাকে।
রথ সপ্তমী স্নান : মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের ৭ম দিনে (জানুয়ারি/ ফেব্রুয়ারি ) এই রথ সপ্তমী উদযাপন করা হয়। এই দিন বিশেষত রথে ধাবমান সূর্যদেবের উদ্দেশ্য স্তুতি জ্ঞাপন করা হয়।
ভীষ্ম একাদশী স্নান : ভীষ্ম একাদশী দিনের বিশেষ স্নান । এই দিনে ভীষ্মদেব পাণ্ডবদের কাছে বিষ্ণুস্মরণম স্তোত্র বর্ণনা করেছিলেন। এই দিনে কুরু পিতামহ ভীষ্মদেব পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মহত্ব বর্ণনা করেন পাণ্ডবদের কাছে। তাই এই দিনটি অত্যন্ত পবিত্র।

মহাকুম্ভ মেলা

এলাহাবাদে প্রতি ১২ বছর পর পর কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এটি প্রতি ১২ বছর পর পর অন্য তিনটি স্থানে ও অনুষ্ঠিত হয়- হরিদ্বার, উজ্জয়নী এবং নাসিক। বৃহস্পতি এবং সূর্যের অবস্থান ও প্রকৃতি অনুসারে কুম্ভমেলা সময় নির্ধারণ করা হয়। প্রয়াগে (এলাহাবাদ) কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হয় জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারিতে যখন বৃহস্পতির অবস্থান হয় বৃষতে এবং মকরে প্রবেশ করে। এই আকর্ষণীয় সমাগমক্ষেত্রে ১৫ লক্ষ মানুষ অংশগ্রহণ করে এবং এটি পৃথিবীর বৃহত্তম লোকসমাগম অনুষ্ঠিান।
বিশেষ মহাকুম্ভ মেলা এর দিনে সমগ্র শহরটিই একটি অস্থায়ী ভিন্নতর শহরে পরিণত হয়। যোগী, সাধু –সন্ত এবং তীর্থযাত্রীদের পদচারণায় মুখরিত হয় চারদিক। অনেকেই খুবই প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এখানে আসেন যেমন হিমালয়ের গুহা থেকে। তাঁদের মধ্যে বিখ্যাত হলেন উলঙ্গ নাগা বাবারা।
শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে কেউ যদি কুম্ভমেলায় গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতী নদীর সঙ্গম অঞলে মহাকুম্ভ মেলা করে তবে সে মুক্তি লাভ করে। প্রধান স্নানের সময়কে বলা হয় শাহী মহাকুম্ভ মেলা বা রয়েল বেথ।
২০১৩ সালে কুম্ভমেলা:
এই বছর মহাকুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হয় প্রয়াগ তীর্থে তথা বর্তমান এলাহাবাদে। গত ১৪ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই কুম্ভমলো চলবে। প্রয়াগতীর্থে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান হল ত্রিবেণী সঙ্গণী সঙ্গম। এছাড়া রয়েছে দশমেধ ঘাট যেখানে ব্রহ্মা সত্যযুগে অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন। এছাড়া ৫০০বছর পূর্বে ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু এই ঘাটে শ্রীল রূপ গোস্বামীকে দীক্ষা প্রদান করেছিলেন। এছাড়াও ভগবান রামচন্দ্র এখানের অক্ষয় বটে এবং ভরদ্বাজ আশ্রমে কিছুকাল অতিবাহিত করেন। এছাড়া প্রয়াগক্ষেত্রের মূল বিগ্রহ হলেন শ্রী শ্রী বেণীমাধ। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এখানে ১৫ দিন অতিবাহিত করেন। এছাড়াও প্রয়াগে ছিল শ্রীল প্রভুপাদের বাসস্থান এবং তাঁর গৃহস্থ জীবনের মেডিসিন দোকান ছিল। যাঁর নাম ‘প্রয়াগ ফার্মেসী’। এছাড়াও প্রয়াগ শ্রীল প্রভুপাদের দীক্ষা ভূমি। তিনি এখানে ১৩ বছর যাবৎ কৃষ্ণভক্তি সাধনে নিমগ্ন ছিলেন।
শ্রীল প্রভুপাদ কথা:
১৯৭৭ সালে কুম্ভমেলার সময় শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর শিষ্যদের বললেন যে তিনি ত্রিবেণীতে স্নান করতে চান, কিন্তু তিনি এত বৃহৎ জনসমাগমে যেতে চান না। তাই তিনি ভক্তদের বললেন বিশেষ সময়ে সেই তীর্থের জল নিয়ে আসতে , যাতে তিনি পরবর্তী দিন স্নান করতে পারেন। দুইজন ভক্ত ত্রিবেণী গিয়ে জল নিয়ে এলেন। পরবর্তী দিন শ্রীল প্রভুপাদ প্রাতে সকলকে দর্শন দিলে সকলে উৎসুক হলেন তাঁর মন্তব্য জানার জন্য। তিনি ব্যাখ্যা করলেন, লক্ষ লক্ষ লোক কুম্ভমেলার সময় ত্রিবেণীতে গিয়ে স্নান করে পুণ্য অর্জন করতে পারে, কিন্তু পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে কৃষ্ণের প্রতি সম্পাদিত যেকোন ধরণের সেবা আরো অধিক মাহাত্ম্যপূর্ণ। শ্রীল প্রভ পাদ কুম্ভমেলার সময় ঠাণ্ডা বরফশীতল জলেও স্নান করে তাঁর শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন যেকোন পরিস্থিতিতেও মঙ্গল আরতিতে যোগদান হতে বিরত হওয়া উচিত নয়। কুম্ভমেলায় ভক্তগণ অংশগ্রহণ করেন শুধুমাত্র বহু পতিত জীবদের মধ্যে কৃষ্ণভাবনা বিতরণ করার জন্য । হরে কৃষ্ণ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here