বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে বাঁধতে বিজ্ঞানের ‘দুই’ সীমাবদ্ধতা

0
70

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দামোদর লীলা আমাদের চরম বুদ্ধিমত্তার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে শিক্ষা দেয়। মা যশোদা কর্তৃক ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দঁড়ি দিয়ে বন্ধন করার প্রচেষ্টা, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দামোদর লীলা প্রসঙ্গে দামোদর মাস (৯ অক্টোবর – ৬ নভেম্বর) উপলক্ষে এই বিশেষ প্রতিবেদন।

চৈতন্য চরণ দাস

মা যশোদা ভগবানকে দড়ি দিয়ে বাঁধতে গেলে প্রতিবারেই দড়ি দুই আঙ্গুল পরিমাণ ছোট হয়ে পড়ে। প্রতিবারেই আরো দড়ি এর সাথে সংযুক্ত করলেও, যত দড়িই সংযুক্ত করা হোক না কেন দড়িটি ঠিকই দুই আঙ্গুল পরিমাপ ছোট থেকে যায় ।
ভগবানের এই অপ্রাকৃত লীলা একটি তৎপর্য বহন করে যে, আমাদের নিজেদের বুদ্ধি দিয়ে ভগবানকে উপলব্ধি করার যতই প্রচেষ্টা করি না কেন সর্বদা এর সীমাবদ্ধতা থেকে যাবে। শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে মহাজাগতিক গবেষণার ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে বৈজ্ঞানিক তথ্য। কিন্তু বৈজ্ঞানিক উপলব্ধি বৃদ্ধি পায়নি, এর কারণ ‘দুই’ অনাকাঙ্খিত সীমাবদ্ধতা :
(১) বিজ্ঞানীরা যতই জানবে, ততই তারা বুঝতে পারবে যে, কত ক্ষুদ্র জ্ঞান তারা লাভ করছে। বিজ্ঞানীরা মহাশূন্য জয় করেছে এবং এর মাধ্যমে তারা উপলব্ধি করেছে যে, এ সম্পর্কে তারা কত ক্ষুদ্র জ্ঞান অর্জন করেছে। বাহ্যিকভাবে মহাশূন্য অভিযানের মাধ্যমে মানবের শ্রেষ্ঠত্ব তারা প্রমাণ করেছে, কিন্তু এর মাধ্যমে মানবের ক্ষুদ্রত্বও ভালোভাবে প্রদর্শিত হলো। মহাশূন্য অভিযানের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় যে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এই বিশ্বের সমস্ত সমুদ্র সৈকতের বালি কণার চেয়েও অধিক মহাজাগতিক বিষয় রয়েছে এবং আমাদের পৃথিবী হল এই বিশাল পরিমণ্ডলের অন্যতম মহাজাগতিক কণামাত্র। এ বিষয়ে আমেরিকান এসোসিয়েশন ফর দ্যা অ্যাডভান্সমেন্ট অব সাইন্স এর প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট কেনেথ আর বোন্ডিং এর মন্তব্য মোটেই আশ্চর্যের নয় যে, “কসমোলজি বা মহাবিশ্ব বিজ্ঞান…সম্ভবত এটি অত্যন্ত *** অনিরাপদ, কেননা এটি একটি ক্ষুদ্র ও পক্ষপাতপূর্ণ (biased) নমুনার মাধ্যমে বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিয়ে গবেষণা করে।”
(২) বিজ্ঞানীরা যত বেশি জানবে, তত বেশি তারা বুঝতে পারবে যে, পূর্বে তারা যা জেনেছে তা ভুল ছিল। আনুবীক্ষণিক (microscopic) ও খালি চোখের (macroscopic) দুনিয়ায় অপ্রযোজ্য হিসেবে পাওয়া পর্যন্ত নিউটনের সূত্রগুলো পদার্থবিজ্ঞানের সত্যের ভিত্তি হিসেবে বিবেচ্য হতো। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের অগ্রগতি সাধিত হয়েছে পরমাণুর ভাগকে বিশ্লেষণের জন্য এবং আপেক্ষিক (relativistic) পদার্থবিজ্ঞান হল মহাজাগতিক (cosmic) বিশ্লেষণের জন্য। কিন্তু সেগুলো সহিংস মতবিরোধে রূপ নেয়।যেহেতু বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উৎসস্থলে উভয়েরই অস্থিত্ব বিদ্যমান থাকতে হবে, যখন মাইক্রোস্কোপিক ও ম্যাক্রোস্কোপিকোর এক ছিল, বিজ্ঞানীদের জন্য তখন পারস্পরিক বিরোধযুক্ত স্তম্ভগুলোর ঐক্যতা সাধনের জন্য একটি তত্ত্ব Theory of Everything বা সংক্ষেপে TOE উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে দুরূহ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছিল ।
চলুন TOE উদ্ভাবনের ইতিহাস :
(১) সূচনালগ্নে নিরর্থক গর্জন। পদার্থবিজ্ঞানী লিও লেডারম্যান : “একটি একক, সরল সূত্রের মাধ্যমে এ সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে আমরা আশাবাদী, যেটি আপনি আপনার টি-শার্টে পরিধান করতে পারেন।”
(২) পরবর্তী ক্রোধিতভাবে ঘোঁ ঘোঁ শব্দ (Subsequent_exasperated grunt)। জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী (Astrophysics) স্টিভেন উইনবার্গ: “বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে উপলব্ধির পথে অগ্রগতি সাধনের ক্ষেত্রে সমস্যা প্রসারিত হচ্ছে, যেন মনে হয় সমাধান সর্বদা আমাদের আওতার বাইরে চলে যাচ্ছে।”
(৩) সর্বশেষ গোপন ঘ্যান ঘ্যান (Final concealed whimper)। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী জন হুইলার : “কখনো একটি বাস কিংবা নারী কিংবা মহাজাগতিক তত্ত্বের (cosmological theory) পেছনে ছুটো না, কেননা কয়েক মিনিটের মধ্যে সর্বদা আরেকটির আবির্ভাব ঘটবে।”

বিজ্ঞানের কৃপাশীর্বাদ প্রয়োজন

পুনরায় ভগবানের সেই লীলায় ফিরে যাওয়া যাক, যেখানে মা যশোদা ভগবানকে বাঁধতে গেলেই দড়িটি দুই আঙ্গুল কমতি হচ্ছে। কিন্তু TOE দড়ি দ্বারা বিজ্ঞান এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে বাঁধার পরিকল্পনা করছে সেটি শুধু ছোটই নয় বরং ভঙ্গুরও, যেরকম স্টিফেন হকিং স্বীকার করেছেন : “পদার্থবিজ্ঞানের যে তত্ত্বসমগ্র আমাদের রয়েছে সেগুলো অসঙ্গত (inconsistent) এবং অসম্পূর্ণ।”
মাতা যশোদা অবশেষে কৃষ্ণকে তখনই বাঁধতে সফল হয়েছিল, যখন কৃষ্ণ নিজেকে স্বইচ্ছায় বেঁধেছিলেন। একইভাবে, বিজ্ঞান এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে উপলব্ধি করতে পারবে, বিশেষত আমাদের অস্থিত্ব ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে, যখন ভগবদ্‌গীতার পারমার্থিক বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা ও প্রয়োগের মাধ্যমে সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ছন্দময় হয়ে অগ্রসর হবে। এভাবে চিন্ময় স্বরূপ উদ্ঘাটনের পথ সুগম হবে। এটি শুনতে অবৈজ্ঞানিক মতে পারে। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতার চেয়েও কম প্রতিভাবান নয় এমন একজন বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক বিবৃতি দিয়েছিলেন, “ধর্মের ক্ষেত্রে, সূচনাতে হলেন ভগবান: বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে, অন্তিমে হলেন ভগবান।” এবং বিজ্ঞান সেই অন্তিমের দিকে অগ্রযাত্রা শুরু করেছে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের “সুন্দর বাক্য (fine lining)” আবিষ্কারের মাধ্যমে জীবনের জন্য আবশ্যক অন্তত আশিটি পরামিতির মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক এবং মানসমূহের সুনির্দিষ্ট সমন্বয়। এখানে এটি সুস্পষ্ট যে, সুন্দর ঐক্যতার জন্য প্রয়োজন সুন্দর ঐক্যতা সাধন করেন এমন একজন ব্যক্তি। এক্ষেত্রে অবশ্যই নাস্তিক্যবাদ এর নিবেদিত ব্যক্তিরা বহু ব্রহ্মাণ্ড রয়েছে বা সম্ভাবনা আছে এরকম প্রস্তাব দিতে পারে, তবে সে তত্ত্বগুলোর সবটাই সহজাত, অপ্রমাণিত ও প্রমাণাতীত। তারা বিজ্ঞানের চেয়ে বিজ্ঞানের কল্পকাহিনির জগতেই বন্ধী।
যখন বিজ্ঞানীরা নিজেদের প্রমাণের রায় গ্রহণ করে, তখন তারা বিজ্ঞানের পারমার্থিক অগ্রসরতার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাকে অপসারণ করবে। পাছে তারা সাহসী পদক্ষেপের মধ্যে হোঁচট খায়। সে সম্পর্কে বিখ্যাত পদার্থবিদ মাইকেল ফ্যারাডের বিবৃতি তাদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছে : “এ জগতে আমরা যা কিছু পেতে পারি তারও উর্দ্ধে ভগবান সম্পর্কে সত্য উদ্ঘাটনের জন্য সকলের যে অধিকার তার মূল্য দিতে হবে।”


লেখক পরিচিতি : চৈতন্যচরণ দাস শ্রীমৎ রাধানাথ স্বামী মহারাজের একজন শিষ্য। তিনি ইলেক্ট্রনিক ও টেলিকমিউনিকেশনের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ করেছেন এবং পুনে মন্দিরে ব্রহ্মচারীরূপে শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। তিনি এ পর্যন্ত আটটি গ্রন্থ লিখেছেন।


ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, অক্টোবর – ডিসেম্বর ২০১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here