বিশ্বকাপ, বিশ্বক্রিকেট ও আমরা

0
520

চলমান ক্রিকেট বিশ্বকাপ বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের জন্য হতে পারে দুঃখ, হাসি ও আনন্দ বা বিনোদনের খোড়াক। কিন্তু এই ক্রিকেট কিন্তু আমাদের কর্ম ও কর্মফল সম্পর্কে এক দারুণ শিক্ষা প্রদান করতে পারে। চৈতন্য চরণ দাসের, হোয়াট ক্রিকেট ক্যান টিচ আস্ একটি লাইফ প্রবচন অবলম্বনে বিশ্বকাপ, বিশ্বক্রিকেট ও আমরা

জীবনের সর্বক্ষেত্রেই আমরা সাফল্য কামনা করি, কিন্তু তবুও সর্বদা সফলতা আমাদের হাতে ধরা দেয় না। আমরা যদি শিক্ষার্থী হই, কিংবা কোন চাকুরীর জন্য ইন্টারভিউ থাকে কিংবা যদি আমরা চাকরীর ক্ষেত্রে থাকি তবে সর্বদাই আমরা নিজেদের জন্য ভাল কিছু প্রত্যাশা করে থাকি। খেলাধুলার ক্ষেত্রে সফলতা নির্ভর করে ব্যক্তিগত বা দলগত পারফরম্যান্স বা প্রচেষ্টার উপর। যেমন ক্রিকেটে যদি কোন ব্যাটসম্যান বা বোলার ভালো না করে তবে তারা সফল হবে না। যেখানে প্রচেষ্টা বা পারফরম্যান্সই সবচেয়ে বড় ব্যাপার, সেখানেও এমনকি দেখা যায় অনেক ক্রিকেটার ব্যক্তিগত কিছু সংস্কার বহন করে।
অস্ট্রেলিয়াকে ধরা হয় ক্রিকেটের মধ্যে অন্যতম আগ্রাসী দল। অস্ট্রেলিয়ানরা সাধারণত অত্যন্ত ভদ্র ও বন্ধুসুলভ হয়। কিন্তু কিকেটে তারা স্লোজিং, আগ্রাসী হওয়ার জন্য বেশ সুপরিচিত। তাদের মতবাদ হল, “আমরা এখানে এসেছি জেতার জন্যই’। এটিই তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলেও অনেক সেরা সেরা অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার অত্যন্ত সুপারস্টিসিয়াম বা কুসংষ্কারবাদী। যেমন, সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ক্যাপ্টেন স্বিভ ওয়াহ খেলার সময় সবসময় পকেটে একটি লাল রুমাল রাখতেন যেটি অর্ধেক প্যান্টের ভিতরে এবং অর্ধেক বাইরে থাকত। যদি তিনি কোন ক্যাচ মিস করতেন যদিও তিনি একজন ভালো ফিল্ডার ছিলেন, তিনি তখন সেই রুমাল পরে গেছে কিনা দেখতেন, আর ভাবতেন “কিভাবে এই ক্যাচটি ড্রপ হল?”
আরেকজন ব্যাটসম্যান হলেন মার্ক টেইলর। যখনই তিনি ব্যাট করতে যেতেন, প্যাভিলিয়ন থেকে বের হওয়ার পূর্বে, তিনি ওয়াশরুমে গিয়ে নিশ্চিত হতেন সমস্ত কমোডের ঢাকনা বন্ধ আছে কিনা? যদি তিনি তাড়াতাড়ি আউট হয়ে যান তবে প্যাভিলিয়নে যাওয়ার পূর্বে তিনি ওয়াশরুমে যেতেন এবং যদি দেখতেন যে কোন কমাডের ঢাকনা খোলা, তিনি তার সহ খেলোয়ারদের বিরুদ্ধে চওড়া হতেন, “কেন তুমি এটি খোলা রেখেছ, এই কারণেই আমি তাড়াতাড়ি আউট হয়ে গেছি।” এখন আমরা বলতে পারি ‘আহ! এটি কি আবার? ক্রিকেট মাঠে কারো পারফরম্যান্স এর জন্য কমোড কেন দায়ী থাকবে?” বিখ্যাত টেনিস প্লেয়ার আন্দ্রে আগাসি খেলার সময় তার সৌভাগ্যের নিদর্শন স্বরূপ এক কানে একটি কানের দুল পড়তেন।
যাহোক, যেরকমটি পূর্বে বলা হয়েছিল, ক্রিকেট সহ সমস্ত খেলাধুলায় পারফরম্যান্স হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও ক্রিকেটাররা জানে যে পারফরম্যান্সই সবকিছু নয়। পারফরম্যান্সের বাইরেও এমন অন্য কিছু রয়েছে যা খেলার ফলাফলকে নাড়িয়ে দিতে পারে। সেই অন্য কিছুকে অনেকে অনেকভাবে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করলেও, মূল বিষয়টি হল পাফরম্যান্স বা প্রচেষ্টা আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, ফলাফল কিন্তু আমার পারফরম্যান্সের উপর নির্ভর করে না। খেলোয়াররা সবাই সেটি অবগত।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা অনুসারে, যখন আমরা কোনো কর্মের ফল কামনা করি তখন সেই কর্মফল প্রাপ্ত হওয়ার জন্য প্রধাণত তিনটি বিষয় দায়ী। সেগুলো হল কর্ম, দৈব ও কাল। অর্থাৎ, কর্ম+দৈব+কাল=ফল। কর্ম হল আমাদের কার্যকলাপ, দৈব হল আমাদের ভাগ্য যেটি আমাদের নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বে এবং এমনকি ভাগ্যেরও পর হল কাল অর্থাৎ সময়। যখন এই তিনটি বিষয় একত্রে কাজ করে তখনই সেই কর্মের ফল লাভ হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কৃষিকাজের সময় কৃষক যখন জমি চাষ করে বীজ বপন করে, সেটি হল দৈব। এরপর হল ঋতুর পরিবর্তনের মাধ্যমে ধান তোলার আগ পর্যন্ত সময় হল কাল। অবশেষে ফসল উত্তোলন হয়। এভাবে আমাদের জীবনের সমস্ত প্রচেষ্টার মধ্যে কর্ম দায়ী তবে, সেটিই সবকিছু নয়।
যদি কৃষক জমি চাষ না করে, বীজ বপন না করে তখন হয়ত বৃষ্টি আসল তবে সেটি শুধু আগাছাই বৃদ্ধি করবে।
সেটি শস্য ফলাবে না। তাই যখন দৈব অনুকূল হয় তখন আমাদের অবশ্যই আমাদের কর্ম করতে হবে। একইভাবে আমরা হয়ত আমাদের কর্ম করতে পারি, কৃষক হয়ত জমি চাষ করতে পারে, কিন্তু বৃষ্টি আসল না। যদি দৈব অনুকূল না থাকে তবে কর্ম ফল উৎপাদন করবে না। এজন্যে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাই বলা হয়েছে, কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন (২/৪৭) “স্বধর্ম বিহিত কর্মে তোমার অধিকার আছে, কিন্তু কোন কর্মফলে তোমার অধিকার নেই।” এক্ষেত্রে এই শ্লোকটি ভ্রান্তভাবে উপলব্ধি করতে পারে “তাহলে কর্মের ফল সম্পর্কে ভাবার দরকারই নেই।”
ভগবদ্গীতা আমাদের সেটি বলছে না। নিরাসক্ত ও দায়িত্ববান হওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নিরাসক্ততা হল কার্যকলাপের পর, দায়িত্বহীনতা কার্যকলাপের পূর্বে সাধিত হয়। কোন শিক্ষার্থী যদি পরীক্ষার জন্য অধ্যয়ণ না করে বলে, “আমি বিষয়ে অনাসক্ত।” তবে সেটি অনাসক্তি নয়, সেটি দায়িত্বহীনতা। অধ্যয়ণ করার পর কি হবে, কত মার্কস্্ পাব, কোথায় আমার ভর্তি হবে, এ সবকিছু আমার হাতে নেই, এ সবকিছু যখন আসবে তখন দেখা যাবে। সেটি হল অনাসক্তি। শ্রীমদ্ভগবদগীতা দায়িত্বহীন হওয়ার জন্য বলছেন না, বরং যেটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেটিতে মনোনিবেশ করতে বলা হয়েছে। কর্ম আমাদের নিয়ন্ত্রণে কিন্তু কর্মফল নয়।
মাঝে মাঝে দর্শকরা বলে, “দুর্ভাগ্য! তারা ভালোই খেলেছিল কিন্তু তাদের দুর্ভাগ্যের কারণে হারতে হয়েছে। (ইস্! যদি রান আউটটি না হত, ইস্!    বলটি যদি বাউন্ডারী পার হত, ইস্! ক্যাচটি প্রায় ধরেই ফেলেছিল কিন্তু হয় নি আর এজন্যেই শেষ বলে হারতে হয়েছে। এ ধরণের ঘটনা ক্রিকেটে প্রায়ই দেখা যায়। এর মানে কি? এর মানে হল পারফরম্যান্স একাই ফল নির্ধারণ করে, তবে কি দৈব বা ভাগ্যকে নির্ধারণ করে? প্রকৃতপক্ষে সেটি হল আমাদের পূর্বকৃত কর্ম। এ সম্পর্কে ভগবদ্গীতায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে, এই জীবন আমাদের একমাত্র ইনিংস নয়। ইতোপূর্বে আমরা অনেক ইনিংস খেলে ফেলেছি এবং ভবিষ্যতেও খেলব। কোত্থেকে নতুন ইনিংস শুরু হবে সেটি নির্ভর করে পূর্ব ইনিংসে আমরা কত স্কোর করেছি তার উপর (অনেকটা টেস্ট ক্রিকেটের মতই)। কিছু লোকের স্কোরে ভাল তাই তারা উচু থেকে শুরু করে, আর যাদের কম তারা নিচু থেকে শুরু করে। কিন্তু এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আমাদের ম্যাচ কিন্তু একে অপরের বিরুদ্ধে নয়। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হল নির্দিষ্ট স্কোরে পৌঁছা।
ঠিক একইভাবে কর্মফল জন্মে অনেক লোক অনেক অবস্থানে থাকতে পারে কিন্তু আমাদের সবার একটা উদ্দেশ্য তা হল ভগবানকে সন্তুষ্ট করা। গীতার (৯/৩৩) এ শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, অনিত্যমসুখং লোকমিমং প্রাপ্য ভজ্যস্ব মাম্্ অর্থাৎ “তুমি এই অনিত্য দুঃখময় মর্তলোক লাভ করে আমাকে ভজনা কর।” এ সম্পর্কে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন, এ জগতে ধনী-গরীব, জ্ঞানী-মূর্খ অনেক ভেদাভেদ থাকতে পারে কিন্তু চরমে এ জগৎ কারো জন্যেই সুখের স্থান নয়। দুঃখ-দুর্দশা হল গণতান্ত্রিক। প্রত্যেকেই দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করবে হয়ত একটু ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে। অনেক সময় দেখা যায় আমরা ভালো কর্ম করি, কিন্তু কোন ফলই আসল না, সেটি কিভাবে হয়?
ক্রিকেটে অনেক সময় দেখা যায়, কোন দলের কোন একজন ব্যাটসম্যান খুব ভার রান করল, কিন্তু দলের অন্যান্য খেলোয়ার রান করতে না পারায় দলকে হারতে হয়। এক্ষেত্রে ব্যাটসম্যানের ভাল ব্যাটিং হল কর্ম কিন্তু অন্যান্যদের প্রচেষ্টা হল দৈব। তাই মাঝে মাঝে আমরা খুব ভাল কর্ম করলেও কোন ফল না পেলে সেটি দৈব হিসেবে ধরে নিতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের কর্ম ব্যর্থ হয় না, সেটি সঞ্চিত থাকে এবং সেটি কোন এক সময় ফল প্রদান করবেই।
এক্ষেত্রে ব্যাটসম্যানের এভাবে ভাবা উচিত যে, সে তার সর্বস্ব চেষ্টা করেছে এবং অন্যদের দায়িত্ব ছিল তাদের ভূমিকা ভালভাবে পালন করা, কিন্তু তা হয়নি। কিন্তু এক্ষেত্রে তার প্রচেষ্টা তাকে আরো পরিপক্ক করে তুলেছে যাতে করে ভবিষ্যতে সে এরকম অবদান রাখতে পারে। তাতে তার ক্ষতির কিছুই হয়নি বরং ভবিষ্যতের জন্য তার সেই প্রচেষ্টা একটি সম্পদ হিসেবে থাকবে। আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনের কর্মও তদ্রুপ হারিয়ে যায় না, সেটি ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চিত থাকে এবং একসময় ফল প্রদান করবে।
পরিশেষে সমস্ত কর্মের পেছনে যদি আমরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হাত দর্শন করি কিংবা আমরা কর্মচক্র সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করতে পারি তবে সেটি আমাদের সর্বাবস্থার পরম শান্তি ও আনন্দ প্রদান করবে। সেটি ক্রিকেট হোক কিংবা জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে হোক।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here