বিবাহ বিভ্রাট (পর্ব-২)

0
27

মিল-অমিল জটিলতা

গত সংখ্যায় বিবাহের উপযুক্ত বয়স কত? সে বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে বিবাহের উপযুক্ত পাত্র/পাত্রীর প্রাথমিকভাবে পছন্দ হলে সেক্ষেত্রে অনেকে সাক্ষাতের আয়োজন করার পর তবেই জ্যোতিষ মিল-অমিলের জন্য একজন জ্যোতিষীর শরণাপন্ন হন। কিন্তু এক্ষেত্রে বুদ্ধিমানের কাজ হবে যদি জ্যোতিষ মিল অমিলগুলো সাক্ষাতের পূর্বেই যাচাই করা যায়। কেননা জ্যোতিষ অমিল পেলে সেক্ষেত্রে বিবাহের আয়োজন করাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, তা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। আবার জ্যোতিষ শাস্ত্রের বিবেচনা করাটাও সবকিছু নয়। আরও বিভিন্ন বিষয় এখানে জড়িত। এ বিষয়ে শ্রীল প্রভুপাদের একজন অভিজ্ঞ শিষ্যা নারায়ণী দেবী দাসী আলোকপাত করেছেন নিন্মোক্তভাবে:
গৃহস্থ ভিশন টিম অনুসারে একটি কোর্স রয়েছে যেখানে গৃহস্থ আশ্রম সম্পর্কে তুলে ধরা হয়। সেখানে পাত্রী নির্বাচনের জন্য কিরকম মিল-অমিল দেখাতে হবে সে বিষয়ে তিনটি বিভাগ যথা পূর্ব জন্ম, বর্তমান জন্ম ও ভবিষ্যত জন্মের মিল-অমিল ।
পূর্ব জন্মের মিল-অমিল দেখার জন্য আপনি যদি আপনার কুণ্ডলী ও চার্ট পর্যবেক্ষণ করেন তবে তার মাধ্যমে মাত্র অতীতের অর্থাৎ পূর্বজন্মের কিছু তথ্য লাভ করবেন, বাকি অর্ধেক তথ্য জানতে পারেন এ জীবনে কিরকম সংস্কৃতিতে পাত্র-পাত্রী বেড়ে উঠেছে সেই অতীত থেকে। যেমন যদি একজন ভারতীয় একজন বিদেশী বা বিদেশীনিকে বিয়ে করে তবে সেটি প্রকৃত মিল না হতে পারে। এমনকি ভারতে যদি কোন এক দক্ষিণ ভারতীয় ব্যক্তি উত্তর ভারতীয় কন্যাকে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত নেন তবে সেটিও একটি প্রকৃত মিল না হতে পারে। এজন্যে কিরকম সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠেছেন সেটি দেখা গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে আরো রয়েছে যেমন, যদি মা ও বাবার মধ্যে ডিভোর্স হয় এবং অনেক সময় কেউ একজন ডিভোর্স প্রাপ্ত হয় নি সে বিষয়গুলোও অতীতের মিল-অমিল দেখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারো শিক্ষা-ব্যবস্থা কেমন ছিল, কোন স্তরে একজন বেড়ে উঠেছিল সেগুলো দেখা উচিত। কুণ্ডলী বা জন্ম তালিকা দেখে যে মিল অনুসন্ধান করা হয় তা মাত্র ৬ ভাগের ১ ভাগ তথ্য প্রদান করে। কারো হয়তো ভালো কুণ্ডলী রয়েছে কিন্তু বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে কিছু বিষয়ের অমিল রয়েছে তবে সেটি যথার্থ নয়। আমি দেখেছি কারো কুণ্ডলী ভালো ছিল এবং বিবাহের পূর্বে তারা দুজন দুজনের সাথে প্রায় দুই বছর ধরে মেলামেশা করে কিন্তু, বিবাহের দুই মাস পূর্বেই সে সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়। কেননা তাদের কুণ্ডলী বা কুণ্ঠি মিললেও অন্যান্য বিষয়গুলো তারা মেলান নি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যে মিল-অমিল দেখতে হবে সেগুলো হল যেমন পাত্র-পাত্রী একে অপরের সাথে সৎভাবে যোগাযোগ বা কথা-বার্তা, আচার-আচরণ ইত্যাদি করেন কি না। এক্ষেত্রে দুইজনেই একে অপরের কথা ভালোভাবে শ্রবণ করা গুরুত্বপূর্ণ। মাঝে মাঝে একজন হয়ত কিছু বলছে কিন্তু অন্যজন তা শ্রবণ করে না, সেটি যথার্থ নয়। এজন্যে জীবন সঙ্গী বা সঙ্গিনী নির্বাচনের জন্য অতীতের বর্তমান মিল অমিল বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। যার সাথে সারাজীবন থাকবেন তার কথা আপনাকে অবশ্যই মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করা উচিত। ভবিষ্যতের মিল-অমিল হল, ভবিষ্যতের জন্য আপনার হয়ত কিছু প্রত্যাশা থাকতে পারে। সেগুলো মিল হচ্ছে কিনা পর্যবেক্ষণ করা। যেমন- কিভাবে আপনি সন্তান প্রতিপালন করতে চাইছেন, কয়টা সন্তান আপনি ভবিষ্যতে কামনা করেন। ভক্তদের ক্ষেত্রে কতটা কঠোরভাবে পারমার্থিক বিধি-নিষেধ মেনে চলতে চান, অর্থনৈতিক ভাবে আপনি কিভাবে জীবন ধারণ করতে চান ইত্যাদি বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করা। আমি এক দম্পতির সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম। তখন সে নারী বললেন যে, তার ভবিষ্যতে স্বামী চেয়েছিলেন বিয়ের পর মন্দিরেই বসবাস করবেন। তারা তখন বিয়ের পর মন্দিরের উপরে একটি ছোট স্থানে বসবাস করতেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম এটি কি আপনি চান না? তিনি উত্তরে বললেন, “না না, আমি তো মন্দিরের বাইরে একটি ফ্ল্যাট নিয়ে বসবাস করতে চাই।” তখন আমি বললাম, “বিষয়টি তো বিবাহের পূর্বে জানানো 61 উচিত ছিল।” সে নারী ভক্ত এরপর স্বামীকে জানিয়েছিলেন এবং তিনিও রাজী হলেন। তবে একটি চাকরি পেলে তিনি তা করবেন বলে জানান, এভাবে এ ধরণের বিষয়গুলো বিবাহের পূর্বে পাত্র-পাত্রীর আলোচনা করা উচিত। অন্যথা এ সমস্ত বিষয়গুলো বিবাহের পর তাদের পৃথক হওয়ার কারন হতে পারে। অতএব বিবাহের পূর্বে এই তিনটি বিষয়-অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত মিল-অমিল সম্পর্কে যাচাই করা উচিত।
[বিবাহের সময় কুষ্ঠি বিচার বিষয়ে শ্রীমৎ ভানু স্বামী মহারাজ বলেছেন, “আপনার সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। যদি খারাপ সিদ্ধান্ত নেন তাহলে খারাপ কর্মফল পাবেন। তালিকায় বিবাহ সংক্রান্ত কোন খারাপ ফল থাকতে পারে, সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আপনি ভালো যোটক নির্ধারণ করতে পারেন। আপনি যদি গুরুত্ব না দেন তাহলে আপনি খারাপ ফল প্রাপ্ত হবেন। বুদ্ধিমত্তার দ্বারা বিচার করেন তাহলে অনেক সমস্যা সমাধান হয়ে যায়, কিছু কিছু তালিকায় খারাপ কর্মের লক্ষণ দেখা যায় ও এগুলোকে নিঃশেষ করাও কষ্টসাধ্য, কেননা এগুলো হচ্ছে পূর্ব কর্মফল জাত। এগুলোকে দূর করা কঠিন হয়ে যায়। যদি আপনি এগুলো এড়িয়ে চলেন তাহলে আপনি যথার্থ যোটক নির্ধারণ করতে পারেন। উদাহরণ স্বরূপ আপনি জানেন এই খাবারটি আহার করলে এই রোগটি হবে, এভাবে তদ্রুপ আমরা যদি দেখে শুনে বিবাহের জন্য আমাকে অগ্রসর না হই তবে বিবাহের মধ্যে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হবে। ব্যাপারটা এমন যে আপনি জানেন আপনার গৃহে আগুন লাগবে, তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। ঠিক সে রকম বিবাহের সময় কুষ্ঠি বিচারে আপনি জানতে পারলেন যে সে পাত্র বা পাত্রী আপনাকে হত্যা করবে। তাহলে আপনাকে সেই সম্বন্ধটি পরিত্যাগ করতে হবে। অর্থাৎ কুষ্ঠি বিচারের মাধ্যমে দুঃখ আসবে জেনে নিয়ে সাবধান হওয়া।’ এক্ষেত্রে শ্রীমৎ ভানু স্বামী বলেছেন, বিবাহের ক্ষেত্রে সাধারণত মঙ্গলদোষ দৃষ্ট হয়। সেক্ষেত্রে মঙ্গল গ্রহের আরাধ্য বিগ্রহ হলেন নৃসিংহদেব। তাই মঙ্গল গ্রহের দোষকে প্রশমিত করার জন্য বা মঙ্গল গ্রহকে শান্ত করার জন্য নৃসিংহদেবের আরাধনা করা যায়, যার মাধ্যমে পাত্র পাত্রীর মঙ্গলদোষ দূর করে বিবাহের জন্য অগ্রসর হওয়া যায়। এছাড়াও ভক্তি হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট শক্তিশালী পন্থা। নিয়মিত হরিনাম জপ, ভাগবত সেবা করার মাধ্যমে ভক্তিকে বলবৎ করে গ্রহের প্রতিক্রিয়া সমূহ নিবারণ করা যায় ।]
উল্লেখ্য, শ্রীমতি নারায়ণী দেবী দাসী আমেরিকার বোষ্টনে জন্মগ্রহণ করেন । একবার তিনি শ্রীল প্রভুপাদের বিভিন্ন সেবার বিশেষত গ্রন্থ বিতরণে নিযুক্ত হন। তিনি বৃন্দাবনে ভক্তিশাস্ত্রী, ভক্তিবৈভব ও ভক্তিবেদান্ত কোর্স শিক্ষা দেন, তিনি ভক্তিশাস্ত্রীর জন্য কারিকুলাম লিখতে সহায়তা করেন। তিনি তিনটি পারমার্থিক গ্রন্থপ্রকাশ করেন। [আগামী সংখ্যায় জ্যোতিষশাস্ত্রের আরো কিছু বিষয় ও এর ব্যবহারের বিভ্রাট নিয়ে আলোচনা করা হবে এবং সে সাথে পাত্র-পাত্রী বিবাহ পূর্ববর্তী সাক্ষাত ও আর কি কি প্রশ্ন করা উচিত সে বিষয়ে বিশদভাবে ধারাবাহিক দেওয়া হবে।] হরে কৃষ্ণ !

বিবাহ বিভ্রাট (পর্ব-৩)


 

সেপ্টেম্বর ২০১৮ মাসিক চৈতন্য-সন্দেশ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here