বলির পাঁঠা কে?

0
44

অনেকগুলো সত্য ও বাস্তব ঘটনার মধ্যে একটি হচ্ছে এটি। এটি একটি পরিবারের ঘটনা। একদিন এই পরিবারে একই সাথে দুটি শিশু জন্মগ্রহণ করল। তবে তাদের মধ্যে একজন পশু-ছাগ শিশু, অন্যজন সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ অর্থাৎ মেয়ে শিশু। মেয়েটির নাম রাখা হল প্রিয়া। ছাগ শিশু এবং প্রিয়া এক সাথেই বড় হতে লাগল । প্রিয়া যখন একটু বড় হল তখন তার খেলার সাথী ছাগ শিশুটির নাম রাখল লালু। পরিবারের যে কোন সদস্য লালু নাম ধরে ডাকলেই লালু সঙ্গে সঙ্গে চলে আসত। ঐদিকে প্রিয়া লালুকে অনেক আদর করত, তাঁরা একসাথে খেত, খেলা করত, মাঠে দৌড়াতো। এভাবে প্রিয়া লালুকে ভাইয়ের মতো ভালোবেসেছিল । লালু ও একটু আদর পাওয়ার জন্য প্রিয়ার কাছাকাছি থাকত ।

প্রিয়ার যখন ৫ বছর বয়স হল, তাঁর পিতা মাতা ঠিক করল যে আসছে মনসা পূজায় লালুকে বলি দেওয়া হবে। কেননা লালু এখন বেশ বড়সড় ও মোটা তাজা হয়েছে। এদিকে প্রিয়া তা জানত না। পূর্বে সে কখনো পশু বলিও দেখেনি অবশেষে সেই প্রতীক্ষিত দিনটি এল । যখন প্রিয়ার সামনে দিয়ে লালুকে কয়েকজন লোক টেনে হিঁচড়ে স্নান করানোর পর কপালে সিঁদুর ও মালা পড়িয়ে দিচ্ছিল, তখনও প্রিয়া বুঝতে পারছিল না যে লালুকে নিয়ে কি করছে তারা ? হঠাৎ উপস্থিত সেই সব লোকদের কয়েকজন যখন লালুর চার পা টেনে হিচঁড়ে, মস্তক টেনে সজোরে লালুকে চেপে ধরে কলের উপর বসালো, তখন প্রিয়ার আর বুঝতে বাকি রইল না যে লালুকে ওরা মারতে যাচ্ছে। আর তখন প্রিয়ার চোখের জল আর স্থির থাকতে পারেনি। সে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে লালুর দিকে ছুটে যেতে চাইলে কয়েকজন মহিলা তাকে আটকে রাখে। প্রিয়া লালু লালু বলে কান্না করতে থাকে। তার পুরো মুখ ভিজে যায় অশ্রুতে। অনেক আর্তনাদ করা স্বত্ত্বেও প্রিয়াকে যেতে দেয়া হয়নি মা লালুর কাছে। এক পর্যায়ে যেই মাত্র মৃত্যুদূতরূপী ব্রাহ্মণ এসে লালুর গলায় মৃত্যুর জল ছিটিয়ে দেয়, তখন এক পাষন্ড হৃদয়ের ভয়ংকর লোক তার হাতে একটি লম্বা ধাঁড়ালো খড়গ দিয়ে মুহুর্তের মধ্যে প্রিয়ার আদরের লালুর মস্তক বিচ্ছিন্ন করে দিল। আর লালুর বিচ্ছিন্ন দেহ অজস্র মৃত্যুর যন্ত্রণায় ছটফট ছটফট করতে লাগল। এদিকে প্রিয়া সম্পূর্ণ বোবা সদৃশ . হয়ে গেল। তার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছিল না। আর তখন ঐ সব হিংস্র লোকেরা লালুর শরীরের রক্ত একেক জনের দিকে ছুঁড়ে মেরে উল্লাস করতে লাগল। প্রিয়ার মনে হচ্ছিল ওরা তার আদরের ভাইয়ের রক্তে “রক্তকেলী” খেলছিল। শোনা যায় দুদিন ধরে সে কিছু না খেয়েই বোবা সদৃশ জীবন যাপন করেছে। কিন্তু এখানে প্রশ্ন রইল প্রিয়ার হৃদয়ে লালুর প্রতি এ কোন বেদনা বা শোকের অনুভূতি হল, যা অন্য সব লোকের হয়নি। অন্য সকলের কাছে প্রিয়ার এই অনুভূতির মূল্যহীন বা নিছক ছেলেখেলা বলে মনে হলেও এটিই প্রকৃত অনুভূতি। কেননা প্রত্যেক জীবের মধ্যে আত্মা বিরাজিত এবং তারা প্রত্যেকেই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সন্তান। তা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। ধরুন একজন পিতার-দুইজন সন্তান রয়েছে। একজন মূর্খ, নির্বোধ, দুর্বল। অপরজন সবল, বুদ্ধিমান ও চালাক । এখন সবল ছেলেটি যদি তার দূর্বল ভাইটিকে উৎসর্গ করার নামে বলি দিতে চায় তবে তাঁর পিতা কি তা অনুমোদন করবে? বৈদিক শাস্ত্র হতে আমরা দেখতে পায় যে, প্রত্যেক দেব-দেবী পরম বৈষ্ণব- বৈষ্ণবী। ধর্ম তারা ভগবান শ্রীবিষ্ণুর নিবেদিত প্রসাদ গ্রহণ করেন। তারা কখনো মাছ-মাংসগ্রহণ করেন না। তাহলে মনসা দেবী বলি গ্রহণ করবেন কোন যুক্তিতে?

বেদে বলা হয়েছে, ‘মা হিংস্যাৎ সর্বা – ভূতানি’ অর্থাৎ কোন জীবকে হিংসা বা হত্যা করো না। আবার অনেকেই মুখ দিয়ে বুলি আওড়ান “জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর”। তাহলে পশুদের গলায় ছুরি বসিয়ে আমরা এই কোন ধরনের জীব প্রেম করছি? পশুরা কি জীব নয়। এটি প্রেম নয়, এটি হল নীরিহ জীবের প্রতি নির্দয় আচরণ তথা মনসা দেবীর মত বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীদের প্রতি ভয়ংকর অপরাধ। এই কলিযুগে পশুবলি নিষিদ্ধ। অন্যান্য যুগে বৈদিক আচার সম্পন্ন শুদ্ধ ব্রাহ্মণেয়া যজ্ঞে বৃদ্ধ পশু আহুতি দিয়ে তৎক্ষণাৎ মন্ত্রযোগে পশুটিকে উন্নত নবজীবন দান করার যথেষ্ট ক্ষমতা ছিল। কিন্তু কলিযুগে বৈদিক আচারভ্রষ্ট ব্রাহ্মণদের সে ক্ষমতা নেই। ভগবান শ্রীবিষ্ণুর অবতার বুদ্ধদেব জগতে পশুবলি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন, সেই ইতিহাস সবারই জানা। মনুসংহিতায় ‘মাংস’ কথাটির অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে ‘মাম স খাদতি ইতি মাংস’ অর্থাৎ “সেও আমাকে এইভাবে খাবে যেরূপ আমি তাকে খাব।” “বলি দিয়ে মাংস খাওয়া ধর্মানুমোদিত মনে করে যদি কেউ মাংসাশী হয়, তবে সে স্বধর্ম ত্যাগ করে বিধর্মকেই স্বধর্ম মনে করে”। (ভা: ১১/৫/১৩) “আর যে সব দাম্ভিক ব্যক্তি ইহলোকে দম্ভ প্রকাশ করবার জন্য যজ্ঞ বা পূজা অনুষ্ঠান করে এবং সেই যজ্ঞে পশু বধ করে, পরলোকে তারা বৈশস’ নামক নরকে নিক্ষিপ্ত হয়। যমদূতগণ তাদেরকে অশেষ যাতনা দিয়ে বধ করে।” (ভা: ১১/৫/২৫) “ধর্মজ্ঞানহীন সাধুত্ব অভিমানী দূর্জন ব্যক্তি নিঃশঙ্ক চিত্তে পশু বধ করলে পরলোকে সেই পশুরাই ঘাতকদের অনুরূপভাবে ভক্ষণ করে থাকে”। (ভা: ১১/৫/১৪)

“ছাগল-মহিষ-আদি বলি দিয়া পূজে ।
বৈশস-নরকে যাথে বধস্থান বলি ॥
নরক ভুঞ্জায়ে তারে তথা লৈঞা পেলি ।
ছাগ-মহিষের রূপ ধরি ভয়ঙ্কর ॥
খন্ড খন্ড করি তার কাটে কলেবর ।
আর্তনাদ করি কান্দে হইয়া ফাপর ।
মহাশূলে তার অঙ্গ বিন্ধে নিরন্তর ॥
(শ্রীকৃষ্ণ প্রেম তরঙ্গিনি – ৫/৮/৪১-৪৪)

শ্রীমদ্ভাগবত (৫/২৬/৩১) শ্লোকে বলা হয়েছে– “যারা পশুবলি দিয়ে ভৈরব বা ভদ্রকালী, মনসা, দূর্গা প্রভৃতি দেব-দেবীর পূজা করে, হিংসা কবলিত সেই পশু যমালয়ে রাক্ষস হয়ে ঘাতকের মতো সুতীক্ষ্ম অস্ত্র দিয়ে তাদের বধ করে। ইহলোকে যারা পশুর রক্ত-মাংস পান করে আনন্দে নৃত্যগীত করে, সেই সব হিংসাশ্রিত পশু সেই রূপেই পরলোকে হিংসাকারীর রক্ত পান করে আনন্দে নৃত্যগীত করতে থাকে।
আবার অনেকে বলে থাকেন আমাদের পূর্ব পুরুষ হতে বলি দেওয়া হচ্ছে, কিভাবে সেই প্রথা ছাড়ব? তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, তাদের বাবা-দাদারও পূর্বপুরুষ তথা মানব জাতির আদি পিতা মনু(পৃথিবীর প্রথম মানব) আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন – মৎস্যান বিবর্জয়েৎ (মনু সংহিতা ৫/১৫) –  মাছ, মাংস ভক্ষণ করবে না।

ভাগবতের বর্ণনা অনুযায়ী, ছাগল বল দানকারী ব্যক্তির মৃত্যুও ছাগল বলীর মতোই মর্মান্তিক হবে। বলীতে যেমন পশুটির চতুস্পদ ভেঙ্গে দিয়ে অবশ করে রাখা হয়, ঠিক তেমনি মৃত্যুকালে বলীর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও হাত পা অবশ হয়ে যায়। সেই নির্বোধ পশুটিকে যেভাবে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় তেমনি সেই ব্যক্তিরাও অনুরূপ একদিকে যমের নির্দয় টানা হিচড়া আর অন্যদিকে আত্মীয় স্বজনের মায়াকান্নার টানাটানিতে পড়ে । বলির সময় পশুটির যেমন বায়ুর চাপে চক্ষু ঠিকড়ে বেরিয়ে আসে, গলা ঘুরঘুর করে, ঠিক তেমনি ঐ ব্যক্তিরও মৃত্যু অবস্থায় যমের কালপাশে পড়ে একই অবস্থা হয়। অধিকন্তু যমদূতের সক্রোধনেত্র দর্শন করে সে মহাভয়ে মল-মূত্র ত্যাগ করতে থাকে । অতঃপর রাজ্যের পাহারাদারেরা যেমন অপরাধীকে দন্ড দেওয়ার জন্য আটক করে নিয়ে যায়, তেমনি যারা পশু হত্যা জনিত অপরাধকর্মে নিযুক্ত ছিল তাদের সূক্ষ্ম দেহকে যমদূত দড়ি দিয়ে বেধে নিয়ে যায়। ভদ্রবেশে মনে করছেন যে, আমি তো কোন পশু বলি দিই নি, শুধু ছাগল ক্রয় বা বিক্রয় বা সহায়তা করছি। তাদের জন্য, মনুসংহিতায় বলা হয়েছে, হত্যার সাথে সংশ্লিষ্ট ৬ প্রকার ব্যক্তি সমানভাবে অপরাধী। অর্থাৎ

১ম – যে প্রাণী হত্যা করে বা হত্যার নির্দেশ দেয়।

২য়-যে বিক্রয় করে বা বিক্রয়ে সাহায্য করে।

৩য়-যে ক্রয় করে বা ক্রয়ে সাহায্য করে,

৪র্থ – যে রান্না করে,

৫ম – যে পরিবেশন করে,

৬ষ্ঠ যে ভক্ষণ করে বা ভক্ষনে সাহায্য করে। 

তাদের সকলকেই এই মহা পাপ কর্মের জন্য ধ্বংস করা হবে। আমরা নিবিড়ভাবে কামনা করি ধর্মের নামে এই নির্মম পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ অবিলম্বেই বন্ধ হোক। ধর্ম হচ্ছে ভালবাসার, হত্যার নয়। নয় রক্তের হোলিখেলা। জীবকে ভালবাসতে শেখায় ধর্মই। অথচ আমরা উদরপূর্তির জন্য চালাচ্ছি পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ। আর যাই হোক এটা ধর্মের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। যে পশুবলির পরিণামে এই মহা-মহা বিপর্যয়ের সৃষ্টি হবে, হরে কৃষ্ণ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here