বরফ আচ্ছাদিত অ্যান্টার্কটিকাতে ভগবদগীতা প্রচার

    0
    27

    মাধব স্মুলেন: ভারতীয় অ্যান্টার্কটিক গবেষণা কেন্দ্র “মৈত্রী” -তে সহ-বৈজ্ঞানিক অভিযাত্রী দলের সদস্যদের মধ্যে ভগবদগীতা বিতরণ ও জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠান উদ্যাপন করেন ইস্‌কন ভক্ত প্রকৌশলী সুরেন্দ্র সিং। পৃথিবীর দক্ষিণতম মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা দক্ষিণ মেরুতে অবস্থিত। এটি বিশ্বের শীতলতম, শুষ্কতম এবং বায়ুপ্রবাহী মহাদেশ ; এর ৯৮% বরফে ঢাকা থাকে। শুধুমাত্র বিজ্ঞানী এবং সহায়ক কর্মীরা সেখানে সারা বছর থাকেন। ইস্‌কনের ৫০ তম বার্ষিকী উদ্যাপন ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেশীহন্ত দাস এবং ত্রিবিক্রম দাস প্রথম ইস্‌কন ভক্ত ছিলেন যারা অ্যান্টার্কটিকাতে কীর্তন করেছিলেন। তারা সেখানে শ্রীল প্রভুপাদের আরতি নিবেদন করেন এবং প্রথমবারের মতো অ্যান্টার্কটিকাতে প্রভুপাদের গ্রন্থ বিতরণ করেন। সেই সাথে অ্যান্টার্কটিকাতে ভগবদ্‌গীতা কয়েকটি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করেন। সুরেন্দ্র সিং-এ প্রথম ইস্‌কন ভক্ত যিনি অধিক সময় অ্যান্টার্কটিকার অন্যান্য বাসিন্দাদের মধ্যে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করেন।
    ২০১৬ সালে তিনি ইস্‌কন রাজস্থান মন্দিরের সাথে যুক্ত হন। রাজস্থান সিকার ইস্‌কন মন্দিরের পরিচালক ললিত গোবিন্দ দাসের নির্দেশনায় তিনি এই প্রচার কার্য পরিচালনা করেন। তিনি শ্রীমৎ ভক্তিচারু স্বামী মহারাজের আশ্রিত শিষ্য। তিনি সিকারে একটি স্থানীয় মেয়েদের স্কুলের জন্য অনলাইন ভগবদ-গীতা ক্লাস শুরু করেছিলেন এবং পরবর্তীতে তিনি অনলাইনে জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠান আয়োজন করেন। সুরেন্দ্র সিং ২০১৬ সাল হতে ইন্ডিয়ান অ্যান্টার্কটিক প্রোগ্রামে কাজ করছেন। প্রোগ্রামটি ভারত সরকারের ভূমি বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যাশনাল সেন্টার ফর পোলার অ্যান্ড ওশান রিসার্চ (এনসিপিওআর) দ্বারা পরিচালিত হয়।
    সুরেন্দ্রের প্রথম দুটি প্রোগ্রামের মেয়াদকাল ছিল নভেম্বর ২০১৬ থেকে ডিসেম্বর ২০১৭ এবং নভেম্বর ২০১৮ থেকে ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত ভারতী গবেষণা কেন্দ্রে। তার বর্তমান অর্থ্যাৎ তৃতীয় অভিযানের সময় সীমা নভেম্বর ২০২০ থেকে জানুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত, তিনি মৈত্রী গবেষণা কেন্দ্রে একটি নতুন বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞান গবেষণাগার স্থাপন করেছেন এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। সুরেন্দ্র প্রভু বলেন, “ললিত গোবিন্দ প্রভু আমাকে অ্যান্টার্কটিকাতে বিতরণের জন্য আমার সাথে ভগবদগীতা নিয়ে যেতে বলেছিলেন।
    আমি ভগবদগীতাসহ কয়েকটি “কুন্তীদেবীর শিক্ষা” গ্রন্থও সাথে নিয়েছিলাম। প্রথমদিকে, আমি আমার সহকর্মীদের কাছে কৃষ্ণ চেতনার কথা বলতে লজ্জা পেতাম, কারণ তার অধিকাংশই ছিল আমিষভোজী। একদিন সকালে, আমি শ্রীশ্রী রাধা-গোপীনাথের চিত্রপটের সামানে বসে পূর্ণ নিমগ্ন হয়ে জপ করছিলাম তখন আমার এক নিরামিষভোজী বন্ধু ভেবেছিলেন আমি অসুস্থ অথবা শীতে জর্জরিত।
    অন্যদিকে, নিরামিষভোজীদের কঠিন দিন অতিবাহিত করতে হয় কেননা সেখানে তাজা ফল বা সবজি নেই। সুরেন্দ্র তার বন্ধুকে বুঝালেন যে, সে শীতের প্রভাবে কষ্ট পাচ্ছে না বরং আধ্যাত্মিক অনুশীলনগুলি তাকে অ্যান্টার্কটিক জীবনের কঠিন সময়গুলোতে সাহায্য করছে । বন্ধুটি লক্ষ্য করলেন যে, সুরেন্দ্র প্রতিদিন ভগবদগীতা পড়ছেন এবং পবিত্র নাম জপের মধ্যদিয়ে খুশিতে দিন অতিবাহিত করছেন। তিনি কোন গল্পগুজবে যুক্ত হচ্ছেন না । অবশেষে বন্ধুটি তাকে জপ এবং কৃষ্ণচেতনা সম্পর্কে জিজ্ঞাস করলে, সুরেন্দ্র বলেন আমি প্রতিদিন ১৬ মালা জপ ও প্রভুপাদের ভগবদগীতা অধ্যয়ন করি ।
    সুরেন্দ্র বলেল, তৃতীয় অভিযাত্রীয় একজন সদস্য তাদের সাথে যোগ দেন এবং এই ছোট্ট দলটি ভোর ৪.০০ টায় উঠে এবং প্রতিদিন জপ করে। শ্রীশ্রী রাধা গোপীনাথের চিত্রপটে মিষ্টিজল এবং ভিজানো বাদাম ভোগ দেওয়া হয়। ঘুমাতে যাওয়ার আগে রাত ১০ টা পর্যন্ত তারা ভগবদগীতা ও চৈতন্যচরিতামৃত অধ্যয়ন করেন। কেন্দ্রে ২১ জন লোকের মধ্যে ১১ জন অংশ নিয়েছিল, যারা ছিল বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত কর্মকর্তা, মেডিকেল অফিসার-ডাক্তার, নার্স, স্টেশন ইঞ্জিনিয়ার, পোলার মেকানিক এবং জেনারেটর মেকানিক।
    সুরেন্দ্র রাত ১১ টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করেন । সবাই কীর্তনে অংশগ্রহণ করে নৃত্য-কীর্তন করেছিলেন। তিনি একটি বক্তৃতাও পড়েছিলেন যা ললিত গোবিন্দ তাকে পাঠিয়েছিলেন এবং দলের সদস্যদের ইস্‌কন এবং শ্রীল প্রভুপাদ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করেছিলেন (তারা ভগবদ-গীতার সাথে পরিচিত ছিল, কিন্তু প্রভুপাদের ভগবদ-গীতা আগে কখনো দেখেনি বা পড়েনি)।
    তিনি আরো বলেন, “আমি বুঝতে পারছি না কিভাবে এটি ঘটেছে এবং আমার মতো একজন ব্যক্তি যিনি কীর্তনের নেতৃত্ব দিতে জানেন না তিনি কিভাবে পুরো এক ঘণ্টা গান গাইতে পারে”।
    পরবর্তীতে, সুরেন্দ্র কৃষ্ণভাবনাময়, জপ এবং অ্যান্টার্কটিকাতে শীতকালে কীভাবে নিজের চিন্তা প্রক্রিয়া পরিচালনা করবেন তার ভিত্তিতে একটি উপস্থাপনা প্রদান করেন ।
    তিনি বলেন, “আমি একটি পতিত আত্মা, এবং আমি শুধু আমার গুরুর ইচ্ছা পূরণের একটি যন্ত্র হয়ে ওঠার চেষ্টা করছি।”
    বর্তমান অভিযানের পর, সুরেন্দ্র ভারতে ফিরে বৈজ্ঞানিক প্রকল্পে নিজেকে নিযুক্ত করার পরিকল্পনা করেন । অ্যান্টার্কটিকায় ফেরার কোন তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা নেই। তিনি মনে করেন এই অভিযানে ভগবদগীতা ও চৈতন্যচরিতামৃত পাঠে অধিক সময় ব্যয় করতে পারায় তার কৃষ্ণভাবনাময় জ্ঞান আরো দৃঢ় হয়েছে যা পরবর্তীতে তাকে আরো ভালভাবে ভক্তি করতে সহায়ক হবে।


     

    চৈতন্য সন্দেশ নভেম্বর-২০২১ প্রকাশিত

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here