ফ্রাইডে থার্টিন

0
31

বিশ্বে ১৩ সংখ্যাটি আনলাকি হিসেবে পরিচিত। তবে সংখ্যাটি আসলেই কী আনলাকি ?

শ্যামানন্দ দাস

যদি আপনি ১৩ সংখ্যাটিকে আনলাকি হিসেবে বিশ্বাস করেন তবে আপনি পৃথিবীর বর্তমান জনসংখ্যার মধ্যে নিজেকে একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। কেননা এই বিশেষ দিনে অধিকাংশ মানুষ উড়োজাহাজে চলাচল, আনন্দ অনুষ্ঠান উদ্যাপন, চাকরির ফরম পূরণ, বিবাহিত জীবনের ব্রত অনুষ্ঠান, নতুন ঘরে প্রবেশ কিংবা নতুন কোনো ব্যবসা শুরু করা বর্জন করে থাকেন। কেউ কেউ এমনকি কাজেও বের হন না। একটি আমেরিকান জরিপ মতে, (এই প্রকারের অনাকাঙ্খিত জরিপ কার্য সমাপনের জন্য তাদের যথেষ্ট সময় এবং শক্তি সর্বদাই বর্তমান থাকে!) ৮ শতাংশ জনগণ ১৩ সংখ্যাকে খুবই ভয় করেন, বিশেষত যদি সেটি আবার শুক্রবার হয়। তাই মানসিক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কতাগণ এই বিশেষ রোগের পূর্ণ ও বিস্তৃত ব্যাখ্যার জন্য এর নাম দিয়েছেন প্যারাস্কিভাইডেকাট্রিয়াফোবিয়া প্যারাস্কিভাই মানে ফ্রাইডে (শুক্রবার), ডেকা মানে ১০, ট্রিয়া মানে ৩ এবং ফোবিয়া মানে ভয়।
২১ শতকের শুরুতে এই ভয় সম্পর্কিত তথ্য কোনো গ্রন্থ যেমন ‘ডিকশনারি অব মডার্ন ফ্যাবল’ এ উল্লেখ ছিল না, কিন্তু কয়েক বছর পর এটি খুবই প্রসিদ্ধি লাভ করে। বিশেষত নাবিকগণ খুবই কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে থাকেন। অনেকেই শুক্রবার জাহাজ ছাড়তে রাজি হন না। এই প্রসঙ্গে একটি খুবই বিখ্যাত এবং প্রচলিত একটি কাহিনি রয়েছে, ১৮ শতকে একজন ব্রিটিশ নাবিক এইচ.এম.এস. ফ্রাইডে নামক একটি জাহাজের কার্যভার গ্রহণ করেন। তিনি নতুন সেই জাহাজের জন্য নাবিক নির্বাচন করেন কোনো এক শুক্রবারে। জাহাজের ক্যাপ্টেন হিসেবে নির্বাচন করেন জেমস ফ্রাইডে’কে এবং জাহাজের চলাচল উদ্বোধন করেন শুক্রবারে। এরপর, একদিন কোনো এক শুক্রবার সকালবেলায় সেই জাহাজটি তার প্রথম যাত্রাতেই চিরতরে হারিয়ে যায়।
কিছু মানুষ শুক্রবার, ১৩ তারিখকে নিজেদের দুর্ভাগ্য হিসেবে মনে করেন কেননা অতীতে তারা দুর্ভাগ্যজনক কোনো অভিজ্ঞতার সম্মুখিন হন এই দিনে। যদি আপনি ১৩ তারিখ কিংবা শুক্রবারে কোনো কিছু হারান, সেই দিনটি আপনার মনে গেঁথে থাকবে। কিন্তু আপনি যদি সর্বদাই ভাবতে থাকেন যে, ১৩ তারিখ শুক্রবার আপনার জন্য দুর্ভাগ্য নিয়ে আসবে তবে আপনি সর্বদাই ছোট ছোট ত্রুটিতেও দুর্ভাগ্য খুঁজে পাবেন।
শুক্রবার, ১৩ আগস্ট, ১৯৬৫, সকাল ৯ টা এমভি জলদূত, সিন্ধিয়া স্টিম নেভিগেশন কোম্পানির একটি কার্গো জাহাজ ভারত ছেড়ে নিউইয়র্ক, আমেরিকার উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করে। সেই জাহাজের একটি কেবিনে ছিলেন শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ। এই বাঙ্গালী বৃদ্ধ ভদ্রলোকের বয়স তখন ৬৯ এবং তিনি সৌজন্যবোধক একটি টিকেট পেয়েছিলেন।
তাঁর ডায়েরিতে ভক্তিবেদান্ত স্বামী লিখেছিলেন, “এই কেবিনটি খুবই আরামদায়ক, শ্রীমতী মোরারজীকে (জাহাজের মালিক) জ্ঞানলোক প্রদান করে এই সকল ব্যবস্থা প্রদান করার জন্য ভগবান শ্ৰীকৃষ্ণকে ধন্যবাদ ।
কিন্তু ১৪ তম দিবসে তিনি লিখলেন, “সামুদ্রিক অসুস্থতা, ঝিমানোভাব, বমি হচ্ছে। প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে, আরো অসুস্থ লাগছে।” ১৯ তম দিবসে, যখন জাহাজটি সিলনের (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) কলম্বোতে পৌঁছল, ভক্তিবেদান্ত স্বামী সামুদ্রিক পীড়া থেকে মুক্ত হলেন। জাহাজের ক্যাপ্টেন তাকে তীরে নিয়ে এলেন এবং গাড়িতে তারা কলম্বো ঘুরে দেখলেন। এরপর জাহাজটি ভারতের পশ্চিম অংশ কোচিনে এসে পৌঁছায়। সেই বছর ২০ আগস্ট তারিখে তিনি জাহাজে জন্মাষ্টমী উদ্‌যাপন করেন। ভক্তিবেদান্ত স্বামী নাবিকদের কাছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দর্শন প্রচার করেন এবং নিজে রান্না করে প্রসাদ বিতরণ করেন। ২১ আগস্ট সাগরে তাঁর জন্মদিন (কোনো উদ্‌যাপন ছাড়া) অতিবাহিত করেন। সেই সময় ভক্তিবেদান্ত স্বামীর শ্রীমদ্ভাগবত ভাষ্য সম্বলিত গ্রন্থের ট্রাঙ্ক বোম্বে থেকে কোচিনে এসে পৌছায় । যাত্রার ২৩ তম দিনে সেই জাহাজটি লোহিত সাগরে এসে পৌছায় যেখানে ভক্তিবেদান্ত স্বামী নানা সমস্যায় পতিত হন। তিনি ডায়েরিতে লিখেন, “বৃষ্টি, সামুদ্রিক পীড়া, ঝিমানো, মাথা ব্যাথা, ক্ষুধামন্দা, বমি হচ্ছে।” উপরোক্ত লক্ষণগুলোর চেয়েও অধিকতর কষ্ট তিনি পাচ্ছিলেন। তিনি বুকে এমন ব্যাথা পাচ্ছিলেন যেন মনে হয় যেকোনো মুহূর্তে তাঁর মৃত্যু হতে পারে। দুইদিনে তিনি দু’বার হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তিনি সেই কষ্টকর পরিস্থিতি সহ্য করেন, তাঁর সেই যাত্রার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধ্যান করার মাধ্যমে । দুইদিন যাবৎ সেই কষ্টকর পরিস্থিতি মোকাবেলা করার পর তিনি ভাবলেন, আর যদি একবার এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতো তাহলে তিনি অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারতেন না।
এই সবকিছু কি এইজন্যই হচ্ছে যে, তিনি ১৩ তারিখ শুক্রবার যাত্রা শুরু করেছিলেন? অবশ্যই নয়। এই সম্পর্কে ভক্তিবেদান্ত স্বামী (পরবর্তীতে ভালবেসে তার শিষ্যরা তাকে শ্রীল প্রভুপাদ বলে সম্বোধন করেছিলেন) বলেছিলেন, “জাহাজের ২য় রাত্রিতে আমি একটি স্বপ্ন দেখলাম। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, তার বিভিন্ন রূপে স্বয়ং সেই জাহাজের কাণ্ডারী হিসেবে ছিলেন এবং তিনি আমাকে বললেন আমার কোনো ভয় নেই। আমি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সুরক্ষা নিয়ে নিশ্চিত ছিলাম এবং এরপর পুনরায় আমাকে সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়নি।”
পরবর্তীতে শ্রীল প্রভুপাদ অত্যন্ত সফলতার সাথে সমগ্র বিশ্বব্যাপী কৃষ্ণভক্তদের জন্য একটি সোসাইটি, শত শত মন্দির, কৃষ্ণপ্রসাদের জন্য রেস্টুরেন্ট, ফার্ম কমিউনিটি স্থাপন করেন, আশিটির মত বৈদিক গ্রন্থ রচনা ও ভাষান্তর করেন যা তাঁর শিষ্যদের মাধ্যমে কোটি কোটি সংখ্যায় সমগ্র বিশ্বে বিতরিত হচ্ছে। তাই শ্রীল প্রভুপাদের ক্ষেত্রে কোন আনলাকি সংখ্যা কিংবা তারিখ নেই। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুদ্ধ ভক্ত হলে তিনি তাঁর ভক্তদের সমস্ত রকমের ভয় থেকে উদ্ধার করেন।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here