ফেয়ার এন্ড লাভলী

0
30

শ্যামানন্দ দাস

আমার মনে পরে কলেজে থাকার সময় আমি একটা সৌন্দর্য বৃদ্ধির ক্রিম ফেয়ার এন্ড লাভলী সম্পর্কে জানতাম। এই ফেয়ার এন্ড লাভলী ক্রিমটির বিশেষ লক্ষ্য ছিল যুবতী নারীদের প্রতি যারা তাদের কলো চেহারার জন্য বিয়ের বাজারে পিছিয়ে ছিল। আর সেই ক্রিমটি এখন আরো নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। তারা এমনকি একটি নতুন ফেয়ার এন্ড হ্যান্ডসাম ক্রিমও উদ্ভাবন করেছে। তবে এবার লক্ষ্য হল পুরুষরা।
আমাদের সবারই সুন্দর একটা গায়ের রঙ থাকার প্রতি স্বভাবজাত আকর্ষণ রয়েছে। এই বিষয়টি সম্পর্কে ভারতে (বাংলাদেশেও) প্রত্যেকেই বেশ সচেতন এবং যদিও কেউ ব্যাপারটি জনসমক্ষে তুলে ধরতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে, তবুও এ বিষয়ে তাদের শক্তিশালী ব্যক্তিগত মতামত রয়েছে। যাহোক যখন জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক ভারতীয় ব্যবহারকারীদের জন্য একটি বিশেষ দরখাস্ত নিবেদন করেছিল, তখন প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। সমস্ত ভারতীয় ফেইসবুক ব্যবহারকারীদের জন্য একটি বিশেষ দরখাস্ত প্রদান করতে হচ্ছিল, যারা তাদের ফেইক প্রোফাইলে সুন্দর চেহারার অধিকারী হিসেবে দেখতে চেয়েছিল। যদি নিজেদের চেহারার রঙ বা সৌন্দর্য নিয়ে অনেক ভারতীয়দের গোপন বাসনা থাকে তবে ফেইবুককে সাধুবাদ জানাতে হয় যে, তাদেরকে বিষয়টি প্রকাশ করতে সহায়তা করার জন্য। কিন্তু প্রেক্ষাপট সেটি ছিল না।
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দিব্যদেহকে কৃষ্ণবর্ণ বা কালো বর্ণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সংস্কৃতি শব্দ ‘কৃষ্ণ’ মানে ‘কালো’। অপরদিকে সেই কালো ভগবান কৃষ্ণকে বর্ণনা করা হয়েছে পরম আকর্ষক হিসেবে। বৈদিক সাহিত্যে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, বৃন্দাবনের সমস্ত গোপী, দ্বারকার রানিরা এবং অন্যান্য সাধারণ নারীরা সবাই সেই কালো শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আকর্ষিত হয়েছিল। অতএব, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কালো বর্ণ মোটেই সাধারণ ছিল না। সৃষ্টিকর্তা ব্ৰহ্মা (বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মৌলিক সৃষ্টিকর্তা, যিনি নিজেও সুদর্শন ছিলেন) কৃষ্ণের সৌন্দর্যকে বর্ণনা করেছেন কন্দর্প-কোটি-কমনীয়ম (যে সৌন্দর্য কোটি কোটি কামদেবের সম্মিলিত সৌন্দর্যকে পরাভূত করতে পারে)।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের পূর্বে দেবকীর গর্ভে থাকার সময় দেব-দেবীরা এই প্রার্থনা নিবেদন করেছিলেন, “প্রিয় প্রভু, যখন আপনি বিভিন্ন অবতারে আবির্ভূত হন, তখন ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে আপনার বহুবিধ নাম ও রূপ থাকে। আপনার অপ্রাকৃত নাম হল ‘কৃষ্ণ’। কেননা আপনি হলেন সর্ব আকর্ষক। আপনার অপ্রাকৃত সৌন্দর্যের কারণে আপনাকে শ্যামসুন্দর নামে অভিহিত করা হয়। ‘শ্যাম’ অর্থ ‘কালো বা কৃষ্ণবর্ণ’, তবুও আপনার সৌন্দর্য সহস্র সহস্র কামদেবের সৌন্দর্যের চেয়েও অতীব সুন্দর। যদিও আপনি জলভরা মেঘের রঙের ন্যায় আবির্ভূত হয়েছিলেন, কেননা আপনি হলেন পরম অদ্বিতীয়। আপনার সৌন্দর্য কামদেবের সৌন্দর্যের চেয়েও বহু বহু গুণ আকর্ষনীয়। আপনি গিরিধারী নামেও পরিচিত কেননা আপনি গোবর্ধন নামে একটি পর্বত উত্তোলন করেছিলেন। আপনাকে অনেক সময় নন্দনন্দন, বাসুদেব বা দেবকীনন্দন নামেও সম্বোধন করা হয়। কারণ আপনি নন্দ মহারাজ, বাসুদেব বা দেবকীর পুত্র রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। নির্বিশেষবাদীরা মনে করে যে, আপনার নাম অথবা রূপ বিশেষ কর্ম এবং গুণানুসারে প্রদান করা হয়েছে, কেননা তারা আপনাকে জাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণ করে।”
বাহ্যিক চেহারার রঙ উন্নত করার প্রচেষ্টাটি একটি অর্থহীন প্রচেষ্টা। এটি দেহাত্মবুদ্ধির একটি নিদর্শন। কৃষ্ণভাবনা হল দেহগত চামড়ারও উর্ধ্বে। শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার সর্বপ্রথম শিক্ষা হল যে, আমরা এই দেহ নই বরং চিন্ময় আত্মা। আত্মাই হল চেতনার উৎস। কেউ যদি একজন ব্যক্তির শুধু পরনের কাপড়ের প্রতি আগ্রহী হয় তবে সেটি সঠিক বুদ্ধিমত্তার নিদর্শন নয়। আমরা অতীতে বহু শরীর পেয়েছি এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের অনেক শরীর পাব (যদি আমরা অজ্ঞতার অন্ধকারে থেকে যাই)। অতএব, আমরা যদি আমাদের বর্তমান দেহ নিয়েই মগ্ন থাকি, তা সেই কালো, সাদা কিংবা হলুদ শরীর যাই হোক না কেন, সেটি শুধুমাত্র এই সকল ক্রিম উৎপাদনকারীদের কর্তৃক প্রতারিত হতে থাকবে। 


 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, এপ্রিল -জুন ২০১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here