পড়ালেখার চাপে ভুগছেন?

0
574

বিবিসি ও প্রথম আলো অবলম্বনে: নেহা সাওয়ান্তদের বাড়িতে এখন পিনপতন নীরবতা। ছোট ফ্ল্যাটটিতে জীবনের কোন ছোঁয়া নেই। অথচ কিছুদিন আগেও ১১বছরের মেয়েটি হইচই করে সারা বাড়ি জমিয়ে রাখত। মাতিয়ে রাখত সবাইকে হাসি-খেলায়। তার অভাব এখন পুরো বাড়িতে। মেয়েটিকে একদিন তাদের বাড়ির জানালায় মৃত অবস্থায় ঝুলে থাকতে দেখা যায়। নেহা সাওয়ান্ত ছিল একজন টিভি তারকা। সনি টেলিভেশনের বগি উগিসহ তিনটি চ্যানেলে নাচের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল সে। মা-বাবার বকাঝকা, পরীক্ষায় ভালো ফল করতে না পারা, নাকি বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ঝগড়া? কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিল ১১ বছরের নেহা? তার পরিবার এখন খুঁজে ফিরছে এসব প্রশ্নের উত্তর। নেহার মা-বাবার জীবনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। তার দাদি এখনো ঘটনাটি বিশ্বাস করতেই পারছে না। শুধু নেহা নয়, ভারতের বড় শহরগুলোতে অনেক কিশোর-কিশোরীই বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ। গত ৫ জানুয়ারি মুম্বাইয়ের একটি বিদ্যালয়ের শৌচাগারে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে ১২ বছরের কিশোর সুশান্ত পাতিল। কেন, কী কারণে তারা জীবন থেকে এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তা বুঝে উঠতে হিমশিম খাচ্ছেন অভিভাবকরা। বিবিসি এক জরিপে দেখা গেছে, ভারতে প্রতিবছর এক লাখ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে কেবল মুম্বাইতেই দিনে গড়ে তিনজন আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সীরাই আত্মহত্যা করছে বেশি। ওয়াল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের সহকারী মহাপরিচালক ক্যাথরিন লক্ষগলস-কামু বলেন, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও আবেগতাড়িত হয়েই মানুষ আত্মহত্যার প্রবণতা কমিয়ে মানুষকে জীবনমুখী করতে মুম্বাই নগরের কর্মকর্তারা এরই মধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছেন। মুম্বাইয়ের সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকেরা চেষ্টা করছেন ছাত্রছাত্রীদের জীবনমুখী করে তুলতে। কোমলমতি কিশোর-কিশোরীদের অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ না দিতে অভিভাবকদের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। এমনকি শচীন টেন্ডুলকার বা বিনোদ কাম্বলিদের মতো ক্রিকেট তারকারা বিদ্যালয়ে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের উজ্জীবিত করছেন। তবে এত চেষ্টা ও উদ্যোগের পরও শেষরক্ষা হচ্ছে না। ভারতে একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেই চলেছে। মুম্বাইয়ের আl নামের একটি হেল্পলাইন অনেক দিন ধরেই কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ে কাজ করছে। হেল্পলাইনটির পরিচালক জমসন থমাস বলেন, বন্ধুদের চাপ, মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগের অভাব। সম্পর্কের ভাঙ্গন, পড়াশোনার চাপ ও ব্যর্থ হওয়ার ভীতির কারণেই বেশির ভাগ শিশু-কিশোর আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এ ধরণের বাস্তবতারই প্রতিফলন ঘটেছে ভারতে সম্প্র্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত থ্রি ইডিয়টস চলচ্চিত্রে। জোর করে প্রকৌশলবিদ্যা পড়ানোর কারণে সেখানে এক কিশোরকে হতাশায় আত্মহত্যা করতে দেখা গেছে। অনেকেই অভিযোগ করেন, চলচ্চিত্রটি কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যার প্রবণতাকে আরও উসকে দিয়েছে। তবে মুম্বাইয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রিয়া টিমবেকার কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করে এ অভিযোগ উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, এই চলচ্চিত্র থেকে মা-বাবাদের শেখা উচিত যে সন্তানদের ওপর বেশি চাপ দেওয়া উচিত নয়। রিয়া এরকম প্রচণ্ড চাপের একটি উদাহরণও দেন। পরীক্ষায় প্রথম স্থান না পেয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করায় এক শিশুকে চার দিন না খাইয়ে রেখেছিল, তার মা-বাবা। এ ধরণের মা-বাবার রীতিমতো মানসিক চিকিৎসা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। মা-বাবাকে বুঝতে হবে, আজকের কিশোর-কিশোরীরা অনেক বেশি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তারা অনেক বেশি সচেতন ও বর্হিমুখী। এখন ১১ বছরের কিশোর-কিশোরীরাই অতীতের ১৪-১৫ বছরের কিশোর-কিশোরীদের মতো পরিণত মানসিকতার অধিকারী। আর এই পরিণত মানসিকতাকে সম্মান দিয়েই ছেলেমেয়েদের বড় করে তোলা প্রত্যেক মা-বাবার দায়িত্ব। মুম্বাইয়ের মতো নগরে, যেখানে সাধারণত মা ও বাবা দুজনেই কাজ করেন সেখানে সন্তানেরা একাকীত্ব ভোগে আর খুব বেশি টেলিভিশন দেখে সময় কাটায়। মা-বাবা যদি শর্তহীনভাবে তাদের সব ধরণের ব্যর্থতা ও সাফল্য মেনে নিয়ে সন্তানদের ভালোবাসেন, তবে এই সমস্যা অনেকখানি কমে যাবে বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞানী দিলীপ পানিকার।
বাংলাদেশেও যতটা না পড়া যায় ছেলে-মেয়েরা চাপ অনুভব করে তার চেয়েও অনেকগুণ বেশি চাপ অনুভব করে অভিভাবকরাই, আর তখন সেসব অভিভাবকরাই ছেলে-মেয়েদের উপর তাদের চেয়ে অনেকগুণ চাপ প্রয়োগ করে ফলশ্রুতিতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বস্তরের ছেলেমেয়েরা। তাদের জন্য চৈতন্য সন্দেশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কিছু টিপস দেয়া হল। এখন যেসব ছাত্র-ছাত্রী তাদের ক্যারিয়ার গঠনের বা লক্ষ্য পূরণের ব্যর্থতা নিয়ে চরম হতাশায় ভুগছেন তাদের জন্য কিছু টিপস বা উদাহরণ তুলে ধরা হচ্ছে।
বলা হয় যে, ‘একজন জয়ী ব্যক্তি প্রতিটি সমস্যার পেছনে একটি সমাধান খুঁজে, আর একজন পরাজিত ব্যক্তি প্রত্যেক সমাধানের সাথে একটি সমস্যা খুঁজে।
এ বিষয়ে বিশ্বের অতি পরিচিত মুখ হেলেন কিলারের উদাহরণ আনা যায়, যিনি ছিলেন অন্ধতো বটেই তার উপর কানে শুনতেন না। তাও আবার দু’বছর বয়স থেকে কিন্তু এ সমস্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এই ব্যক্তি হলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি কিনা কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন লাভ করে পরবর্তীতে একজন বিখ্যাত লেখক এবং বক্তাও হয়েছিলেন। তিনিও কিন্তু প্রাথমিক অবস্থায় পারিপার্শি¦কভাবে অনেক বাঁধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। কিন্তু তবুও এসব ব্যর্থতা তার কোন কিছুই করতে পারেনি। যেসব ছাত্র-ছাত্রীরা এখন চরম হতাশায় ভুগছেন তারা হেলেন কিলারের দৃঢ়তা থেকে অনুপ্রেরণা পেতে পারেন। মূলত সকল ধরণের হতাশা আসে আমাদের নেতিবাচক বিভিন্ন চিন্তাভাবনা থেকে। তাই মনকে পজেটিভ করুন, শ্রীল প্রভুপাদ ৭০ বছর বয়সে গোটা দুনিয়া ভ্রমণ করেন অনেক প্রতিকুল পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও।
যখন আপনি একটি সুযোগ হাতছাড়া করেন, আপনার চোখ অশ্রুসিক্ত করবেন না কেননা তাহলে আপনার আরও একটি সুযোগ হাতছাড়া করার সম্ভবনা আছে।
কেউই তার অতীতে ফিরে যেতে পারে না এবং খারাপ শুরুটাকে পরিবর্তন করতে পারে না। কিন্তু যে কেউ এখন শুরু করতে পারে এবং একটি ভাল পরিসমাপ্তি করতে পারে। এ ধরনের পজেটিভ দর্শন আপনার মনকে দমন রাকতে পারে। সর্বোপরি নিজের বুদ্ধি দিয়ে মনকে শিক্ষিত করুন।
আইনস্টাইন বলেছিলেন- একজন সফল ব্যক্তি হওয়ার চেষ্টা করো না। কিন্তু পক্ষান্তরে একজন মূল্যবান মানুষ হওয়ার চেষ্টা করো।
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোতে অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীরাই আকাক্সিক্ষত ইনস্টিটিউটে ভর্তি হতে পারে না। তার মানে এটা কি ব্যর্থতা? না, কেননা সফলতা মানে শুধুমাত্র সর্বোচ্চ জিনিসটি পাওয়াই নয়, সর্বোত্তম দেয়াই হল সফলতা।
পরিশেষে, ছাত্র-ছাত্রী এবং অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলব হতাশ হবেন না। সুযোগ হাতছাড়া হলে আরেকটি আসবেই শুধু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি বিশ্বাস ও ধৈর্য রাখতে হবে। সেসাথে আপনার ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে চান তবে কৃষ্ণভাবনা গ্রহণ করার কোন বিকল্প নেই। দেখবেন যদি তারা এ শিক্ষায় শিক্ষিত হয় তবে তারা যে কোন চ্যালেঞ্জ অকপটেই স্বীকার করার মানসিকতা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। কৃষ্ণভাবনামৃতের আন্দোলনের সঙ্গে যারা জড়িত তারা প্রতিদিন ১৬ মালা জপ, বিগ্রহ দর্শন বা অর্চন, হরিনাম কীর্তন, কৃষ্ণকথা শ্রবণের মাধ্যমে জীবনে সঠিকভাবে গড়ে তোলার শিক্ষা দেয়। আপনি নিজেও আপনার ছেলেমেয়েদেরকে এ ভাবনায় যুক্ত করুন। করেই দেখুন না। পরীক্ষা করতে দোষ কি? আপনি নিজেই সবকিছু উপলদ্ধি করতে পারবেন। হরে কৃষ্ণ।

(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ ২০১০ সালে মার্চে প্রকাশিত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here