প্রতি পদক্ষেপেই বিপদ

0
1297

সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী : সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া অনেক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও প্রতিনিয়ত ধ্বনিত হওয়া যুদ্ধের হুংকার এই সবকিছুর আলোকে অনেক লোক বৈদিক সাহিত্যের একটি উদ্ধৃতির সাথে একমত হবেন। তা হলো বিপদ সংকুল এই পৃথিবীর প্রতি পদক্ষেপেই বিপদ। যখন কাউকে সাম্প্রতিক সময়ের বিমান সন্ত্রাসের সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞাসা করা হয় তখন এক আমেরিকান ভীতিময় বিমান ভ্রমণের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেন। এইভাবে, সব জায়গায় সন্ত্রাসীরা ছড়িয়ে রয়েছে, কি স্থলে, কি জলে, কি অন্তরীক্ষে আমরা যেন তাদের সাথেই আছি। যদি আমি কোনো কারণে এই দেশ থেকে পালাতে চাই তারা সেটিও আমাকে করতে দেবে না। আজকের এই অগ্রগতির পথে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া বিশ্বকে বিপদ যেন চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে, যার ফলে আমাদের চিরচেনা পরিবার, বাড়ি হঠাৎ ভূমিকম্পের এক ঝাঁকুনিতেই ধ্বংস হতে পারে। আকাশচারী সন্ত্রাসীদদের খপ্পরে পরা আমার এক আত্মীয়ের কাছে তার অভিজ্ঞতার কথা জানতে চেয়েছিলাম তার স্বীকারোক্তি অনুসারে, “আমরা খুব একটা হৃদয় বিদারক মুহূর্তের মধ্যে অবস্থান করছিলাম, প্রতিটি মুহূর্ত ছিল উদ্বেগ উৎকন্ঠায় ভরা আমি ভাবছিলাম সন্ত্রাসের কাছে এই পৃথিবীটা কত ছোট হয়ে গেছে। বড় বড় মহানগরী হতে শুরু করে ইলিনোয়েসের মত ছোট নগরীর মধ্যে লেগে গেছে সন্ত্রাসের দাবানল।”

এই বিপদসঙ্কুল পৃথিবীতে আমাদের উদ্বেগময় অবস্থার কথা বিবেচনা করুন। শুনলে অবাক হবেন এমন লোকেরাই পৃথিবীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ যারা এখান থেকে পালাবার পথও অনুসন্ধান করে না। তাদের কাছে এখান থেকে পালানোর চেয়ে যৌন সুখ ও একের প্রতি অন্যের আকর্ষণবোধই সবচেয়ে অনুসন্ধানীয়। একজন রক ভক্ত দাবী করেছিলেন, যখন আমরা অনবরত শুনতে থাকি যে, আমেরিকা ও রাশিয়ার কাছে যে পরিমাণ মিসাইল আছে তা দিয়ে পঞ্চাশ বারেরও বেশী বার পৃথিবীকে ধ্বংস করা যাবে তখন যেন আমরা শুনতে পাই শান্ত হও, খোলা মন নিয়ে হলিউডে যাও। জীবনটাকে একটা সিনেমার মত ভাব। আর মুমূর্ষু অবস্থার চেয়ে মৃত্যু হওয়া অনেক ভাল। এই ধরনের প্রক্রিয়া আমাদের অতিমাত্রায় জড় জাগতিক জীবনের প্রতি আসক্তির ফল। ফলশ্রুতিতে আমাদের মন দিন দিন খরগোশের অবস্থার দিকে যাচ্ছে। যে বিপদ দেখলেই চোখ বন্ধ করে বসে থাকে এবং সে ভাবে যেহেতু আমি বিপদকে দেখিনি তাহলে বিপদও আমাকে দেখেনি। মনে প্রশান্তির ভাব নিয়ে আমরা যতই মৃত্যুকে ভুলে থাকার চেষ্টা করি না কেন, মৃত্যু কিন্তু মাদকের ভয়াবহতা, এইডস, যৌনতার নির্মম প্রহারের মাধ্যমে আমাদের নিকটেই এগিয়ে আসছে।
কিছু কিছু লোক জিজ্ঞাসা করতে পারে পৃথিবীতে এমন কোনো লোক কি আছে যারা মাদকের অমোঘ হাতছানি ও যৌনতার কটাক্ষকে পিছু ফেলে আসতে পারে? এরকম লোকের সংখ্যা কম হলেও তাদের অস্তিত্ব পৃথিবীতে নেই এ কথা ভাবা উচিত নয়। আপনি যেসব বিপদের কথা বলছেন এগুলোর হাত থেকে আমার পরিবার পরিজন কি আমাকে রক্ষা করতে পারবে না? আমেরিকান পরিসংখ্যান সংস্থার স্বীকারোক্তি অনুসারে উত্তর হচ্ছে, না।
খোদ আমেরিকার মধ্যেই ১৯৭১-১৯৮০ সালের মধ্যে অনেক ভয়াবহ দূর্ঘটনা ঘটেছে যেগুলোতে কমপক্ষে পাঁচজন আর সর্বোচ্চ শতের ওপরে লোক মারা গিয়েছে। তার বেশিরভাগ ঘটেছে ঘরে আগুন লেগে, মোটর গাড়ি ও বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মাধ্যমে। এই সংখ্যার দ্বিগুণ লোক আহত হয়েছে ঘরের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে, আর এই সংখ্যার পাঁচগুণ লোক আহত হয়েছে রাজপথে। এইভাবে একটি ঘরের সুখ শান্তির চারপাশে বিপদ ওৎ পেতে বসে আছে। তথাপি যুক্তির খাতিরে বলা যায়, মানুষ ঘরেই নিরাপদ মনে করে আশ্রয় করে সে সমস্ত বিপদ হতে রক্ষা পাওয়ার অনবরত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জীবাণু, দূষণ, ক্ষতিকর রশ্মির হাতে থেকে যদি আমরা মৃত্যুকে এড়াতে চাই তবে তা পৃথিবীর বাইরে গিয়েও বোধহয় সম্ভব নয়। আমরা হাওয়ার্য হাকমের কথা চিন্তা করি না কেন। যিনি। নিজেকে লাসভেগাসের অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত এক হোটেলের মধ্যে রেখেছিলেন এবং তার সেবকরা খুব নিখুঁতভাবে শোধন করতো যা সে স্পর্শ করবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তার সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। মৃত্যু তার কাছে কোনো ইঙ্গিত না দিয়ে এসেছিলো। তার মৃত্যু হয় অজ্ঞাত এক কারণে। কেউ মৃত্যুরর হাত থেকে রেহাই পাবে না। কেননা যে মর্ত্যলোকে আমরা বাস করছি তাকে বলা হয় মৃত্যুলোক দুনিয়া।
সাম্প্রতিককালে আমাদের অনেক দেশ নেতা ও সমাজপতিদের অসংযমী চিত্তের কারণে একে অন্যের সাথে যুদ্ধ করার প্রবণতা অনেক বেড়ে গেছে আর যুদ্ধে পারমানবিক শক্তি যথেচ্ছাচার ব্যবহার যা আমাদের অস্তিত্বের পথে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে আর তার সাথে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস তো আছেই। কিন্তু আমরা জরা, মৃত্যু, ব্যাধির সাথে অনবরত যুদ্ধ করেও জয় লাভ করতে পারি না। আমদের সমস্ত শক্তি এই তিনটির বিরুদ্ধে প্রয়োগ করেও এদের টিকিটিও স্পর্শ করতে পারি না।

সর্বোপরি আমরা দেখতে পাই, আমেরিকার মত শক্তিশালী ও সম্পদশালী দেশও খুব অল্প সংখ্যক চরমপন্থিদের হাত থেকে তাদের নাগরিকদের রক্ষা করতে পারে না।
এই অসহায়তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় জরা, ব্যাধি, মৃত্যুর বিরুদ্ধে আমরা কত অসহায় আবার অনেকে জীবনের অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার সাথে যুদ্ধ করে পরাস্ত হয়ার পর নিজে নিজেই মৃত্যুকে আহ্বান করে। আত্মহত্যা এখন অনেক দেশেই আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়ে গিয়েছে।
এখনকার প্রেক্ষাপট এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আত্মহত্যাইই যেন অনন্ত যাতনা থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায়। যেন তেন ভাবে যদি নিজেকে হত্যা করা যায় তবে মনে হয় যেন এই মানসিক ও শারীরিক অসহ্য যাতনা হতে নিস্তার পাওয়া যাবে। সাম্প্রতিক সময়ের অস্তিত্ববাদী দার্শনিকদের মতে আত্মহত্যা মানুষের স্বাধীন চিন্তা চেতনার বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
আসলেই কি তাই? বৈদিক সাহিত্য অনুসারে আত্মহত্যার মাধ্যমে জড় জগতের এই অনন্ত দুঃখের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া যায় না। বরঞ্চ যাতনার পরিমাণ আরো বেড়ে যায়। কেননা, আত্মহত্যার পর নরক যাতনা শেষে তাকে আবার এই মৃত্যুময় সংসারে ফিরে আসতে হবে এবং আত্মহত্যা জনিত পাপের কারণে তাকে এমন এক যোনিতে জন্মগ্রহন করতে হয় যেখানে সে গত জন্মে যে পরিমাণ দুঃখ কষ্টে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল তার চেয়ে শতগুণ বেশী। তাই এই দুর্দমনীয় যাতনার হাত থেকে মুক্তি উপায় হিসেবে যদি আত্নহত্যাকে বেছে নেওয়া হয় তবে তা আমাদের দুঃখ যাতনা কন্টকাকীর্ণ পথকে আরো কন্টকময় করে তোলে।জড়জগতে এই সমস্যা ও বিপদ হতে মুক্তি পেতে চাই আমরা তাহলে প্রথমেই আমাদের অনুসন্ধান করতে হবে এই বিপদ দুঃখ যাতনার উৎসমূল কোথায়? কেনইবা আমরা এই মানব শরীর লাভ করে যাতনা ভোগ করছি।

এই জড় জগতের প্রতিটি প্রাণীর হৃদয়ে পরমাত্না রয়েছে। আমাদের জানতে হবে আমি এই জড় শরীর নয়,আমি চিন্ময় আত্না। এই জানার ফলে জড় জগতের এই ক্ষণস্হায়ী সুখ ও দুঃখ আমাকে আন্দোলিত ও বিচলিত করতে পারে না। যদি আমরা অনন্ত আনন্দ উপভোগ করতে চাই তবে আমাদের অসীম আনন্দের প্রধান উৎসের সাথে সংযোগ স্হাপন করতে হবে,আর এই আনন্দের প্রধান উৎস হলো পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। কেননা জগতের সকল আনন্দ সকল সুন্দরের সৃষ্টি তার মধ্য থেকেই এই জ্ঞান অর্জন করার পন্হা বৈদিক সাহিত্যে বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা নিয়ত পাঠ ও জীবনে অনুশীলনের মাধ্যমে এই জীবনের অবসানে আমাদের নিত্য আলয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারি,শুধুমাত্র তাই নয় এই জীবনে ও জড়জগতে আমাদের নিত্য সাথী বিপদের ভয় ও উৎকন্ঠা থেকে আমরা মুক্ত থাকতে পারি। যদি আমাদের চেতনা সম্পূর্ণরূপে কৃষ্ণভাবনাময় হয় তবে জরা, ব্যাধি, মৃত্যুর হাত হতে অনন্ত সুরক্ষা লাভ করতে পারি। প্রশ্ন হতে পারে, কৃষ্ণভাবনাময় হওয়ার সুবাদে আমরা কখনো বৃদ্ধ, ব্যাধিগ্রস্হ ও মৃত্যুপথযাত্রী হবো না? না,তা নয়, বৃদ্ধ, ব্যাধিগ্রস্হ ও মৃত্যুপথযাত্রী হওয়ার কারণে যে শারীরিক ও মানসিক যাতনা আমাদের ভোগ করতে হতো তা আমাদের শরীর ও মনকে ততটা ভারাক্রান্ত করতে পারবে না যতটা না জড় জাগতিক মনোভাব সম্পন্ন হলো করতো এবং অন্তিমে আমাদের নিত্য আলয়ে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে জড়া,ব্যাধি ও মৃত্যুর হাত থেকে চির সুরক্ষা লাভ করবো।
মহান জ্ঞানী ব্যক্তিও ভীষ্মদেব ও মহারাজ পরীক্ষিতের আধ্যাত্নিক উপলদ্ধি হতে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি মৃত্যুর দ্বার প্রান্ত উপনীত হয়েও তারা কি রকম স্হির,ধীর ও মানসিক প্রশান্তিময় অবস্থায় ছিলেন,তাদের পদাঙ্ক অনুসরন করার মাধ্যমে আমরাও আত্নউপলদ্ধির চরম শিখরে উপনীত হতে পারি।
তাই যখন আমরা মৃত্যুর মুখোমুখি হবো তখন আমাদের বিচলিত ও উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই এবং তখন আমাদের দায়িত্ব ও পরিত্যাগ করার প্রয়োজন নেই। অতি সরল সাধারনভাবে কৃষ্ণভাবনামৃত অনুশীলনের মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনকে স্বার্থক করে তুলতে পারি। এটি একটি নিশ্চিত উপায় যেটি অনুশীলনের মাধ্যমে সে যে শুধু নিজে অনন্ত দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করতে পারে তাই নয় অপরকেও এই মুক্তির ভাগীদার করতে পারে। শ্রীমদ্ভাগবত অনুসারে যদি কেউ যিনি মুক্তিদাতা মুকুন্দ নামে খ্যাত, তার পাদপদ্মকে নৌকা রূপে আশ্রয় করে, এই ভবসমুদ্র তার কাছে গোষ্পদ তুল্য হয়, বা সে অনায়াসেই পারি দিতে পারে, আমাদের সবার অন্তিম লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই দিব্যলোক গোলক বৃন্দাবনের, যেখানে নেই কোনো মৃত্যু, জড়া ব্যাধি নেই প্রতি পদক্ষেপে বিপদের উৎকন্ঠা।হরে কৃষ্ণ।

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ মার্চ ২০১৪ সালে প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here