প্রতিদিন নয় লক্ষ দেবতার পূজা!

0
101

পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনার মাধ্যমে ভগবানের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গরূপ সমস্ত দেব-দেবীর আরাধনা করা সহজতর

শ্যামানন্দ দাস

মহামুনি ব্যাসদেব ব্যাক্তিগতভাবে যোগ্যতা সম্পন্ন ও জিজ্ঞাসু চিত্তের অধিকারী ছিলেন। তাঁর এই মনোভাবের কারণে তিনি সমস্ত বেদ অধ্যয়ন করে অতঃপর তা সংকলন করেন। এতসব পারমার্থিক অপ্রাকৃত তত্ত্ব উপলব্ধির পর তিনি কর্মকাণ্ডীয় জ্ঞান (যেমন- অন্ন দান, বস্ত্র দান, পথ্য দান, শুশ্রুষা দান সহ বিভিন্ন প্রকার রীতি নীতি), কল্পিত জ্ঞান (উপনিষদ সমূহের বিশদ পর্যালোচনার মাধ্যমে), রহস্যময় শক্তি (হঠযোগ) এবং চূড়ান্তভাবে, বিশুদ্ধ চিত্তে ভক্তিমূলক সেবাভাব সম্পর্কিত বিশদ বর্ণনা দিয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন পুরাণে বিভিন্ন দেব-দেবতাগণের পূজা করার জন্য সিদ্ধান্ত দেন৷
বিশাল জনগোষ্ঠীর এই ধর্মে পছন্দ অনুযায়ী যে কোনো পূজা করার স্বাধীনতার ওপর জোর দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য কোনো চাপ প্রয়োগ করা হয় না। এই নীতি অন্যান্যদের নীতির সাথে দ্বন্দ্বভাবযুক্ত। যারা মনে করে, তাদের ধর্ম হচ্ছে একেশ্বরবাদী ও হিন্দুধর্ম হচ্ছে বহু ঈশ্বরবাদী। এই ধারণা হিন্দুধর্মকে (খ্রিস্টান, ইসলাম, ইহুদি ধর্মের ভিন্ন) অগ্রহনীয় প্রাচীন কুসংস্কারময় ধর্মীয় শ্রেণিতে শ্রেণিভুক্ত করে।

এটি কি সত্যি?

হিন্দুধর্মের এই আপেক্ষিক বহু ঈশ্বরবাদী অবস্থান যে বিভ্রান্তির জন্ম দেয় সেই বিভ্রান্তি মীমাংসার জন্য ভারতে নবনির্বাচিত সরকারের উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, যেমন সেখানে অনেক জ্ঞানী মন্ত্রী রয়েছে সেখানে অনেক মন্ত্রী, রাজনৈতিক পণ্ডিত রয়েছে)। কিন্তু সেখানে প্রধানমন্ত্রী একজন। যেহেতু তিনি একজন তাকে বলা হয় “প্রধান”। যেমন সব প্রতিষ্ঠানের । একজন সিইও (Chief Executive Officer) বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আছে। তাই যদি আমরা প্রতিষ্ঠান বা দেশকে এই বিশ্বজগতের সাথে তুলনা করি তখন দেখতে পাই সেখানেও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন। তাহলে সেই ব্যবস্থাপনাটি কীভাবে সুশৃঙ্খল হবে যদি পরিচালনা পর্ষদের সবাই স্বাধীন ও নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণকর্তা বা প্রধান (Boss) বলে দাবি করে? অবশ্যই কিছু ব্যবস্থাপক সাংঘাতিকভাবে ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেন কিন্তু সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেন না। তাদেরও মহাব্যবস্থাপক বা প্রধান ব্যবস্থাপকের অনুগত থাকতে হয়।
শ্রীমদ্ভাগবতে বহুধা শক্তি বিস্তৃত দেবতাগণ ও পরমেশ্বর ভগবানের পদমর্যাদাগত পার্থক্য নিরূপণ করতে বহুশাখা বিশিষ্ট বৃক্ষ ও তার মূলের উদাহরণ উপস্থাপন করেছে। সেখানে আরো একটি উদাহরণ দেয়া হয়েছে পাকস্থলী ও দেহের বিভিন্ন অংশের ।
আমরা কখনো একটি বহু শাখা বিশিষ্ট বৃক্ষের প্রতিটি পত্র, শাখা, পল্লবে জল সিঞ্চন করি না বরং তার মূলে জল সিঞ্চন করলেই সকল পত্র, শাখা, পল্লব, কাণ্ড পরিপুষ্ট হয়ে যায়। একইভাবে আমরা আমাদের পাকস্থলিতে পুষ্টিমান খাদ্য প্রেরণ করেই নিশ্চিন্ত থাকি অন্যান্য অংশে সেই পুষ্টি সরবরাহ হল কিনা সেই দুশ্চিন্তা করতে হয় না। 
বহু ব্যক্তি এই প্রশ্নটি করে থাকেন যে “বিভিন্ন দেব-দেবতাকে পূজা করলে সেটি কি প্রকারান্তে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পূজা হয় না?
যদিও এটি সত্য যে, দেবতাদের উদ্দেশ্য কৃত সকল যাগ-যজ্ঞের চূড়ান্ত ভোক্তা হচ্ছেন শ্ৰীকৃষ্ণ । তথাপিও শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা অনুসারে এই প্রকারের পূজাকে “অবিধিপূর্বকম” বলে অভিহীত করা হয়েছে। যার অর্থ ভ্রান্ত পন্থায় পূজা অর্চনা করা ।
সেটা অনেকটা মহান ব্যক্তির গৃহে প্রবেশাধিকার লাভ করার জন্য দ্বাররক্ষীকে ঘুষ প্রদান করার মত। এই দেবতারা কৃষ্ণের অসীম শক্তির একেকটি প্রকাশ মাত্র। কিন্তু চূড়ান্তভাবে কৃষ্ণ তাঁর যেকোনো সৃষ্টির চেয়েও মহান ও অসীম ক্ষমতাধর। পরমেশ্বর ভগবান পরিষ্কারভাবেই চান যে, সকলেই তাঁর শরণাগত হোক এবং তিনি বলেছেন, জড় কামনা-বাসনা পূরণ করার মাধ্যমে সন্তুষ্টি প্রাপ্তির প্রয়াসে দেব-দেবী পূজা-অর্চনা করা জ্বলন্ত অগ্নিতে ঘি ঢালার সামিল। তাই এটি ইন্দ্রিয় তৃপ্তি বা শান্তি লাভের পন্থা নয় বরং এটি সেই পথ যা আমাদের জড় শৃঙ্খলে বন্দি করে।
যদিও আমরা আমাদের বিভিন্ন প্রয়োজনাদি সরবরাহের জন্য দেব-দেবীগণের নিকট ঋণী। তারপরও কৃষ্ণ যদি তাদের এই রসদাদি সরবরাহের জন্য নির্দেশ ও শক্তি প্রদান না করতেন তাহলে তাঁরা স্বাধীনভাবে আমাদের এই প্রয়োজনসমূহ নিবৃত্ত করতে পারতেন না!
গীতা অধ্যয়নের ফলে আমরা জানতে পারি যে, সকল প্রাকৃত ও অপ্রাকৃত সন্তুষ্টি আসে কৃষ্ণ হতে। তাহলে কেন আমরা দেব-দেবীগণের মুখাপেক্ষী হব?
তদুপরি, শ্রীকৃষ্ণের অর্চনা-বন্দনা অন্যান্য দেব দেবীগণের পূজার্চনা হতে সহজতর। বিশেষ করে বর্তমান কলিযুগে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অবতার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় আমাদের ভক্তিযোগ অনুশীলনের জন্য পূর্বকৃত কোনো অপ্রাকৃত যোগ্যতার প্রয়োজন নেই। আমাদের শুধু সরলভাবে
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।
জপ করলেই চলবে। কেননা জপ আমাদের কৃষ্ণের সাথে সম্পর্ক যুক্ত করে যা সমস্ত আনন্দের উৎস। এটি আমাদের সকল বাসনা পূর্ণ করে আমাদের সন্তুষ্ট করে এবং কৃষ্ণের প্রতি চিন্ময় ও অপ্রাকৃত প্রেম জাগরিত করে।
শ্রীমদ্ভাগবতে ৫/৭/৬ এ সম্পর্কে বলা হয়েছে “বিভিন্ন যজ্ঞের প্রারম্ভিক কার্য সম্পাদন করার পর, মহারাজ ভরত তা ধর্মের নামে ভগবান বাসুদেবকে নিবেদন করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি সমস্ত যজ্ঞ বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণের প্রসন্নতা বিধানের জন্য অনুষ্ঠান করেছিলেন । মহারাজ ভরত বিচার করেছিলেন যে, যেহেতু দেবতারা হচ্ছেন বাসুদেবের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, তাই বৈদিক মন্ত্রে যে সমস্ত দেবতাদের বর্ণনা করা হয়েছে, তিনি তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করেন। এইভাবে চিন্তা করার ফলে মহারাজ ভরত কাম, ক্রোধ, লোভ আদি সমস্ত জড় কলুষ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। পুরোহিতেরা যখন যজ্ঞাগ্নিতে আহুতি প্রদান করার জন্য হবি গ্রহণ করতেন, তখন মহারাজ ভরত অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে হৃদয়ঙ্গম করতেন কীভাবে বিভিন্ন দেবতাদের উদ্দেশ্যে অর্পিত সেই সমস্ত আহুতি ভগবানের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে নিবেদন করা হচ্ছে। যেমন, ইন্দ্র হচ্ছেন ভগবানর বাহু এবং সূর্য হচ্ছে তাঁর চক্ষু । এইভাবে মহারাজ ভরত জানতেন যে, বিভিন্ন দেবতাকে নিবেদিত আহুতি প্রকৃতপক্ষে ভগবান বাসুদেবের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নিবেদন করা হচ্ছে।”
এই শ্লোকের তাৎপর্যে প্রভুপাদ উল্লেখ করেছেন যে- “সমস্ত দেবতারা হচ্ছে ভগবানের বিভিন্ন অংশ, এবং আমরা যদি তাঁদের সেবা করি, তাহলে প্রকৃতপক্ষে আমরা ভগবানেরই সেবা করি। ব্রহ্মসংহিতায় দেব-দেবীদের পূজা করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেই শ্লোকগুলি পরমেশ্বর ভগবান গোবিন্দেরই ভজনা করার নির্দেশ দিচ্ছে যেমন, ব্রহ্মসংহিতায় (৫/৪৪) দুর্গাদেবীর পূজার উল্লেখ করা হয়েছে-
সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়সাধনশক্তিরেকা
ছায়েব যস্য ভুবনানি বিভর্তি দুর্গা।
ইচ্ছানুরূপমপি যস্য চ চেষ্টতে সা
গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি ৷৷
শ্রীকৃষ্ণের আদেশ অনুসারে দুর্গাদেবী সৃষ্টি, পালন এবং বিনাশ কার্য সম্পাদন করেন। শ্রীকৃষ্ণও ভগবদ্‌গীতায় এই তত্ত্ব প্রতিপন্ন করেছেন। ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরম্-“হে কৌন্তেয়, আমার নির্দেশ অনুসারে এই জড়া প্রকৃতি স্থাবর এবং জঙ্গম সমস্ত জীবদের উৎপন্ন করে।” (ভগবদ্‌গীতা ৯/১০)
এই ভাবনা নিয়ে দেব-দেবীদের পূজা করা উচিত। যেহেতু দুর্গাদেবী কৃষ্ণের প্রসন্নতা বিধান করেন, তাই দুর্গাদেবীকে সম্মান প্রদর্শন করা আমাদের কর্তব্য। শিব যেহেতু শ্রীকৃষ্ণেরই অংশ, তাই শিবের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা উচিত তেমনই, ব্রহ্মা, অগ্নি, সূর্যাদি দেবতাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করা উচিত ৷”
উপসংহারে বলা যায়, হিন্দুধর্ম (অথবা বৈদিক সনাতন ধর্ম) বহুঈশ্বরবাদী ধর্ম (যেখানে ঈশ্বরের সকল আকার বা দেবদেবীগণ এক) নয়। কিন্তু এর জ্ঞান উপলব্ধির জন্য পরম্পরার মাধ্যমে আসা জ্ঞান হতে এটি গ্রহণ করা উচিত।
এভাবে হয়তো আপনি প্রতিদিন নয় লক্ষাধিক দেব-দেবীকে পূজা করার মাধ্যমে বছরে তেত্রিশ কোটি দেবতার পূজা সম্পন্ন করতে পারেন!

 

 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, অক্টোবর – ডিসেম্বর ২০১৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here