প্রখ্যাত প্রত্যাখ্যাত

0
505

আনন্দমূর্তি দাস:  যদি কেউ জগন্নাথ মন্দিরের কয়েকশ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করেন, তখন তারা আশ্চর্য হবেন অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিগণ এখানে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। এদের অনেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন আবার অনেকে মন্দিরের আমন্ত্রন প্রত্যাখ্যান করেছেন।
— বিখ্যাত কবি ও সাধু কবির ১৩৮৯ সনে জন্মগ্রহণ করেন। যখন তিনি পুরীতে পৌছেন তখন তিনি তাগিয়া (মুসলিম টুপি) পরিহিত ছিলেন। এটি দেখে পাণ্ডারা তাকে মন্দিরে প্রবেশ করতে বাঁধা প্রদান করেন। একদিন জগন্নাথ পাণ্ডাদের স্বপ্নে এসে কবিরকে মন্দিরে প্রবেশ অধিকার প্রদানের জন্য আদেশ দিলেন, এছাড়াও তাকে সন্মান প্রদর্শন করতে বললেন। পাণ্ডারা এরপর কবিরকে খুঁজতে বের হলেন এবং পরিশেষে কবির মন্দিরে জগন্নাথের দর্শন লাভ করলেন।
— গুরু নানক ১৫০৮ সনে তার এক মুসলিম শিষ্য মর্দনকে নিয়ে পুরীতে আসেন। যখন তারা জগন্নাথ পুরীতে প্রবেশ করতে চাইলেন তখন পাণ্ডারা মর্দনকে দেখে বললেন গুরু প্রবেশ করতে পারলেও তারা তাঁর শিষ্য মর্দনকে প্রবেশাধিকার দিলেন না। স্থানীয় লোককথা অনুসারে, গুরু নানক এরপর স্বর্গদ্বারের সন্নিকটে অবস্থিত পুরী সমুদ্রে গমন করেন এবং তিনি সেখানে জগন্নাথের নিকট প্রার্থনা জানালেন। এদিকে মর্দন ক্ষুদার্থ হয়ে মন্দিরে প্রবেশ করে প্রসাদ গ্রহণ করতে না পারার জন্য গুরুকে দোষারোপ করলেন। সন্ধায় অদ্ভুতভাবে একজন আবির্ভূত হয়ে সোনার থালায় তাদের অপ্রতুল খাবার ও সুস্বাধু জল প্রদান করল। একই রাত্রিতে পুরীর রাজা স্বপ্নে দেখলেন জগন্নাথদেব স্বয়ং পুরী সমুদ্রের গিয়ে এক সাধুকে প্রসাদ দিয়েছিলেন। পরবর্তী দিন যখন পূজারীগন জগন্নাথকে জাগ্রত করতে গেলেন তখন সকলে দেখলেন জগন্নাথের সোনার থালা আর সেখানে নেই। তৎক্ষণাৎ চর্তুদিকে শোরগোল শুরু হল এবং রাজাকে এই বিষয়ে জানানো হল এবং মন্দিরে আসতে অনুরোধ জানানো হল। রাজা হাস্য সহকারে পুরী সমুদ্রের উদ্দেশ্য রওনা হলেন। সেখানে উপস্থিত হয়ে তিনি গুরু নানককে প্রণাম নিবেদন করেন। তখন গুরু নানক রাজাকে বললেন, “শ্রীজগন্নাথ শুধুমাত্র হিন্দুদের কিংবা পুরীর ভগবান নন, তিনি সকলের ভগবান। ” পরে রাজা গুরু নানক এবং তার অনুসারীদের জগন্নাথ মন্দিরে প্রবেশের অধিকার প্রদান করলেন। সেই দিন থেকে গুরু নানকের অনুসারি শিখ ধর্মের মানুষ জগন্নাথ মন্দিরে প্রবেশ করতে পারে।
— ১৮৮৯ থেকে ১৯০৫ পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের বড়লাট ছিলেন লর্ড কার্জন। তিনি হলেন প্রথম ব্রিটিশ ব্যক্তি যিনি ভারতের ভূগোল, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব আগ্রহী ছিলেন। ১৯০০ সালে যখন তিনি পুরী মন্দিরে পৌছান তখন তাকে মন্দিরে প্রবেশ করতে বাঁধা দেওয়া হয়।
— যখন ১৯৩৪ সালে মহাত্মা গান্ধি এবং তার শিষ্য বিনোবাভাব ও অন্যান্য মুসলিম, খ্রিস্টান ও দলিতদের নিয়ে পুরী প্রবেশ করতে চাইলেন তখন তাদের বাধা দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে গান্ধি একটি পদযাত্রা করেন যার নাম ছিল হরিজন পদযাত্রা। গান্ধিজি প্রশ্ন করেন, কেন ভগবানের মন্দিরে মানুষে ভেদাভেদ থাকবে?
— বিশ্বনাথ দাস (১৮৮৯-১৯৮৪) ভারতের অন্যতম সংবিধান রচয়িতা এছাড়াও তিনি ১৯৭১-৭২ সালে উড়িষ্যার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি মহাত্মা গান্ধিকে অনুসরণ করতেন। দলিত ও অহিন্দুদের মন্দিরে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় না বলে তিনি মন্দিরে প্রবেশ করেন নি কখনো।
— পিরালী ব্রাহ্মণ গোত্রীয় ছিলেন বিধায় নোবেল পুরষ্কার জয়ী বাঙ্গালী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পুরী মন্দিরে প্রবেশ করতে পারেন নি।
— যদিও তিনি তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ভারতের প্রথম প্রধামন্ত্রী জহরলাল নেহেরুর সন্তান। তথাপিও ১৯৮৪ সালে তাকে পুরী মন্দিরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। কেননা তিনি একজন পার্সি, ফিরোজ গান্ধিকে বিয়ে করেছিলেন। পরে তিনি রঘুনন্দন লাইব্রেরী থেকে মন্দির দর্শন করেন।
— থাইল্যান্ডের প্রিন্স মহাচক্রি সিরির্ধোণ ২০০৫ সালে মন্দিরে এলে একজন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বলে মন্দিরে প্রবেশাধিকার পান নি।
— ২০০৬ সালের মে মাসে সুইজারল্যান্ডের অধিবাসী এলিজাবেথ জিগলার জগন্নাথ মন্দিরে ১ কোটি ৭৮ লাখ রুপি দান করেন। এটি ছিল একজন কর্তৃক জগন্নাথ পুরীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ দান। কিন্তু পা-ারা সেই জিগলারকে ও মন্দিরে প্রবেশ করতে দিলেন না কেননা তিনি জন্মগতভাবে খ্রিস্টান ছিলেন।
— ১৯৫৮ সালে আমেরিকায় জন্মগ্রহণকারী ফায় রাইট হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত হয়ে দয়া মাতা নাম ধারণ করেন। ভারত কৃষ্ণ তীর্থের অনুরোধে পুরী মন্দির দয়ামাতাকে মন্দিরে প্রবেশ করতে দেয়। তিনি হলেন একমাত্র অহিন্দু যিনি মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি পান। তবে আবার ১৯৬৪ সালে সেই অধিকার বন্ধ করে দেওয়া হয়।
— ১৯৭৭ সালের জানুয়ারী মাসে এ.সি.ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদকে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সকল পাণ্ডা ও বিদ্ধান ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য প্রবচন প্রদানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে প্রভুপাদ সেই আমন্ত্রন প্রত্যাখ্যান করে প্রস্তাব দেন যদি তাঁর পাশ্চাত্যবাসী শিষ্যদের মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় তবে তিনি সেখানের আমন্ত্রন গ্রহণ করবেন।
পুরীতে সকলের প্রবেশ অধিকার প্রদানের জন্য অনেকে অনেকভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, তিনি সকলেই ব্যর্থ হয়েছেন। উড়িষ্যার প্রধানমন্ত্রী জানকি বল্লভ পাটনায়েক ১৯৯৬ সালে এই বিষয়টি নিয়ে বির্তক উত্থাপন করেন কিন্তু তার প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। তিনি বলেন, “এটি খুবই দুভার্গ্যজনক যে, ভগবান জগন্নাথ হলেন জগতের নাথ, কিন্তু তার মন্দিরে অনেকের প্রবেশ অধিকার নেই। সেই দিন কখন আসবে যখন সকলেই হাতে হাত রেখে মন্দিরে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে।”
তবে সমগ্রবিশ্ব যেন জগতের নাথ জগন্নাথের কৃপা পেতে পারে তাই সমগ্রবিশ্বে ভগবান জগন্নাথের মন্দির স্থাপন ও পাশ্চাত্য জগতে রথযাত্রার প্রবর্তন করেন আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্‌কন) এর প্রতিষ্ঠাতা আচার্য কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ। শ্রীল প্রভুপাদের কৃপায় এই রথযাত্রা উৎসব পুরীর গণ্ডি পেরিয়ে এখন সমগ্রবিশ্বে পালিত হচ্ছে এবং জগতের নাথ জগন্নাথের নাম সার্থক হচ্ছে।হরেকৃষ্ণ।

(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ জুলাই ২০১৮ সালে প্রকাশিত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here