প্রকৃত সেলফি নিখুঁত ফোন

0
67

আমাদের প্রকৃত সত্তাকে খুবই স্পষ্টভাবে উপলব্ধির জন্য সহায়ক পথ নির্দেশনা

নন্দ দুলাল দাস

একটা সময় ছিল যখন Deficit Hyperactivity Disorder ( ADHD) নামে একটি রোগের প্রাদুর্ভাব ছিল। এই আচরণগত সমস্যার একটি উপসর্গ হচ্ছে কাজের সময় কিংবা কথোপকথনের সময় যথেষ্ট মনোযোগী না হওয়া এবং সবকিছু ঝোঁকের বশে করা ইত্যাদি। এই মানসিক ভারসাম্যহীনতা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছোটদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। বিশেষত, যে সমস্ত কোমলমতি শিশুরা তাদের অপরিণত বয়সে অত্যধিক পরিমাণে আধুনিক যন্ত্র যেমন মোবাইল, ভিডিও গেইম, ইন্টারনেট ইত্যাদির প্রতি অস্বাভাবিকভাবে আসক্ত। এই আসক্তির ফলে শিশুদের মনে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রবাহিত হয়। তারা ইন্টারনেট থেকে সাধারণভাবে যে সকল তথ্য লাভ করে তা তাদের অপরিণত মন ও দেহকে বিক্ষুব্ধ করে। ফলে মন সর্বদাই বিশৃঙ্খল ও বিচলিত থাকে এবং সে কখনো কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজে পূর্ণ মনোনিবেশ করতে পারে না। খুব শীঘ্রই মেধাবী শিশুটি হয়ে পড়ে রাগী, বদমেজাজী এবং খিটখিটে।
দিন দিন এই রোগের পরিণতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। বর্তমানে অন্যতম একটি সমস্যা হল অত্যধিক অন্তর্মুখী মোহে আবদ্ধ থাকা। বর্তমান যুগটিই সেলফি যুগ।
আমরা এমন এক সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, যখন বিভিন্ন ওয়েব সাইট আনলিমিটেড স্টোরেজ সুবিধা দিচ্ছে যা ব্যবহার করে আমরা যেকোনো বিষয়ের বা সময়ের আনলিমিটেড ছবি সংরক্ষণ বা শেয়ার করতে পারি। বর্তমানের মোবাইল ফোনগুলো কল্পনাতীত উপায়ে সেলফি তোলার সুবিধা দিয়ে বাজারে ছাড়ছে।
সেলফির সাহায্যে নিজের ছবি তোলার মাধ্যমে মূলত আমাদের আত্মকেন্দ্রীক প্রবণতা এবং স্বার্থপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেলফি যুগের কারণে আমরা জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এমনভাবে ক্যামেরা বন্ধী করতে চাই ঠিক যেন আমরা কোনো সেলিব্রেটি। ভগবানের নাম জপ করার চেয়ে আমরা চাই যেন মানুষ আমাদের নাম জপ করে।
এই প্রবণতা আমাদের কোন্ দিকে ধাবমান করছে? আমরা বর্তমানে হতাশার সর্বোচ্চ শৃঙ্গে অবস্থান করছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ারকৃত আমাদের সেলফি যদি লাইক বা ভোট না পড়ে তবে আমরা হতাশায় নিমজ্জিত হই। আমাদের নির্দিষ্ট ক্ষেত্র ব্যতিরেকে ভিন্নতর কিছু করার প্রবণতা হ্রাস পাচ্ছে। যেহেতু অধিকাংশ মানুষের অজানা ‘আমি কে?’ সেহেতু সামাজিক যোগাযোগের অজানা অচেনা মাধ্যমে অপরিচিত কারো কাছ থেকে সৌহার্দ্য পাওয়ার ইচ্ছাটা হাস্যকর কল্পনামাত্র।
নিজেদের ছবির মায়া মোহে আবিষ্ট হওয়ার মধ্যে কি কোনো ভুল আছে? বিখ্যাত চিত্রশিল্পি রেমব্রেন্ড তাঁর নিজের চেহারার চিত্রকর্ম তৈরিতে বিখ্যাত ছিলেন। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (২/১৩, ২/৫৬, ২/৭০ এবং ৫/১৮) আত্মজ্ঞান সম্পর্কে বলা হয়েছে। নিজেকে জানার এবং উপলব্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভগবদ্গীতার নির্দেশনা অনুসারে নিজেকে জানার অর্থ হলো আত্মতত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা, নিজের দেহের প্রতি আসক্ত হওয়া নয়। আত্মচিন্তা বা স্বার্থপরতা আমাদের দৈন্যতা থেকে বহু দূরে সরিয়ে রাখে। আমরা যদি নিজেদের প্রতি অত্যধিক আসক্ত হই তবে সকল মানুষের জন্য কল্যাণকর কিছু করে যেতে পারব না। প্রকৃতপক্ষে অন্যের প্রতি সেবাভাব আমাদের চরিত্র এবং স্বকীয়তাকে অনেক বেশি উজ্জ্বল করে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়ে আত্মগৌরবাপন্ন ধৃতরাষ্ট্র ও দুর্যোধনের কথা উল্লেখ আছে। অর্জুন ভগবদ্গীতার প্রারম্ভে দেহগত সম্পর্ক নিয়ে বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন, যদিও তার কথোপকথনে ধর্মীয় আদর্শ ছিল। ধৃতরাষ্ট্র দুর্যোধনকে সিংহাসনে বসিয়ে রাজকীয় আমোদ-প্রমোদ উপভোগ করার বাসনা করেছিলেন। তার অন্ধত্ব দেহকে ভেদ করে তার মনের গভীরে প্রবেশ করেছিল। পারমার্থিকতা বিকাশ করার জন্য তার সকল সুবিধাদি ছিল। কিন্তু আত্মগৌরবে এবং আত্মকেন্দ্রিকতায় তিনি এতই অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন যে, তিনি ধর্মকেও অবজ্ঞা করেছিলেন। অনেক সময় শারীরিক অক্ষমতা আমাদের কৃষ্ণমুখী করতে সহায়তা করে। ঠিক যেমন-বিল্ব মঙ্গল ঠাকুর এবং সুর দাস মহান কৃষ্ণভক্তে পরিণত হয়েছিলেন।
দুর্যোধন তার পিতাকে অনুসরণ করেন। তিনি পাণ্ডবদের বিভিন্ন ভাবে কষ্ট দেওয়ার জন্য কিংবা হত্যা করার জন্য নানা অসদুপায় অবলম্বন করেছিলেন। এই সবকিছুই তিনি করেছিলেন শুধুমাত্র হস্তিনাপুরের রাজ সিংহাসনে আরোহনের জন্য। তার লক্ষ্য পূরনের মাঝখানে কাউকে তিনি বাধা হতে দিবেন না। ভগবদ্গীতায় (১/৩) দুর্যোধন দ্রোণাচার্যকে বললেন, পাণ্ডবদের পক্ষে যুদ্ধ করছে দ্রোণাচার্যের শিষ্য দ্রুপদ পুত্র দৃষ্টধ্যুম্ন। দ্রোণাচার্য এবং দ্রুপদ রাজা শুরুতে একে অন্যের খুব ভালো বন্ধু ছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে একে অন্যের চিরশত্রুতে পরিণত হন। প্রতিশোধের নেশায় শুধুমাত্র দ্রোণাচার্যকে হত্যার জন্য দ্রুপদ রাজা যজ্ঞ করেছিলেন যাতে দ্রোণাচার্যকে বধ করার জন্য উপযুক্ত পুত্র লাভ হয়। দৃষ্টদ্যুম্নকে অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষার জন্য দ্রোণাচার্যের কাছে পাঠানো হলে তিনি সব জেনেও তাকে পূর্ণশিক্ষা প্রদান করেন। কেননা দ্রোণাচার্য ছিলেন একজন মুক্ত ব্রাহ্মণ।
দুর্যোধন দ্রোণাচার্যকে বোঝাতে চাইলেন, শত্রুকে অস্ত্রবিদ্যা শেখানো ছিল দ্রোণাচার্যের অন্যতম ভুল। দুর্যোধন তার ছল চাতুরির মাধ্যমে দ্রোণাচার্যকে রাগান্বিত করতে চেয়েছিল, যাতে তিনি পাণ্ডবদের কঠোর হস্তে দমন করেন। দুর্যোধন এতবেশি আত্মগৌরবান্বিত ছিল যে, সে জানাল যে পাণ্ডব সৈন্যগণ ভীম দ্বারা সুরক্ষিত। দুর্যোধন চাইছিল ভীম যেন শীঘ্রই নিহত হয়। কেননা তিনি ভীমকে একজন শক্তিশালী যোদ্ধারূপে মনে করতেন। এছাড়াও অর্জুন শুরুতে দেহগত সম্পর্কের কারণে যুদ্ধ করা থেকে বিরত ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় তিনি দিব্যজ্ঞান লাভ করে যুদ্ধ করতে রাজী হন।
ধৃতরাষ্ট্র ও দুর্যোধনের পরে কুরু বংশের অন্যতম পরীক্ষিৎ মহারাজ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন কিভাবে আত্মকেন্দ্রিক না হয়ে কিংবা সিংহাসনের প্রতি আসক্ত না থেকেও নিজেদের দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করতে হয়। তিনি যখন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন তখন একজন রাজা হিসেবে কলিকে তৎক্ষণাৎ শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন। আবার যখনই তিনি শ্রবণ করলেন তার মৃত্যু সম্পর্কে তখনই তিনি সবকিছু পরিত্যাগ করে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণে পূর্ণ মনোনিবেশ করেন।
নিজের পরিচয়ে গৌরবান্বিত কিংবা অহংকারী ব্যক্তিগণের জীবনে এমন কোনো পরিস্থিতি নেমে আসে যে তাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। রামায়ণে সেই ধরনের ঘটনা দেখা যায়। রাবণ তার শক্তিমত্তায় অত্যন্ত অহংকারী হয়ে উঠাতে তার পতন হয়েছিল। রাবণ ও জটায়ুর যুদ্ধে আমরা অনেক শিক্ষা পাই। যেমন-রাবণ চেয়েছিল ভগবানের সম্পত্তি হরণ করতে। আর জটায়ু পরমেশ্বর ভগবান এবং তার অন্তরঙ্গা শক্তির সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা অধ্যয়নের মাধ্যমে আমরা পারমার্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিজেদের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য জানতে পারি। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় সৌন্দর্য কিংবা কুৎসিত গুরুত্বপূর্ণ নয়, কেননা আমরা দেহ নই আত্মা। মৃত্যুর মাধ্যমে আমাদের এই দেহ বিনাশ হয়ে যাবে। ভগবদ্গীতা আমাদের শিক্ষা দেয়, সেলফির মাধ্যমে সর্বদা আমরা যে দেহ প্রদর্শনে ব্যস্ত রয়েছি সেই দেহ বিনষ্ট হবেই। সেলফিময় এই দেহ আমাদের প্রকৃত সত্ত্বা নয়।
সেলফি এক্সপার্ট ফোনের পেছনে আমাদের গমনের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা বর্তমানে দেখা যায়। কিন্তু ভগবদ্গীতা আমাদেরকে এক অন্যরকম সেলফি প্রদান করে আর তা হল আমাদের প্রকৃত রূপ আত্মা। তাই ভগবদ্‌গীতাকে আমরা বলতে পারি একটি পারমার্থিক সেলফি এক্সপার্ট ফোন।
লেখক পরিচিতি : নন্দদুলাল দাস হলেন ব্যাক টু গডহেড ইন্ডিয়ার সম্পাদকীয় দলের একজন সদস্য।


 

জানুয়ারী-মার্চ ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here