পারমার্থিক প্রগতির পথে সহায়ক বস্তু

0
35

পারমার্থিক জীবনের সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের অবশ্যই জাগতিক আশাকে পারমার্থিক আশায় রূপান্তর করতে হবে।

বিশাখা দেবী দাসী


আশা যেটি আমাদের হৃদয়ের অভ্যন্তরীন বিষয়, এটি কিছু জীবিত ও মৃতের মধ্যকার পার্থক্য নিরূপন করে। স্বয়ং মৃত্যু থেকে বেঁচে যাওয়া ভিক্টর ফ্রাঙ্কেল লিখেছিলেন, হলোকাস্ট (ইহুদীদের বিপক্ষে সংঘটিত ব্যাপক হত্যা যজ্ঞ) এর সময় বন্ধী শিবিরে মৃত্যুর হার বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে অধিকাংশই নির্যাতনের ফলে মৃত্যু বরণ করে নি। তাহলে কেন এতবেশি মৃত্যু বরণ করছিল? কারণ প্রতি বছর একটি গুজব ছড়াত যে হনুক্কারের (ইহুদীদের উৎসব) সময় বন্ধীদের মুক্ত করে দেওয়া হবে। তারা মুক্ত হতে পারবে ভেবে আশায় আশায় জীবন ধারণ করতো। কিন্তু তারা উৎসব শেষ হওয়ার পরে মুক্ত হতে না পেরে তাদের সর্বশেষ আশাও ধূলিস্যাৎ হয়ে যায় এতে তাদের দেহের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তারা মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করে। মূলত আশাই তাদের এতকাল বাঁচিয়ে রেখেছিল কিন্তু আশাহত হওয়ায় মৃত্যুই ছিল তাদের একমাত্র গন্তব্য। ফ্রাঙ্কেল লিখেছিলেন, “ দুর্ভাগ্য তাদের যারা জীবনে বেঁচে থাকার কোনো রসদ্ পায়না, পায়না কোনো লক্ষ্য, উদ্দেশ্য যাতে সে সম্বলটুকু নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। তাই সে শীঘ্রই হারিয়ে যায়…” একইভাবে এলিজাবেথ কুবলার রস্ তাদের আসন্ন মৃত্যু নিয়ে গবেষণা কর্মে লিখেছেন, “যদি একজন রোগী আশা প্রকাশ বন্ধ করে দেয় তবে বুঝতে হবে এটি তার আসন্ন মৃত্যুর লক্ষণ। কোনো রোগী হয়তো বলতে পারে, “ডাক্তার মনে হয় আমার এটি হয়েছে অথবা ‘আমার মনে হয় এটিই’ অথবা সেই রোগী একদিন বলে উঠল ‘আমার মনে হয় এটি একটি অলৌকিক ঘটনা যে আমি এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত (মৃত্যু বরণ) এবং আমি আর কোনো ভয়ে ভীত নই।’
স্বাভাবিক ভাবে আমরা আশা প্রবণ । আশা অনেক প্রকারের হতে পারি কিন্তু তাকে মূলত দু’ভাগে বিভক্ত করা হয়-পারমার্থিক এবং জাগতিক ।

পারমার্থিক আশা

রূপ গোস্বামী এই ধরনের আশাকে বর্ণনা করেছেন, আশা বদ্ধ (আশার বন্ধন)। ভক্ত হয়তো ভাবতে পারে, “আমি যেহেতু ভক্তিমূলক সেবার সমস্ত নিয়মাবলী মেনে চলার চেষ্টা করছি, তাই যেকোনভাবেই আমি ভগবানের সম্মুখবর্তী হতে পারব এবং নিশ্চিতরূপে তার কৃপা লাভ করতে পারব। ভগবানের কৃপাতে আমি ভগবদ্ধামে গমন করতে সক্ষম হব।”
আশা বদ্ধ অবস্থায় একজন ভক্ত ভাবে, “আমি ভাল কোনো পরিবারে জন্ম গ্রহণ করার সৌভাগ্য অর্জন করিনি, আমি কোনো উত্তম কার্য সাধন করতে পারিনি, আমার ভগবানের সম্বন্ধে কোনো জ্ঞান নেই এবং তার প্রতি কোনো ভালোবাসা নেই, আমার হরিনামে কোনো রুচি নেই। কিন্তু আমি ভগবানের সান্নিধ্যে আসতে চাই এবং সেই চাওয়ার মুহূর্তে আমি খুবই হতাশ হই, কেননা, আমি সেই সৌভাগ্যের জন্য যোগ্য নই, আমার সবকিছুই আসুরিক তাই আমি ভগবানের কৃপার প্রতি নির্ভরশীল ।”
অন্যকথায় পারমার্থিক আশার স্থিতিতে অবস্থিত ভক্ত ভগবানকে বলেন, “আমি আপনার নিকটে এসেছি, কৃপা করে আপনি আমাকে রক্ষা করুন।”
শ্রীমদ্ভাগবতের ৫/৫/১৫ বলা হয়েছে “কেউ যদি ভগবদ্ধামে ফিরে যাবার জন্য ঐকান্তিকভাবে আগ্রহী হন, তাহলে ভগবানের কৃপা লাভই জীবনের চরম লক্ষ্য বলে তাঁকে মনে করতে হবে।

জাগতিক আশা

ভগবদ্‌গীতার ৯/১২ শ্লোকে কৃষ্ণ ‘মোঘাশা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। ‘মোঘাশা’ মানে ‘ব্যর্থ আশা’ এবং এই শব্দটি মোহাচ্ছন্ন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে । পরবর্তীতে ১৬/১২ শ্লোকে ভগবান ‘আশপাশ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন যার অর্থ হলো ‘আশারূপ রজ্জু’। জড় জগতের মানুষ হাজারো আশার রজ্জুতে আবদ্ধ থাকে যারা অধিকাংশই কাম এবং রাগ মিশ্রিত। জড় জাগতিক লাভের আশা যেমন খ্যাতি, ধন, শক্তি, সাফল্য, সম্পর্ক এসব ঠিক ফাঁসের মতো যেটি আত্মাকে গ্রাস করে। আমরা পারমার্থিক আশা করতে পারি যা আমাদের পারমার্থিক সৌভাগ্য এনে দিতে পারে। কিন্তু জাগতিক আশা আমাদেরকে হতাশায় নিমগ্ন করবে। কৃষ্ণ বলেছেন, “যিনি জাগতিক আশা করেন তিনি অত্যধিক উদ্বিগ্ন, তিনি কেবল দুঃখ-দুর্দশা লাভ করে থাকেন এক কথায় পরাজিত হন।”
জড়-জাগতিক বিভ্রান্তি কর ও দুঃখময় ফাঁদ থেকে বাঁচতে হলে অবশ্যই জড় আশা পরিত্যাগ করে পারমার্থিক আশার পথ অবলম্বন করতে হবে।

আশার পরিবর্তন ভগবানের ইচ্ছা স্বীকার

শ্রীমদ্ভাগবতে কুরু সাম্রাজ্যের একজন অধিপতি মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের উদাহরণ দ্বারা আমরা জড় আশা পরিত্যাগ করার পথ খুঁজে পাই ৷ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তার শতপুত্র নিহত হওয়ার পর তিনি পাণ্ডু পুত্রদের অনুগ্রহে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন, যদিও তিনি বহু বছর পাণ্ডবদের সাথে আন্তরিকতাহীন আচরণ করেন। ধৃতরাষ্টের সৎ ভাই মহাত্মা বিদুর ধৃতরাষ্ট্রের জড় আরামদায়ক আশাকে পারমার্থিক আশার স্তরে উন্নীত করতে সহায়তা করেছিলেন।
বিদুর বলেছেন, “পরম পুরুষোত্তম ভগবানই মহাকালরূপে আমাদের সম্মুখে উপস্থিত হয়েছেন। যে-ই মহাকালের দ্বারা প্রভাবগ্রস্ত হয়, তাকে অবশ্যই তার সর্বাপেক্ষা প্রিয় প্রাণই সমর্পণ করতে হয় এবং ধন-সম্পদ, মান মর্যাদা, সন্তান-সন্ততি, জমি বাড়ি এই সবের মতো অন্যান্য জিনিসের কথা আর বলার কী আছে! ”শ্ৰীমদ্ভাগবত ১/১৩/১৯-২০
সুতরাং আমাদের আশাকে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি সমর্পিত করার প্রথম স্তর হলো তাঁর অপ্রাকৃত রূপের প্রতি আসক্ত হওয়া যা আমাদের সমস্ত জড় বাসনাকে বিদূরিত করে। এই মহাবিশ্বের এমন কেউ শক্তিধর নেই যিনি সময়কে রোধ করতে পারবেন। ঠিক একইভাবে জড় বাসনা আমাদের অবস্থাকে অসহায় ও আশা শূণ্য করে দেয়। কেননা, ভগবানের রচিত এই সৃষ্টি জগতের নিয়মানুসারে প্রত্যেক জীবকে বৃদ্ধ ও মৃত্যু বরণ করতে হবে। আত্মতত্ত্ব জ্ঞান লাভের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ভগবানের সেবা ও আসক্তির মাধ্যমে আমরা ক্রমাগতভাবে জাগতিক আশা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারি।

নিরাসক্ত হোন

যখন আমরা নিজস্ব সত্তাকে পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারব তখন আমাদের জাগতিক বাসনা বিদূরিত হবে এবং সেই স্তরে পারমার্থিক আশার সঞ্চার হবে। তখন আমরা অনুভব করতে পারব যে, আমাদের বুদ্ধিমত্তা শুদ্ধ হচ্ছে। জড় বিষয়ে নিরাসক্ত হওয়ার মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে আমরা মায়ার দাসত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারি। তখন আমরা যে কোন প্রকারে কৃষ্ণের কৃপা গ্রহণ করতে পারি। বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে নিরাসক্ত হওয়া প্রসঙ্গে বলেছেন, “আপনি জন্মকাল থেকেই অন্ধ এবং সম্প্রতি আপনার শ্রবণশক্তিও হ্রাস পেয়েছে। আপনার স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং বুদ্ধি ভ্রংশ হচ্ছে। আপনার দন্তরাজি জীর্ণ হয়েছে, আপনার যকৃতের ত্রুটি ঘটেছে এবং আপনার কাশির সঙ্গে সশব্দে কফ নির্গত হচ্ছে। আহা, কোনো জীবের বেঁচে থাকার আশা কী বলবতী!…. মৃত্যুবরণে আপনার অনিচ্ছা সত্ত্বেও এবং মান-মর্যাদা নষ্ট করে বেঁচে থাকার জন্য আপনার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও, আপনার কার্পণ্যদুষ্ট দেহটি অবশ্যই একটা পুরনো পোশাকের মতো জরাগ্রস্ত এবং ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। [শ্রীমদ্ভাগবত ১/১৩/২২-২৫] আত্মা নিত্য ও শাশ্বত তাই সকল জীব মৃত্যুকে এড়াতে চায়। ধৃতরাষ্ট্রও ব্যতিক্রম ছিলেন না । তিনি চেয়েছিলেন অসীমকাল ধরে যেন তার দেহের সুখ ও প্রশান্তি বজায় থাকে । ধৃতরাষ্ট্রের মতো সমস্ত মানুষের কর্তব্য হলো, তার দেহ, মন ও বুদ্ধি মত্তাকে কাজে লাগিয়ে পারমার্থিক পথে উন্নতি সাধন করা। মানব জীবনের উদ্দেশ্য নিজেকে এবং ভগবানকে জানা এবং পরিশেষে এই জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ভগবদ্ধামে অর্থাৎ ভগবানের কাছে ফিরে যাওয়া। শ্রীল প্রভুপাদ তার ভাষ্যে লিখেছেন, “পাঁচ হাজার বছর পূর্বে একজন ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন কিন্তু বর্তমানে প্রতি ঘরেই ঘরেই বহু ধৃতরাষ্ট্র রয়েছে।” অধিকাংশ মানুষ তাদের এই দুর্লভ মানব জীবনকে অবহেলায় বিনষ্ট করে কারণ তাদের কোনো পারমার্থিক আশা নেই ।

ভগবানের প্রতি শ্রদ্ধার উন্নয়ন

ভগবানের ইচ্ছাকে স্বীকার করলে আমরা জড়-জাগতিক দুর্দশা থেকে নিজেকে অনেকাংশে মুক্ত করতে পারি এবং এটিই ছিল আমাদের প্রাথমিক স্তর। দ্বিতীয় স্তরে আমাদের কর্তব্য কৃষ্ণের প্রতি অগাধ বিশ্বাস স্থাপন করা ।
যদি আমরা শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আস্থাহীন হই তবে আমাদের অন্য জড় বিষয়ের প্রতি ধাবিত হতে হবে। ফলে একসময় আমরা গভীর হতাশায় নিমগ্ন হব। কোনো জড় আশা আমাদের চিত্তকে প্রশান্তি দিতে পারে না। কৃষ্ণ আমাদের এই মানব জীবনকে একটি অমূল্য উপহার হিসেবে প্রদান করেছেন যাতে আমরা তার প্রতি পারমার্থিক আশায় ও ভক্তিযোগে রত থেকে অন্তিমে তার স্বীয় ধামে গমন করতে পারি ।
বিদূর তার শক্তিশালী বচনের মাধ্যমে ধৃতরাষ্ট্রের হৃদয়ে পারমার্থিক আস্থার উন্মোচন করেছেন। “যিনি নিজের উদ্যোগে বা অন্যের কাছ থেকে শুনে আত্মজ্ঞানসম্পন্ন হয়ে ওঠেন এবং এই জড় জগতের অলীক মায়া ও দুঃখ-দুর্দশা উপলব্ধি করেন এবং তাই গৃহত্যাগ করে পরিপূর্ণভাবে তাঁর হৃদয়ে স্থিত পরম পুরুষ ভগবান শ্রীহরিতে ভরসা রাখেন, সুনিশ্চিতভাবে তিনিই সর্বোত্তম মানবসত্তা।
(শ্রীমদ্ভাগবত ১/১৩/২৭)
আমরা এই মহাবিশ্বের যেই স্থানে থাকি না কেন পরমেশ্বর ভগবান সর্বদাই আমাদের সাথে আছেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর আন্তরিক ভক্তদের যেকোনো পরিস্থিতিতে সুরক্ষা প্রদান করেন। তাই আমরা এই পৃথিবীর যেকোনো স্থানে ভগবানের কথা আলোচনা করতে পারি, হরিনাম জপ করতে পারি এবং ভগবদ্ভক্তদের সঙ্গ লাভ করতে পারি। আমাদের পারমার্থিক একাগ্রতা যত বেশি হবে পারমার্থিক আশাও তত বেশি জাগ্রত হবে।

স্বাধীনতার সদ্ব্যবহার

বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে তার স্বাধীনতার সদ্ব্যবহার করতে উপদেশ দিয়েছিলেন। ধৃতরাষ্ট্রের একটি স্বাধীনতা ছিল— যেটা ধর্ম সম্মত নয় তা হওয়ার আশা (মায়া) অথবা যেটি ধর্ম সিদ্ধ (পারমার্থিক জীবন)। কৃষ্ণ কৃপাপূর্বক আমাদের ক্ষুদ্র স্বাধীনতা দিয়েছেন যার দ্বারা আমরা ইচ্ছা মতো পথ নিৰ্বাচন করতে পারি। পারমার্থিক আশা মানে কৃষ্ণের সেই দিব্য উপহার গ্রহণ করা এবং তাঁর নিকটবর্তী হওয়া। বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে বলেছেন, আপনি অনুগ্রহ করে আত্মীয়-স্বজনদের অজ্ঞাতসারে উত্তর দিকে গমন করুন, কারণ শীঘ্র এমন একটি সময় আসছে, যার প্রভাবে মানুষদের সদৃগুণাবলী নষ্ট হয়ে যাবে। ধৃতরাষ্ট্র চাইলে সেখানে থাকতে পারতেন কিন্তু তার স্বাধীন মত বলছে যে, তিনি সেখানে থাকতে পারেন না ।

ভগবানের প্রতি বিশ্বাস সুদৃঢ় করণ

ধৃতরাষ্ট্র তার পত্নী গান্ধারী ও বিদুরকে নিয়ে বনে গমন করেন। বিদুরের উপদেশে ভগবানের প্রতি ধৃতরাষ্ট্রের বিশ্বাসের জন্ম হয়। বিশ্বাস বলতে কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী বুঝিয়েছেন মহিমান্বিত কিছুর প্রতি অপ্রতিহত আস্থা ।
সেই সব মহাত্মাগণ, যাঁদের গুরু ও ভগবানে পরা ভক্তি রয়েছে, কেবল তাঁদের কাছেই বৈদিক জ্ঞানের সমস্ত তাৎপর্য স্বতঃই প্রকাশিত হয়। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৬/২৩
ভগবানের প্রতি যাদের বিশ্বাস রয়েছে তারা ভগবানের সেবা করার মাধ্যমে সন্তুষ্ট থাকে। প্রত্যেক জীব মাত্রই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করবে। বিশ্বাসের মাধ্যমে আমাদের হৃদয়ে পারমার্থিক আশার সঞ্চয় হয়। আমরা সর্বদাই এই আশায় মগ্ন যে, আমরা কিভাবে ভগবানের সেবা আরো ভালভাবে করতে পারি এবং কিভাবে চিন্ময় ধামে ভগবানের সেবা লাভের অপ্রাকৃত সুযোগ লাভ করতে পারি। আমাদের জীবনে যা ঘটুক না কেন সবকিছু ভগবানের ইচ্ছা রূপে মেনে নিতে পারি এবং কৃষ্ণকে আমাদের সুহৃদ ও ভালবাসার পাত্র রূপে সর্বদাই গ্রহণ করতে পারি ।
এই প্রকার আশার ফলে আমরা জীবদ্দশায় কৃষ্ণের কৃপা লাভ করতে পারি। “এভাবে তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিদুর কর্তৃক উপদিষ্ট হয়ে আজমীঢ় বংশ মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আধ্যাত্মিক জ্ঞান (প্রজ্ঞা) লাভ করে চিত্তের দৃঢ়তার দ্বারা আত্মীয়বর্গের নিবিড় স্নেহপাশ ছিন্ন করে গৃহ থেকে মুক্তি লাভের পথে বহির্গত হলেন।” (শ্রীমদ্ভাগবত ১/১৩/২৯)
ভগবানের শুদ্ধভক্তদের দিব্য সঙ্গের প্রভাবে পারমার্থিক জীবনের প্রতি আমাদের আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়। এ প্রসঙ্গে শ্রীল প্রভুপাদ ১/১৩/২৯ তাৎপর্যে লিখেছেন, “ব্যবহারিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা নিঃসঙ্কোচে বলতে পরি যে, কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী মহারাজের সাথে মাত্র কয়েক মিনিটের প্রথম সঙ্গ প্রভাব না পেলে আমাদের পক্ষে ইংরেজি ভাষায় শ্রীমদ্ভাগবতের বর্ণনা দেওয়ার মতো সুবিপুল কার্যভার গ্রহণ করা সম্ভব হত না। সেই বিশেষ সময়ে তাঁর সঙ্গে যদি সাক্ষাৎকার না হতো, তা হলে হয়ত আজ আমরা বিপুল ব্যবসায়ীতে পরিণত হতে পারতাম, কিন্তু সেই মহাপুরুষের নির্দেশ অনুসারে ভগবানের সেবায় যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে প্রকৃত মুক্তির পথে অগ্রসর হতে পারি।”
শ্রীগুরু বন্দনা গীতে শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর লিখেছেন, গুরুমুখপদ্মবাক্য, চিত্তেতে করিয়া ঐক্য, আর না করিহ মনে আশা ৷ অর্থাৎ গুরুদেবের মুখপদ্ম-নিঃসৃত উপদেশকে তোমার চিত্তের সঙ্গে ঐক্যব দ্ধ কর এবং অন্য আর কোন কিছুই আশা করো না ।
এই গীত সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রবচনে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন, “যদি তুমি সত্যিই পারমার্থিক পথে উন্নতি সাধন করতে চাও তবে তোমাকে অবশ্যই শ্রীগুরুচরণের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে… এটি সমগ্র বৈষ্ণব দর্শনের শিক্ষা। তাই আমরা যদি তা পালন না করি তবে মূঢ় থেকে যাবো।”-ফিলাডেলফিয়া ১৯৭৫
আমাদের শুধুমাত্র শ্রীগুরুদেবের আদেশ মেনে চলতে হচ্ছে যদি শ্রীগুরুর আদেশ আমরা আমাদের হৃদয় এবং আত্মায় ধারণ করে চলতে পারি, সেটিই সাফল্য এটি খুবই ব্যবহারিক। লএঞ্জেলস্ ১৯৭৫
কেউ যদি শুধুমাত্র একটি নির্দেশ পাও সেটিকে পরমানন্দ বলে বিবেচনা কর। অন্যথায় এখানে কোনো আনন্দ নেই । বৃন্দাবন ১৯৭৭
সদ্‌গুরুর কাছ থেকে শ্রবণ ঠিক যেমন বিদুরের কাছ থেকে ধৃতরাষ্ট্রের শ্রবণ ঠিক তেমনি শ্রীল প্রভুপাদের কাছ থেকে আমাদের শ্রবণ। সদ্‌গুরু তথা মুক্ত পুরুষদের কাছ থেকে শ্রবণের মাধ্যমে আমরা পারমার্থিক এবং জাগতিক আশার মধ্যকার শ্রেয়তর বিষয়ের সন্ধান লাভ করতে পারব। অন্যথায় আমাদের প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে ধৃতরাষ্ট্র রাজনীতি, ইন্দ্রিয়তৃপ্তি এবং পারিবারিক আসক্তিতে এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, তিনি সর্বদাই সফল হতে চাইতেন। কিন্তু পরিশেষে তিনি গভীর হতাশায় পতিত হন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের একজন শু দ্ধভক্ত বিদুরের নির্দেশে ধৃতরাষ্ট্রের বিশ্বাস উদয় হয়েছিল। ধৃতরাষ্ট্র আত্মজ্ঞান লাভে সমর্থ হয়েছিলেন। বিদুরের মতো ভক্ত শুধুমাত্র জড় আসক্তিহীন ছিলেন তা নয় তিনি ভগবানের সাথে পারমার্থিক বন্ধনেও আবদ্ধ ছিলেন। একইভাবে শ্রীল প্রভুপাদ ও তার অনুসারীদের প্রতি আমাদের বিশ্বাসের ফলশ্রুতিতে তাদের কৃপায় জাগতিক অপসংস্কৃতির প্রতি আমাদের অনাসক্তির উদয় হয়।

ফলাফল

ভগবানের ইচ্ছাকে স্বীকার করে, জড় সংসর্গ থেকে বিমুক্ত থেকে, সর্বদা ভগবানের প্রতি আস্থা রেখে, আমাদের ক্ষুদ্র স্বাধীনতাকে সদ্ব্যবহার করতে হবে। এভাবে ধীরে ধীরে আমরা ভগবানের প্রতি আমাদের সেবা মনোভাবের উন্নতি সাধন করতে পারি। যদিও বিভিন্ন প্রকারে আমরা অযোগ্য তবুও আমরা সুনিশ্চিত যে, দৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকার মাধ্যমে এক সময় পারমার্থিক সফলতা লাভ সম্ভব। পারমার্থিক আশা আমাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে অবিচল রাখে অর্থাৎ এটি আমাদের শ্রীকৃষ্ণের কাছে নিয়ে যায়। পারমার্থিক আশায় থাকার অর্থই হচ্ছে বর্তমানকে নিয়ে বসবাস যেটি আমাদের ভবিষ্যৎ রচনা করে। যখন আমরা কৃষ্ণে আশা রাখি তখন আমরা লোভ, কাম ইত্যাদির প্রতি সন্দেহ দূরীভূত করি এবং সর্বদা পরমেশ্বর ভগবানের স্মৃতিমগ্ন থাকি যা পরিশেষে আমাদের ভগবদ্ধামে নিয়ে যায় ।
ধৃতরাষ্ট্র যোগ সাধনের মাধ্যমে তার মন, ইন্দ্রিয় এবং পারিবারিক আকর্ষণ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। “যিনি জড় বিষয় থেকে ছয় ইন্দ্রিয় প্রত্যাহার করে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরির ভাবনায় মগ্ন থাকেন। তিনি জড় প্রকৃতির সত্ত্ব, রজো এবং তমোগুণজনিত কলুষ থেকেও মুক্ত থাকেন। (ভাগবত ১/১৩/৫৪)
যদিও ধৃতরাষ্ট্র মায়াময় আশা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য অষ্টাঙ্গ যোগ সাধন করেছিলেন কিন্তু বর্তমান কলিযুগে আমাদের জন্য নির্ধারিত একমাত্র সাধন পন্থা হল ভক্তিযোগ। ভক্তিযোগের সকল বিধিনিষেধ পালন, ভগবানের প্রতি আমাদের মনকে নিবন্ধ এবং তাঁর সেবা করার মাধ্যমে আমাদের সকল প্রকারের জড় বাসনা বিদূরিত হবে। ঠিক যেমন পারমার্থিক গুরুদেবের বাণী আমাদের হৃদয়ের গভীরে স্পর্শ করে এবং আমাদেরকে সন্তুষ্ট করে এর ফলে কৃষ্ণ এবং আমাদের মধ্যকার দূরত্ব ধীরে ধীরে কমতে থাকে । পারমার্থিক আশা আমাদেরকে অপ্রাকৃত অভিজ্ঞতা লাভের জন্য প্রস্তুত করে। তখন আমরা যেন তেন প্রকারে কৃষ্ণ প্রেম লাভের জন্য উন্মুক্ত হই। শ্রীল প্রভুপাদ (১/১৩/৫৫) তাৎপর্যে লিখেছেন,
“পরমেশ্বর ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত জড়জাগতিক আকাশের কোনো গ্রহলোকে বাস করেন না, এমন কি জড়া প্রকৃতির উপাদানগুলির সঙ্গে কোন রকম সংযোগও তিনি অনুভব করেন না। পরমেশ্বর ভগবানের স্বরূপগত সমভাবাপন্ন আগ্রহ-অনুরাগের পারমার্থিক স্রোতধারায় সঞ্জীবিত হয়ে তাঁর তথাকথিত জড় শরীরটির অস্তিত্ব থাকে না এবং তাই তিনি মহতত্ত্ব প্রসূত সামগ্রিক কলুষ থেকে চিরতরে মুক্ত হন। ভগবদ্ভক্তির প্রভাবে জড়া প্রকৃতির সপ্ত আবরণের অতীত হয়ে, তিনি চিদাকাশে সর্বদা বিরাজ করেন। বদ্ধ জীবাত্মারা জড় জগতের আবরণের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, সেক্ষেত্রে মুক্ত জীবাত্মারা সেই আবরণের অনেক অনেক ঊর্ধ্বে বিরাজ করেন।”
[বিশাখা দেবী দাসী ত্রিশ বছরেরও অধিক সময় যাবৎ ব্যাক টু গডহেডের বিভিন্ন প্রবন্ধ লিখছেন এবং মূল্যবান ছবি প্রদান করছেন, তিনি এবং তার পতি ১৯৯৯ সাল থেকে কানাডার বৃটিশ কলম্বিয়ার হরেকৃষ্ণ কমিউনিটি খ্যাত শরণাগতি গ্রামে বসবাস করছেন ।]


 

এপ্রিল-জুন ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here