পাপ থেকে মুক্তির সরল উপায়

0
103
১১ নভেম্বর ১৯৭৩ দিল্লিতে প্রদত্ত শ্রীমদ্ভাগবত (১/২/৫-৬) নং শ্লোকের প্রদত্ত প্রবচন

জীবনের দুর্বিষহতা কমাতে আর আনন্দ উপভোগ বাড়াতেই মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা ও আচার্য
প্রদত্ত ভাষণের বঙ্গানুবাদ


স বৈ পুংসা পরো ধর্মো যতো ভক্তিরধোক্ষজে।
অহৈতুক্যপ্রতিহতা যয়াত্মা সুপ্রসীদতি ॥

যয়াত্মা সুপ্রসীদতি। প্রত্যেকেই সুখের সন্ধানে ছুটে চলছে। আত্যন্তিক দুঃখনিবৃত্তিঃ। জীবনের দুর্বিষহতা কমাতে আর আনন্দ উপভোগ বাড়াতেই মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। আমরা জীবাত্মা, সকলেই শ্রীভগবানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মমৈবাংশো জীবভূতঃ। সমস্ত জীবমাত্রই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অবিচ্ছেদ্য অংশ বিশেষ। যখন আমরা শ্রীকৃষ্ণের কথা বলি, তখন ভগবানকেই বুঝি।

ভগবান শব্দের অর্থ কি?

ভগবানের হাজার হাজার নাম আছে, কিন্তু এই নামটি প্রধান। ‘কৃষ্ণ’ মানে ‘সর্বাকর্ষক’। শ্রীকৃষ্ণ সকলকেই আকর্ষণ করে থাকেন। কিংবা বলা চলে, যিনি প্রত্যেককে আকর্ষণ করছেন, তিনিই ভগবান। কিছু লোকের বা কিছু জীবের প্রতি কেবল ভগবানের আকর্ষণ এবং অন্য কাউকে আকর্ষণ করেন না, ভগবান এমন নন। ভগবানের সমগ্র ঐশ্বর্য্য,  সমগ্র জ্ঞান, সমগ্র সৌন্দর্য, সমগ্র শৌর্য-বীর্য, সমগ্র যশ, সমগ্র বৈরাগ্য দিয়ে তিনি সর্বাকর্ষক হয়ে রয়েছেন। এই সমস্ত গুণাবলী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মধ্যেই একমাত্র দেখা যায়।

ঐশ্বর্য্য সমগ্রস্য বীর্যস্য যশসঃ শ্রিয়ঃ।
জ্ঞানবৈরাগ্যয়োশ্চৈব ষণ্নাং ভগ ইতীঙ্গনা ॥   

(বিষ্ণু পুরাণ ৬/৫/৭৪)

‘ভগ’ মানে ‘ঐশ্বর্য্য বা ‘শ্রী’। যেমন, কখনও আমরা বলি ‘ভগবান’। সেটা এসেছে এই ‘ভগ’ শব্দ থেকে। তাই ‘ভগবান’ মানে ‘যিনি সমগ্র ঐশ্বর্য্যবান।’ তাঁকে বলা হয় ভগবান। আজকাল অনেক অনেক ভগবান উঠেছে, কিন্তু তারা কেউ সমগ্র ঐশ্বর্যের অধিকারী নয়। হয়ত খানিকটা থাকতে পারে। কিন্ত ‘ভগবান’ মানে সমগ্রস্য। অর্থাৎ সম্যক্ সম্পূর্ণ।
কোনও ধনী লোক দাবি করতে পারে, “আমি এত কোটি টাকার মালিক।” আর একজন বলে উঠতে পারে, “না, আপনার চেয়ে আমার আরও দু-এক কোটি টাকা বেশি আছে।” আবার অন্য অনেকে অনেক বেশি বলতেও পারে-এমন তো চলতেই পারে। কিন্তু কেউ দাবি করতে পারে না, “আমি সমগ্র ঐশ্বর্যের মালিক।” তবে ভগবদ্গীতায় দেখবেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দাবি করছেন, ভোক্তারং যজ্ঞতপসাং সর্বলোকমহেশ্বরম্। (গীতা ৫/২৯) সর্বলোকমহেশ্বরম্ মানে “সকল গ্রহলোকের পরম অধিকারী।” শাস্ত্রে তা অনুমোদিত হয়েছে।
ব্রহ্মসংহিতায় (৫/১) বলা হয়েছে, ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ। ‘ঈশ্বর’ মানে নিয়ন্তা অর্থাৎ শক্তিমান-নিয়ন্ত্রণকারী। যেমন, দেশের রাষ্ট্রপতি কিংবা রাজা। অনেক ঈশ্বর অর্থাৎ নিয়ন্তা আছে। আপনিও ঈশ্বর, আমিও ঈশ্বর। কারণ আপনি অন্তত আপনার পরিবারবর্গের সবাইকে কিংবা পালিত পশুকেও নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। তাই এই নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা প্রত্যেকের মধ্যেই রয়েছে, কারণ আমরা পরম নিয়ন্তা শ্রীকৃষ্ণেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আমরা পরম নিয়ন্তা নই। আমরা কয়েকটি জীবসত্ত্বার নিয়ন্তা হতে পারি, কিন্তু আমরাও অন্য এক পরম শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি। অতএব আমরা পরম নিয়ন্তা নই।
আমরা আপেক্ষিক নিয়ন্তা। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধে বলা হয়েছে, ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ। ‘পরমঃ’ মানে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’। তিনি প্রত্যেককে অর্থাৎ প্রতিটি জিনিসকে নিয়ন্ত্রণ করেন, কিন্তু তিনি কারও দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন না। তাঁকেই বলে ঈশ্বরঃ পরমঃ। আমরাও ঈশ্বর, আমাদের নিজ সীমানার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করে থাকি, কিন্তু আমরাও অন্য কারও দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি। এটা ভালভাবে বুঝতে চেষ্টা করুন। তবে শ্রীকৃষ্ণের জীবনে দেখবেন তিনি প্রত্যেককে নিয়ন্ত্রণ করছেন, কিন্তু তিনি কারও কাছে নিয়ন্ত্রিত হন না। তাই তাঁকে বলা হচ্ছে ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ।

পরম নিয়ন্তা কি নির্বিশেষ?

তাঁর নিজ স্বরূপ আছে। ভগবানের আকার আছে। মায়াবাদী দার্শনিকেরা মনে করে-পরম তত্ত্বের বিশেষ রূপ নেই, নির্বিশেষ। তারা শূন্যবাদী। না। পরম তত্ত্ব শূন্য হতে পারে না বা নির্বিশেষ হতেও পারে না, কারণ তিনি নিয়ন্তা, নিয়ন্তা অবশ্যই মস্তিষ্কে বুদ্ধি আছে। যদি মস্তিষ্কে বুদ্ধি না থাকে কিভাবে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন? আর, মস্তিষ্ক যখন আছে তা হলে মস্তিষ্কের নির্দেশ মেনে কাজ করবার উপযোগী দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও নিশ্চয়ই থাকছে। তাই যখনই আপনার ইন্দ্রিয়াদি আপনি লাভ করছেন, যখনই আপনি ইন্দ্রিয়াদির উপযোগী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গাদি পাচ্ছেন, যখনই আপনি একটি মস্তিষ্ক অর্জন করছেন, আর যখনই সেই মস্তিষ্ক কাজে লাগিয়ে ইন্দ্রয়াদি হাত-পা চালাতে হবে, তবেই ‘মানুষ’ নামের পদবাচ্য হওয়া যেতে পারে। এটাও শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত।
অতএব পরম নিয়ন্তা নির্বিশেষ হতে পারেন না। বাস্তব জীবনেই আমরা দেখছি, সরকার হয়েছে। ‘সরকার’ একটি নৈর্ব্যক্তিক শব্দ হতে পারে না। বাস্তব জীবনে আমরা দেখতে পাচ্ছি দেশের গভর্ণর আছে, তিনি কোনও একটি লোক। লোক চাই-যে মস্তিষ্ক কাজে লাগিয়ে সবকিছু করবে। তা হলে এটা কেমন করে হতে পারে, মস্তিষ্ক নেই অথচ সারা বিশ্বজগৎ নিয়ন্ত্রিত হয়ে হচ্ছে? সেটা খুব যুক্তিসঙ্গত কথা হল না। আর সেই কথা শাস্ত্রসম্মতও নয়।
শাস্ত্র অনুসারে, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় পরম সত্যকে তত্ত্বজ্ঞান বলে বোঝানো হয়েছে। ‘তত্ত্ব’ মানে ‘সত্য’। শ্রীমদ্ভাগবত বলছে, তত্ত্ববিদঃ।

বদন্তি তত্তত্ত্ববিদস্তত্তৎ যজজ্ঞানমদ্বয়ম্।
ব্রহ্মেতি পরমাত্মেতি ভগবানিতি শব্দ্যতে ॥
                                                                      (ভাগবত ১/২/১১)

“পরম তত্ত্বজ্ঞান যাঁদের সত্যই আছে, তাঁরা জানেন পরম তত্ত্বের প্রকাশ ঘটে তিনটি সংজ্ঞায়- নির্বিশেষ ব্রহ্ম, পরমাত্মা এবং ভগবান।”
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন, প্রত্যেক দেহে আত্মা রয়েছে, ক্ষেত্রজ্ঞ। ইদং শরীরং ক্ষেত্রেম্ ইত্যভিধীয়তে। আমি এই শরীরটি নই, কিন্তু আমি জেনেছি এটাই আমার শরীর। অতএব আমি ক্ষেত্রজ্ঞ আর শরীরটি হল ক্ষেত্র। আর শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, ক্ষেত্রজ্ঞং চাপি মাং বিদ্ধি সর্বক্ষেত্রেষু ভারত। (গীতা ১৩/৩) সর্বক্ষেত্রেষু ভারত মানে প্রত্যেকের শরীর মধ্যে রয়েছেন, ভগবানের অভিপ্রকাশ হলেন শ্রীকৃষ্ণ পরমাত্মা রূপে। একটি গাছের সঙ্গে এটির তুলনা করা চলে। একটি গাছে যেন দুটি পাখি বসে আছে। একটি পাখি ফল খাচ্ছে (জীবাত্মা) আর অন্যটি শুধুই দেখছে (পরমাত্মা)।

প্রকৃত সমস্যা ও তার সমাধান

মানব জীবনে এই পারমার্থিক বিজ্ঞান চর্চা, এই বিজ্ঞান উপলব্ধি করতে মানুষ চায়। মানুষের জীবন সেই জন্যই সৃষ্টি হয়েছে। পরম বিজ্ঞান এই তত্ত্ব কথা। অথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা। মানব জীবনটা কুকুর বেড়ালের মতো অপব্যবহার করার জন্য হয়নি- কেবল আহার, নিদ্রা, মৈথুন নয়। ওটা মানুষের জীবনধারা নয়। এই মুহূর্তে মানুষ কেবলই তার জীবনে দেহটির দাবি মেটাতেই চারটি জড়জাগতিক অভ্যাসে সংশ্লিষ্ট হয়ে রয়েছে- আহার, নিদ্রা, ইন্দ্রিয়তৃপ্তি আর কিভাবে নিজেকে বাঁচাতে হয় এবং আত্মরক্ষা করতে হয়।
দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমরা পশুদের চেয়েও অধম হয়ে পড়ে আছি, কারণ পশুদের কোনও সমস্যাই নেই। ৮৪ লক্ষ জীবযোনির মধ্যে মানবযোনি মাত্র ৪ লক্ষ। বেশির ভাগ জীবনই হচ্ছে অন্যান্য আকৃতির।

জলজা নবলক্ষাণি স্থাবরা লক্ষবিংশতি।
ক্রিময়ো রুদ্রসংখ্যকাঃ পক্ষিণাং দশলক্ষণম্ ॥

জলজ প্রাণি আছে, কীট পতঙ্গ রয়েছে, পশুপাখি, গাছপালা, সব শেষে মানুষ- বিবর্তনের ক্রমান্বয়ে হয়েছে। অন্য যোনিজ প্রাণিদের কোন সমস্যা নেই। দেখতে পাচ্ছে- ভোরবেলা এই সব পাখিগুলি নাচে, গায়- ওদের কোনই সমস্যা নেই। এখনি কোনও গাছে যাবে, ফল খাবে- খাওয়ার সমস্যা নেই। ঘুমের সমস্যা নেই, যৌন জীবনেরও সমস্যা নেই। নারী পুরুষ পরস্পরকে বাঁচাতে খুব চেষ্টা করে থাকে নিজেদের বুদ্ধিমতো। এগুলি সমস্যাই নয়। শরীরের প্রয়োজনে এগুলির সমাধান হয়েই যাবে। এটাই শাস্ত্রের বচন।
তল্লভ্যতে দুঃখবৎ অন্যতঃ সুখং কালেন সর্বত্র গভীররংহসা। যার যার শরীর অনুসারে, আহার সমস্যা, নিদ্রার সমস্যা, ইন্দ্রিয় তৃপ্তির সমস্যা এবং আত্মরক্ষার সমস্যার সমাধান হয়েই রয়েছে। আপনাদের প্রকৃত সমস্যা হল জন্ম, মৃত্যু, জরা ও ব্যাধির কালচক্রটির সমস্যা কিভাবে সমাধান করা চলে। সেটাই আপনাদের সমস্যা। তাই মানব সমাজে, কিছু ধর্ম-সংস্কৃতির ব্যবস্থান আছে, যার মাধ্যমে এই সমস্যাগুলির সমাধান হয়। কিন্তু বর্তমান যুগে মানুষ এমনই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে তারা যথার্থ সমস্যার কথা ভাবছে না, কিন্তু তারা অনিত্য সমস্যা আদি নিয়ে বড়ই ব্যতিব্যস্ত হয়ে রয়েছে যেগুলির সমাধান হয়েই রয়েছে। আমরা কেবল সেইগুলির অব্যবস্থা ঘটাচ্ছি। তাই জীবনের সমস্যাদির সমাধান করবার পদ্ধতি তাকে বলা হয় ধর্ম। ধর্ম মানে বিধিবদ্ধ জীবনধারা বিধিবদ্ধ নীতির মাধ্যমে গড়ে উঠে এবং তার জন্য রাষ্ট্রের আইনকানুন থাকে, তেমনি মানব সমাজেও বিধিবদ্ধ নিয়মনীতিকে বলে ধর্ম। মানুষের জীবন সার্থক করার জন্যই তা দরকার। সার্থক জীবন কাকে বলে? মানুষের সার্থক জীবন বলতে বিবর্তনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই মানব রূপ লাভ করেছে। এখনই তাকে এমন ব্যবস্থা করতে হবে যেন জন্ম, মৃত্যু, জরা ও ব্যাধির আবর্ত থেকে সে মুক্ত হয়ে উচ্চতর গ্রহলোকে উন্নত জীবন যাপনের অধিকার লাভ করতে পারে।
ধর্ম শব্দের যথার্থ ব্যাখ্যা
সেটি (গীতা ৯/২৫) বোঝানো আছে-

যান্তি দেবব্রতা দেবান্ পিতৃন্ যান্তি পিতৃব্রতাঃ।
ভূতানি যান্তি ভূতেজ্যা যান্তি মদ্যাজিনোহপি মাম্ ॥

এই হল মানব জীবন। জন্ম, মৃত্যু, জরা ও ব্যাধির আবর্ত থেকে মুক্ত হয়ে জীবনের দুর্বিষহ অবস্থার স্থায়ী সমাধানের জন্য উচ্চতর জীবনধারার উপযোগী করে নিজেকে গড়ে নিতে হবে। এটাই বাঞ্ছনীয়। এটাই মানুষের কাজ, অর্থাৎ ধর্ম।
তাহলে কিভাবে সেই ধর্ম আয়ত্ত করা যাবে? ধর্ম মানে বৃত্তি মূলক কর্তব্য পালন। ধর্ম একটা ভাবাবেগের ব্যাপার নয়। বস্তুত আজকাল মানুষ ধর্মকে মনে করে একটা বিশ্বাস মাত্র। কিন্তু বৈদিক শাস্ত্রে সেইভাবে বর্ণনা দেওয়া আছে। বিশ্বাস আমরা বদলাতে পারি। আজ হিন্দু, কাল বৌদ্ধ। বা আজ খ্রিষ্টান কাল জৈন। বিশ্বাস বদলানো যায়। কিন্তু সেটা ধর্ম নয়। ধর্ম মানে যা আপনি বদলাতে পারেন না।
ধরুন, আপনি সরকারি কর্মী। একটা সরকারি দপ্তরে কাজ করছেন। কিন্তু কাল হিন্দু বা খ্রিষ্টান হয়ে গেলেন। তবে তাতে কি আপনার সরকারি চাকরিও বদলে যাবে? না। সেটা চলতে থাকবে। তাহলে আসল কাজ বলতে বোঝায় কাউকে সেবার কাজ, সেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু জীবের স্বরূপ হয় নিত্য কৃষ্ণদাস। আমাদের প্রকৃত কাজ, প্রকৃত বৃত্তি হল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা। সেই সেবা মনোভাব নেই, কারণ আমরা ভগবানকে ভুলে আছি। আমরা অন্য জনগনের সেবা করছি। ওটা হল মায়া। সেবা আমাদের করতেই হবে। কেউ বলতে পারে না, “আমি কারও সেবা করি না। আমি স্বাধীন।” তা সম্ভব নয়। আপনাকে সেবা করতেই হবে। আর সেই সেবাই হল ধর্ম। যেমন, লবন নোনা স্বাদের হয়, চিনি মিষ্টি স্বাদের। মিষ্ট স্বাদটি চিনির ধর্ম। লঙ্কার ঝাল তার ধর্ম। এটা বদলাতে পারে না। চিনি নোনতা হলে আপনি তা নেন না। “আরে, এটা তো চিনি নয়।” তেমনি, জীবের নিত্য বৃত্তি রয়েছে। সেটি সেবা বৃত্তি। সেই সেবাকে ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে- ‘পরিবারের সেবা’, ‘দেশের সেবা’, ‘সমাজ সেবা’, ‘জাতির সেবা’, ‘মানবতার সেবা’- এমনকি কত নাম আছে। কিন্তু সব আছেই। তবে এই সমস্ত সেবা সম্পূর্ণ হতে পারে না ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পারমার্থিক সেবাকার্য সম্পন্ন না হলে। তাতেই সেবার সার্থকতা। আর সে-ই হল ধর্ম। ধর্ম কাকে বলে এ থেকে তা বুঝতে চেষ্টা করবেন।
শ্রীমদ্ভাগবতে শ্রীল সূত গোস্বামী নৈমিষারণ্যে সমবেত মুনি সমাবেশে শৌনক মুনির প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। শ্রীকৃষ্ণ অবতীর্ণ হয়েছিলেন- পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্; ধর্ম সংস্থাপনার্থায়। তাই মুনিদের জিজ্ঞাসা ছিল- “শ্রীকৃষ্ণের অপ্রকট লীলার পরে, ধর্মের পালন কিভাবে হবে?” আর “ধর্ম প্রকৃতভাবে কি?” এখানে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। স বৈ পুংসা পরো ধর্মঃ। ‘পরঃ’ মানে ‘শ্রেষ্ঠ’। এই ধর্ম, সেই ধর্ম হিন্দু ধর্ম, খ্রিষ্টান ধর্ম কিংবা আরও কত ধর্ম রয়েছে। সবই ধর্ম। এসব অনিত্য। কিন্তু ‘পরো ধর্মঃ’ মানে ‘নিত্য ধর্ম’, শাশ্বত ধর্ম বা সনাতন ধর্ম। তাকে বলে পর। ‘পরা’ মানে ‘শ্রেষ্ঠ’।
তাই স বৈ পুংসাং পরো ধর্মো যতো ভক্তিরধোক্ষজে। ‘অধোক্ষজ’ মানে ‘ভগবান’। ‘অধঃ’ মানে ‘নিম্নমুখী’। ‘অক্ষজ’ মানে ‘প্রত্যক্ষ ধারণা’। প্রত্যক্ষ ধারণায় ভগবানকে উপলব্ধি করা যায় না। চোখ আছে, কিন্তু তা দিয়ে ভগবানকে দেখতে চাইলে দেখা যাবে না। চোখ তৈরি করা চাই। এর জন্য শ্রুতির মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। শ্রবণ অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।

 ভগবানের উপলব্ধি হবে কিভাবে?

শ্রবণং কীর্তনং বিষ্ণোঃ স্মরণং পাদসেবনম্।
অর্চনং বন্দনং দাস্যং সখ্যম্ আত্মানিবেদনম্ ॥

এই হল পদ্ধতি। শ্রবণ মাধ্যমে শুরু করতে হয়। যদি শুধুমাত্র শ্রবণের মাধ্যমে ভগবানের কথা শোনা যায়, তা হলে শ্রবণের মাধ্যমেই ভগবানকে দেখা যাবে। কারণ আমাদের অন্তরে কলুষতার মেঘ জমে রয়েছে। সেই কালিমা পরিমার্জিত না হলে আমাদের ভগবানের উপলব্ধি হবে না।
এই জন্যই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ কীর্তনের এই পদ্ধতি বর্ণনা করে বলেছেন, চেতোদর্পণমার্জনম্- “চিত্তদর্পণটিকে পরিমার্জন করতে হবে।” ধুলিধূসরিত দর্পণটিকে পরিষ্কার না করলে যেমন নিজের মুখ ভালভাবে দেখা যায় না, তেমনি খুব ভালভাবে চিত্ত পরিমার্জন না করলে পাপকর্ম ফলে পরিপূর্ণ অন্তরে ভগবানের যথাযথ উপলব্ধি অসম্ভব। কোন মতেই তা সম্ভব হয় না। গীতায় ৭/২৮ বলা হয়েছে-

যেষাং ত্বন্তগতং পাপং জনানাং পুণ্যকর্মণাম্।
তে দ্বন্দ্বমোহনির্মুক্তা ভজন্তে মাং দৃঢ়ব্রতাঃ ॥

যে সমস্ত পুণ্যবান ব্যক্তির পাপচিন্তা সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়েছে তাঁরা ভগবানকে দেখতে পারেন। সেটা খুব সহজেই সম্ভব হয়। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় ১৮/৬৬ বলেছেন-

সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥

এই জড় জগতে আমরা প্রত্যেকেই গত জন্মের এবং ইহ জন্মের পাপকর্মের ফল ভোগ করছি। সেটা বাস্তব সত্য। কিন্তু পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, “যদি তুমি আমার শরণাগত হও, আমার কাছে আত্মসমর্পণ কর, তা হলে তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে আমি মুক্ত করব।”
অতএব, পাপময় জীবন থেকে মুক্ত পেতে হলে একটি মাত্র সহজ সরল পন্থা রয়েছে- পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণে আত্মসমর্পণ করা। সেখানেই শুরু হয় ভগবদ্ভক্তি। যতো ভক্তিরধোক্ষজে। ভগবানের পাদপদ্মে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করলেই ভক্তিজীবন শুরু হয়। ভগবানে আত্মসমর্পণ ভক্তিজীবন। হিন্দু হোক, খ্রিষ্টান হোক, বৌদ্ধ হোক তাতে কিছু আসে যায় না। অধোক্ষজ ভগবান তথা শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভালবাসা জাগাতে পারে যে কেউ। সেখানেই ভক্তির পরীক্ষা। আপনি বড়াই করে বলতে পারেন, “আমি ধার্মিক মানুষ,” কিন্তু তার পরীক্ষা হয় আপনি ভগবানকে ভালবাসতে শিখেছেন কতটা, তাঁর শ্রীচরণে পরিপূর্ণভাবে নিজের সবকিছু সমর্পণ করতে পেরেছেন কতটা, সেই হিসেব দেখে।

সূত্র: ব্যাক টু গডহেড ( এপ্রিল – জুন) ২০২০ সালে প্রকাশিত।

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ ও ব্যাক টু গডহেড এর ।। গ্রাহক ও এজেন্ট হতে পারেন

প্রয়োজনে : 01820-133161, 01758-878816, 01838-144699

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here