পরীক্ষিৎ মহারাজের মহিমাময় প্রয়াণ

0
28

মহারাজ পরীক্ষিৎ সমগ্র বিশ্বকে শিখিয়েছিলেন যে, কিভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়।

শ্রীমৎ রাধানাথ স্বামী

প্রতিরুদ্ধেন্দ্রিয়প্রাণমনোবুদ্ধিমুপারতম
স্থানত্রয়াৎ পরং প্রাপ্তং ব্রহ্মভূতমবিক্রিয়ম্ ৷৷

অনুবাদ : সেই মুনির ইন্দ্রিয়, প্রাণ, মন এবং বুদ্ধি সমস্তই জড় বিষয় থেকে প্রত্যাহৃত হয়েছিল, এবং তিনি জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি এই ত্রিবিধ অবস্থার অতীত তুরীয় পদ প্রাপ্ত হয়েছিলেন বলে তিনি ব্রহ্মভূত ও নির্বিকার ছিলেন। (ভা. ১/১৮/২৬)

ভগবানের গুণগান শ্রবণ ও কীর্তনের গুরুত্ব

নৈমিষারণ্যে মুনিগণ সমবেত হয়ে পরমেশ্বর ভগবানের অপ্রাকৃত লীলাসমূহ শ্রবণের জন্য উন্মুখ ছিলেন, কেননা তারা জানতেন যে শ্রদ্ধাপূর্বক কেউ যদি ভগবানের গুণমহিমা শ্রবণ করে তবে তার জীবনে এক অভূতপূর্ব চেতনার বিপ্লব সাধিত হয়। নৈমিষারণ্যে মুনিগণ সমবেত হয়ে এক বড় যজ্ঞ করছিলেন। কিন্তু সহসা তারা উপলব্ধি করলেন যে, ভগবানের নাম সংকীর্তনের চেয়ে বড় কোনো যজ্ঞ হতে পারে না। তাই তারা ভগবানের নাম সংকীর্তনের জন্য সৃত গোস্বামীকে অনুরোধ করলেন। পৃথিবীর অন্যতম মহৎ রাজা পরীক্ষিৎ যখন তার জীবনের শেষ ৭ দিন মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত উপবাস থাকার সংকল্প হয়ে গঙ্গা তটে শুকদেব গোস্বামী কর্তৃক শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করেছিলেন, তখন সেখানে উপস্থিত সূত গোস্বামী কি কি শ্রবণ করেছেন তা জানতে চাইলেন নৈমিষারণ্যের মুনিগণ। বিশেষত তারা জানতে চাইলেন কীভাবে মহারাজ পরীক্ষিৎ জীবন সন্ধিক্ষণে এই মহৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন? তাই সূত গোস্বামী মহারাজ পরীক্ষিতের জন্মবৃত্তান্ত শ্রবণ করানো শুরু করলেন।
যখন তোমার সবকিছু কৃষ্ণকে সমর্পন করবে, তখন কৃষ্ণ সবকিছুর যত্ন বিধান করবে। তুমি কোনো ভয় কর না। তোমার জীবনকে কৃষ্ণের প্রতি সমর্পনের জন্য প্রস্তুত কর।
অভিমন্যু ও উত্তরার পুত্র পরীক্ষিৎ। তার পিতা কৃষ্ণের প্রীতিবিধানের উদ্দেশ্যে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে লড়াই করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন। আমাদের অবশ্যই সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে, যদি আমাদের জীবন কৃষ্ণের প্রতি উৎসর্গ করি, তবে তিনি অন্যসব কিছু দেখভাল করবেন। মাঝে মাঝে মানুষ ভীত হয়ে ভাবে, যদি আমার সবকিছু কৃষ্ণকে উৎসর্গ করি তবে আমার পরিবারের সদস্যদের কী হবে? কিন্তু যার পারমার্থিক জ্ঞান ও বিশ্বাস আছে সে উপলব্ধি করতে পারে যে যদি কৃষ্ণের নির্দেশ অনুসারে আমাদের কর্তব্য পালন করি, তবে পরম নিয়ন্তা ভগবান সবকিছু নিয়ন্ত্রন করবেন। জড় এবং চিৎ শক্তি উভয়ই তার অধ্যক্ষতায় নিরলস কাজ করছে। কৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় বলেছেন,

“সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মাম্ একম্ শরণং ব্রজ
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ।

সর্ব প্রকার ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করব। তুমি শোক করো না।”
এটি আমাদের প্রতি পরমেশ্বর ভগবানের প্রতিশ্রুতি। তাই আমাদের কোনো ভয় থাকবে না, আমরা প্রহ্লাদ মহারাজের জীবনী থেকে দেখি যে প্রহ্লাদ মহারাজের পিতা অসুররাজ হওয়া সত্ত্বেও তিনি সর্বদাই কৃষ্ণভাবনায় থেকে কৃষ্ণের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসী ছিলেন। হিরণ্যকশিপুর কারণে প্রহ্লাদের কার্যক্রম তাকে ক্রমে ক্রমে নরকতুল্য দুর্দশার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। প্রহ্লাদ মহারাজ সেই অবস্থায়ও দিব্য আনন্দ লাভ করছিলেন, কিন্তু হিরণ্যকশিপু তার ইন্দ্রিয় দিয়ে আনন্দ লাভের চেষ্টা করছিলেন কিন্তু তিনি ধারণাতীত অপকর্ম করেছিলেন। বিশেষত ব্রাহ্মণ হত্যা, মানুষের ঘরে অগ্নি সংযোগ, যজ্ঞ ধ্বংস করা, গাভী হত্যা ইত্যাদি। কিন্তু প্রহ্লাদ সর্বদাই ভগবানের ইচ্ছার প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন, তাই ভগবানের কৃপায় তার পিতা মুক্ত হয়েছিল। এমনকি প্রহ্লাদ মহারাজের পূর্বের ১০ প্রজন্ম এবং পরবর্তী ১০ প্রজন্ম উদ্ধার হয়েছিল। কেননা ভগবান যখন ভক্তকে কৃপা করেন, তখন তিনি সেই ভক্তের সাথে সম্বন্ধযুক্ত সকলকেই কৃপা করেন। তাই কৃষ্ণ বলেছেন ভয় না করার জন্য।
আরেকটি সুন্দর উদাহরণ। অর্জুনের পুত্র ছিলেন অভিমন্যু। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কুরু সেনাগণ এমন এক বিশেষ রণকৌশল সাজিয়েছিলেন যাকে চক্রব্যূহ বলে। যার মাধ্যমে সম্পূর্ণ পাণ্ডব সেনাকে ধ্বংস করা সম্ভব, যদি না কেউ সেই বিশেষ কৌশল সম্পর্কে জ্ঞাত না হন। সেই চক্রব্যূহকে ভেঙ্গে প্রবেশ না করলে পাণ্ডবগণ নিশ্চিতরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তখন অর্জুন ছিলেন বহুদূরে যুদ্ধরত, তাই তাকে সেই মুহূর্তে আহ্বান করা অসম্ভব। অর্জুন ছাড়া শুধুমাত্র অভিমন্যু জানতেন চক্রব্যূহ ভেদ করার কৌশল। তাই যখন তাকে অনুরোধ করা হল তখন তিনি যুধিষ্ঠির এবং অন্যদের জানালেন, তিনি এই চক্রব্যূহে প্রবেশ করার কৌশল জানেন কিন্তু সেখান থেকে বের হওয়ার কৌশল জানেন না। যারা এই ব্যূহে আটক হবেন তাদের মৃত্যু সুনিশ্চিত। তখন ভীম, যুধিষ্ঠির এবং অন্যরা প্রতিজ্ঞা করলেন তারা তাকে অনুসরণ করে সেই চক্রব্যূহে প্রবেশ করবেন, যদি বহু যোদ্ধা চক্রব্যূহে প্রবেশ করতে পারে তবে কোনো ক্ষতি হওয়ার আশংকা থাকবে না। অভিমন্যু বুঝলেন যে, এটি তার জীবনের জন্য একটি ঝুঁকি। চক্রব্যূহ থেকে জীবিত ফিরে আসার সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। তিনি তা জানতেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি আসন্ন মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে ব্যূহ ভেদ করতে গেলেন কেননা কৃষ্ণপ্রীতির জন্য তিনি যুদ্ধ করছেন।
কৃষ্ণের দাসানুদাস হিসেবে তার জীবিত বা মৃত যে কোনো অবস্থার সম্মুখিন হতে কোনো ভয় নেই। কেননা তার পিতা অর্জুন, জ্যাঠা যুধিষ্ঠির মহারাজ সহ সকলেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পক্ষে যুদ্ধ করছিলেন। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সন্তুষ্টি। ক্ষত্রিয় ধর্ম অনুসারে তারা ছিলেন যোদ্ধা। তার বিশ্বাস ছিল, তাই কোনো ভয় ছিল না। তাই নিঃসঙ্কোচে তিনি সেই ব্যূহে প্রবেশ করলেন। তখন তিনি ছিলেন একজন তরুণ। তিনি প্রবেশ করার সাথে সাথে কুরুগণ সেই ব্যূহের দ্বার বন্ধ করে দেয়। তাই আর কেউ সেই ব্যূহে প্রবেশ করতে পারলেন না। অভিমন্যু একাকী লড়াই করতে লাগলেন। কুরুদের সমস্ত শক্তিশালী মহারথীগণ অবিধিপূর্বক একত্রে অভিমন্যুকে প্রতিদ্বন্ধিতায় আহ্বান করলেন। তিনি তখন এমনভাবে লড়াই করলেন যে, তার শত্রুপক্ষের মহারথীগণও ভীত হয়ে পড়েছেন। শেষ পর্যন্ত কুরুপক্ষের সমস্ত মহারথীরা মিলে অন্যায়ভাবে অভিমন্যুকে হত্যা করে।
একইভাবে ভগবানের কীর্তন চলাকালীন সময়ে শ্রীবাস পণ্ডিতের ছেলে মারা যান এবং ভগবানের নিত্যধামে গমন করেন। এইভাবে মৃত্যুবরণ করাতে কোনো প্রকার ক্ষতি নেই, কেননা আমাদের অন্তিম উদ্দেশ্য হল নিত্যধামে গমন করা। যেহেতু আমাদের জীবন মাত্র কয়েক বছরের সমষ্টি মাত্র, তাই এই ক্ষুদ্র জীবনেই কৃষ্ণভাবনামৃত অবলম্বনের মাধ্যমে পরিশেষে ভগবানের নিত্যলীলায় যুক্ত হওয়ায় জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। কিন্তু তার প্রয়াস করার পরিবর্তে আমরা এই জগতে দেহসুখ ভোগ করার বাসনা নিয়ে থাকি এবং ভগবানের কাছে ফিরে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ হারাই । এটি হলো একটি দুর্ভাগ্যজনক ক্ষতি।
অভিমন্যু ভগবানের ধামে ফিরে গেলেন। তিনি ভগবানের সেবায় যুক্ত থেকে পরিশেষে ভগবানের নিত্যলীলায় যুক্ত হলেন। তাই এতে কোনো ক্ষতি নেই। মহাভারতে এই বিখ্যাত ঘটনার পরবর্তী সময়ের কথা বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। পরবর্তীতে অর্জুন জয়দ্রথকে হত্যা করেন যিনি অভিমন্যুকে হত্যার জন্য দায়ী। এরপর দৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণকে হত্যা করেন। দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা এর প্রতিশোধ নিতে চাইলে তিনি পাণ্ডবদের সকল উত্তরাধিকারীদের হত্যা করতে চাইলেন। অভিমন্যু যখন মৃত্যু বরণ করছিলেন তখন তার পত্নী ছিল গর্ভবতী। তাই কেউ হয়তো বা বলতে পারেন পিতা মৃত্যুবরণ করায় কে এই শিশুর দেখাশুনা করবেন? এটি জাগতিক ধারণা। পারমার্থিক দর্শনে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, অভিমন্যু ছিল একজন ভক্ত যিনি কৃষ্ণের প্রতি শরণাগত হয়ে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাই কৃষ্ণই তার পুত্রের রক্ষণাবেক্ষণ করবেন, এটি ছিল সুনিশ্চিত। এই শিশু তার পিতা অভিমন্যু এবং প্রপিতামহ অর্জুনের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন তাই কেন কৃষ্ণ তার যত্নগ্রহণ করবেন না? ভগবান পরম নিয়ন্ত্রক তিনি তাঁর ভক্তের জন্য নিজের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেন। অশ্বত্থামা যখন উত্তরার গর্ভের শিশুর দিকে ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করলেন তখন সেই অসহায় মাতা উত্তরার ডাকে ভগবান সাড়া দিয়ে তার গর্ভস্থ শিশুকে রক্ষা করলেন। কেননা ভগবান প্রতিজ্ঞা করেছেন-

ক্ষিপ্রং ভবতি ধর্মাত্মা শাচ্ছান্তিং নিগচ্ছতি ।
কৌন্তেয় প্রতিজানীহি ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি ॥

তিনি শীঘ্রই ধর্মাত্মায় পরিণত হন এবং নিত্য শান্তি লাভ করেন। হে কৌন্তেয়! তুমি দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা কর যে, আমার ভক্ত কখনও বিনষ্ট হন না। (গীতা-৯/৩১)
এখানে সূত গোস্বামী শ্রীমদ্ভাগবতে বহু দিব্য লীলা কাহিনি বর্ণনা করেছেন। শ্রীল রূপ গোস্বামী বলেছেন, “এই জীবন কৃষ্ণকে অর্পন কর। ভীত হইও না। কৃষ্ণ তোমাকে সবকিছু প্রদান করবেন এমনকি তিনি নিজেকেও তোমার কাছে সমর্পন করবেন।” তাই আমাদের দ্বিধান্বিত হওয়া উচিত নয়। কৃষ্ণ গীতায় বলেছেন “তাঁর সেবায় যে ভক্ত নিজেকে উৎসর্গ করেন তিনি তাঁর প্রাপ্তি এবং অপ্রাপ্তিগুলো সংরক্ষণ করেন।” তাই যদি আমরা কৃষ্ণের শরণাগত হই তাহলে কৃষ্ণ আমাদের রক্ষা করবেন।

পরীক্ষিৎ মহারাজের জীবনী

পরীক্ষিৎ মহারাজ আবির্ভূত হওয়ার পর একটি অসাধারণ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষিৎ মহারাজ মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করেন। তাই তিনি বাল্যকাল থেকে কৃষ্ণ ভক্তি পালন করেন। তিনি সর্বদা বিগ্রহ অৰ্চন ও পূজা কার্যে মনযোগ নিবন্ধ করতেন। তিনি অন্যান্য রাজপুত্রদের মতো খেলাধুলায় সময় ব্যয় করতেন না। তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী শিশু, তিনি মহারাজ যুধিষ্টির, ভীম, অর্জুন, নকুল এবং সহদেবের হিমালয় গমন এবং পরিশেষে ভগবদ্ধামে প্রত্যাবর্তনের পর রাজা হন।

বিচার কি?

মহারাজ পরীক্ষিৎ সম্পূর্ণ শাস্ত্রীয় অনুশাসনে রাজ্য পরিচালনা করতেন। তিনি সবকিছুই ভগবানের প্রীতির উদ্দেশ্যে করতেন। প্রজাদের সুরক্ষার জন্য তিনি নিজেই ভ্রমণ করতেন। একবার তিনি দেখলেন কলি কর্তৃক একটি গাভী ও ষাঁড়কে নির্যাতন করা হচ্ছে, তা দেখে তিনি ক্রোধে কলিকে হত্যা করতে চাইলেন। এটিই হলো সুবিচার । শুধু কোর্টে গিয়ে আইনজীবির মাধ্যমে জুরি বোর্ডে আপিল করে বিচার করার প্রত্যাশা করা নয়। এই প্রক্রিয়ায় সর্বদা সুবিচার প্রত্যাশা করা যায় না। মহারাজ পরীক্ষিৎ ছিলেন সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর। তিনি চাইলে বহু অপকর্ম করতে পারতেন, কিন্তু তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত ছিলেন বিধায় সুবিচার করে প্রজাদের সর্বোত্তম সুরক্ষা প্রদান করেছিলেন।

চতুর্যুগের চক্র

মায়া শক্তি সম্পন্ন কলি মহারাজ পরীক্ষিতের পাদপদ্মে শরণাগত হন। তিনি কেমন রাজা ছিলেন? তাঁর সময়ে ভগবানের ইচ্ছায় কলিযুগের সূচনা হয়। চতুর্যুগের প্রথম যুগ সত্যযুগকে ধর্মের স্বর্ণযুগ বলা হয়। এরপর ত্রেতাযুগে ধর্মের চার ভাগের একভাগ বিনষ্ট হয় ও দ্বাপর যুগে অর্ধেক জনসংখ্যার মানুষ অধার্মিক। কলিযুগে চারভাগের তিনভাগ মানুষ অধার্মিক এবং একভাগের কম মানুষের আধ্যাত্মিক জ্ঞান আছে। কলিযুগ যতই এগোবে আধ্যাত্মিক চেতনার মানুষের সংখ্যা ততই কমতে থাকবে এবং কলিযুগের শেষে কল্কি অবতার আবির্ভূত হয়ে সমস্ত দুষ্কৃতকারীদের হত্যা করে সত্যযুগের সূচনা করবেন। এই চার যুগের চক্রকে বলা হয় দিব্যযুগ
মানব জাতির আদি পিতা মনুর এক জীবনে এই ধরনের ৭১টি দিব্য যুগ আসে। মোট মনুর সংখ্যা ১৪ জন। অর্থাৎ ব্রহ্মার একদিনে ১ হাজার টি দিব্যযুগ আসে। ব্রহ্মার ১ দিন সমান ৪ বিলিয়ন ৩২০ মিলিয়ন বছর। এরপর ৪ বিলিয়ন ৩২০ হাজার বছরে হয় ব্রহ্মার ১ রাত্রি, এই সময়কালে সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড জলে নিমগ্ন থাকে। সকলে তখন ভগবান বিষ্ণুর শরীরে নিদ্রামগ্ন থাকেন। এরপর ব্রহ্মা জাগরিত হওয়ার পর সমস্ত জড় বদ্ধ জীব ৮৪ লক্ষ বিভিন্ন প্রজাতিতে কর্মের ফল অনুসারে জড় দেহ লাভ করে। এই যুগচক্র ভগবানের ইচ্ছায় সংঘটিত হচ্ছে। কলিযুগে যুগাবতার আবির্ভূত হন না কিন্তু এই কলিযুগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এই কলিযুগে যুগাবতার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সর্বাপেক্ষা দয়ার অবতার। তাই আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে কলিযুগের আবির্ভাব ভগবানের বিশেষ ইচ্ছায় এবং উদ্দেশ্যে। সেই উদ্দেশ্যটা হলো কলিযুগের সমস্ত জীব ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন ও শ্রবণের মাধ্যমে ভগবদ্ধামে প্রত্যাবর্তন করতে পারে।

সাধুর গুণাবলী

মহারাজ পরীক্ষিৎ একবার তৃষ্ণার্ত হয়ে বনে পরিভ্রমণ করছিলেন। তখন এক অদ্ভূত লীলা সংঘটিত হলো। তিনি ছিলেন সহিষ্ণু, সমব্যথী, আত্মনিয়ন্ত্রক, সকলের প্রতি কৃপা পরায়ণ। এটাই হলো মহান সাধুর লক্ষণ। মহারাজ পরীক্ষিৎ রাজমুকুট পরিহিত ছিলেন, তাঁর অঙ্গে নানাবিদ রত্ন শোভা পাচ্ছিল এবং তিনি একটি বৃহৎ প্রাসাদে বসবাস করতেন। একজন সাধু সর্বদাই সহিষ্ণু। তিনি সমস্ত জীবের প্রতি কৃপাপরায়ণ এবং তিনি সর্বদাই কৃষ্ণকে স্মরণ করেন। যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর অন্তরঙ্গ পার্ষদদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, বৈষ্ণব কে? তিনি বলছিলেন কুলিনা গ্রামের অধিবাসীদের কথা তাদের অধিকাংশই ছিল গৃহস্থ। অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন যে, বৈষ্ণব হওয়ার জন্য গৃহত্যাগ করতে হয়। কিন্তু বৈষ্ণব হলেন সেই যিনি সর্বদা কৃষ্ণ নাম কীর্তন করেন, সর্বদা কৃষ্ণকে স্মরণ করেন এবং কৃষ্ণের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কৃষ্ণের দেওয়া আদেশ অনুসরনে জীবন নির্বাহ করেন। এটিই হলো বৈষ্ণব ও সাধুর লক্ষণ।

মন্দির বা গৃহে কলির প্রবেশ

মহারাজ পরীক্ষিৎ এতই দয়ালু ছিলেন যে, তিনি কলিকে ক্ষমা করেছিলেন। যদিও কলি গাভী হত্যার মাধ্যমে ধর্মের পা ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। মহারাজ পরীক্ষিৎ তাকে শুধু ক্ষমাই করেন নি, তাঁর বসবাসের জন্য স্থানও নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। তিনি কলিকে তাঁর রাজ্যের কয়েকটি স্থান প্রদান করেন কেননা রাজা হিসেবে তাঁর কর্তব্য শরণাগতকে স্থান দেওয়া। তিনি বলেছেন যেখানেই অবৈধ স্ত্রী সঙ্গ, নেশা দ্রব্য গ্রহণ, দ্যূতক্রীড়া এবং মাংসাহার ও পশুহত্যা চলে যেখানে লোভ ও সম্পদের অহঙ্কার থাকবে এমন ৫টি স্থানে কলি অবস্থান করতে পারবেন। তাই বর্তমান পৃথিবীতে কলির বহু বাসস্থান হয়ে গেছে। কলি সমগ্র বিশ্ব শাসন করছে। তাই মন্দির কিংবা গৃহে কলির প্রবেশ রুদ্ধ করার জন্য আমাদেরকে শুদ্ধ হতে হবে, ঝগড়া বিরোধ না করে একে অন্যকে সহযোগিতা করতে হবে এবং সকলে মিলে পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি আমাদের হারানো বিশ্বাস পুনঃস্থাপন করতে হবে।
মহারাজ পরীক্ষিতের বদান্যতায় কলি স্থান পেয়েছিলো। মহারাজ পরীক্ষিৎ ছিলো একজন বৈষ্ণব। তিনি প্রজাদের কৃষ্ণভাবনামৃতের শিক্ষা দিতেন। তাই প্রজাদের সমস্ত আবাস ভূমি ছিল শুদ্ধ। তাই সমগ্র পৃথিবী ছিল শুদ্ধ। যেহেতু সমস্ত জল ছিল শুদ্ধ তাই তিনি যেকোনো স্থানে গিয়ে জল পান করতে পারতেন। তখন কোনো বিষক্রিয়া ছিলো না। কিন্তু বর্তমানে যদি আমরা পুকুর বা নদীর জল পান করি তবে টাইফয়েড, ডাইরিয়া ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হবো। বর্তমানে মিনারেল। ওয়াটারের বোতলের ওপর নির্ভর করতে হয় এবং জলকে পরিশুদ্ধ করার জন্য আছে ফিল্টারিং সিস্টেম। কিন্তু বৈদিক যুগে সমস্ত জল ছিল সুপেয়।

অভিশাপগ্রস্থ মহারাজ পরীক্ষিৎ

জলের সন্ধানে বনে পরীক্ষিৎ মহারাজ শৈমিক ঋষির আশ্রমে পদার্পণ করেন। শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণিত আছে, শৈমিক ঋষি ছিলেন একজন মহান যোগী, তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাবে সমস্ত নিয়মাবলী অনুসরণ করতেন। ধ্যানাবস্থায় তার বাহ্যজ্ঞান ছিল না। সেসময় মহারাজ পরীক্ষিৎ তার কাছে পানীয় জল চাইলেন। বৈদিক প্রথা অনুযায়ী কোন অতিথি গৃহে পদার্পণ করলে তাকে খাবার জল প্রদান করতে হয়। শৈমিক ঋষি সমাধি মগ্ন থাকায় মহারাজ পরীক্ষিৎ কোনো সমাদর পেলেন না। মহারাজ পরীক্ষিৎ যেহেতু একজন মহান ভক্ত ছিলেন তাই তার পক্ষে তা উপলব্ধি করা ছিল সহজতর। কিন্তু যেহেতু পরমেশ্বর ভগবান কলিযুগ প্রারম্ভ করতে চাইলেন তাই বহু উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তিনি একটি লীলা প্রকাশ করতে চাইলেন। কৃষ্ণ একদিকে কলিযুগ প্রারম্ভ করতে চাইলেন এবং অন্যদিকে তিনি যুগাবতার গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুরূপে আবির্ভূত হতে চাইলেন। সূত গোস্বামী শ্রীমদ্ভাগবতে বলেছেন যে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধানের পর তিনি নিজেকে ত্রুটিমুক্ত অমল পুরাণ শ্রীমদ্ভাগবতরূপে আবির্ভাব ঘটান। কৃষ্ণের অধ্যক্ষতায় এই জগতে এই অমূল্য শ্রীমদ্ভাগবত অবতরণ করেছে। এই শ্রীমদ্ভাগবতের আবির্ভাব ঘটেছে মূলত মহারাজ পরীক্ষিতের মাধ্যমে। যোগমায়ার মাধ্যমে মহারাজ পরীক্ষিতের বুদ্ধিমত্তা হল অন্তর্হিত। আমাদের সকল স্মৃতি, জ্ঞান ও ভুলে যাওয়ার ক্ষমতাও কৃষ্ণ দিয়েছেন। তাই কৃষ্ণের ইচ্ছায় মায়ার আবেশে মহারাজ পরীক্ষিৎ একটি মৃত সৰ্প নিয়ে শৈমিক ঋষির গলায় পরিয়ে দিলেন।

শ্রীমদ্ভাগবতের আগমন

শৈমিক ঋষির শৃঙ্গী নামক এক বিখ্যাত পুত্র ছিল । ব্রাহ্মণপুত্র শৃঙ্গির ছিল অসাধারণ শক্তি, কিন্তু তিনি ব্রাহ্মণগুণসম্পন্ন ছিলেন না। তাই তিনি রাজাকে অভিশাপ দিলেন যে, ৭ দিন পর তক্ষক নামক একটি সর্পপাখি কর্তৃক তিনি দংশিত হয়ে মৃত্যুবরণ করবেন। যখন মহারাজ পরীক্ষিৎ সেই বাণী শ্রবণ করলেন তখন তিনি উপলব্ধি করলেন এটি ভগবানের ইচ্ছা। তিনি তার সাম্রাজ্য, স্ত্রী-পুত্র, ঐশ্বর্যের প্রতি আকর্ষিত ছিলেন না, তিনি শুধুমাত্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। তিনি জীবনের শেষ ৭ দিন যা করলেন সেটিই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তিনি গঙ্গার তীরে গমন করে সমস্ত ঋষিদের ভগবান কৃষ্ণ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। সেই স্থানটি এখনো রয়েছে। এটি ঋষিকেশ ও দিল্লির মধ্যবর্তী স্থান মিরাটের সন্নিকটবর্তী। সেই অপ্রাকৃত স্থানটির নাম সুখদা। এই স্থানে মহারাজ পরীক্ষিৎ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তিনি ৭ দিন যাবৎ আহার নিদ্রা ত্যাগ করে সর্বদাই কৃষ্ণ লীলা স্মরণ করবেন। তখন সেখানে সমস্ত মহান ঋষিগণের আগমন ঘটল। নারদ মুনি, পরাশর মুনি, ভরদ্বাজ মুনি, কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস, গৌতম ঋষি সহ সকলে মিলে স্থির করছিলেন কে মহারাজ পরীক্ষিৎকে কৃষ্ণকথা শ্রবণ করাবেন? সেই সময় ১৬ বছর বয়স্ক শুকদেব গোস্বামী সভাস্থলে প্রবেশ করলেন। উল্লেখ্য, অলৌকিকভাবে শুকদেব গোস্বামী ১২ বছর মাতৃগর্ভে ছিলেন। তিনি একজন ব্রাহ্মণ, মুক্ত আত্মা। পরমেশ্বর ভগবানের মহিমা শ্রবণ করে তিনি বেরিয়ে এলেন এবং বেদব্যাস তাকে শ্রীমদ্ভাগবত শিক্ষা প্রদান করেন। তাই পরম্পরাক্রমে শুকদেব গোস্বামী ছিলেন উপযুক্ত ব্যক্তি। সভাস্থ সকলে শুকদেব গোস্বামীকে ব্যাসাসন প্রদান করেন এবং মহারাজ পরীক্ষিৎ তাকে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন। এভাবেই মহান শাস্ত্রের আগমন ঘটে।

মহারাজ পরীক্ষিতের শরণাগতি

মহারাজ পরীক্ষিৎ মৃত্যুবরণের অভিশাপ গ্রন্থ হয়েছিলেন। তাহলে পরীক্ষিতের মৃত্যু পরবর্তী কে রাজ্যশাসন করবে? তিনি তখনো কোনো উত্তরসুরী তৈরি করেননি। সাধারণত এই জগতে কোনো মানুষ ৫০ বা ৬০ বছর বয়সে পৌছানোর পর তার উত্তরাসুরী তৈরি করে তাকে প্রশিক্ষণ প্রদান করে। কিন্তু মহারাজ পরীক্ষিৎ ছিলেন তখনও একজন যুবক। যখন আমরা যুবক বয়সে উপনীত হই তখন আমরা জড় সুখ ভোগে মত্ত থাকি। কিন্তু পরীক্ষিৎ মহারাজের সামনে মৃত্যুর খড়গ ঝুলছিল, তাও সাধারণ কোনো মৃত্যু নয়। তক্ষকের দংশন অচিন্তনীয় বেদনাদায়ক। যখন সেই সর্প কাউকে দংশন করবে, তার বিষ এতই উত্তপ্ত ও ভয়ংকর যে দংশিত ব্যক্তির দেহে আগুন লেগে যায়। তাই আমাদের কি এই ধরনের দুঃখ উপনীত হতে হয়েছে? কিন্তু আমরা কারো দ্বারা সামান্যতম নিপিড়িত হলেই অন্যকে দোষারোপ করা শুরু করি। এটি কেন? ওটি কেন? এটি কী সঠিক? এটি সুবিচার নয়। কেন আমার মত ভালো মানুষের কপালে এত দুঃখ? কেন আমি এত দুর্দশাগ্রস্থ হচ্ছি? ভগবান আমাকে কৃপা করছেন না। কিন্তু মহারাজ পরীক্ষিৎ শুধুমাত্র বলেছেন, “কৃষ্ণ! তোমার যা ইচ্ছা তাই কর।” ভক্তিবিনোদ ঠাকুর বলেছেন, তুমি আমাকে মারতে পার, আবার রক্ষাও করতে পার, তোমার যা ইচ্ছা তা করতে পার। আমি তোমার সেবক। সেবক কখনো তার প্রভুর দোষারোপ করে না। সেবক সর্বদাই তার প্রভুর নির্দেশ পালনে রত থাকে। যে দেহেই হোক না কেন কৃষ্ণসেবা করলে, কৃষ্ণ সমস্ত কিছুর ব্যবস্থা করবেন, আমাদের ভয়ের কোনো কারণ থাকবে না। তাই বলা হয়েছে, “ভজ হুরে মন শ্রীনন্দনন্দন অভয়চরণারবিন্দ রে।” ভক্তগণ সর্বদাই ভয়শূন্য কেননা তারা কৃষ্ণকৃপা লাভ করেন। তাই মহারাজ পরীক্ষিৎ অভিশাপের কথা শুনে উদ্বিগ্ন না হয়ে শুকদেব গোস্বামীকে পাদপদ্মে আশ্রয় নিয়ে বলেছিলেন- “আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান। কৃষ্ণ আমাদের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। আমি এখন কৃষ্ণ মহিমা শ্রবণ-কীর্তনের জন্য আপনার কাছে উপনিত হয়েছি।” সমগ্র শাস্ত্র অনুসারে আমাদের সর্বশ্রেষ্ট সম্পদ কোনটি? এটি হল সেই উপলব্ধি- সর্বদাই কৃষ্ণ স্মরণ কর, কখনো কৃষ্ণকে ভুলে যেও না। কৃষ্ণ সেবা এবং কৃষ্ণ ভক্তদের সঙ্গই হল আমাদের সর্বশ্রেষ্ট সম্পদ। বাকি সবকিছুই হল অস্থায়ী। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন ‘কৃষ্ণ ছাড়া এই জগতের সবকিছুই মায়া।’ তাই মহারাজ পরীক্ষিৎ গঙ্গাতটে গিয়ে কৃষ্ণভক্তদের সান্নিধ্যে কৃষ্ণের নাম, গুণ ও লীলা শিক্ষা লাভ করে সমগ্র বিশ্বকে শিখিয়েছেন কিভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়।

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে ।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে

 

জানুয়ারি-মার্চ ২০১৬ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here