পরম দয়াল শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু (পর্ব- ০১)

0
8
শ্রীপাদ তারকব্রহ্ম দাস

কলি যুগের পাবনাবতার শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুর অন্তরঙ্গ সহযোগী বলরামের অবতার পরম দয়াল শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর (২৫ ফেব্রুয়ারি) আবির্ভাব উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন

শ্রীনিত্যানন্দের আবির্ভাব

একচক্রাধামে শ্রীনিত্যানন্দের আবির্ভাবের পূর্বাভাস সম্পর্কে শ্রীনরহরি চক্রবর্তী ঠাকুর “শ্রীভক্তিরত্নাকর” গ্রন্থের দ্বাদশ তরঙ্গে বলেছেন, “দ্বাপর যুগের শেষে কুন্তীদেবীসহ পঞ্চপাণ্ডব ভ্রমণ করতে করতে রাঢ়দেশে প্রবেশ করে একচক্রা নামক গ্রামে কিছুকাল অবস্থান করেছিলেন। তাঁরা একচক্রা গ্রামে নির্জনে মহানন্দে অবস্থান করে একচক্রা ভূমির মনোহর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দর্শন করে মুগ্ধ হন। যুধিষ্ঠির মহারাজ মনে মনে বিচার করলেন অনেক দেশে ভ্রমণ করে দর্শন করেছি। কিন্তু একচক্রা ভূমির ন্যায় পরম সৌন্দর্য কোথাও মন আকৃষ্ট হয় নাই। তাই মনে হয় এই একচক্রা ভূমি শ্রীভগবানের লীলাস্থলী। শ্রীভগবান কৃপা করে যদি এই স্থানে মহিমা প্রকাশিত করেন তবেই এই ভূমির মহিমা জানা যেতে পারে। এভাবে মনে বিচার করতে করতে রাত্রি যখন প্রায় শেষ হয়ে আসল তখন শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় নিদ্রা যুধিষ্ঠির কৃপায় নিদ্রা যুধিষ্ঠির মহারাজকে আকর্ষণ করল। তখন রোহিণী নন্দন শ্রীবলরাম একচক্রা গ্রামে যুধিষ্ঠির মহারাজকে রাত্রে স্বপ্ন যোগে দর্শন দিয়ে নবদ্বীপে মহাপ্রভু শ্রীগৌরাঙ্গের আবির্ভাব এবং একচক্রা গ্রামে তিনি স্বয়ং শ্রীনিত্যানন্দরূপে যে আবির্ভূত হবেন তার ইঙ্গিত দিয়ে ভগবদ্ধাম শ্বেতদ্বীপের দর্শন প্রদান করে অন্তর্হিত হন। প্রাতঃকালে নিদ্রাভঙ্গ হলে যুধিষ্ঠির মহারাজ তাঁর ভ্রাতাদের নিকট রাত্রির স্বপ্নকথা প্রকাশ করেন।

কলিযুগের প্রথম সন্ধ্যায় শ্রীবলরামই শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু নামে বীরভূম জেলার ঐ একচক্রা গ্রামে ১৩৯৫ শতাব্দে মাঘ মাসে শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে (১৪৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ১২ জানুয়ারী) মধ্যাহ্ন সময়ে আবির্ভূত হন। তাঁর পিতার নাম শ্রীমুকুন্দ বন্দোপাধ্যায়। সমাজে তিনি হাড়াই পণ্ডিত বা হাড়ো ওঝা নামে পরিচিত ছিলেন। পিতামহের নাম সুন্দরামল্ল নকড়ি বাড়ুরী। শ্রীনিত্যানন্দের পিতৃপুরুষ শাণ্ডিল্য গোত্রীয় রাঢ়ী শ্রেণীর ব্রাহ্মণ। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর মাতার নাম শ্রীমতী পদ্মাবতী দেবী। মাতামহ ছিলেন ময়ূরেশ্বরের রাজা মুকুট নারায়ণ রায়। শ্রীগৌরগণোদ্দেশ দীপিকার মতে, পূর্ব অবতারের বসুদেব ও দশরথের মিলনে হাড়াই পণ্ডিত বা শ্রীমুকুন্দ বন্দোপাধ্যায় আবির্ভূত হন। রোহিণী ও সুমিত্রা মিলনে শ্রীমতী পদ্মাবতী দেবী আবির্ভূতা হন। হাড়াই পণ্ডিতের সাত পুত্র ছিলেন; নিত্যানন্দ, কৃষ্ণানন্দ, সর্বানন্দ, ব্রহ্মানন্দ, পূর্ণানন্দ, প্রেমানন্দ ও বিশুদ্ধানন্দ। নিত্যানন্দ ছিলেন সর্ব জ্যেষ্ঠ।

শ্রীনিত্যানন্দের বাল্য-পৌগণ্ড লীলা

শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু একচক্রা ধামে খেলার বাস্তব প্রেমের সুধারস আস্বাদনে মাতোয়ারা ছিলেন। তাঁর ভাবী জীবনের লীলা বাল্য খেলাতেই সূচিত হয়েছিল। বাল্যলীলাচ্ছলে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু শ্রীকৃষ্ণলীলা, রামলীলাদি তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে অভিনয় করতেন। তিনি জাগতিক সাধারণ শিশুদের মতো শৈশবোচিত খেলা খেলতেন না। তিনি শ্রীকৃষ্ণেরও শ্রীরামচন্দ্রের লীলা বিষয়ক খেলা খেলে লোক শিক্ষা প্রদান করেছেন। যাত্রাগানে, গীতাভিনয়ে যে সব সাজ সজ্জার প্রয়োজন শ্রীনিত্যান্দ অতি বাল্য বয়সে যথাসম্ভব সেই সব সাজ সজ্জার আয়োজন করতেন, তাতে সুচারুরূপে লীলাভিনয় সম্পন্ন হতো। এর ফলে নরনারীগণের চিত্তে যে কেবল আনন্দেরই সঞ্চার হতো তা নয়, তাদের হৃদয় ভক্তিরসে প্লাবিত হতো।

খেলাচ্ছলে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুসকল নর-নারীদের চিত্তে এভাবে নিত্য  আনন্দময় ভক্তিরসের সঞ্চার করতেন। পৌগণ্ড বয়সে মহাসমারোহে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর উপনয়ন সংস্কার সম্পন্ন হয়েছিল। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু পাঠশালায় অল্প দিনের মধ্যেই ব্যাকরণাদি শাস্ত্রে বিচক্ষণ হয়েছিলেন দ্বাদশ বছরের মধ্যেই তার অসাধারণ প্রতিভা দর্শনে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে “ন্যায় চূড়ামণি” উপাধি প্রদান করা হয়েছিল।

শ্রীনিত্যানন্দের গৃহ ত্যাগ

জেষ্ঠ্য পুত্র নিত্যানন্দ গৃহ ত্যাগ করে চলে যাবে- এই আশঙ্কায় পিতা-মাতা পুত্রের প্রতি সর্বদাই সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। অন্তর্যামী শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু সাক্ষাৎ ভগবান বিষ্ণু বলে সব কিছুই তিনি জানতেন। তাই তিনি পিতৃ-মাতৃ সুখ বিধান রূপ ধর্ম পালন করতেন। অর্থাৎ পিতামাতার কাছে সর্বদাই অবস্থান করতেন। এরূপ যখন শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু মাতা-পিতার প্রাণের প্রাণ ও নয়নমণি হয়ে ওঠেছিলেন, ইত্যবসরে একদিন সহসা এক বৈষ্ণব সন্ন্যাসী এসে হাড়াই পণ্ডিতের ভবনের অতিথি হলেন। হাড়াই পণ্ডিত পরম সমাদরে সেই অতিথির সেবায় প্রবৃত্ত হলেন। তিনি কল্পনা করতে পারেন নাই যে, তাঁর গৃহে সন্ন্যাসীর বেশে অক্রুরের আগমন হয়েছে। যথা সময়ে হাড়াই পণ্ডিত অভ্যাগত বৈষ্ণব সন্ন্যাসীকে পরমাদরে নিজগৃহে ভোজন করিয়ে সন্ন্যাসীর নিকটে বসে উভয়ে রসময় কৃষ্ণ কথায় প্রবৃত্ত হলেন। সন্ন্যাসীগণ গৃহস্থের গৃহে অধিক সময় অতিবহিত করে তাদের স্নেহের বন্ধনে আবদ্ধ হন না। রজনী অবসান হলে ব্রাহ্মণ-দম্পতির সুখের রজনীরও অবসান হলো। সন্ন্যাসীবর পরদিন প্রাতঃকালে হাড়াই পণ্ডিতের গৃহত্যাগ করার সময় বলতে লাগলেন- আমি পরিব্রাজক, তীর্থ পর্যটনই আমার জীবনের ব্রত, আমার সাথে কোন উপযুক্ত ব্রাহ্মণ নেই, তাই কিছু দিনের জন্য তোমার জ্যেষ্ঠ পুত্রকে আমায় অর্পণ কর। আমি প্রাণ তুল্য করে তোমার জ্যেষ্ঠ পুত্রকে সঙ্গে রাখব। আর তোমার পুত্রও নানাতীর্থ পর্যটন রূপ শিক্ষা লাভ করবে। সন্ন্যাসীর কথা শ্রবণ করে হাড়াই পণ্ডিত কাতর হয়ে মনে মনে ভাবতে লাগলেন জ্যেষ্ঠ পুত্র নিত্যানন্দ আমার প্রাণতুল্য।

এই সন্ন্যাসী আমার প্রাণটি অপহরণ করে আমার শরীর মাত্র ফেলে রেখে চলে যাবেন। আর আমি যদি তাঁর প্রার্থনা পূর্ণ না করি তা হলেও বিপদ। সন্ন্যাসীকে নিরাস করলে যদি নিত্যানন্দের কিছু অকল্যাণ হয়-এটি যেন তিনি ভাবতেও পারেন না। এভাবে হাড়াই পণ্ডিত উভয় সঙ্কটে পড়লেন। তখন পণ্ডিত পতিব্রতা সহধর্মিণী শ্রীমতী পদ্মাবতীর নিকট গিয়ে সন্ন্যাসী সম্পর্কীত সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। বিবরণ শুনে দেবী পদ্মাবতী বললেন-, “যে তোমার ইচ্ছা প্রভু সেই মোর কথা”- পদ্মাবতীর বাক্য শ্রবণে হাড়াই পণ্ডিতের মনে প্রবল শক্তির সঞ্চার হলো। তারপর পুত্র দানের স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে তিনি সন্ন্যাসীর কাছে আগমন করলেন।

“আইলা সন্ন্যাসী স্থানে নিত্যানন্দ পিতা।

ন্যাসীরে দিলেন পুত্র, নোঙাইয়া মাথা॥

নিত্যানন্দ লই চলিলেন ন্যাসীবর।

হেন মতে নিত্যানন্দ ছাড়িলেন ঘর॥

-শ্রীচৈতন্য ভাগবত

পিতা মাতার ঘনীভূত জমাট বাঁধা স্নেহ সহসা বিগলিত নয়ন জলের আকারে পতিত হয়ে শ্রীনিত্যানন্দকে অভিষিক্ত করল। শেষবারের মত পিতা-মাতা বুকে তুলে নিয়ে মস্তকাঘ্রাণ করলেন। তারপর সন্ন্যাসীর হস্তে সমর্পণ করেন। পিতামাতার অত্যন্ত দুঃখ হবে জেনে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু নিজে ইচ্ছ্বা করে গৃহ ত্যাগ করেন নাই।

শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু হলেন সকলের নিয়ন্তা। মনে হয় তাঁর প্রেরণাতেই এই সন্ন্যাসী এসে হাড়াই পণ্ডিতের গৃহে অতিথি হয়ে শ্রীনিত্যানন্দকে প্রার্থনা করেছেন। সন্ন্যাসীর মাধ্যম ব্যতীত নিত্যানন্দ যদি নিজের ইচ্ছাতে গৃহত্যাগ করতেন, তা হলে পিতা মাতার যে দুঃখ হতো তা এই দুঃখ হতেও তীব্রতর হতো।

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ, ফেব্রুয়ারি ২০২0 সংখ্যা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here