পরমেশ্বর ভগবানের নির্দেশ মেনে চলাই প্রকৃত ধর্ম

0
965

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
৫ অক্টোবর ১৯৭৫ খ্রিস্ট্রাব্দে মরিশাসে শ্রীমদ্ভাগবতে (১/২/৬) প্রবচন থেকে সংকলিত

সমাজ যখন ব্রাক্ষণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এবং ব্রক্ষচারী, গৃহস্থ, বানপ্রস্থ, সন্ন্যাস এই আট শ্রেণীতে বিভক্ত হয়, তখন তাকে মানব সমাজ বলে। বর্ণাশ্রমাচরবতা পুরুষেণ পরঃ পুমান্ ।
বিষ্ণুরারাধ্যতে পন্থা নান্যৎ তত্তোষকরণম॥

যতক্ষণ পর্যন্ত মানব সমাজ বর্ণশ্রম ধর্মের মান প্রকাশে কার্যকরী না হচ্ছে, ততক্ষণ একে মানব সমাজ বলা যাবে না এটা হলো পশু সমাজ। পশুদের কোনো নিয়ন্ত্রক আর্দশ নেই। কিন্তু মনুষ্য সমাজে এই আর্দশ অবশ্যই থাকতে হবে। তাকে বলে বর্ণাশ্রম ধর্ম। অতএব বর্ণাশ্রম ধর্মও জাগতিক। এটা আধ্যাত্মি নয়। বর্ণাশ্রম ধর্ম হলো আত্মিক জীবনের প্রারম্ভ। কি করে মানুষ চিন্ময় জীবনে পৌঁছতে পারে? এটা হলো নিয়ন্ত্রিত জীবন। চিন্ময় জীবন হলো বিষ্ণূপূজার স্তরে পৌঁছায়, তখনই সেটা হলো চিন্ময় জীবন। কিন্তু লোকেরা জানে না তাঁদের জীবনের লক্ষ কী? শুধু বর্তমানে যে তারা জানে না, তা নয়। জড় জগতের অর্থ যে এমনই আগে থেকেই তারা যানে না । তারা ভুলে গেছে। যারা খুব বেশি পরিমাণে জড়বাদী তারা ভাবে যে, “আমি হলাম এই দেহ এবং দৈহিক ইন্দ্রিয়তপ্তি বিধানই হলো জীবনের অন্তিম লক্ষ্য নয়। পরমেশ্বর ভগবানের হলো জীবনের লক্ষ্য।
এই অধ্যায়ে এটাও বলা হয়েছে , অতঃপুম্ভির্দ্বিজশ্রেষ্ঠ বর্ণাশ্রমবিভাগশঃ….। সূত গোস্বামী এই সভার সভাপতিত্ব করেছিলেন। অনেক বিদ্বান ব্রাহ্মণ, বিজ্ঞ পণ্ডিত এবং মুনি ঋষিরা সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন। সেজন্য তিনি শ্রোতৃবর্গকে দ্বিজশ্রেষ্ঠঃ বলে সম্বোধন করেছিলেন। ‘দ্বিজ’ অর্থ যার দু’বার জন্মহয়েছে-প্রথম জন্ম পিতা-মাতার দ্বারা এবং দ্বিতীয় জন্ম তার সংস্কার বা সংস্কৃতির দ্বারা। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদের সংস্কার আছে। শূদ্রের কোনো সংস্কার নেই। সংস্কার বর্জিত মানেই শূদ্র। এই যুগে কেঊ সংস্কার মানে না। সেইজন্য শাস্ত্রে বলা হয়েছে , কলৌ শূদ্র-সম্ভবাঃ। কলিযুগে প্রত্যেকেই শূদ্র। সেই কারণে এই যুগে এত বেশি বিশৃঙ্খলা। সরকার শূদ্রের দ্বারা বা শূদ্রেতর ম্লেচ্ছদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ম্লেচ্ছ রাজেন্দ্র- রূপিনঃ। ম্লেচ্ছরাই সরকারের স্থান দখল করেছে। সরকারের দায়িত্ব ক্ষত্রিয়দের জন্যই। অর্থাৎ উপযুক্ত গুণবান ক্ষত্রিয়, খুব সাহসী, খুব পরহিতপরায়ণ ক্ষত্রিয়। যুদ্ধ বাদলে যারা পালিয়ে যায় না। এই হলো ক্ষত্রিয়ের অবস্থান। ব্রাহ্মণের অর্থ সত্যং শমোদমস্তিতিক্ষা। সুতরাং লোকেদের ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য হিসেবে শিক্ষিত হতে হবে। কৃষিগোরক্ষ্যবানিজ্যং বৈশ্যদের কাজ হলো খাদ্যশস্য উৎপাদন, কৃষিকাজ, আর গো-জাতির সংরক্ষণ। উদ্ধৃত খাদ্য-শস্য উৎপাদিত না হলে, যেখানে যেখানে খাদ্যের স্বল্পতা আছে সেই সেই স্থানে তোমরা ব্যাবসা করতে পার। প্রকৃতপক্ষে শাস্ত্রের এই কলৌ শূদ্রসম্ভবঃ বাক্যের অর্থানুসারে কলিযুগে ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য নেই, কারণ কেউ তাদের কর্তব্য করছে না। বৈশ্যরা খাদ্য শস্য উৎপাদনের পরিবর্তে বড় বড় কলকারখানা চালাচ্ছে। আর কল-কারখানা তো খাদ্য শস্য উৎপাদন করতে পারে না। সুতরাং খাদ্য শস্যের অভাব দেখা দিচ্ছে অথবা প্রচুর খাদ্য-শষ্য পাচ্ছে না। লোকেরা অভুক্ত থাকছে। আর সেখানে অবশ্যই বিক্ষোভ দেখা দিচ্ছে। সেখানে ব্রাহ্মণের পরিচালনা নেই, ক্ষত্রিয় রাজা নেই, এবং শূদ্রেরাও তাঁদের কর্তব্য করছে না। তা’হলে ফল কি হবে? ফল এই রকমই হবে। কাজেই এই হল জাগতিক ধর্ম। অতঃ পুম্ভি র্দ্বিজশ্রেষ্ঠ বর্ণাশ্রমবিভাগশ:। এই বিভাগ বা শ্রেণী সেখানে থাকতে হবে। না হলে সেখানে বিশৃঙ্খলা অনিবার্য। ঠিক তোমাদের দেহের বিভাগের মতো। মস্তিষ্ক বিভাগ, হস্তবিভাগ, উদর বিভাগ এবং পদ বিভাগ। এই বিভাগের প্রয়োজন আছে। যদি তোমার মস্তিষ্ক না থাকে, তবে কিভাবে তুমি অন্যান্য ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখবে? যদি তোমার বাহুতে বল না থাকে,তবে কিভাবে তুমি নিজেকে রক্ষা করবে? তোমার যদি খাদ্য পরিপাকের শক্তি না থাকে, কোনো খাদ্য যদি না থাকে,তবে কি করে তুমি বাঁচবে? যদি তোমার পা না থাকে,অথবা শ্রমিক শ্রেণী না থাকে,তবে কি করে তুমি হাঁটবে? এটা হলো স্বাভাবিক বিভাগ অবশ্যই থাকতে হবে। সেটাই হলো মনুষ্য সমাজ। ভগবদ্গীতায় সমস্তকিছুই সুন্দরভাবে বর্ণিত আছে। অন্নাদ্ ভবন্তি ভূতানি পর্যন্যাদ্ অন্নসম্ভবঃ। পর্যন্যাদ্ অন্ন সম্ভবঃ এবং যজ্ঞাদ্ভবতি পর্যন্যো যজ্ঞঃ কর্ম….(বিরতি)। পশুরা বড় ও হৃষ্টপুষ্ট হলেই তাদের কষাইখানায় চালান করা হয়। এই ব্যাবসা চলে আসছে। সুতরাং খাদ্যশস্যের অভাবই বা হবে কেন এবং মনুষ্য সমাজের মাঝে বিশৃঙ্খলাই বা দেখা দেবে কেন? অবশ্যই দেখা দেবে। এর কারণ আমারা পরমপুরুষ ভগবানের আদেশ মেনে চলছি না। আর ধর্ম মানে হলো পরম প্রভুর আদেশ মেনে চলা। ধর্মং তু সাক্ষাদ্ ভগবৎ প্রণীতম্। তোমরা ধর্ম সৃষ্টি করতে পার না। “এইটা হল এই ধর্ম, ওইটা হল ওই ধর্ম।” এসবই মিথ্যা। প্রকৃত ধর্ম হল, সর্ব ধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ। এই হল ধর্ম। সবাই মনে করে ধর্ম হল হিন্দু ধর্ম, ইসলাম ধর্ম, এই ধর্ম, ওই ধর্ম-এগুলি ধর্ম নয়। অতএব বলা হয়েছে, স বৈ পুংসাং পরো ধর্মঃ। পরঃ অর্থ ‘পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণা নাও, তা হলেই প্রথম শ্রেণির ধর্ম হবে।’ অন্য সব ধর্মই ফাঁকি, মিথ্যা। রাজ্রের বা সরকারের আইন যে মেনে চলে তাকে সুনাগরিক বলে। ঠিক তেমনি সেই হল প্রকৃত ধার্মিক ব্যক্তি যে পরম পুরুষ ভগবানের আদেশ মেনে চলে। দুর্ভাগ্যবশতঃ সেই পরমেশ্বর সম্পর্কে আমাদের কোনো তথ্য জানা নেই। পরমেশ্বর কৃষ্ণ বর্তমান থাকতে তারা ভাবে সেই পরম প্রভু হরেন নিরাকার। আমি এক ব্যক্তি আমার পিতা এক ব্যক্তি, তার পিতা, তার পিতা…এইভাবে তোমরা যদি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে সেই পরম পুরুষ বা পরমেশ্বর ভগবানকে খুঁকে বের করতে চাও, তবে কি করে তিনি নিরাকার হবেন? এই বৈর্ব্যক্তিকতা পরম পুরুষের একটি বৈশিষ্ট্য, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মেতি পরমাত্মেতি ভগবান ইতি শব্দত্যে। এই হল বৈদিক তথ্য। আমরা জীব সব নিত্য, সনাতন, এছাড়াও অন্য শ্রেষ্ঠ নিত্য সনাতন জীব আছে এবং তিনিই হলেন ভগবান, তিনিই কৃষ্ণ। অতএব ভগবদ্‌গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয়ঃ “আমার থেকে অনধিক শ্রেষ্ঠ পুরুষ আর নেই।” তিনিই হলেন কৃষ্ণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here