পতিতার কাছ থেকে শিক্ষা

0
63

পতিতার জীবনের এক অসাধারণ রাত্রিতে হতাশা থেকে সুগভীর জ্ঞানের অভ্যূদয়।
চৈতন্য চরণ দাস

সাধারণ ঐতিহ্য হিসেবে বেশ্যাদেরকে সমাজে কু-দৃষ্টিতে দেখা হয়, কিন্তু কিছু ধর্মীয় শাস্ত্রে আছে যে তাদের কাছ থেকে আধ্যাত্মিকতার আশীর্বাদ লাভের মূল্য রয়েছে। তাই, গপেলে একজন পতিতার কাহিনি বর্ণিত আছে (যাকে অনেকসময় মেরি মেগডেলিন হিসেবে সম্বোধন করা হয়) যিনি যীশু কর্তৃক উদ্ধার লাভ করেছিলেন। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাহিত্য যেমন চৈতন্য চরিতামৃতে মহান বৈষ্ণব হরিদাস ঠাকুরের একটি কাহিনি রয়েছে যেখানে একজন পতিতাকে তার আধ্যাত্মিক অধঃপতনের জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল ।

শিক্ষিকা হিসেবে পতিতা

বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থের বর্ণনা অনুসারে পতিতাকে প্রজ্ঞার গ্রহিতা হিসেবে না দেখিয়ে জ্ঞানের শিক্ষাদাতা হিসেবে দেখানো হয়েছে। বৈষ্ণব ঐতিহ্যে, আমরা তেমন একটি কাহিনি পাই মধ্যযুগীয় সন্ত বিল্বমঙ্গল ঠাকুরের জীবনে। সাধু হওয়ার পূর্বের জীবনে তিনি চিন্তামণি নামক এক বেশ্যার প্রতি আকর্ষিত ছিলেন, যিনি ছিলেন দেখতে তার স্ত্রীর মতো। একবার তিনি ভয়ংকর ঝড়বাদল, অন্ধকার রাত্রী এবং বন্যা উপেক্ষা করে সাহসিকতার সাথে তার কাছে গমন করেন। যখন সেই বেশ্যা দেখলেন যে, তার কাছে পৌছানোর জন্য তাকে অনেক কষ্ট পেতে হয়েছে। তখন তিনি বললেন, “যদি তুমি ভগবানকে লাভ করার জন্য এত কষ্ট করতে তবে তুমি উত্তম সাধু হতে পারতে।”
সেই ঝড়ের রাত্রিতে সেই কথাগুলো বজ্রপাতের মতো বিল্বমঙ্গল ঠাকুরের জীবনে বিদ্ধ করল। তখন তাঁর ঘুমন্ত পারমার্থিক সত্ত্বা ঝাকুনি খেয়ে জেগে উঠল। তিনি পতিতাকে ধন্যবাদ জানালেন, জাগতিক জীবন পরিত্যাগ করে বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করলেন। অতঃপর তিনি বৈষ্ণব ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা সুপ্রসিদ্ধ সাধু ও কবি হিসেবে আবির্ভূত হন।
বিল্বমঙ্গল ঠাকুরের এই ঘটনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, একজন পতিতা পারমার্থিক পথপ্রদর্শন করছে, আবার শ্রীমদ্ভাগবতে একজন পতিতা কর্তৃক গাওয়া গানে বহু দার্শনিক অন্তদৃষ্টি ফুটে ওঠে। এই গান ভাগবতের ১১ স্কন্ধের ৮ অধ্যায়ে উদ্ধব গীতা (৬ষ্ঠ থেকে ২৯ তম অধ্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত) নামক অংশে বর্ণিত আছে, যেটি উদ্ধবের প্রতি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশনা। উদ্ধব গীতার মধ্যে রয়েছে একটি অংশ যেটি ভিক্ষু গীতা (সাধুদের গান)। যদিও কেউ কেউ এই অংশটিকে বলে ভগবানের অবতার দত্তাত্রেয় গীতা। ভাগবতে দত্তাত্রেয়কে একজন ব্রাহ্মণ বা অবধূত (যিনি সামাজিক নীতি প্রচলন করেন) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ভিক্ষু গীতায় এই দত্তাত্রেয় যদু রাজাকে শিক্ষ দিয়েছিলেন যে, কিভাবে তিনি তার ২২ জন গুরুর মাধ্যমে বাস্তবিক জীবনের নানা বিষয় শিক্ষা প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তার মধ্যে একজন গুরু ছিলেন পিঙ্গলা নামক একজন পতিতা।

গুরু যিনি শিক্ষা ছাড়া শেখান

ভিক্ষু গীতায় এমন এক শুরুর ধারণা দেওয়া হয়েছে যা উপদেশ প্রদানকারী জ্ঞানী শিক্ষকের সাধারণ ধারণা থেকে ভিন্নতর। শিষ্যের পারমার্থিক উন্নতির জন্য নির্দেশনা প্রদানকারী গুরুদেব আবশ্যক এবং ভাগবতে বাস্তবিক জীবনের সত্যতা সম্পর্কে শিক্ষা প্রদানকারী বহু গুরুদেবের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভাগবতের ভিক্ষু গীতায় গুরু থেকে শিষ্য ধারার যে শিক্ষা তার ভিন্নতা প্রদর্শন করেছে। যদিও সার্থক জ্ঞান বিতরণের ভার গুরুর ওপর থাকে, তবে এক্ষেত্রে গ্রহণকারী প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নয়। অর্থাৎ এখানে পারমার্থিক জ্ঞান এমনভাবে প্রবাহিত হচ্ছে যাতে গুরুদেবের দায়িত্বভার অন্তরীণ হয়। অর্থাৎ গুরু সরাসরিভাবে শিক্ষা প্রদানে জড়িত নয়। ভাগবত অনুসারে জ্ঞান অন্বেষণকারীদের উচিত পারমার্থিক জ্ঞান অর্জনের জন্য সচেষ্ট হওয়া। যদি জ্ঞান অর্জনের তীব্র ইচ্ছা থাকে তবে পৃথিবীতে নিত্যদিনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা থেকে জীবনের সত্যতা উপলব্ধি করা সম্ভব। এই পৃথিবীর যেসমস্ত জিনিস আমাদেরকে সত্যতা অন্বেষণ ও উপলব্ধিতে সহায়তা করে তাদের আমরা গুরুরূপে জানতে পারি, কেননা তারা আমাদেরকে প্রকৃত জ্ঞান প্রদানের মাধ্যমে গুরুর কাজ করছে।
ভাগবতে পিঙ্গলা এবং ব্রাহ্মণের মধ্যে কোনো প্রকারের মিথষ্ক্রিয়া দেখানো কিংবা ইঙ্গিত দেওয়া হয় নি। এমনকি, ব্রাহ্মণ ২২ জন গুরু থেকে সরাসরি মৌখিক কোনো নির্দেশনা পাননি, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা সকলেই তার শিক্ষা-দীক্ষার উৎস। পর্যবেক্ষণ ও অনুমানের মাধ্যমে সমস্ত শিক্ষা তিনি লাভ করেছেন। যখন তিনি কোনো ঘটনার কথা উল্লেখ করেন যা থেকে তিনি শিক্ষা প্রাপ্ত হয়েছেন, তখন তিনি সর্বজ্ঞ কথক হিসেবে তা বর্ণনা করেন। হয়তোবা আমরা বলতে পারি, ঘটনাটি ঘটার সঠিক মুহূর্তে সঠিক সময়ে উপস্থিত থাকার কারণেই কেবল এটি হয়েছে, কিন্তু এখানে আরও অনেক ব্যাপার রয়েছে। এছাড়াও তাঁর ছিল সঠিক বিচারক্ষমতা অর্থাৎ নিরন্তর শেখার বাসনা যা তাকে সঠিক বিষয় পর্যবেক্ষণ এবং সঠিক শিক্ষা লাভ করতে সাহায্য করেছে। তিনি পিঙ্গলার কাছ থেকে অনাসক্তি থাকার শক্তি সম্বন্ধে শিক্ষা লাভ করেছেন, যা আমাদের সুখি এবং আনন্দময় থাকতে সহায়তা করে। (শ্রীমদ্ভাগবত ১১/০৮/২৭) যা তীরের ফলার মতো কাজ করে এবং যা সকল বাসনার যন্ত্রণাদায়ক শৃঙ্খল থেকে আমাদের মুক্ত করে (১১/০৮/২৮)।

পতিতার হতাশা

পিঙ্গলা কাহিনী শুরু হয় একজন বারবণিতার নিত্যকার বিশেষত রাত্রির রুটিন অনুযায়ী। যখনই সন্ধ্যা নামে পিঙ্গলা নিজেকে কামাতুরভাবে সজ্জিতকরণ এবং পোশাক পরিধান করে (২৩: বিভরতি রপম্ উত্তমাম্) এবং ঘরের বাইরে বের হয়ে পথের লোকেদের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। তার পেশার সকল নারীদের মতো সেও চায় একজন ধনী খদ্দের, যে তাকে অনেক অর্থ প্রদান করবে এবং কখনো কখনো উদারভাবে অতিরিক্ত উপহারও প্রদান করবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে আরো অধিক প্রত্যাশা করে। সে শুধুমাত্র একজন খদ্দের নয় একজন ভালোবাসার মানুষের সন্ধান করে যে তাকে স্নেহ এবং সুখ প্রদান করবে। শ্রীমদ্ভাগবতের বর্ণনা অনুসারে পিঙ্গলা নিজেই গীতের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি প্রকৃতপক্ষে একজন ভালোবাসার মানুষের সন্ধান করছেন।
সন্ধ্যার পর আসে রাত্রি এবং রাত্রির পর আসে মধ্যরাত্রি, কিন্তু তথাপিও কেউ তার সন্নিকটে আসে না। কিংকর্তব্যবিমূঢ়, হতাশ এবং ক্লান্ত হয়ে তিনি তার কক্ষে প্রবেশ করে ঘুমিয়ে পড়েন কিন্তু হঠাৎ জেগে ওঠার পর উদ্বিগ্নতায় থাকেন যে, তিনি হয়তোবা কোনো খদ্দেরকে মিস করলেন। এবার কাউকে আকর্ষণ করার তীব্র বাসনা নিয়ে তিনি পথ দিয়ে পুণরায় অতিক্রম করতে লাগলেন, কিন্তু এতে কোনো লাভ হলো না। যেহেতু সেই রাতে উপার্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেন, তাই তার চেহারা বিবর্ণ হলো- যেন এক ইউরেকা। ভাগবতে বর্ণিত আছে যে, তার মধ্যে হঠাৎ অনাসক্তি জেগে উঠল (নিরবদা পরমো জ্ঞানে)। এই অনাসক্তি শুধুমাত্র তার উদ্বিগ্নতা নিরসন করেনি, বরং এটি আনন্দের উদয় ঘটিয়েছিল (চিন্তা-হতঃ সুখভহহ)। তার বিশ্লেষণ ও উপলব্ধিসমূহ তিনি একটি সুপ্রসিদ্ধ গীত আকারে উপস্থাপন করেন, যা গোপী গীতের মতোই অধিকাংশ সময় গাওয়া হয়।

পিঙ্গলার গান

পিঙ্গলা নিজ সত্ত্বার বাইরে গিয়ে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করলেন, নিজের অনিয়ন্ত্রিত মনের কারণে তিনি যে এই মায়াচক্রে আবদ্ধ হয়েছেন তা জেনে অপরিসীম বিলাপ করতে লাগলেন। মাঝে মধ্যে মায়ার জাদুতে আমরা এমন কিছু করি যা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং পরক্ষণে সম্বিত ফিরে পেয়ে অবাক হয়ে যাই যে, আমরা কি করতে চেয়েছিলাম, আর আমরা কি ভুল করেছি। হঠাৎ ঠিক এই ধরনের আত্মসচেতন হয়ে পিঙ্গলা ভালোবাসার মানুষ লাভের সেই মূল্যহীন অভিলাষের জন্য ভুল বুঝতে পারলেন।
কেন তিনি তার প্রেমিকদের মূল্যহীন বললেন তার কারণ বর্ণিত হয়েছে পরবর্তী শ্লোকে (৩২ নং শ্লোক)। তিনি বিলাপ করে বললেন, সেই অপরূপ পরমেশ্বর ভগবানকে সন্তুষ্ট করার জন্য সচেষ্ট না হয়ে তিনি কাম এবং লোভে জর্জরিত অভাগা ব্যক্তিদের সন্তুষ্টি বিধানে নিয়োজিত ছিলেন। এরপর তিনি ভগবানের সাথে জড় মানুষের বৈসাদৃশ্যের কথা বর্ণনা করলেন এবং ভগবানকে প্রতিপালক এবং আনন্দের উৎস হিসেবে ৩১ নং শ্লোকে বর্ণনা করলেন। তিনি জঘন্য এই পেশায় (পতিতা বা সংকেত্যবৃত্তি) নিযুক্ত হয়ে নিজের ওপর যে অবিচার করেছেন তার জন্য অপরিসীম দুঃখ প্রকাশ করলেন। ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর তার ভাষ্যে বলেছেন সংকেত্যবৃত্তি বলতে এমন পেশাকে বোঝায় যা দেহের অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে অন্যের মধ্যে কামভাব উদ্দিপ্ত করে। একসময় যে পিঙ্গলার পেশাকে সমাজের সর্বাপেক্ষা জঘন্য পেশা হিসেবে দেখা হতো, বর্তমানে এই পৃথিবীতে পতিতাবৃত্তি হল সর্বাপেক্ষা লাভজনক পেশা।

সব দেহ এমনকি পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা সুন্দরী নারী পুরুষের দেহ, ওজ তথা বীর্য, মল, মূত্র দিয়ে তৈরি যা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের দেহের সৌন্দর্যও বেশিদিন স্থায়ী নয়। দেহের সৌন্দর্যের এই মায়া একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বলবৎ থাকে।

এছাড়া বর্তমান পর্ণোগ্রাফিক ইন্ডাস্ট্রির আয় ফুটবল, বাস্কেটবল এবং বেসবল এর যুগপৎ আয় তথা যেকোনো যুগপৎ পেশার আয়ের চেয়েও বেশি।
প্রেমিক পুরুষের খোঁজের নির্বুদ্ধিতার কথা বর্ণনা করার পর তিনি সুখ লাভের অন্বেষণে থাকা অন্যান্য উপাদানগুলোর অকর্মণ্যতার কথা উল্লেখ করেন। বিশেষত তার সুন্দর দেহ। তিনি দেহকে একটি অমনোরম ঘরের সাথে তুলনা করেছেন যেখানে হাড়গুলো হল সেই ঘরের এক একটি বিম এর মতো, দেহের চামড়া, চুল এবং নখ দিয়ে জঘন্য দেহকে আবৃত করে রাখা হয়েছে, যেগুলোকে নারীরা বহু উপায়ে সৌন্দর্য বর্ধন করার চেষ্টা করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেহকে আবৃত রাখার এই কাজটিও নিখুঁত নয়। সব দেহ এমনকি পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা সুন্দরী নারী পুরুষের দেহ, ওজ তথা বীর্য, মল, মূত্র দিয়ে তৈরি যা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের দেহের সৌন্দর্যও বেশিদিন স্থায়ী নয়। দেহের সৌন্দর্যের এই মায়া একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বলবৎ থাকে।
তাই দেহের সৌন্দর্যের নির্বুদ্ধিতা ব্যক্ত করে তিনি পরিতাপ করেছেন কেন তিনি নিত্যকালের জন্য সৌন্দর্যময় পারমার্থিক দেহ প্রদানকারী একমাত্র পরমেশ্বর ভগবান অচ্যুতের সন্ধান না করে জড় ভালোবাসার মরীচিকার পেছনে ছুটলেন।
ভগবানকে একজন সুহৃদ, প্রেমিক, প্রভু এবং অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী হিসেবে মহিমান্বিত করার পর তিনি নিজেকে তার সেবায় সমর্পণ করেন। লক্ষ্মীদেবী যেমন সর্বদাই ভগবানের সেবায় নির্মল আনন্দ লাভ করছেন তেমনি পিঙ্গলা নিজেকে সম্পূর্ণরূপে ভগবানের কাছে সমর্পণ করে তাকে ক্রয় করতে চেয়েছেন। ঠিক যেমন তিনি পূর্বে তার দেহকে বিক্রির মাধ্যমে প্রেমিক ক্রয় করার কথা ভাবতেন, তাই তিনি ভগবানকেও লাভ করার জন্য আত্মিক ভাষা ব্যবহার করেছেন। এছাড়া এটি আমাদের ভক্তির যুক্তবৈরাগ্যকে তুলে ধরে, যা জড় বিষয় পরিত্যাগ না করে সেগুলোকে ভগবানের সেবায় ব্যবহার করার জন্য বলে। আমাদের দেহ এবং দেহগত দক্ষতাকে ভগবানের সেবায় ব্যবহার করতে পারি।
পিঙ্গলার হৃদয়ে যাতে আর কোনো জড় কামনা না থাকে তাই তিনি বললেন যে, সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্টতর মানব কিংবা দেবতারাও ক্ষণস্থায়ী, তাই তারা তাদের স্ত্রীদের কি আনন্দ দিতে পারবে?
যেহেতু তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে অনাসক্তি অনুভব করছেন তাই এটির উৎস সম্বন্ধে খোঁজ করলেন। তিনি অনুমান করলেন এই অনাসক্তির উৎস ভগবান বিষ্ণু (৩৭ নং শ্লোক), যিনি কোনো না কোনো ভাবে তার প্রতি সন্তুষ্ট। অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তার এই অভূতপূর্ব পরিবর্তনের জন্য তিনি ভগবানের কৃপার কথা উল্লেখ করলেন।
এরপর তিনি একটু আগে তার জীবনের দুর্ভাগ্যরূপে পরিগণিত হওয়া একটি ঘটনার কথা স্মরণ করলেন তার বাসনা পূরণের জন্য কোনো খরিদ্দার না পাওয়া। তার পারমার্থিক জাগরণের কারণে তিনি উপলব্ধি করলেন যে, তার দুর্ভাগ্য কামনার থেকে উৎপন্ন, হতাশা থেকে নয় বরং ইচ্ছার আধিপত্যের কারণেই হয়েছে। এটি উপলব্ধির জন্য আমাদের নিচের একটি উদাহরণ উল্লেখ করা যায়।
ধরা যাক, একজন মাতালের মদ পানের ইচ্ছা জাগলে সে মধ্যরাত্রিতে বাইরে বের হল। সে কাছের একটি মদের দোকানে গেল, কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখল যে মদের মজুদ শেষ। তখন সে নিজেকে অভাগা ভাবল এবং মদের জন্য হতাশায় নিমজ্জিত হল। কিন্তু হঠাৎ তার সদ্‌গুণের উদয় হলে সে বুঝল যে, “যখন শহরের সবাই তাদের বিছানায় শান্তিপূর্ণভাবে ঘুমোচ্ছে, আমি তখন সেই রাত্রিতে ঘর থেকে বের হয়ে শহরের অর্ধেক পথ অতিক্রম করে কেন মূল্যবান সময়ের অপচয় করলাম ?” কেননা মদ্যপানের ইচ্ছা আমার ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছে।” যখন সে বুঝতে পারল যে, কিভাবে বাসনা মানুষকে ক্রীতদাস করে তোলে, তখন তার মধ্যে অনাসক্তির উদয় ঘটল, তৎক্ষণাৎ তার মদ্যপানের বাসনা চলে গেল। অবশেষে সেই পাহাড়সম তৃষ্ণা নিবারিত হয়ে তাকে শান্তি প্রদান করল, ঠিক যেমন বহুদিনের বাতের ব্যথা নিরসনের পর মানুষের যেমন আনন্দ হয় তেমন।
উপরোক্ত উদাহরণের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারব পিঙ্গলার অভিব্যক্তি- দুঃখদুর্দশা আমাদের জীবনে দুর্ভাগ্যসম নয় যদি এটি আমাদের মাঝে নিরাসক্তির উদয় ঘটায়, কেননা নিরাসক্তি শান্তি বয়ে আনে। এরপর তিনি নিশ্চিত হলেন যে, তার এই নিরাসক্তি মূলত পরমেশ্বর ভগবানের একটি কৃপা যা তার ওপর বর্ষিত হয়েছে। এই নিরাসক্তির সম্পদ পাওয়া যাবে প্রথমত জড় অবস্থা এবং বাসনা পরিত্যাগ করার মাধ্যমে, দ্বিতীয়ত ভগবানের পাদপদ্মে আশ্রয় গ্রহণের মাধ্যমে। এছাড়া তিনি সমাধান দিয়েছেন যে, জড়জাগতিক অণুপ্রেরণা পরিহার করা হবে প্রয়োজনীয় পূর্বসতর্কতা, যা ঠিক মদ্য পান থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য মদের দোকান থেকে দূরে সরে থাকার মতো। তারা ঠিকই জানে যে, এক গ্লাস মদ গ্রহণও তাদেরকে পুনরায় অন্ধগর্তে নিমজ্জিত করবে।
পরবর্তী শ্লোকে (৪০ নং) তিনি কিভাবে ভগবানের আশ্রয় গ্রহণ করবেন সেই পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি জাগতিকভাবে সন্তুষ্ট থাকবেন সৎ উপায়ে যা উপার্জন করতে পারেন তা নিয়ে। এখন তিনি পরমানন্দের উৎস ভগবানের মধ্যেই আনন্দের সন্ধান করবেন। এর পরের শ্লোকে তিনি রূপকার্থে আমাদের সর্বাপেক্ষা শত্রু অসুরবৃত্তি নিয়ে বলেছেন। আমরা সকলেই একটি অন্ধকার কূপে নিমজ্জিত হয়েছি, যা জড় চেতনায় আচ্ছন্ন জাগতিক অস্তিত্বকে বহন করছে। আমাদের আত্ম উপলব্ধি তথা পারমার্থিক উপলব্ধি শূন্যের কোঠায়। আরো ক্ষতিকর দিক হচ্ছে আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়সমূহকে বিষয় বাসনায় উন্মুক্ত রেখেছি যা আমাদের পারমার্থিক স্খলনের জন্য দায়ী। আরো ভয়ংকর অবস্থা হলো আমরা সময় নামক কালসাপের ক্রিয়ায় আক্রান্ত, প্রতি মুহূর্তেই এটি আমাদেরকে গলাধঃকরণ করছে। তিনি বলেছেন, “পরমেশ্বর ভগবান ছাড়া কে আমাদেরকে এই অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে পারে?” ভক্তিযোগে বলা হয়ে থাকে যে কূপের ওপরে ভগবান রয়েছেন এবং তিনি ওপর থেকে রজ্জু (দড়ি) ফেলে আমাদেরকে উদ্ধার করবেন এবং সেই দড়িটি হল ভক্তিযোগ যা আমাদের জড় চেতনা থেকে মুক্ত করে পারমার্থিক চেতনা জাগরিত করতে সহায়তা করে।
পিঙ্গলার গানের সর্বশেষ শ্লোকে (৪২) তিনি সময়কে পুনরায় কালসর্পরূপে বর্ণনা করেছেন, যেটি ব্যক্তি থেকে শুরু করে সমস্ত পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে এবং বিনাশ সাধন করছে। তিনি ঘোষণা করলেন শুধুমাত্র এই সকল জড় সত্ত্বা যে ক্ষণস্থায়ী তা উপলব্ধির মাধ্যমে আমরা এগুলোর প্রতি নিরাসক্ত হতে পারব যা আমাদের প্রতিরক্ষা করবে। যদি এই ধরনের দর্শন জন্মানোর মাধ্যমে আমরা নিশ্চিতভাবে ভগবানের আশ্রয়ে যেতে পারব। আমরা তখনই রূপক অর্থে সেই অন্ধকূপ থেকে মুক্ত হতে পারব যদি আমরা নিশ্চিতভাবেই বিশ্বাস করি যে, ভক্তিযোগের রজ্জু দ্বারাই আমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারব।

ধ্বংসাত্মক বাসনা থেকে নিত্য জীবন লাভের বাসনা

পিঙ্গলার কথা শেষ হয়েছে অতি সাধারণ একটি ঘটনা দিয়ে- তিনি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ হৃদয়ে তার বিছানায় বসলেন এবং সানন্দে ঘুমিয়ে পড়লেন। যদিও মনে হতে পারে যে, এটি অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা, কিন্তু তা নয়। একজন পতিতা যিনি সারাদিনে একজনও খদ্দের পাননি তার অবস্থা ঠিক একজন দোকানদারের সারাদিনে একজনও ক্রেতা না পাওয়ার মতোই। দোকানদার হয়তোবা এই ঘটনার পর বিরক্ত, চিন্তিত, হতাশাগ্রস্ত হতেন এমনকি রাতের ঘুমও তার পক্ষে কষ্টদায়ক হতো। যেহেতু কোনো রকম ব্যবসায়িক লেনদেনবিহীন একটি দিন কাটানোর পরও পিঙ্গলা শান্তিতে ঘুমিয়েছিলেন তাই এটি নির্দেশ করে যে, তার
নিরাসক্তি ছিল বাস্তবিক ।
পিঙ্গলার কাহিনি এখানেই শেষ। আমরা কোনো পরবর্তী কাহিনি লিখছি না। সেটি সহজবোধ্য, একজন ব্রাহ্মণ দত্তাত্রেয় এখানে জীবনের গল্প বলছেন না, তিনি এখানে জীবনের শিক্ষা আঁকছেন। তিনি তার প্রাপ্ত শিক্ষার পুনঃবর্ণনার মাধ্যমে তার উক্তি শেষ করেছিলেন। এই শিক্ষা যে কারো জন্য প্রযোজ্য যারা কোনো জড় বিষয়ের প্রতি আসক্ত আছেন, “আসক্তিই দুর্দশার কারণ; বাসনার মুক্তিই হলো আনন্দ লাভের কারণ।”
এই সর্বশেষ শিক্ষা থেকে আমাদের উপলব্ধি করা চলবে না যে, পরিপূর্ণ জীবন মানে সকল বাসনা পরিত্যাগ। ভাগবতের শিক্ষা হচ্ছে সবকিছু পরিত্যাগ করা নয় বরং সবকিছুকে ভগবানের দিকে নিয়ে যাওয়া। ভগবানই হলেন সবকিছুর উদ্দেশ্য ও বিধেয়। এই ধরনের মঙ্গলময় বাসনার মাধ্যমে পিঙ্গলা ভগবানের সেবায় নিজেকে চিরতরে উৎসর্গ করেছেন। কৃষ্ণপ্রেম এবং কৃষ্ণসেবা হল নিত্য পূর্ণ সার্থক জীবন লাভের পন্থা। এই ধরনের পারমার্থিক বাসনা আমাদের জীবনের প্রতিটি স্তরে আমাদেরকে আনন্দময় রাখবে, সেই সাথে এই ধরনের বাসনা আমাদের অসীম হতাশা এবং বারংবার মৃত্যু থেকে মুক্তি দিয়ে কুণ্ঠামুক্ত ভগবানের নিত্য আলয় বৈকুণ্ঠে নিয়ে যাবে।
জাগতিক আকাঙ্ক্ষা কিংবা কৃষ্ণবিহীন বাসনা হল জীবনকে অস্বীকার করার মতোই কেননা এটি আমাদের নিত্য আনন্দময় জীবনের উৎস থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। পিঙ্গলার বর্ণনানুসারে সেই বাসনাসমূহ পরিত্যাগ করে পারমার্থিক বাসনা সম্পন্ন জীবনই হোক আমাদের জীবনের একমাত্র দৃশ্যপট।

চৈতন্যচরণ দাস শ্রীমৎ রাধানাথ স্বামী মহারাজের একজন শিষ্য। তিনি ইলেক্ট্রনিক ও টেলিকমিউনিকেশনের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ করেছেন এবং পুণে মন্দিরে ব্রহ্মচারীরূপে শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। তিনি এ পর্যন্ত আটটি গ্রন্থ লিখেছেন।


 

জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here