নামে কি আসে যায়?

0
79

কোনো শিশুর জন্মের পরপরই সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠে তার কী নাম হবে? কিংবা কোনো জিনিসের নাম কী দেয়া যেতে পারে? এভাবে পৃথিবীতে অনেক নামের উদ্ভব হয়, কিন্তু সেগুলোর কোনোটিই প্রকৃত চিন্ময় নামের মতো ব্যবহারিক বা তাৎপর্যপূর্ণ নয়।

মুরারিগুপ্ত দাস

সম্প্রতি একটি ব্যাংক তাদের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। “তাতেই বা কি যায় আসে” পাঠকরা হয়তো এই প্রশ্ন করতে পারে না কিন্তু বড় ঘটনাটি হল এই নাম পরিবর্তনের কারণে বিজ্ঞাপন ও সকলকে জানানোর জন্য, বিলবোর্ড প্রচার প্রচারণায় ব্যাংকটি বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করে ফেলেছে। আমি কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে যুক্ত হবার পূর্বের একটি ঘটনা স্মরণ করছি। অনেক বছর আগের ঘটনা যখন আমি মেডিকেলের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। আমি আমার বন্ধুর সাথে একটি শিব মন্দিরে গিয়েছিলাম। দর্শন করার পর যখন আমরা ফিরে আসছিলাম তখন এক বয়োজ্যেষ্ঠ ভদ্রলোক আমাদের নিকট আসলেন। বললেন আমরা সাক্ষর সমাবেশ করছি “তিনি বললেন আমরা স্থানীয় রেল স্টেশনটি নাম পরিবর্তন করতে চাচ্ছি এবং এর একটি ভারতীয় নাম দিতে চাচ্ছি অনুগ্রহ করে আমাদের এই অভিযানে সাক্ষর দিয়ে আমাদের সহায়তা করুন।’
কেন? আমি জিজ্ঞাসা করলাম “কি লাভ হবে যদি আপনি নাম পরিবর্তন করেন” লোকটি উত্তর দিল “এই নামটি ইংরেজদের দেওয়া নাম। এটি পরিবর্তন করলে ভিনদেশীয় শাসনের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করা হবে।” কিন্তু নাম পরিবর্তন করে তো আপনি ইতিহাস পরিবর্তন করতে পারবেন না। আমি তাকে প্রশ্ন করলাম “ব্রিটিশরা ভারত শাসন করেছিল। সেটির কি হবে?” “না…” সে বিভিন্ন ভাবে আমাকে যথাযথ প্রতি উত্তর দিতে চেষ্টা করছিল। অন্যদিকে আমি তার সব প্রচেষ্টাকেই অরণ্যরোদন বলে অনুভব করছিলাম। কেন একটি নাম পরিবর্তনের বিষয় নিয়ে সময় ও সামর্থ্যের অপব্যয় করছেন? এটি করলে সমাজে কোনো ধরনের উপকার সাধন হবে? এটি একটি নাম কেইবা এগুলোকে গণ্য করে।” কিছু সময়ের জন্য আমাদের বাক-বিতণ্ডা চলেছিল। কিন্তু এই বিতর্কে নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই আমার বন্ধু আমার কনুইতে টান দিয়ে বলল “চলে আয়, একটি স্বাক্ষর করে দে, আমাদের ছবি দেখতে যেতে হবে।”
অনিচ্ছুকভাবে, আমি কলম তুলে নিলাম এবং বৃদ্ধ ব্যক্তিটিকে কড়া সুরে বললাম “অন্য নাম হলেই বা কি হবে?

অর্থহীন নামগুলো (শাব্দিক নাম)

বিখ্যাত লেখক শেকসপিয়ার আমার আবেগকেই (পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদের) সমর্থন দিয়েছিলেন, বলেছিলেন “নামে কি আসে যায়? গোলাপকে গোলাপ ডাক, বা অন্য নামে ডাক সে একই সুবাস দেবে” তারপরও নাম আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম যা পরিচিত হতে এবং ব্যক্তি বা বস্তু নির্ধারণ বা তার সম্পর্কে বলতে সহায়তা করে। নাম কখনো কখনো খ্যাতিকে নির্দেশ করে। যদি আপনি কোনো খ্যাতনামা কোম্পানিকে নাম পরিবর্তন করতে বলেন, যদি সনিকে বলা হয় তার নাম টনি, বনি বা পনিতে পরিবর্তন করতে, তখন কী হবে? এই নামটির সুনাম অর্জন করতে বছরের পর বছর শ্রম, টাকা পয়সা খরচ করতে হয়েছে সেই SONY তার নাম TONY করে ফেলবে! এমনকি যদি কোম্পানিটি তাদের নাম পরিবর্তন করার সিদ্ধান্তও নেয় তবে একটি বিশাল অঙ্কের অর্থ তাদের ব্যয় করতে হবে ক্রেতা, শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে এই খবর পৌঁছে দিতে যে, নতুন নামধারী কোম্পানিটি পূর্বতন কোম্পানির মতই বিশ্বস্থ। ইতোপূর্বে বর্ণিত সেই ব্যাংকটির মত তাকেও বিশাল অংকের অর্থ খরচ করতে হবে।
নাম আবার আমাদের আবেগকেও বহন করে। যেমনটি পূর্বতন বয়োজ্যেষ্ঠ ভারতীয় ব্যক্তিটি ভেবেছিলেন যে, স্থানীয় (ভারতীয়) রেলস্টেশনের নাম ইংরেজদের নাম প্রদত্ত হওয়ায় এটি তার আবেগকে যন্ত্রণা তাড়িত করছিল। একটি ভারতীয় নাম ভারতের ঐতিহ্য ও পরিচিতি তুলে ধরে। একটি ভারতীয় নামের আকাঙ্ক্ষা ভদ্রলোকটিকে (বৃদ্ধ) মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল এবং সেটিই তাকে কর্মে প্রবৃত্ত করে রেখেছে। তার যে কর্মে প্রবৃত্ত হওয়া সেটা নাম পরিবর্তনের মাধ্যমেই শেষ হবে না। একটি সামাজিক পরিবর্তন বা পুনর্গঠনেও নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু যাই হোক এর উপযোগিতা হয়তো এখানেই শেষ হবে। এই শাব্দিক নাম এই জগতের মতই আপেক্ষিক এবং ব্যবহার ও জাগতিক বিষয়ের সাথেই সীমাবদ্ধ। আবার কোনো নাম কখনো কখনো কদাচিৎ কোনো কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর গুণকে নির্দেশ করে। যেমন একজন অন্ধ ব্যক্তির নাম হতে পারে “নয়নসুখ” যার অর্থ যে চোখের দ্বারা আনন্দ লাভ করে। একজন বালিকার নাম হতে পারে ‘সুইটি’ কিন্তু তার গলা কাকের মত কর্কশ হতে পারে। ‘প্রীতি’ নামে মেয়ের মুখ পিম্পলে (ব্রণ) ভরা থাকতে পারে। অমর নামের ব্যক্তিটি মারা যায়, ডিউক হয় কুকুরের নাম হতে পারে। রাস্তার ভিক্ষুকের নাম হতে পারে ‘সম্রাট’।

পবিত্র নাম

অন্যদিকে, পরমেশ্বরের পবিত্র নামসমূহ বিশ্বের ধর্মীয় ঐতিহ্যে, বিশেষ করে ভক্তিপথকে নির্দেশ করে। তাই ধ্যান বা ধর্মানুশীলনে পরমেশ্বরের পবিত্র নাম জপ করার জন্য বলা হয়ে থাকে। তাই বৈদিক শাস্ত্রসমূহ ঘোষণা করছে এই শঠতা ও প্রতারণার যুগে যেখানে সাধারণ লোকেদের কাছে ভগবানের জন্য ক্ষীণ সময় ও আগ্রহ বরাদ্দ রাখা হয়, তাদের জন্য পরমেশ্বরের পবিত্র নাম জপ করা সহজ ও পারমার্থিক প্রগতির জন্য অত্যন্ত ব্যবহারিক পন্থা (ব্রহ্মনারদীয় পুরাণ)
পরমেশ্বরের নাম জপ করা কলিযুগের জন্য সর্বোত্তম যজ্ঞ। শ্রীমদ্ভাগবত বলছে-
কৃষ্ণবর্ণং ত্বিষাকৃষ্ণং সাঙ্গোপাঙ্গাস্ত্রপার্ষদম্ ।
যজ্ঞৈঃ সঙ্কীর্তনপ্রায়ৈর্যজন্তি হি সুমেধসঃ ॥ ৩২ ॥
কলিযুগে যেসব বুদ্ধিমান মানুষেরা ভগবৎ-আরাধনার উদ্দেশ্যে সংকীর্তন যজ্ঞানুষ্ঠান করেন, তাঁরা অবিরাম শ্রীকৃষ্ণের নাম গানের মাধ্যমে ভগবৎ অবতারের আরাধনা করে থাকেন। যদিও তাঁর দেহ কৃষ্ণবর্ণ নয়, তা হলেও তিনিই স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ । তাঁর সঙ্গে পার্ষদরূপে রয়েছেন তার অন্তরঙ্গ সঙ্গীরা, সেবকগণ, অস্ত্র এবং সহযোগীবৃন্ধ ।
শ্রীল প্রভুপাদ ভগবদ্‌গীতার ১৬ অধ্যায়ের ১-৩ নং শ্লোকে তাৎপর্যে বলেছেন সংকীর্তন যজ্ঞকে এই যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ যজ্ঞ বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সংকীর্তন যজ্ঞ হচ্ছে ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে’ সর্বোত্তম ও ব্যয়হীন যজ্ঞ। যে কেউ চাইলে এটি করতে পারে এবং এর দ্বারা উপকৃত হতে পারে। ভগবদ্‌গীতায় (১০.২৫) ভগবান বলছেন-
মহর্ষীর্ণাং ভৃগুরহং গিরামস্ম্যেকমক্ষরম্ ।
যজ্ঞানাং জপযজ্ঞাহস্মি স্থাবরাণাং হিমালয়ঃ ॥ ২৫ ৷৷
মহর্ষিদের মধ্যে আমি ভৃগু, বাক্যসমূহের মধ্যে আমি ওঁকার। যজ্ঞসমূহের মধ্যে আমি জপযজ্ঞ এবং বস্তুসমূহের মধ্যে আমি হিমালয় ।
যজ্ঞ জীবসত্তার প্রতি ভগবান কর্তৃক অপরিমেয় প্রয়োজন সরবরাহের জন্য তাঁর এই কর্মের কৃতজ্ঞতা জানাতে আয়োজিত কর্ম। আমরা যদি অকৃতজ্ঞের মত তাঁর প্রদত্ত উপহার ও উপযোগগুলো ভোগ করতে থাকি তবে আমরা অবাধ্য ও অবিবেকী নির্বোধ পুত্রের মতোই হব। অন্যদিকে এই ধরনের যজ্ঞের মাধ্যমে পরমেশ্বরের করুণা ও কৃপাদৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। ভগবদ্‌গীতায় (৩.১২) শ্লোকে ভগবান বলছেন-
ইষ্টান্‌ ভোগান্ হি বো দেবা দাস্যন্তে যজ্ঞভাবিতাঃ।
তৈদত্তানপ্রদায়ৈভ্যো যো ভুঙক্তে স্তেন এব সঃ ॥
যজ্ঞের ফলে সন্তুষ্ট হয়ে দেবতারা তোমাদের বাঞ্ছিত ভোগ্যবস্তু প্রদান করবেন। কিন্তু দেবতাদের প্রদত্ত বস্তু তাঁদের নিবেদন না করে যে ভোগ করে, সে নিশ্চয়ই চোর। ভগবদ্‌গীতায় (৩.১৪) শ্লোকে আরো বলা হয়েছে-
অন্নাদ্ ভবন্তি ভূতানি পর্জন্যাদন্নসম্ভবঃ।
যজ্ঞাদ্ ভবতি পর্জন্যো যজ্ঞঃ কর্মসমুদ্ভবঃ ॥
অন্ন খেয়ে প্রাণীগণ জীবন ধারণ করে। বৃষ্টি হওয়ার ফলে অন্ন উৎপন্ন হয়। যজ্ঞ অনুষ্ঠান করার ফলে বৃষ্টি উৎপন্ন হয় এবং শাস্ত্রোক্ত কর্ম থেকে যজ্ঞ উৎপন্ন হয় ।
তাই ভগবানের পবিত্র নাম জপ করা সমাজের বা ব্যক্তির জন্য অলস ও অর্থহীন কোনো প্রচেষ্টা নয় বরং সমস্ত প্রয়োজনের জন্য সর্বোত্তম উপযোগ। এটি পরমেশ্বরের নৈকট্য লাভের একটি পন্থা। এমনকি পবিত্র নাম জপ করার প্রাথমিক অবস্থা থেকেই আমরা পরমেশ্বরের উপস্থিতি, সুরক্ষা ও পরমেশ্বর প্রতি প্রেমভাব লাভ করতে পারি এবং বিশুদ্ধ স্তরে এই নামের মাধ্যমে আরো অধিকতর অমৃত সাগরে অবগাহন করা যায় যেমনটি শ্রীল ভক্তিবিনোদ বলেছেন-
“যখন পূর্ণ বিশুদ্ধভাবে আমি হরিনাম আস্বাদন করি তখন সেটি আমাকে শ্রীকৃষ্ণের ধাম গোলক বৃন্দাবনে নিয়ে যায় এবং শ্রীকৃষ্ণের অপূর্ব মনোহর চিত্ততৃপ্তকারি লীলাসমূহ আমার সম্মুখে প্রকাশিত হয়। এটি আমাকে চিন্ময় স্বরুপ দান করে চির লালায়িত ভগবৎ সঙ্গ দেয় আর এই দেহজনিত সকল অজ্ঞতাগুলোকে এক মুহূর্তেই ধ্বংস করে।”
উপসংহারে আমরা দেখতে পাই, জাগতিক নাম আমাদের জন্ম-মৃত্যুর জড়শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখে, কিন্তু পরমেশ্বরের পবিত্র নাম আমাদের এই শৃঙ্খল হতে মুক্তি দেয়। এটি শুধু শৃঙ্খল হতে মুক্তি দেয় না বরং দেয় চিন্ময় জগতের আস্বাদন। নাম জপ শরীরবৃত্তিয় ধারণা হতে মুক্ত করে এবং আমাদের স্বরূপ উন্মোচন করে যে, আমরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চিন্ময় সেবক ।
পরমেশ্বরের নামের এতসব মহিমা শ্রবণ করার পর, যদি পরবর্তীতে আপনাকে কেউ প্রশ্ন করে “নামে কিই বা আছে” তাহলে আপনি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারেন “যদি সেটি পরমেশ্বরের নাম হয় তবে অনেক কিছুই আছে। সবকিছুই ভালভাবেই আছে”।

 

 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, অক্টোবর – ডিসেম্বর ২০১৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here