ধর্ম কি বিজ্ঞান না কল্পনা?

0
51
ধর্ম শব্দের বিজ্ঞানসম্মত অর্থ হচ্ছে কোনো পদার্থের অবিচ্ছেদ্য মৌলিক বৈশিষ্ট্য। যা বস্তু থেকে পৃথক করা যায় না ।

গোপীকান্ত দাস


“দর্শন বিহীন ধর্ম হচ্ছে ভাবপ্রবণতা বা অন্ধ গোঁড়ামি, আর ধর্ম বিহীন দর্শন হচ্ছে অলীক কল্পনা।” সংস্কৃত ধর্ম শব্দে রিলিজিয়ন বোঝায় না। রিলিজিয়ন বলতে কোন গোষ্ঠীগত ধর্মীয় পন্থা বা সম্প্রদায় বোঝায়, কিন্তু ধর্ম শব্দের অর্থ ভিন্ন। সংস্কৃত কথা ধর্ম বলতে বোঝায় যা অপরিহার্য অঙ্গরূপে কোন কিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িত থাকে। রসায়ন বিজ্ঞানে ধর্ম শব্দটির অনেক ব্যবহার রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন পদার্থের ভৌত ধর্ম ও রাসায়নিক ধর্মের বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যেমন আগুনের ধর্ম তাপ ও আলোক বিকিরণ করা, জলের ধর্ম তরলতা। এইসব আগুণ বা জলের রিলিজিয়ন বোঝায় না । ঐসব বস্তুর বৈশিষ্ট্যকে বোঝায়।
সুতরাং, ধর্ম শব্দের বিজ্ঞান সম্মত অর্থ হচ্ছে কোন পদার্থের অবিচ্ছেদ্য মৌলিক বৈশিষ্য যা সেই বস্তু থেকে পৃথক করা যায় না। যে বস্তুর যা নিত্য স্বভাব তা তার নিত্য ধর্ম। ‘বস্’ ধাতুতে সংজ্ঞার্থে ‘তু’ প্রত্যয় করে ‘বস্তু’ শব্দ হয়। সব জড় বস্তুর যেমন অবিচ্ছেদ্য সহজাত গুণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে তেমনি আত্মা একটি বস্তু যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় স্পিরিটন বলা হয়। তারও নিজস্ব স্বরূপগত গুণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটি একটি বিজ্ঞান সম্মত। তথ্য-কোন মতবাদ নয়। আত্মার এই বৈশিষ্ট্য কি? যা তার সঙ্গে নিত্য বর্তমান। তারা হচ্ছে সেবা করা ও ভালবাসা। যা জীব দেহে অবস্থানের ফলে তারা বেঁচে থাকে। সমস্ত মানুষ পশু-পাখি-উদ্ভিদ সকলেরই কম বেশি অপরকে সেবা করা ও ভালবাসার প্রবণতা রয়েছে। জীবের এই নিত্য ধর্মকে সংস্কৃত ভাষায় সনাতন ধর্ম বলে। আর এই সনাতন ধর্ম কোন সাম্প্রদায়িক ধর্ম নয়। এটা আত্মার ধর্ম। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান সকলেরই শরীরে এই আত্মা আছে। একজন মুসলিম হিন্দু হতে পারে, বা খ্রিষ্টান মুসলিম হতে পারে। তার বিশ্বাসের পরিবর্তন হলেও তার ধর্মের কোন পরিবর্তন হয় না। ধর্ম কোন বিশ্বাসকে বোঝায় না। আমরা বিশ্বাস করি আর না করি সকলের দেহেই আত্মা আছে। শ্রীপাদ রামানুজাচার্য সনাতন কথাটির ব্যাখ্যা করে বলেছেন, যার শুরু নেই শেষ নেই, আদি নেই অন্ত নেই। মুসলিম- বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান এই সমস্ত ধর্ম সৃষ্টির ইতিহাস আছে। কিন্তু সনাতন ধর্ম সৃষ্টির ইতিহাস পৃথিবীর ইতিহাসের বর্ষপঞ্জিতে লেখা নেই কারণ এটা কোন দেহগত ধৰ্ম নয় এটা আত্মার ধর্ম। কেউ কেউ মনে করে যে সনাতনীরা আত্মা বা পুনর্জন্মে বিশ্বাস করে সনাতনীদের ধর্ম। কর্ম অনুসারে সকলের ই পুনর্জন্ম হয়। গীতায় (২/১৩) বলা হয়েছে—
দেহিনোহস্মিন্ যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা।
প্রতিটি মানুষের শরীরের পরিবর্তন হয় যেমন বাল্যাবস্থা, তারুণ্য এবং বার্ধক্য। এটা একটি বিজ্ঞান। চিকিৎসা বিজ্ঞান গবেষণা করে দেখেছে প্রতি ৭ বছর অন্তর অন্তর শরীরের সমস্ত কোষ পরিবর্তন হওয়ায় রূপের ও গঠনের পরিবর্তন হয়ে যায়। দেহের মৃত্যুর পর বর্তমান বাসনার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন একটি শরীর গ্রহণ করে। এটা কোন ধর্মের মতবাদ নয়; তা সম্পূর্ণ বাস্তব সত্য। আত্মা হচ্ছে ‘সৎ’ যার অর্থ ‘চিৎ’ যার অর্থ জ্ঞানময় ও আনন্দময়। তার পৃথক কোন পরিচয় নেই। সনাতনীদের আত্মা ও মুসলমানের আত্মা একই। এই আত্মা কোন পরিবারের, দেশের বা কোন জাতির দেহ ধারন করার ফলে একটি বিশ্বাস বা মতবাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে সে মনে করে আমি হিন্দু-মুসলিম-ভারতীয়-আমেরিকান ইত্যাদি। এইভাবে জীব সেই পরিবারকে দেশকে জাতিকে সেবা করে ও ভালবাসে। তার প্রকৃত ধর্ম হারিয়ে ফেলে কারণ সে জানে না কাকে সেবা করলে এবং ভালবাসলে সে পূর্ণরূপে তৃপ্ত হতে পারবে এবং বারবার এই শরীর পরিবর্তন করার পরিবর্তে চরমে মুক্তি লাভ করতে পারবে।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন ‘জীবের স্বরূপ হয় কৃষ্ণের নিত্য দাস।’ জীব যখন শ্রীকৃষ্ণকে সেবা ও প্রেম অর্পণ করে তখনই তার ধর্ম সার্থক হয়। শ্রীমদ্ভাগবত ১/২/৬) বলা হয়েছে-
স বৈ পুংসাং পরো ধর্ম যতো ভক্তিরধোক্ষজে।
অহৈতুক্যপ্ৰতিহতা যয়াত্মা সুপ্রসীদতি ॥
অর্থাৎ “সমস্ত মানুষের পরম ধর্ম হচ্ছে সেই ধর্ম যার দ্বারা ইন্দ্রিয়জাত জ্ঞানের অতীত শ্রীকৃষ্ণে অহৈতুকী ও অপ্রতিহতা ভক্তি লাভ করা যায়। সেই ভক্তি-বলে অনর্থ নিবৃত্তি হয়ে যথার্থ প্রসন্নতা লাভ করে।” ভগবানকে সেবা না করে পৃথিবীতে যত ধর্ম আছে তাকে ভাগবতে ছল বা কৈতব ধর্ম বলা হয়েছে। ধর্মঃ প্রোজঝিত কৈতবঃ
অর্থাৎ জাগতিক লাভের জন্য যে ধর্ম তাকে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদি কেউ ধর্ম করে কিন্তু জানে না ভগবান কে এবং কিভাবে তাকে ভালবাসতে হয়। তাহলে বুঝতে হবে এটা মনগড়া ধর্ম ।
পৃথিবীতে যাহা কিছু ধর্ম নামে চলে ।
ভাগবত কহে তাহা পরিপূর্ণ ছলে ॥
প্রকৃতপক্ষে ধর্ম কোন মানুষের সৃষ্টি নয়। ধর্মং তু সাক্ষাদ্ ভগবদপ্রণীতম্। (ভাগবত-৬/৩/১৯) ভগবান নিজেই তা সৃষ্টি করেছেন। এই সমস্ত নির্দেশ সৃষ্টির সময় তাঁর নিঃশ্বাস থেকে বেদ রূপে প্রকাশিত হয়। বেদ হচ্ছে সমস্ত মানুষের চরম মুক্তির জন্য আইন গ্রন্থ। বেদের অনুগামীরা হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বী। বহু শতাব্দী পূর্বে ভারতে যখন মুসলিম আসে তখন তারা সিন্ধু নদীর তীরবর্তী বেদের অনুসরণকারীদের হিন্দু বলে সম্বোধন করতো। কিন্তু বেদ ও বৈদিক অভিধানে হিন্দু শব্দের কোন উল্লেখ নেই। কিন্তু সনাতন ধর্মের অনেক বর্ণনা রয়েছে। বেদের প্রতিটি কথাই যে সত্য তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে। গোবর দিয়ে অপবিত্র স্থানকে পবিত্র করা যায় এটা বেদে বলা হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণা করে দেখেছে গোবরে জীবানুনাশক পদার্থ আছে। গঙ্গাজল পবিত্র এটাও বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছে গঙ্গাজল অনেক দিন ঘরে রেখে দিলেও পোকা হয় না। বেদে বলা হয়েছে উদ্ভিদের প্রাণ আছে। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্ৰ বসু তা আবিষ্কার করেছেন। এই রকম বহুপ্রমাণ আছে। তাই প্রকৃত ধর্ম সত্য তা বাস্তব ও বিজ্ঞান ভিত্তিক। কোন জল্পনা কল্পনা বা ভাব প্রবণতা নয়। দেশের আইন অমান্য করলে যেমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তেমনি ভগবানের নির্দেশ অস্বীকার করলে জগতে অশান্তি দেখা দেয়। তখনই ভগবান অবতীর্ণ হন । হে ভারত, যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখন আমি নিজেকে প্রকাশ করে অবতীর্ণ হয় (গীতা-৪/৭)। অতএব কলিযুগেও তিনি অবতীর্ণ হয়েছেন। তারও প্রমাণ শ্রীমদ্ভাগবতে রয়েছে। এমন নয় যে কেউ নিজেকে ভগবান বলে জাহির করলেই তিনি ভগবান হয়ে যায় না। প্রকৃত ভগবানের লক্ষণ ভাগবতের (১১/৫/৩২) দেওয়া হয়েছে।
কৃষ্ণবর্ণং ত্বিষাকৃষ্ণং সাঙ্গোপাঙ্গাস্ত্র পার্ষদম্ ।
যজ্ঞৈঃ সঙ্কীর্তনপ্রায়্যৈজন্তি হি সুমেধস্ঃ॥
এই কলিযুগে সুমেধা-সম্পন্ন ব্যক্তিগণ অবিরাম কৃষ্ণ কীর্তনকারী ভগবানের অবতারকে আরাধনা করার জন্য সংকীর্তন যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। যদিও তাঁর গাত্রবর্ণ অকৃষ্ণ, তবুও তিনি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। তিনি তাঁর সাঙ্গ পাঙ্গ নিয়ে আবির্ভাব হবেন। ইনি হচ্ছেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যিনি ভক্তরূপে অবতীর্ণ হয়েছেন “সংকীর্তন যজ্ঞ করে কৃষ্ণ আরাধনা প্রবর্তন করেছেন।” কোনো রোগজীবানু যখন মহামারী রূপে ছড়িয়ে পড়ে তখন তা দমনের জন্য সরকার দেশের জনগণের স্বার্থে টিকা দিয়ে থাকে। তা যেমন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ সকলের নিরাময়ের জন্য দেওয়া হয়। তেমনি চৈতন্য মহাপ্রভু কলিযুগের সমস্ত মানুষের দুঃখ দূর করার জন্য এই হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র— প্রদান করেছেন। এটাই সনাতন ধর্মের শিক্ষা যা যেকোন মানুষ এটা অভ্যাস করলে তিনি নেজেই বুঝতে পারবেন এটা কতটা বিজ্ঞান ভিত্তিক ধর্ম । না কি কাল্নিক ধর্ম ।
কলিযুগের ধর্ম হয় নাম সংকীর্তন ।
চারিযুগে চারি ধর্ম জীবের কারণ ॥


এপ্রিল-জুন ২০১৮ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here