দিশেহারা নেতৃবর্গ ও জনগণের প্রতি

0
67

রাজনীতিবিদেরা নানা রকমের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাধ্যমে নিজ নিজ দলগত লাভ ওঠানোর জটিল খেলায় মাঝে মাঝে খুবই মেতে ওঠেন। এই ব্যাপারে তো তাঁরা সদাসর্বদাই উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকেন। কিন্তু ভাবখানা তাঁরা এমনই দেখাতে থাকেন যেন দেশবাসীর মঙ্গলাকাক্সক্ষায় তাঁদের বুঝি নাওয়া খাওয়ারই সময় হয় না! তাঁরা দিন-রাত সকাল-বিকেল কত মিটিং করছেন, গ্রামে গঞ্জে ঘন ঘন গাড়ির মিছিল করে সাধারণ মানুষকে হকচকিয়ে দিয়ে পতাকা-ফেস্টুনের জাঁকজমক দেখিয়ে গালভরা বক্তিতা শুনিয়ে আসছেন।
সাধারণ লোকেও সাদাসিধে (বোকাসোকা?) মন নিয়ে ঐসব রাজনৈতিক নেতাদের পতাকা বইছে, তালে তাল দিয়ে হরেকরকম গালভরা শ্লোগান তুলছে তাদের বড় আশা-ঐ সব নেতারা তাদের দেশের কল্যাণ করবেন, ছেলে-মেয়েদের ভাল লেখাপড়া আর রুজি-রোজগারের সুবন্দোবস্ত করে দেবেন, সমাজের উন্নতি সাধনের সব উদ্যোগ নেবেন।
কিন্তু আজ বোধ করি এমন একটা সময় এসেছে, যখন ছোট-বড় সব দেশবাসীরই হাড়ে হাড়ে বেশ মালুম হচ্ছে-রাজনীতিবিদেরা যতই চান যে, মানুষে-মানুষে এবং জাতিতে-জাতিতে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠুক, কিন্তু তাঁরা যেহেতু আসলে জড়জাগতিক আধিপত্যের প্রতিই বেশি আসক্ত, তাই তাঁরা নিতান্তই মোহাচ্ছন্ন, স্বার্থান্বেষী এবং ভীতগ্রস্ত। ঠিক এই সব কারণেই দেখা যাচ্ছে, প্রকৃত নিঃস্বার্থ পরার্থপরতার অভাবে রাজনীতিবিদদের শান্তি-সংযমের আহ্বান সমাজের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারছে না কিছুতেই।
কেবলমাত্র এই ভারতেই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য রাজনৈতিক তথা সমাজনেতাদের এই মূলগত দুর্বল স্বরূপ ইদানিং যেন বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে।
আশা করা গিয়েছিল যে, ১৯৩৯-৪৪ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জগদ্ব্যাপী বিধ্বংসী হানাহানির পরিণামে সব নেতারা বেশ ধাতস্থ হতে পারবেন। কিন্তু আধুনিক জগতের সর্বজনপ্রিয় মনস্বী সন্ন্যাসীপ্রবর শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ নির্ভীকভাবে সমস্ত নেতাদের জনসমক্ষে উদ্‌ঘাটিত করে দিয়ে তাঁর গ্রন্থরাজির মাধ্যমে বহু জায়গায় বিশ্ববাসী তথা দেশবাসীকে সতর্ক সাবধান করে দিয়ে বলেছেন যে, ঐ সব রাজনীতিবিদেরা শত শত বছর ধরে শান্তি সম্মেলন, ময়দানে জমায়েত করে গরম গরম বক্তৃতা দিলেও, আখেরে তাঁদের কোনও পরিকল্পনাই তেমন কার্যকরী হবে নাÑতার কারণ, নেতারা নিজেদের সংকীর্ণ মতবাদ আর সীমিত ক্ষমতার ঊর্ধ্বে উত্তীর্ণ হবার পন্থা জানেন না।
অথচ সমাজে আজকাল নেতৃস্থানীয় কোনও মানুষের সম্বন্ধে যখন সংবাদপত্রে প্রশংসা করে অনেক কিছু লেখা হয় পাতা ভরানোর তাগিদে, তখন অচিরেই সেই মানুষটি সমাজের একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি হয়ে ওঠে এবং সাধারণ সরল প্রকৃতির সব মানুষ স্বভাবতই তাকে অনুসরণ করে চলতে চায়।
কখনও কখনও কোনও বিশেষ দলের রাজনৈতিক নেতাদের সম্বন্ধে সংবাদপত্রে ফলাও করে প্রচার হতে দেখা যায় এবং এই ধরনের প্রচারের ফলে স্বভাবতই একজন নগণ্য লোকও অতি অল্প সময়ের মধ্যে একজন কেউকেটা হয়ে ওঠে।
তবে এই ধরনের অন্তঃসারশূন্য প্রচার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হচ্ছে অযোগ্য মানুষের অপকীর্তির প্রচার এবং তার ফলে কারোরই কোনও যথার্থ মঙ্গল সাধিত হয় না। এই প্রকার প্রচারের ফলে, জনমানসে সাময়িক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও তার তেমন কোন স্থায়ী ফল হয় না। তাই, এই সব কার্যকলাপগুলি সময়ের অপচয় মাত্র। পত্র-পত্রিকায় এই সমস্ত প্রতিবেদন পাঠ করে জনগণের একাংশ যথেষ্টই প্রভাবিত হয় এবং বিভ্রান্তও হয় বৈকী! নেতৃত্ব যদি বিভ্রান্তিকর হয়, তা হলে সমাজ এবং জাতির কোটি কোটি মানুষ সর্বাঙ্গীণ সর্বনাশের পথে চলতে থাকে গড্ডালিকা প্রবাহের মতো।
আমাদের দেশে তো এই অবস্থাই চলছে। নেতারা যে বিভ্রান্তির কবলে পড়েছেন, তা সাম্প্রতিককালে সরকারি স্থিতিশীলতার নিদারুণ অভাব থেকে বেশ প্রকটিত হয়ে উঠেছে। কারণ নেতাদের মধ্যে মতের মিল নেই এবং তাঁরা সম্যকভাবে জানেন না বা জানবার চেষ্টাই করেন না যে, ভারতের মতো সুমহান বৈদিক সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী দেশবাসীর বাস্তবিক সুখ-সমৃদ্ধির পথে কোন্ সামগ্রী তথা কোন মতবাদের প্রয়োগ আশু প্রয়োজন।
নেতারা কেবলই এক্সপেরিমেন্ট করে সময় নষ্ট করছেন, অথচ এই দেশেরই লুপ্ত প্রায় ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের জন্য কোনও উদ্যোগই গ্রহণ করছেন বলে মনে হয় না। যেমন, তাঁরা প্রথমেই ভারতের ঐতিহ্য বিরোধী একটি ভুল নেতৃত্ব বিগত পঞ্চাশ বছর যাবৎ দিয়ে আসছেন-সেটি হল ধর্মনিরপেক্ষ, তথা সেকুলার নেতৃত্ব।
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের জগদ্গুরু শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ বরাবরই তাঁর বিপুল গ্রন্থাবলীর মাধ্যমে সুদৃঢ়ভাবে সুচিন্তিত বৈদগ্ধ্যপূর্ণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, ধর্মকে কোনও কিছু থেকেই বাদ দেওয়া যায় না। আগুনের ধর্ম তাপ, জলের ধর্ম তরলতা-স্বাভাবিক অবস্থায় এই সব ধর্ম যেমন ত্যাগ বা বর্জন করার কথা ভাবাই যায় না, তেমনই জীব তথা মানুষের যে শাশ্বত ধর্ম, সেই ধর্মের প্রতি নিরপেক্ষ হয়ে জীবন ধারণ করার বিভ্রান্তিকর তত্ত্বটি ঠিক যেন সোনার পাথরবাটির মতোই মনে হয়। পণ্ডিতমনা ব্যক্তিদের এক নবতম ধাপ্পা এই ভিত্তিহীন তত্ত্ব।
ভারত ভূমির ধর্ম সংস্কৃতির ঐতিহ্য সম্পদ সব নস্যাৎ করে দেবার ক্ষেত্রে তাই এই দুই অবিসম্বাদিত নেতা এক বিচিত্র উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তা মানতেই হবে। আর তার নীট ফললাভ যে কি হয়েছে, তা তো আজকের দিনের যুবসমাজের দিশাহারা ছন্নছাড়া ভাবসাব দেখে সহজেই অনুমান করা চলে। তরুণ সমাজের সামনে আজ নেই কোনও উচ্চ আদর্শ, ভব্যতার মানদণ্ড কিংবা ভক্তিশ্রদ্ধার লেশমাত্র।
এই ভক্তিশ্রদ্ধার ব্যাপারটাই সর্বস্তরে একটা শূন্যতার সৃষ্টি করেছে, তা অনস্বীকার্য। নানা প্রকার পদ মর্যাদা, ঐশ্বর্য, প্রতিপত্তি, নাম যশের মায়ায় প্রভাবিত হয়ে আজ সর্বস্তরের অধিকাংশ মানুষ যে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে, তা থেকে সকলকে উদ্ধারের পথ অবশ্যই দেখাতে হবে। কে নেবে সেই পথ দেখানোর ভার? যে-সব নেতারা নিজেরাই ছন্নছাড়া ভাবাদর্শে দিশাহারা এবং আত্মকলহে জেরবার হয়ে রয়েছেন, তাঁরা? নিঃসন্দেহে তাঁরা আজ এই ব্যাপারে নিতান্তই অযোগ্য, তাঁরা বালখিল্য, অর্বাচীন।
তা হলে পথ দেখাবে কে? এই যথার্থ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ভারতবর্ষের সনাতন বৈদিক শাস্ত্রসম্ভার স্মরণ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। সেখানে অতি সহজ সরল ভাষায় বারে বারে মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, একটি বৃক্ষ যেমন একটি পূর্ণ সত্তা, কিন্তু তার শাখা-প্রশাখা এবং পাতাগুলির বিভিন্ন অবিচ্ছেদ্য অংশ, তেমনি মানবজাতি তথা জীবকুলও এক পরম সত্তার অংশ। গাছের পাতা এবং শাখা-প্রশাখাগুলিও গাছ, কিন্তু পূর্ণ বৃক্ষটি তো পাতা নয় কিংবা শাখা-প্রশাখা নয়।
তেমনই, দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হাত-পাগুলিকে দেহ বলা হয়, কিন্তু পূর্ণ দেহটি তো হাত বা পা নয়।
দেহের বিভিন্ন অঙ্গগুলি যখন দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন আর সেইগুলি দেহের সঙ্গে যুক্ত হাত অথবা পায়ের মতো থাকে না। তার দ্বারা দেহের কোনও উপকার সাধিত হতে পারে না।
তেমনই, সকল সৃষ্টির মূলে যে ভগবান আছেন, এই কথাটা আজকের দিনের নেতারা ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ ভ্রান্তিবশে মানুষের মন থেকে নির্বোধের মতো মুছে ফেলেছেন বলেই সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত মানুষ ভগবানের সাথে মঙ্গলময় সুসম্পর্ক হারিয়ে ফেলে এক বিপজ্জনক ভয়াবহ বিচ্ছিন্নতাবোধের আতঙ্কে হয়েছে নিমজ্জিত।
বিকৃতমস্তিষ্ক হয়ে যায় কারা? যারা সম্পূর্ণভাবে ভরসাহীন, আশ্রয়হীন, সম্বলহীন, পথনির্দেশ বর্জিত হয়ে নিজের অহমিকার পাকচক্রে আবর্তিত হতে থাকে। আজ জনগণের সেই দশা।
এইজন্যে সঙ্কটকালে ভগবানের ওপর ভরসা করতে পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে, কারণ সর্বশক্তিমান ভগবান রয়েছেন সবাকার অন্তরে। অন্তর থেকে তিনি সকল জীবকে সবার অলক্ষ্যে যথাযথভাবে পথনির্দেশ করতে থাকেন।

ন বৈ জনো জাতু কথঞ্চনাব্রজে-
মুকুুন্দসেব্যন্যবদঙ্গ সংসৃতিম্।
স্মরন্মুুকুন্দাঙঘ্রুপগূহনং পুন-
র্বিহাতুমিচ্ছেন্ন রসগ্রহো জনঃ ॥
(ভাগবত ১/৫/১৯)

শ্রীনারদমুনি তাই শ্রীল ব্যাসদেবকে এইভাবে বলেছিলেন যে, কোনও কারণে কৃষ্ণভক্তের পতন বা ত্রুটিবিচ্যুতি হলেও তাকে কখনই অন্যান্য কর্মীদের মতো জড়জগতের পাকেচক্রে অহেতুক জড়িয়ে পড়তে হয় না। কারণ, যে-মানুষ একবার সকল সৃষ্টির মূল অধিকর্তা পরমেশ^র ভগবানকে অনন্য ভক্তিনিবেদনের মাধ্যমে তাঁর সাথে পারমার্থিক সংযোগ সাধন করতে পারে, তখন ভগবান তাঁকে পরম পিতার আদরে সংশোধন করে নেন।
শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ বলেছেন, একজন অনাথের দুঃখ আর একজন রাজার ছেলের দুঃখ এক নয়। অনাথ যথার্থই দুর্দশাগ্রস্ত; কারণ তাকে দেখবার কেউ নেই; কিন্তু কোনও ধনী মানুষের প্রিয় পুত্রকে আপাত দৃষ্টিতে অনাথের মতো মনে হলেও সে সর্বদাই তার পিতার পর্যবেক্ষণে থাকে।
অসৎ সঙ্গের প্রভাবে ভগবানের কোনও ভক্ত কোনও কোনও ক্ষেত্রে সকাম কর্মীদের মতো অনুকরণ করতে পারে। সকাম কর্মীরা এবং নেতারা জড় জগতে আধিপত্য করতেই চায়। পরিণামে তারা দুঃখ পায়, দুঃখ দেয়।
তেমনই, মানুষ তার অজ্ঞানতাবশত ভগবানের উদ্দেশ্যে ভক্তিনিবেদনের মাধ্যমে আধিপত্য লাভের আকাক্সক্ষা করতেও পারে। জানতে হবে, এই ধরনের অনভিজ্ঞ মানুষদের ভগবান কখনও-কখনও বিভিন্ন অসুবিধার মধ্যে ফেলেন। ভগবান তাঁর বিশেষ কৃপাস্বরূপ তাঁদের সমস্ত জড় সম্পদ, মান-সম্মান, মর্যাদা প্রতিপত্তি সব অপহরণ করে নিতে পারেন। তার ফলে সেই বিভ্রান্ত মানুষকে তার সমস্ত আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব পরিত্যাগ করে চলে যায় এবং তখন সে ভগবানের কৃপায় আবার যথাযোগ্য জ্ঞান লাভ করে ভগবৎ-সেবায় আত্মোৎসর্গ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
তাই, নেতাই হোন কিংবা সাধারণ মানুষই হোন-সকলকে জানতে হবে যে, পরমেশ্বর ভগবান স্বাভাবিকভাবে পূর্ণ শক্তিমান। এই শক্তির কণামাত্র যখন জীব তথা মানুষ গ্রহণ করতে পারে, তখন সে অসাধ্য সাধন করতে পারে। কিন্তু কখনও যদি সেই অসাধ্য সাধনের ক্ষমতায় অহমিকা জাগে এবং নিজের সীমিত বুদ্ধির ভরসায় নেতাগিরি করতে কেউ দুঃসাহসী হয়, তবে তার অবশ্যম্ভাবী পরিণাম হবে বুদ্ধিবিকার আর অধঃপতন। তাই বিপথগামী নেতাদের অবশ্য কর্তব্য পরমেশ্বর ভগবানের মাহাত্ম্য স্বীকার করে তাঁর প্রেমময়ী সেবায় ভক্তি নিবেদনে এগিয়ে আসা এবং তাঁদের অধীন জনগণকে ভক্তির পথে উজ্জীবিত করে তোলা। সেই জন্যই ভগবান জননেতাদের সৃষ্টি করেছেন। জননেতারা জনগণকে ভগবদ্ভক্তির পথে উদ্বুদ্ধ না করলে এই জগতে কখনই শান্তি আসতে পারে না। ভগবান নেতাদের সৃষ্টি করেছেন এই কাজের জন্যই-যথার্থভাবে সর্বতো উপায়ে ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের শরণাগত হওয়া। সেটিই হল যথার্থ নেতাদের প্রকৃত কর্তব্য। জনগণ যেন শুধুমাত্র তেমন নেতাদেরই চিনে নিতে পারেন।


 

চৈতন্য সন্দেশ এপ্রিল-২০২২ প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here