দামোদর মাসের গুরুত্ব

0
35

কেউ যদি কার্তিক মাসে সামান্য ভাগবতীয় সেবাও করে, তবে সে পারমার্থিক পুরস্কার লাভ করবে। পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে, কেউ যদি কার্তিক ব্রত বা দামোদর পূজা করে তাহলে শতজন্ম ধরে সুফল লাভ করে।

শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ

নমো দেব দামোদরান্তবিষ্ণো
প্রসীদ প্রভো দুঃখজালাব্ধিমগ্নম্ ।
কৃপাদৃষ্টি-বৃষ্ট্যাতিদীনং বতানু-
গৃহাণেশ মামজ্ঞমেধ্যক্ষি দৃশ্যঃ ॥
অনুবাদ : হে দেব! হে দামোদর! হে অনন্ত! হে বিষ্ণো! আমার প্রতি প্রসন্ন হও। হে প্রভো! হে ঈশ্বর! আমি দুঃখ পরম্পরারূপ সমুদ্রে নিমগ্ন হয়ে একেবারে মরণাপন্ন হয়েছি, তুমি কৃপাদৃষ্টিরূপ অমৃত দ্বারা আমার প্রাণ রক্ষা কর।
কুবেরাত্মজৌ বদ্ধমুর্ত্যৈব যদ্ধৎ
ত্বয়া মোচিতৌ ভক্তিভাজৌ কৃতৌ চ ৷
তথা প্রেমভক্তিং স্বকাং মে প্রযচ্ছ
ন মোক্ষে গ্রহোমেহস্তি দামোদরেহ ॥
অনুবাদ : হে দামোদর! তুমি যে রকম গো অর্থাৎ গাভী-বন্ধন-রজ্জু দ্বারা উদখলে বদ্ধ হয়ে শাপগ্রস্ত নলকুবের ও মণিগ্রীব নামক কুবের পুত্রদ্বয়কে মুক্ত করতঃ তাদের ভক্তিমান করেছ, আমাকেও সেইরকম প্রেমভক্তি প্রদান কর। এই প্রেমভক্তিতেই আমার আগ্রহ; মোক্ষের প্রতি আমার আগ্রহ নেই।
আমাদের বৈদিক শাস্ত্র অনুসারে কার্তিক ব্রত বা দামোদর পূজা খুবই জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব। স্কন্ধপুরাণ, পদ্মপুরাণ এবং এমনকি ভাগবতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, পরিবারের সবাই মিলে দশ লক্ষ বার কোন মন্ত্র পাঠ বা অন্যান্য ব্রত করলে যে ফল পাওয়া যায় তার থেকে বেশি ফল পাওয়া যায় সঠিকভাবে দামোদর ব্রত করলে। যখন প্রেমভক্তি সহকারে ভগবানকে ঘৃত প্রদীপ নিবেদন করা হয় তখন হৃদয় থেকে সমস্ত খারাপ প্রবৃত্তিগুলো দূরীভূত হয় এবং হৃদয়কে ঘৃতের মত নরম ও কোমল করে তোলে। আর বৈষ্ণবসঙ্গে ভগবানের গুণমহিমা কীর্তন করলে নিজেদের শুদ্ধতাও বৃদ্ধি পায়। কার্তিক মাসে যখন মথুরাতে ভগবানের পূজা করা হত তখন ধ্রুব মহারাজ শ্রীহরিকে দর্শন করার জন্য সেখানে উপস্থিত হতেন। শাস্ত্রে বর্ণিত আছে, কেউ যদি বিশেষ করে কার্তিক মাসে তীর্থযাত্রীগণ বৃন্দাবনে দামোদর আরতী দর্শন করে তাহলে সহজেই তার হৃদয়ে কৃষ্ণপ্রেমভক্তির উদয় হয়। যাদের পক্ষে বৃন্দাবনে যাওয়া অসম্ভব, তারা তাদের জীবদ্দশায় নিকটস্থ ইসকন মন্দিরে বসে এই বৈদিক সেবাগুলো সম্পাদন করতে পারে কারণ শ্রীল প্রভুপাদের এই ইসকন মন্দিরগুলো অভিন্ন বৃন্দাবন স্বরূপ।
দামোদর মাস উপলক্ষে ভক্তগণের উদ্দেশ্যে প্রেরিত শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজের সংক্ষিপ্ত অভিভাষণ ।
এখন দামোদর ব্রত মাস আমরা পালন করছি। একবার শ্রীল প্রভুপাদকে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম এই মাসে সবকিছু এত বিশেষভাবে করার প্রয়োজনীয়তা আমাদের আছে কি না। তিনি বলেছিলেন যে এই দামোদর মাসটি বিশেষভাবে নতুন ভক্ত এবং যারা এখন ভক্ত নয়, তাদের আকর্ষণ করার জন্য। কেননা যারা নিয়মিতভাবে ভক্ত তারাতো সকল মাসগুলোতেই ভগবানের সেবা করছেন আর তাঁর কল্যাণ লাভ করছেন।
আমি এই বিষয়টি নিয়ে ভাবছিলাম যে, যারা ভক্ত নয় তাদের এবং যারা নতুন তাদেরকে আমরা গত বহু বছর ধরেই এই দামোদর মাসের সুযোগ দান করার চেষ্টা করে আসছি । এইভাবে আমরা আমাদের জন্য অনেক ধরনের আশীর্বাদও লাভ করতে পারি। অবশ্যই আমি মায়াপুর ধামে বাস করা একজন সন্ন্যাসী এবং দামোদর মাসে বৃন্দাবনে থাকার কল্যাণও আমি প্রাপ্ত হয়ে থাকি। কিন্তু অন্যান্যদের এই একই সুযোগ নাও থাকতে পারে। তাই আমরা তাদেরকে দামোদরাষ্টকম কীর্তন করার সুযোগ প্রদান করছি। আপনি যদি অন্যান্য আচার অনুষ্ঠান পালন নাও করেন, এইভাবে তাহলে যে কেউই কৃষ্ণকে আকর্ষণ করতে পারেন। কেবলমাত্র দামোদরের কাছে প্রদীপ নিবেদনের দ্বারা আমরা মানুষকে ভগবানের কৃপা লাভের সুযোগ প্রদান করছি।
 
পদ্মপুরাণে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ভগবানের প্রীতিসাধনের নিমিত্ত যেকোনো কার্যই অন্যান্য সাধারণ দিনগুলির চেয়ে এই দামোদর মাসে শতগুণে মঙ্গল প্রদান করে। ভগবান দামোদরকে সন্তুষ্ট করার জন্য নির্দিষ্ট কার্য সম্পাদনের মাধ্যম তাঁর কৃপা লাভের কোনো তুলনা চলে না।
ভগবান দামোদর অপরাজেয়। কিন্তু তিনি পরাজিত হয়েছিলেন তাঁর মাতার প্রেমের দ্বারা। এই বার্তাটিই দামোদর মাস স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে যে, মা যশোদা দামোদরকে তাঁর সন্তান ভেবে বাঁধতে চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বুঝতে পারেননি যে দামোদর হচ্ছেন অসীম, পরমেশ্বর ভগবান। আর তাই তিনি তাঁকে বার বার বাঁধতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই দড়িটি দু’আঙুল ছোট হয়ে যাচ্ছিল। এই দুটি আঙুলের অর্থ কী? একটি হল শুদ্ধভক্তের আকাঙ্ক্ষা এবং দ্বিতীয়টি হল পরমেশ্বর ভগবানের অহৈতুকী কৃপা। মা যশোদার বাসনাটি ছিল শুদ্ধ আর কৃষ্ণ যখন সম্মত হলেন তিনি বাঁধা পড়লেন। কৃষ্ণের সম্মতি বিনা কেউই তাঁকে বাঁধতে পারে না। সুতরাং তিনি তাঁর মায়ের প্রেমের দ্বারা বিজিত হয়েছিলেন । দামোদর মাসে এই বার্তাটিই আমরা লাভ করি। সুতরাং সাধারণ মানুষের কাছেও ভগবানের কৃপা লাভের এটি একটি সুযোগ। দামোদর মাসের গুরুত্বের কথা হরিভক্তি বিলাস, ভক্তিরসামৃতসিন্ধু ও আরও নানা গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ কিছুই আপনাকে করতে হবে না। ভগবানের কাছে দীপ নিবেদন করুন, অর্ঘ্য নিবেদন করুন এবং প্রার্থনা নিবেদন করুন, তাহলেই হবে। এই সমস্ত সাধারণ জিনিসগুলিই আমরা করে থাকি। দামোদর ব্রতের কথা এমনভাবে আমরা প্রচার করেছি যে, আমরা অনেক গৃহে ভগবান দামোদরের ছবি প্রদান করেছি এবং মানুষ তাদের গৃহে দামোদরের ছবির সামনে আরতি নিবেদন করছে। ভগবান দামোদরের কাছে কোনো প্রার্থনা করার কথাও আমরা তাদের বলছি। এভাবে সাধারণ মানুষ ভগবানের অসীম কৃপা লাভ করছে। শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্‌গীতায় বলেছেন যারা মানুষকে তাঁর ভক্তিপূর্ণ সেবায় নিয়োজিত করার জন্য যুক্ত রয়েছেন, সমস্ত ভক্তদের মধ্যে তাঁরা সবচেয়ে প্রিয়। তাই এইভাবে দামোদর মাসে মানুষকে ভগবানের সেবায় নিযুক্ত করে আমরা কৃষ্ণের অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠছি।
আমার মনে আছে, একবার পাশ্চাত্যের ইকুয়েডর দেশের গুয়াকুইল শহরে ‘সিটি হল’ নামক সভাগৃহে আমরা প্রায় তিন/চারশত মানুষ একটি কৃষ্ণভাবনামৃত অনুষ্ঠানে সমবেত হয়েছিলাম। তখনও ছিল দামোদর মাস। তাই সেখানে ভগবান দামোদরের একটি ছবি ছিল, সামনে এক থালা ভর্তি বালি ছিল আর সেখানে ছিল অনেক মোমবাতি। আমরা যেহেতু সেখানে ঘিয়ের বা তিল তেলের প্রদীপ জ্বালাতে অপারগ ছিলাম, তাই আমরা মোমবাতি জ্বালিয়েছিলাম । আমরা যখন সমবেত মানুষকে ভগবান দামোদরের কাছে তাদের দীপ নিবেদন করতে বললাম, যদিও তারা ছিল মূলত অন্য ধর্মাবলম্বী এবং তাদের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না যে, ঠিক কীভাবে ভগবান দামোদরের কাছে আরতি নিবেদন করতে হয় কিন্তু তবুও তারা উৎসাহের সঙ্গে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিল এবং একে একে দামোদরের কাছে দীপ নিবেদন করেছিল। এই সেবাটি করে তারা অত্যন্ত আশীর্বাদধন্য বলে নিজেদের মনে করেছিল। তাই আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রয়েছে যে, এই সেবা ঠিক কীভাবে অংশগ্রহণকারীকে পরম আনন্দ দান করে।
মায়াপুরেও, ভক্তরা ছাড়াও, দর্শনার্থীদের সবাইকে দীপ দান করার জন্য অনুরোধ করা হয় এবং এই বিশেষ মাসটিতে সহস্র সহস্র দর্শনার্থীর ভীড় হয়। তাঁরা সকলেই রাধারানি এবং মা যশোদা ও দামোদরের ছবিতে এবং বিভিন্ন বিগ্রহকে ঘিয়ের সলতের দীপ এই মাসে বিশেষভাবে নিবেদন করে থাকেন।
তাই মানুষকে ভক্তিসেবায় যুক্ত করার জন্য এমনভাবে আচরণ করা উচিত যাতে তারা যেন কখনও কৃষ্ণকে ভুলে না যায়। তাই আমি আশা করব, ভক্তগণ এই সেবাটি অত্যন্ত উৎসাহের সাথে গ্রহণ করবে।
মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর ইসকন মন্দিরের শ্রীউত্তম চৈতন্য দাস ধীরে ধীরে সেখানে এই অনুষ্ঠানটি প্রধানভাবে গড়ে তুলেছিল। দামোদর মাসটি যে কতখানি চমৎকার সে বিষয়ে বিভিন্ন শাস্ত্র থেকে সে বিভিন্ন উদ্ধৃতি সংগ্রহ করেছিল। কিন্তু আমাদের কাছে এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, সে সহসা ভগবদ্ধামে ফিরে গেছে। এখন আমরা আশা করব যে, দামোদর মাসের প্রতি তাঁর নিষ্ঠাপূর্ণ কর্মধারাকে স্মরণ করে আমরা আরও বড় ভাবে এবং আরও বর্ণাঢ্য মহিমার মধ্য দিয়ে সেসাথে নতুন নতুন চিন্তার মধ্য দিয়ে প্রতি বৎসর এই দামোদর মাসে সাধারণ মানুষকে কৃষ্ণের সেবায় নিয়োজিত করব। দামোদর মাসে যারা এই ব্রত বা সেবায় যুক্ত থাকে আমরা যদি তাদের সকলের সঙ্গে যোগাযোগ বা সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি, তাহলে তাদেরকে আমাদের সঙ্ঘবদ্ধ প্রচারের অংশ করে তুলতে ও সামগ্রিকভাবে সবকিছু পরিচালনা করলে দামোদর ব্রতের ব্যাপারটি আরও সহজ হবে।
অতএব দেখা যায় যে, এইভাবে পবিত্র দামোদর মাসের কার্যাবলীসমূহ অত্যন্ত সহজ, বিনম্র ও অত্যন্ত কার্যকরী। তাই আশা করা যায় যে, প্রত্যেকেই এই দামোদর মাসকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করবে। সকলকে অনেক ধন্যবাদ।

 

 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, অক্টোবর – ডিসেম্বর ২০১৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here