তুলসী দাস ও ভগবান জগন্নাথ

0
111

১৬ শতকের বিখ্যাত কবি তুলসী দাস একবার বাল্মীকি রচিত রামায়ণ পাঠ করার সময় একটি শ্লোক দেখলেন যেখানে ভগবান রামচন্দ্র রাবণের ছোট ভাই বিভীষণকে নির্দেশ দিয়েছিলেন-

রামোহুপি মুনিভিঃ সার্দ্ধং পার্থি বৈশ্চ মহাত্মভিঃ।
শ্রুত্বা তদ্গীতিমাধুর্য্যং কর্স্মশালামুপাগমং॥

শ্লোকটি পাঠ করার পর তুলসী দাস ভগবান শ্রীজগন্নাথদেবকে দর্শন করার প্রবল ইচ্ছা পোষণ করেন। তাই তিনি কাশি (বেনারস) থেকে পদব্রজে পুরী যাত্রা শুরু করেন। উড়িষ্যাতে তুলসী সরোবর নামে একটি স্থানে রয়েছে (ভুবনেশ্বর ও কটকের মাঝমাঝি স্থান) যেখানে পুরী যাত্রা পথে তুলসী দাস বিশ্রাম গ্রহণ করেন বলে কথিত আছে। তিনি যাত্রাপথে পুরী থেকে কয়েক মাইল দূরে ভার্গবী নদীর উত্তরে দন্ডসহী নামক একটি গ্রামে বিশ্রাম গ্রহণ করেন। তিনি গ্রামে অবস্থানকালে গ্রামবাসীগণ তাঁর স্মরণে একটি হনুমানের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন, যেটি এখনো সেখানে বর্তমান। পুরী মন্দিরে পৌঁছানোর পর তিনি সরাসরি ভগবানকে দণ্ডবৎ প্রণতি নিবেদনের জন্য মন্দির অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। তিনি পরম রামভক্ত তুলসী দাস শ্রীজগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা দেবীকে দর্শন করে ভগবান রামচন্দ্রের কোন লক্ষণ দেখতে পেলেন না। দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে, তুলসী দাস কোন প্রসাদ গ্রহণ না করে মন্দির ত্যাগ করে ৬ মাইল দূরে মালতীপাটাপুরে পৌঁছালেন। এখানে তিনি একটি সরুপথের পাশে অশ্বত্থ বৃক্ষের নীচে বিশ্রাম করছিলেন।
কথিত আছে যে, তিনি যখন সেই রাত্রি সেখানে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখন একটি স্বপ্ন দেখলেন। তিনি দেখলেন, লক্ষ্মীদেবী ভগবান জগন্নাথকে বলছিলেন, “ হে ভগবান, কোন ভক্তই প্রসাদ গ্রহণ ব্যতীত পুরী ত্যাগ করেন না। কিন্তু তুলসী দাস কোন প্রসাদ গ্রহণ না করে চলে গেলেন এবং এখন উপবাস করছেন।” তুলসী দাস দেখলেন শ্রীজগন্নাথ এরপর একটি ছোট্ট শিশুর রূপ ধরে তুলসী দাসের কাছে এলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি শ্রীরামচরিতমানসে পরম সত্যর প্রকৃতি সমন্ধে কি লিখেছিলে?” তুলসী দাস জবাব দিলেন-

বিনু পদ চলে শুনে বিনু কানে
করে বিনু কর্ম করে বিধি নান
আনন রহিত সকল রস ভোগী
বিনু বাণী ভক্ত বড় যোগী।
তনু বিনু পরশ নয়ন বিনু দেখে
গ্রাহাই ঘ্রাণ বিনু বাস অশেষ
অসি সব ভান্তি অলৌকিক করণী
মহিমা যশ যার নাহি বরনী।

অনুবাদ : “তিনি পা ছাড়া হাঁটতে পারেন, কর্ণ ছাড়া শ্রবণ করেন এবং হস্ত ছাড়াই সকল কর্ম সম্পাদন করেন। মুখমণ্ডল ছাড়া সকল স্বাদ উপভোগ করেন এবং জিহ্বা ছাড়াও একজন সুচতুর বক্তা। তিনি দেহ ছাড়াই স্পর্শ করেন, চক্ষু ছাড়া দর্শন করেন এবং নাক ছাড়া ঘ্রাণ নিতে পারেন। তার কর্মকাণ্ড এতই আশ্চর্যময় যা বর্ণনার অতীত।”
এরপর ভগবান বললেন, “তুমি ভগবানের যে রূপ বর্ণনা করেছ এটিই কি জগন্নাথরূপে মন্দিরে দেখতে পাও নি?”
তুলসী দাস তৎক্ষণাৎ জেগে উঠলেন। এরপর সমগ্র রাত্রি তিনি রামনাম জপ করলেন। পরবর্তী দিন সকালে দৌড়ে দৌড়ে শ্রীমন্দির গমন করলেন। এইবার যখন তিনি মন্দিরে প্রবেশ করলেন, তখন নাটমন্দিরে রাম, লক্ষণ এবং সীতাদেবীকে দর্শন করলেন।
তুলসী দাস ভগবানের কণ্ঠ শুনতে পেলেন, “হে সাধু! তাকে দর্শন কর যাকে তুমি রামচন্দ্র থেকে ভিন্ন ভেবেছিলে! আমরা এক। যারা আমাকে যেভাবে দর্শন করতে চাই সেভাবে আমি হস্ত, পদ, চক্ষু, মুখমণ্ডল ধারণ করি। আমরা ভক্ত আমাকে যেভাবে দর্শন করতে চায়, আমি সেভাবে রূপ ধারণ করি।”

তুলসী দাস তার ভুল বুঝতে পারলেন এবং ভাবাবেগে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না। চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু বের হতে লাগল। তিনি এরপর গভীর নিষ্ঠা সহকারে ভগবানকে প্রণতি নিবেদন করলেন এবং ভগবানের মহিমা কীর্তন করতে লাগলেন।
তুলসী দাস এরপর সেই স্থানে ফিরে গেলেন যেখানে শ্রীজগন্নাথ তাকে স্বপ্নে দর্শন দিয়েছিলেন। কথিত আছে যে, তিনি সেখান থেকে পুরী মন্দিরের পতাকা দর্শন করে তিনি গাইলেন –

হরি শব্দে মজ রাম শব্দে মজ
তুলসী মানসে দেখে জগৎবন্ধুকা ধ্বজ।
ধ্বজ দর্শনে সকল পাপ হরে
চন্দ্রমুখ দর্শনে জীবন প্রাণ ভরে ॥

সেই স্থানটি পরবর্তীতে তুলসী চৌয়ারা নামে পরিচিত হয়। আবার সেই স্থানে হনুমান বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়। তুলসী দাসের অবস্থানের সময় হনুমান বিগ্রহ, তুলসী পিলার এবং সমগ্র গ্রামকে সুন্দরভাবে সাজানো হয়। এখনো তুলসী চৌয়ারায় সেই বিগ্রহের পূর্জাচনা করা হয়।
পুরীর জগন্নাথ মন্দির দর্শনের সময় তুলসী দাস যেখানে অবস্থান করেন সেখানে পরবর্তীতে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয় যা সিদ্ধ হনুমান বা সিদ্ধ মহাবীর নামে পরিচিত। স্থানীয় ঐতিহ্য অনুসারে, ভগবান রামচন্দ্র স্বীয়ধামে প্রত্যাবর্তনের পর হনুমান এই স্থানে অবস্থান করতে আসেন। মন্দিরটি এখনো বর্তমান এবং এটি গুণ্ডিচা মন্দিরের উত্তর-পূর্বে আধা মাইল দূরে পুরী-কোণার্ক সড়কে অবস্থিত। সিদ্ধ হনুমান মন্দির হল অষ্ট মহাবীর মন্দিরের মধ্যে অন্যতম যা সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হনুমান মন্দিরের অন্যতম। এখানে হনুমান বিগ্রহটি অত্যন্ত মনোরম। এটি ৬ ফিট লম্বা এবং বাম হাতে গদা ধারণ করছেন এবং ডান হাতে গন্ধমাদন পর্বত ধারণ করছেন। এই বিগ্রহের সন্নিকটে রয়েছে ছোট সুগ্রিব, জাম্ববান, বালি, অঙ্গদ এবং হনুমানের অন্যান্য পার্ষদের বিগ্রহ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here