ডাক্তার জগন্নাথ

0
1546
 ভারতী জা:
পারমার্থিক জীবনের যত্ন গ্রহণের পাশাপাশি প্রভু জগন্নাথ তাঁর ভক্তের চিকিৎসা সেবাও প্রদান করে থাকেন এবং ভক্তকে তাঁর আরও সন্নিকটে নিয়ে আসেন। অধিকাংশ লোকই ভগবানের কাছে আসেন হয় দুঃখে না হয় কোনো কিছুর প্রয়োজনে। তারা বিশ্বাসের সাথে গ্রহণ করে যে, ভগবান তাদের জাগতিক জীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান করে দেবে। পাঁচ বছর পূর্বে আমার পরিবার ভারতের উত্তর প্রদেশে গাজিয়াবাদে স্থানান্তরিত হয়। যদিও আমরা দূর্গাদেবীর পূজা করতাম এবং জাগতিক জীবনের অধিকাংশ অংশই পরিবার,বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়দের ছাড়া অন্য কিছুই ভাবতে পারতাম না। আমি সময়ে সময়ে দূর্গাদেবীর কাছে প্রার্থনা করতাম। যত কঠিন পথই হোক না কেন আমাকে যেন তিনি মুক্তি এবং আনন্দ প্রদান করেন। মনে হয় তিনি আমার প্রার্থনাগুলি আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করেছেন।
স্বাস্থ্য যখন বিপন্ন
 
হঠাৎ একদিন আমি অসুস্থ হয়ে পড়লাম, জীবন তখন একভাবে চলছিল। আমার তলপেট এক ধরনের ভারী হয়ে পড়েছিল যা আমাকে মারাত্মক ব্যাথার উদ্রেক সৃষ্টি করেছিল। শুরুর দিকে ব্যাপারটি আমি ততটা নজর দিইনি, ভেবেছিলাম কোনো সাধারণ কিছু হবে। কিন্তু ব্যাথা সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল, শরীরও ফুলে গেল। এটি ছিল অসহনীয়। আমি দিল্লিতে অনেক ডাক্তারের চিকিৎসা গ্রহণ করি। কিন্তু কোনো মতেই অসুখ সারছিল না। ডাক্তার বলল দুগ্ধ ও দুগ্ধ জাতীয় খাবার পরিহার করতে। ব্যাথা দিন দিন বাড়তে লাগল। টানা ছয় মাস আমি ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। যার ফলে শরীরও ভেঙে পড়ল। শরীরের হাড়গুলোতে ফাটল দিতে শুরু করল। হাত ও পায়ের আঙ্গুলগুলো থেকে Pus oozed অবশেষে মারাত্মক দুর্বল হয়ে পড়লাম। অনেক ইনজেকশন দিয়েও সুরাহা হচ্ছে না। এমনকি ঘুমের ঔষধ খেয়েও ঘুম আসছে না। ঐ সময় আমি শত শত বিভিন্ন ধরনের ঔষধ খেয়েছিলাম এবং সে সাথে খরচও করে ফেললাম কাড়ি কাড়ি অর্থ। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ডাক্তাররা অবশেষে রোগ শনাক্ত করল ‘ইরিট্যাবল বাওয়েল সিনড্রোম(IBS),তলপেটে যক্ষ্মা ও পেপটিক আলসার ইত্যাদি সব রোগ একত্রিত হয়ে এই দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। তারা আমাকে সর্তক করল যে,আমি আর বড়জোর এক বা দুই বছর বাঁচব। এটি শোনার পর আমি হতাশায় বিপর্যস্থ হয়ে পড়লাম এবং আমার পরিবার চরম উদ্ধিগ্ন হয়ে উঠল। তারা রাহু,কেতু,মহা-মৃত্যুন্ঞ্জয় ও অন্যান্য গ্রহনক্ষত্রের অশুভ প্রভাব কাটানোর জন্য বিভিন্ন সংস্কারাদি করতে লাগল। আমার সারা শরীরে অনেক পাথর gems পড়ানো হল। যাতে আমার উপর অশুভ প্রভাব কেটে যায়। কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হলো না। আমি অত্যন্ত হতাশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ি।
প্রকৃত ডাক্তারের সঙ্গে সাক্ষাৎ
 
একদা আমার স্বামীর সাথে ইন্ডিয়া গেইটে সংকীর্তনরত কিছু ইস্কন ভক্তদের সাথে সাক্ষাৎ হলো। তারা তাকে একটি জপমালা দিলেন এবং একটি পাম্পলেট দিলেন যাতে লেখা ছিল কিভাবে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করতে হয়। সে আমাকে বাসায় পাম্পলেটটি দেখালো এবং তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম একবার জপ করেই দেখা যাক না। বলাবাহুল্য, আমি ঐ দিন থেকেই জপ করতে শুরু করলাম। তখন আমার মধ্যে এক অপরিমেয় শক্তি অনুভব করলাম। আমি এর প্রভাব দেখে আশ্চর্য হলাম যে,আমি গৃহস্থালি কাজকর্ম করার শক্তি অর্জন করলাম এবং সে সাথে শান্তিপূর্ণভাবে ঘুমাতেও পারছিলাম। পরবর্তীতে আমি এই জাদুকরী মন্ত্র সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলাম। পাম্পলেটে দেওয়া টেলিফোন নাম্বারে ফোন দিলাম, এটি ছিল গাজিয়াবাদের ইসকন মন্দিরের যোগাযোগ নাম্বার। আমি যখন সেই মন্দিরে গেলাম তখন বুঝতে পারলাম এটি তো সেই মন্দির যার পাশ দিয়ে আমি মেডিকেল চেকাপে যেতাম। আসলে আমার অটোরিক্সার ড্রাইভার প্রতিদিন সেখানে প্রসাদ খেতে যেত। কিন্তু তখন আমি কখনো মন্দিরে ঢুকে দর্শনের আগ্রহ প্রকাশ করি নি।
এরপর থেকে নিয়মিতভাবে আমি মন্দিরটি পরিদর্শন করতে লাগলাম এবং শীঘ্রই মন্দিরের বিগ্রহ জগন্নাথ, বলদেব এবং সুভদ্রাদেবীর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়লাম। তাদেরকে দর্শন মাত্রই আমি নিজের মধ্যে শক্তি অনুভব করতাম। একদিন দুপুরের আরতি শেষ করার পর পূজারী আমাকে মাখন প্রসাদ দিলেন। তখনই আমার মনে পড়ে গেল ডাক্তারের নির্দেশ- আমি যেন দুগ্ধ জাতীয় খাবার গ্রহণ না করি,অন্যথা মস্তিষ্কের hemorrhage এ ভুগে আমার মৃত্যু ঘটতে পারে। আমি ডাক্তারের সতর্কতাকে আমলে না নিয়ে জগন্নাথের প্রসাদ আস্বাদন করি। পরদিন আশা করছিলাম হয়তো মারাত্মক কোনো শারীরিক সমস্যা শুরু হবে। কিন্তু আমার কিছুই হলো না এবং ঐ দিন থেকে আমি ডাক্তারের বিধিবদ্ধ নিয়মের বাইরেই চলতে লাগলাম। আমি ভগবানের প্রসাদ পেতে শুরু করলাম। এমনকি সেটি যদি দুগ্ধজাতও হয়। আমি দ্রুতই উপলব্ধি করলাম,জগন্নাথ আমাকে কৃপা বর্ষন করছে। পরবর্তীতে আমার পতি ও দুই সন্তানও সানন্দে কৃষ্ণভাবনা অনুশীলন করতে লাগল।
 
ভগবান জগন্নাথের আগমন
একসময়,আমরা জগন্নাথ পুরীর পবিত্র শহর পরিদর্শনে যাই, আমরা যখন সেখানে ছিলাম, আমার মেয়ে বাসায় পূজা করার জন্য জগন্নাথ, বলদেব এবং সুভদ্রাদেবীর বিগ্রহ নেয়ার জন্য বললেন। বিগ্রহদের যথাযথভাবে যত্ন করতে পারব কিনা তা ভেবে আমি কিছুটা নারাজ ছিলাম । আমি তখন তাকে বললাম যদি প্রভু জগন্নাথ স্বয়ং আমাদের গৃহে আসেন তখন আমি তাঁকে স্বাগত জানাব।
এবং সানন্দে গৃহে তাঁর আরাধনা করব। একদিন নিকটবর্তী একটি পার্কে হাঁটার সময় আমি আশ্চর্য হয়ে একসেট জগন্নাথ বিগ্রহ দেখলাম। আমার স্বামী বলল,’আহ!বিগ্রহ এখানে কি করে সম্ভব? তুমি সর্বদা জগন্নাথকে স্মরণ কর তাই বোধহয় তিনি এখানে চলে এসেছেন ‘। এরপর আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম যে,আমাদের গৃহে প্রভুর পূজা অর্চনা শুরু করব। এখন আমার পরিবার প্রভু জগন্নাথ, প্রভু বলদেব এবং তাদের বোন সুভদ্রা,শ্রী গোপাল,আমার স্বামী, আমি,আমার কন্যা রিচা ও আমার পুত্র চেতরকে নিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ পরিবার,আমরা সবাই প্রত্যহ ১৬মালা হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করি, চারটি বিধিনিষেধ (দ্যুতক্রীড়া,আমিষহার,অবৈধ যৌনসঙ্গ,নেশা বর্জন)পালনের মাধ্যমে ভগবানের বিভিন্ন সেবাকার্য করি। প্রভু জগন্নাথ আমার সমস্ত জাগতিক সমস্যা দূরীভূত করেছে।
 
যদিও বৈদিক শাস্ত্রে জাগতিক লাভের জন্য ভগবানের প্রতি ভক্তি সম্পাদনের প্রতি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে,তবুও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মাঝে মাঝে তার ভক্তদের ওপর জাগতিক পুরস্কার প্রদান করে থাকেন।ভগবানের এই রকম প্রীতি বিনিময় ভক্তের কাছে অত্যন্ত আনন্দের এবং তা তার ভক্তিমূলক সেবার ক্ষেত্রে বিশ্বাস বৃদ্ধি করে। তবে এক্ষেত্রে ভক্তকে অবশ্যই সর্বদা ভগবানের প্রতি অহৈতুকী শুদ্ধ ভক্তিপূর্ন সেবা নিবেদন করার প্রতি আগ্রহী হতে হবে। শুধুমাত্র এই ধরনের সেবা কাউকে ভগবানের প্রতি শুদ্ধ ভক্তিপূর্ণ সেবা নিবেদনের সবোচ্চ  লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা প্রদান করবে।
                                                                                                হরে কৃষ্ণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here