ট্রি অফ লাইফ

0
26

বাহরাইনের অদ্ভুত এক বৃক্ষ!

কল্যাণী আজরেকার

যখন আমার ভাই বাহরাইন বেড়াতে যান, তখন তিনি সেখানকার একটি বিখ্যাত বৃক্ষ দেখতে গিয়েছিলেন। যেই বৃক্ষটির নাম দেওয়া হয় ‘Tree of life’ অর্থাৎ ‘জীবনের বৃক্ষ’। তিনি আমাকে সেই বৃক্ষের ছবিটি দেখিয়ে বলেছিলেন, এর অস্তিত্বের পেছনে কিছু অদ্ভুত কার্যকলাপ রয়েছে, ছবিটি দেখে আমার অনুভব হয় অদ্ভুতই বটে! এই বৃক্ষটির মাধ্যমে আমরা কিছু পারমার্থিক শিক্ষা লাভ করতে পারি।
এর প্রকৃত নাম ‘মেসকুইট ট্রি’ যেটি বাহরাইনের উত্তপ্ত মরুভূমিতে একা ঠাই দাঁড়িয়ে আছে।
মুরুভূমিতে এই বৃক্ষের বেঁচে থাকাটাই অলৌকিক, কেননা মরুভূমিতে কোনো জলের উৎস নেই। তবুও বৃক্ষটি ৪০০ বছর ধরে এখানে দাঁড়িয়ে আছে এবং সবুজ পাতা দ্বারা আবৃত হয়ে বছরে দুইবার ফুলও দিয়ে থাকে। ৩২ ফুট উঁচু এই বৃক্ষটি মরুভূমির চরম্ উত্তাপ, বিশাল বালু ঝড় এবং জলের অভাব সত্ত্বেও বেঁচে আছে। তাই এই আশ্চর্য বৃক্ষটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ট্রি অফ লাইফ’।
অনেকে জল্পনা কল্পনা করে কীভাবে বৃক্ষটি জীবন ধারণ করে, কীভাবে এটি জল শোষণ করে ।
কিছু বিজ্ঞানী বলেন যে, নিকটবর্তী জলের উৎস হল মাটির নীচে দুই কি.মি. দূরে। তার মানে বৃক্ষটি জল শোষণের জন্য এত দূর পর্যন্ত তার শিকড় বিস্তৃত করেছে।
অন্য বিজ্ঞানীরা বলেন, এই বৃক্ষটির একটি অলৌকিক শক্তি রয়েছে যা পারস্য উপসাগর থেকে প্রবাহিত বায়ুর মধ্যে অবস্থিত জলকে পৃথকীভূত করে শোষণ করতে পারে। আবার অনেকে বলেন যে, এই বৃক্ষটি বালির ওপর চাপ প্রয়োগ করে বালি থেকে জল পৃথক করে শোষণ করার মাধ্যমে বেঁচে থাকার কৌশলটি রপ্ত করেছে। কিছু লোক বিশ্বাস করে, বৃক্ষটি স্বর্গের উদ্যানের প্রকৃত স্থানটি চিহ্নিত করে এবং এর মাধ্যমে বেঁচে থাকার জন্য বিশেষ আশীর্বাদপুষ্ট হয়েছেন। এত সব তথ্যের পর এই বৃক্ষটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি হল, জীবনে যে পরিস্থিতিই আসুক না কেন, আমাদের সাথে সর্বদা কৃষ্ণের কৃপা রয়েছে। আমাদের যেটি প্রয়োজন তা হলো এই কৃপাকে গ্রহণ করা। এজন্য পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাথে সম্বন্ধ স্থাপন করতে হবে। ভক্তির শিকড় হৃদয়ের গভীরে এমনভাবে প্রসারিত করতে হবে, যাতে জড় জগতের সবকিছুর সঙ্গে কৃষ্ণকে সংযুক্ত করতে পারি। পারিপার্শ্বিক প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য হয়তো আমাদের অনেক অভিযোগ থাকতে পারে। এজন্যে আমরা বিভিন্ন দোষ ত্রুটিরও অনুসন্ধান করি। কিন্তু এভাবে এ জগতে নিজেদের উন্নতি সম্ভব নয়। এই মানবজীবন হল কৃষ্ণের সঙ্গে আমাদের হারানো সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করা। যেটি আমরা লাভ করতে পারি নিরবচ্ছিন্নভাবে ভগবানের সেবা এবং তাঁর সন্তুষ্টি বিধান করতে হবে।
আমাদের পূর্বতন আচার্যগণ যে সহজ সরল পন্থা প্রদর্শন করেছেন তা অনুসরণের মাধ্যমে আমরা কৃষ্ণের অপ্রাকৃত কৃপাকে আকর্ষণ করতে পারি।
আমাদের উচিত সর্বদা কৃষ্ণকে স্মরণ রাখা, তাঁকে কখনো ভুলে না যাওয়া। কিন্তু বাস্তবে এটি অনুশীলন করা দুরূহ মনে হতে পারে। সৌভাগ্যবশত, দুরূহ পরিস্থিতিতে অর্জুনেরও এই অনুসন্ধান ছিল এবং তাই তিনি কৃষ্ণের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। কৃষ্ণ আমাদের জন্য এটি অত্যন্ত সরল করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সমস্ত জীব প্রজাতির মধ্যে তিনি বিশেষ ঐশ্বর্যরূপে বর্তমান রয়েছেন। এই বিশেষ ঐশ্বর্য আমাদেরকে কৃষ্ণের সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপনে সহজ করে তোলে।
‘ট্রি অফ লাইফ’ বৃক্ষটি প্রদর্শন করে যে, কীভাবে সর্বদা কৃষ্ণভাবনাময় হয়ে থাকা যায়। উত্তপ্ত বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে, তপ্ত রোদ বিকিরণ হচ্ছে যা বৃক্ষটির পাতাগুলো শুকিয়ে দিতে চেষ্টা করছে তবুও এটি বেঁচে আছে। ‘ট্রি অফ লাইফ’ এর মাধ্যমে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, কৃষ্ণ অগ্নির উত্তাপ রূপে বর্তমান যখন উত্তপ্ত বায়ুর মাধ্যমে পাতাগুলো নড়ে, এর মাধ্যমে আমরা স্মরণ করতে পারি যে, পরিশোধনকারীদের মধ্যে কৃষ্ণ হলেন বায়ু। অতএব, তার ইচ্ছা ছাড়া একটি পাতাও নড়ে না। যেহেতু বৃক্ষটির কোনো জলের উৎস নেই, তাই সে দূরের কোনো উৎসের অনুসন্ধান করছে। তদ্রুপ আমাদের জীবনে যে পরিস্থিতিই আসুক না কেন, যখন আমরা দেখব এর প্রকৃত কারণ হলো কৃষ্ণ স্বয়ং, তখন আমরা সেই পরিস্থিতি হাসিমুখে বরণ করে নেব।
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে কৃষ্ণকে অনুসন্ধান করার মাধ্যমে কৃষ্ণের প্রতি বিশ্বাসকে সুদৃঢ় করতে হবে। কৃষ্ণের প্রতি সুদৃঢ় বিশ্বাস আমাদেরকে জীবনের সুখ-দুঃখ, সফলতা-ব্যর্থতা, আনন্দ বেদনা, প্রশংসা-পরিহাস এই দ্বন্ধগুলো গ্রহণে সহায়তা করে। যখন বিশ্বাসের শিকড়সমূহ গভীর থেকে গভীরে যায়, তখন কৃষ্ণের ওপর নির্ভরশীলতাও বৃদ্ধি পায়। এভাবে তখন কেউ পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করে। সময় যত অতিবাহিত হয় ততো কৃষ্ণ একটি সুযোগ করে দেয় যাতে উত্তপ্ত মুরুভূমিতে ‘ট্রি অফ লাইফ’ এর মতো প্রত্যেকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে পারি। এর মাধ্যমে যেন আমরা উত্তপ্ত বায়ুর মতো যত ধরনের সমস্যা বা প্রতিকূলতা আসে তার মাঝেও আমাদের দৃঢ়তা প্রমাণ করতে পারি এবং উৎসাহের সাথে হরিনাম শ্রবণ-কীর্তনের স্বাদরূপ জলের উৎসের অনুসন্ধান করতে পারি। যদি কৃষ্ণ দেখেন আমরা ব্যর্থ হচ্ছি তখন তিনি আমাদের সুরক্ষা করেন এবং আমাদের যা প্রয়োজন তা সরবরাহ করেন। ভগবানের কাছ থেকে এ প্রকার সুরক্ষা লাভ করে ভক্ত পুনরায় কৃষ্ণ অনুসন্ধান; তাঁর পবিত্র নাম জপ, তাঁকে সেবা করতে ও তাঁকে প্রসন্ন করতে দৃঢ় হয়।


কল্যাণি আজরেকর মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্টের ওপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট। তিনি মুম্বাইয়ে শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য কৃষ্ণভাবনামূলক বিভিন্ন কোর্স পরিচালনা করেন। 


 

 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, এপ্রিল -জুন ২০১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here